সিডনির অনিক এখন চিরঘুমে রকউড গোরস্তানে

সিডনির অনিক এখন চিরঘুমে রকউড গোরস্তানে

ফজলুল বারী: শোকার্ত বাবা-মা-ভাই-স্বজন, সহপাঠী-বন্ধুরা চোখ ভেজানো কান্নায় শেষ বিদায় জানালেন অনিককে। মনোয়ার সরকার অনিক (২৪) । অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বুকে বেড়ে ওঠা মেধাবী বাংলাদেশি প্রজন্ম। ইউনিভার্সিটি অব নিউসাউথ ওয়েলস থেকে প্রকৌশল ডিগ্রী অর্জনের পর সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছিলেন অনিক। ২৯ সেপ্টেম্বর যখন অনিক বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে বের হবেন এর আগেই মা জানতেন তারা ক্লিফটন পাহাড়ের দিকে যাবেন। মা তখন অনিককে ডেকে সতর্ক করে বলেন, দুষ্টুমি কম করবি, সাবধানে থাকবি। মায়ের কথায় অনিক আবার তার সামনে ফিরে আসেন। মায়ের মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে একবার হাসেন। মাকে আশ্বস্ত করার হাসি। সেই শেষ হাসি। সন্তানের সঙ্গে এটিই তার শেষ কথা। শেষ বিদায়। নাড়ি ছিঁড়ে জন্মদেয়া, বড় করা সেই সন্তানকে কবরের মাটির বিছানায় শুইয়ে রেখে সেই মা কী করে একা ফিরেন ঘরে! কবর দেয়া শেষ। কিন্তু মা’তো স ন্তানকে এভাবে একা ফেলে রেখে ফিরতেই চাইলেননা। শুধুই অঝোরে কাঁদছিলেন মা। স্বজনরা ধরাধরি করে বুঝিয়ে তাকে ফিরিয়ে নিতে উদ্যত হতেই মুর্ছা গেলেন মা। অনিকের সহপাঠীরাও সবাই তখন কাঁদছিলেন। সবাই তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী। সবার পরনে শোকের কালো পোশাক। বেশিরভাগই চীনা বংশোদ্ভূত।

পাহাড় ভালো আসতেন অনিক। কবিতা লিখতেন। ভালোবাসার পাহাড়েই ঘটলো তাঁর জীবনের শেষ। ২৯ সেপ্টেম্বর বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলেন ক্লিফটন পাহাড়ে। সেখানে অসতর্ক পা পিছলে পড়ে যান অনেক নীচে। দূর্ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। মূহুর্তে খবর চলে যায় পুলিশের কাছে। পুলিশ উদ্ধার করে তাঁর প্রানহীন মৃতদেহ। এরপর লাশ হাসপাতাল হয়ে হিমঘরে। খবর পেয়ে শারজাহ থেকে ছুটে আসেন বাবা অধ্যাপক ইলিয়াস সরকার। তিনি সেখানে শারজাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। এমন পরিস্থিতি কোন একজন বাবা বা মায়ের জন্যে কতোটা দূর্যোগপূর্ন তা শুধু ওয়াকিফহালরাই শুধু জানেন। বাবা’র কাঁধে সন্তানের লাশ পাহাড়ের চেয়ে ভারী হয়। বুধবার সবাই সেটি লাকেম্বা মসজিদ আর সিডনির রকউড গোরস্তানে দেখেছেন।

দূর্ঘটনায় মৃতের আইনানুগ নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে অক্টোবরের ৩ তারিখে অনিকের মরদেহ স্বজনের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। ৪ অক্টোবর জোহরের নামাজের পর জানাজা হয় লাকেম্বার বড় মসজিদে। সেখানে অনিকের বাবা অধ্যাপক ইলিয়াস সরকার, একমাত্র অনুজ ভাইসহ সিডনির বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের বিশিষ্ঠজনেরা, অনিকের বন্ধু-বান্ধব-সহপাঠীরা উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন অনিকের অধ্যাপক বাবা’র অনেক ছাত্রছাত্রী। অনিকের শিক্ষকরাও ছিলেন অকাল প্রয়াত ছাত্রের শেষকৃত্যে। সবাই চোখ মুছছিলেন বারবার। কান্না ছাড়া প্রতিক্রিয়া প্রকাশের ভাষা যে কারো জানা ছিলোনা। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বজনীন এটিই যে প্রতিক্রিয়ার চেনাজানা ভাষা।

অনিকের বাবা অধ্যাপক ইলিয়াস সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। অস্ট্রেলিয়ায় পিএইচডি করতে এসে অভিবাসন নিয়ে এখানেই থিতু হন। এরপর চাকরি নিয়ে চলে যান আরব আমিরাতের শারজাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনিকরা দুই ভাই মায়ের সঙ্গে থাকতেন সিডনিতে। পেশাগত প্রয়োজনে বাবা ভিন্ন দেশে বড় সময় থাকতেন বলে এখানে সিডনিতে বাবা-মা দু’জনের দায়িত্বই পালন করতেন অনিকের মা। সেই বড় ছেলেকে একা কবরে শুইয়ে রেখে মা কী করে ফেরেন ঘরে। কিন্তু মৃত্যু যে এরচেয়েও কঠিন করুন সত্য। যেতে নাহি দেবো তবু যেতে দিতে হয় তবু চলে যায়। রকউড গোরস্তানের মুসলিম এলাকার কবরে শেষ শয্যায় শুইয়ে সবাইকেই একে একে চলে আসতে হয়। জীবন ব্যস্ততায় বুধবারের শেষকৃত্যে যোগ দেয়া অনেকে হয়তো আর কোন দিন রকউড গোরস্তানে যাবেননা। কিন্তু একজন বারবার যাবেন। তিনি মা। কবরের পাশে বসে বসে কাঁদবেন একা একা। মায়ের সংজ্ঞাটি পৃথিবীর কোথাও কাউকে নতুন করে বলে শিখিয়ে দিতে হয়না।

 


Place your ads here!

Related Articles

নাজিম উদ্দিনরাই এই সময়ের হিরো

ফজলুল বারী: গ্রামের রাস্তায় আগে একটা দৃশ্য প্রায় দেখা যেতো। এখন সেটি দেখা যায় কীনা জানিনা। তাহলো, এক ভিক্ষুক আরেক

On democratic autocracy

The concepts of democracy and autocracy are apparently contradictory. Democracy is a system of government where people elect their representatives

অনু গল্প : ক্ষণিকা

আমাকে বলেছিলো “ক্ষণিকা”, রেস্টুরেন্টের নাম। ওখানেই ও অপেক্ষা করবে। আমি সিএনজি থেকে নামলাম রাস্তার এক পাশে – রাস্তার ঠিক ওই

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment