যুদ্ধাপরাধী সাঈদি চান্দে!
ফজলুল বারী: হিজরী ১৪৩৮ সাল এখন। অর্থাৎ এ পর্যায়ের ইসলাম ধর্মের বয়স ১৪০০ বছরেরও অনেক বেশি। এ ধর্মের শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ(দঃ)। মুসলমানরা তার নাম উচ্চারনের সঙ্গে শ্রদ্ধায় দুরুদ পড়েন। এ ধর্মের আরও অনেক নবী পয়গম্বর আছেন। ইসলাম প্রচারে বাংলাদেশ অঞ্চলে আসেন হযরত শাহ জালাল(রঃ), শাহ পরান(রঃ) সহ তাদের সাড়ে তিনশ’র বেশি সঙ্গী। ধর্মপ্রান মুসলমানরা এদের স্বপ্নে দেখেন বলেও গল্প করেন। কিন্তু শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ(দঃ) থেকে শুরু করে ইসলামের নবী-পয়গম্বর কাউকে কখনো চাঁদে বা মহাকাশের কোথাও দেখা গেছে এমন দাবি বাংলাদেশ বা বিশ্বের কোন অঞ্চলের মুসলমানরা কখনও করেননি। কিন্তু বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর লোকজন তাদের সাঈদিকে চাঁদে দেখা যাবার মিথ্যা দাবি করেছে! শুধু দাবি করা নয় এই মিথ্যা দাবির গুজব-ফানুস ছড়িয়ে তারা দেশের একটি অঞ্চলে তান্ডব পর্যন্ত চালিয়েছে। কারন এটি একটি ধর্মাশ্রয়ী মিথ্যাবাদীদের সংগঠন।
সাঈদির মিথ্যাচার নিয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো এই সুযোগে বলি। আমার পায়ে হেঁটে বাংলাদেশ ভ্রমনের সময় আমি এলাকার এলাকার মুক্তিযোদ্ধা-রাজাকারদের তালিকা সংগ্রহ করতাম। কিন্তু পিরোজপুরের সাঈদখালী যেখানে সাঈদির বাড়ি সেখানে আমার যাওয়া হয়নি। আমার সংগ্রহ করা রাজাকারের তালিকা বিচিন্তায় ছাপা হচ্ছে দেখে পিরোজপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড তাদের প্যাডে আমাদের একটি চিঠি লিখে। এটি ১৯৮৭ সালের কথা। ওই চিঠিতে তারা জানায় একাত্তরে তাদের এলাকায় দেইল্লা রাজাকার নামের এক হিংস্র প্রকৃতির রাজাকার ছিলো। সে তখন অনেক খুন খারাবি-ধর্ষন করেছে। গরিব রাজাকার হওয়াতে হিন্দু বাড়ি লুটের মালামাল হাটবারে সে পাড়েরহাট বাজারে বিক্রিও করতো। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পর এলাকা থেকে পালিয়ে যাওয়াতে তারা তাকে ধরতে পারেননি। সেই চিঠির উপসংহারে বলা হয় সেই দেইল্লা রাজাকার এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেলোয়ার হোসেন সাঈদি নামে ওয়াজ করছে!
পিরোজপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডের চিঠিটা পাবার পর সাঈদির বক্তব্য নেবার জন্যে আমরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। সাঈদি তখনও জামায়াতে ইসলামীতে অফিসিয়েলি যোগ দেননি। রাজারবাগ এলাকায় থাকতেন। কিন্তু বিষয়টির উল্লেখ করে সাক্ষাৎকার চাইলে এড়িয়ে যেতে চান। কয়েকবার যোগাযোগের পর এক পর্যায়ে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হন অমুক দিন সন্ধ্যায়। সেই সন্ধ্যার আগে ফোন করে তার বাসার ঠিকানা চাইলে এক মহিলা ফোন ধরে বলেন, সাঈদিতো বাসায় নেই। বিদেশে গেছেন। আমাকে সাক্ষাৎকারের সময় দিয়েছেন, আর বিদেশেতো একজন মানুষ হঠাৎ করে যায়না, আগের থেকে প্ল্যান-প্রোগ্রাম করে যায় এ কথা বললে সেই মহিলা কোন জবাব না দিয়ে ফোন রেখে দেন। সাঈদির মিথ্যাচার বুঝতে পেরে আমরা আর তার অপেক্ষা না করে পিরোজপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সেই চিঠিটিই বিচিন্তায় ফিল্ম করে ছাপি। পরবর্তিতে দৈনিক জনকন্ঠের ‘সেই রাজাকার’, গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্টে সাঈদির যুদ্ধাপরাধ বৃত্তান্ত উঠে আসে। জনকন্ঠের রিপোর্টের পর সাঈদি পত্রিকাটির পিরোজপুর প্রতিনিধি শফিউল ইসলাম মিঠুকে মেরে ফেলতে তার ওপর হামলা চালায়। মিঠু সেদিন সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও তাকে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে হয়েছে। আজও তিনি পুরোপুরি সুস্থ হননি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার ক্ষমতায় এসে প্রবীর শিকদার, মিঠুর মতো এমন মাঠ পর্যায়ের নির্যাতিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন সময়ে তার বিদেশ সফরে সঙ্গী করে তাদের ত্যাগের কিছুটা স্বীকৃতি দেবার চেষ্টা করেছেন। সাঈদি রাজাকার ছিলেন কিনা এমন একটি প্রশ্ন বিভিন্নভাবে তার উদ্যোগে ছড়ানো হয়। এই প্রোপাগান্ডায় আওয়ামী লীগের অনেকেও এ ইস্যুতে আচ্ছন্ন! এটাতে অনেকের একিনও আসে। অনেকে বলার চেষ্টা করেন সাঈদি জামায়াতে যোগ দেবার পর অনেকের রাজনৈতিক আক্রোশে পড়েছেন! এমন প্রচারনার জবাবে আমরা বলি, ১৯৮৭ সালের বিচিন্তার ফাইল দেখুন। আমরা যখন সাঈদির রাজাকারি-যুদ্ধাপরাধের বৃত্তান্ত প্রথম তুলে ধরি তখন সাঈদি জামায়াতের প্রাথমিক সদস্যও ছিলেননা। সাঈদির ভক্তরা তার চতুর ভূমিকাটির কথাও ভুলে যান। একাত্তরে সাঈদির নামশুধু দেলোয়ার হোসেন ছিল। বাংলাদেশের নোয়াখালী বরিশাল বেল্টে নামের সংক্ষিপ্ত ডাকতে গিয়ে অনেক বিকৃতিও হয়। যেমন কামাল হয়ে যায় কামাইল্লা! এক্ষেত্রে দেলোয়ার হয়ে গেছে দেইল্লা, দেইল্লা রাজাকার। বিচারও হয়েছে একজন দেইল্লা রাজাকারের।
বাংলাদেশে গ্রামে গঞ্জে যারা ওয়াজ করেন তারা নামের সঙ্গে এলাকার নাম যুক্ত করেন। যেমন বদরপুরী, করিমপুরী। এটা মুসলিম বিশ্বেও আছে। যেমন বাগদাদী অথবা বুগদাদী। নিজের গ্রামের সাঈদখালী নাম যুক্ত করে দেলোয়ার হোসেন তথা দেইল্লা রাজাকারকে আড়াল করতে ইনিও দেলোয়ার হোসেন সাঈদি হয়ে যান! রংপুরের একটি কলেজে কিছুদিন প্রভাষকগিরি করে গোলাম আযম যেমন মিথ্যুকের মতো নিজেকে অধ্যাপক লিখতে শুরু করেন, সাঈদিও পরে নিজেকে লিখতে শুরু করেন আল্লামা! আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদি! অথচ কি কি যোগ্যতায় একজন অধ্যাপক বা আল্লামা হন, এই পদবীগুলো কারা দেয় সরল মানুষেরা সে প্রশ্নটিও কোনদিন তাদেরকে করেননি। সাঈদির পৈত্রিক নামবদলের এসব এফিডেবিট কোথায় কবে হয়েছে তা কেউ জানেনা। এত মিষ্টি মিষ্টি কথা, যৌন উত্তেজক কথা বলে যিনি ওয়াজ করেন ইনি কখনও কপট বা মিথ্যাবাদী হতে পারেন এটি তার ভক্তদের পক্ষে চিন্তা করাটাও কঠিন। কপটরা এরও সুযোগ নেয়।
সাঈদির মিথ্যাচারের আরও দুটি ঘটনা বলি। ঘটনাক্রমে এই রিপোর্টগুলোও আমার হাতে হয়েছে। ৯/১১ এর পর আমেরিকানরা ‘নো ফ্লাই প্যাসেঞ্জারস লিস্ট’ নামে একটি তালিকা করে। আমেরিকার জন্যে কারা কারা বিপদজ্জনক ব্যক্তি, আমেরিকায় কোন কোন যাত্রীর প্রবেশ নিষিদ্ধ এমন একটি তালিকায় বাংলাদেশের শুধু সাঈদির নাম ছিল। বিএনপি তখন মাত্র ক্ষমতায় এসেছে। যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতের দুই সদস্য মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ তখন খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভার সদস্য, সে কারনে চেপে যাওয়া হয় বাংলাদেশ সরকার তথা সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কাছে আসা তালিকাটি। ওই তালিকার সঙ্গে চিঠিতে লিখা হয় সাঈদিকে যাতে আমেরিকাগামী কোন বিমানে চড়তে দেয়া না হয়। কিন্তু ধর্মের কল যে বাতাসে নড়ে! এখন যেমন ৫৭ ধারার ভয় অথবা ফেসবুকে অনেকে অনেক তথ্য নিজেরা প্রকাশে অনিরাপদ মনে করলে তা আমার ইনবক্সে দেন, তেমনি সিভিল এভিয়েশনের কোন একটি অজ্ঞাতনামা সূত্র তখন চিঠিটির ওপরে এটেনশন ফজলুল বারী লিখে পাঠিয়ে দেন জনকন্ঠ অফিসের ফ্যাক্সে। সেটি নিয়ে রিপোর্ট করার পর রিপোর্ট মিথ্যা-মনগড়া উল্লেখ করে সাঈদি প্রতিবাদ পাঠিয়েছিলেন! প্রতিবেদকের বক্তব্যে লিখেছিলাম, এটিতো মার্কিন ডকুমেন্ট, প্রতিবাদতো করবেন ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে। এই জবাবে চুপ মেরে যান মিথ্যাবাদী সাঈদি। এরপর আর কোনদিন সাঈদি আমেরিকা যাবার চেষ্টা করেননি। অথচ আমেরিকায় তার ওয়াজের ভালো একটি বাজার ছিলো।
২০০৪ বা ২০০৫ সালে সাঈদি শেষবার ব্রিটেনে যান। এর আগে আমার হাতে আসা কক্সবাজার এলাকায় তার একটি ওয়াজের ভিডিও ক্লিপিং নিয়ে যান বিলাতের চ্যানেল ফোরের এক সাংবাদিক। ওই ওয়াজে ইরাক যুদ্ধের প্রতিশোধ নিতে মার্কিন ও ব্রিটিশ স্থাপনায় আক্রমনের উস্কানি ছিল। সাঈদি ওয়াজ উপলক্ষে লন্ডন পৌঁছলে তাকে নিয়ে একটি রিপোর্ট করে চ্যানেল ফোর। ওই রিপোর্টে প্রশ্ন তুলে বলা হয় ব্রিটেনের স্বার্থের পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ এমন একজন ব্যক্তি বিলাতে প্রবেশের ভিসা পেয়েছে কী করে। এ নিয়ে টাগ অব ওয়ার শুরু হয় বিলাতের হোম অফিস আর ফরেন অফিসের মধ্যে। আসলে সাঈদিকে ওই সফর উপলক্ষে ফরেন অফিস তখন ভিসা দেয়নি। সাঈদির পাসপোর্টে আগে থেকেই পাঁচ বছরের মাল্টিপল ভিসা ছিল।
মিডিয়ার চাপে তখন বিলাতের হোম অফিস সাঈদির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার পথ খোঁজ শুরু করে। বিলাতে তখন লেবার পার্টির সরকার ক্ষমতায়। লন্ডনের বিখ্যাত বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট রেডফোর্টের মালিক আমিন আলীর সঙ্গে লেবার পার্টির উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। পরামর্শের জন্যে ব্রিটিশ গোয়েন্দারা গেলেন আমিন আলীর কাছে। তারা জানতে চাইলেন সাঈদিকে আটক করে মার্কিন কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিলে কেমন হয়। ঠান্ডা মাথার আমিন আলী বললেন এমন কিছু করলে সাঈদি উল্টো আন্তর্জাতিক ফিগার হয়ে যাবে। এর চাইতে আমরা তাকে বার্তা পাঠাই যে ব্রিটিশ গোয়েন্দারা তাকে ধরে আমেরিকার হাতে তুলে দেবার চিন্তা করছেন! আমিন আলীর ধারনা ছিলো এমন বার্তা পেলে সাঈদি নিজেই চলে যাবেন। হলোও তাই। আমেরিকার ওয়াজের বাজার হারানোর পর বিলাতের ওয়াজের বাজার ছিলো সাঈদির রোজগারের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু ওই বার্তা পেয়ে চুপচাপ সব প্রোগ্রাম বাতিল করে সাঈদি দেশে ফিরে যান। এই রিপোর্টও আমার হাতে জনকন্ঠে ছাপা হয়েছিল। সাঈদি এই রিপোর্টের অবশ্য প্রতিবাদ করেননি। চুপচাপ হজম করে গেছেন। এমন পরপর আমেরিকা-ব্রিটেনের ওয়াজ বাজার হারিয়ে যুদ্ধাপরাধের মামলায় পড়ার আগে থেকেই অর্থনৈতিক সংকট তার সঙ্গী হয়েছিল।
একাত্তরের হিংস্র রাজাকার তথা আজকের সাঈদির বিচারের ফাঁসির আদেশ দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল। এরপর একাত্তরের এই খুনিকে চাঁদে দেখা যাবার গুজব ছড়িয়ে তান্ডবের কাহিনী সবাই জানেন। এই তান্ডবে পরে সরকার হয় ভীতসন্ত্রস্ত হয়েছে অথবা দূর্বল ঈমানের কারনে তার রায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে! এমন লিখার কারনটিও বলছি। সাঈদির ট্রাইব্যুনালে ফাঁসির রায় যখন সুপ্রীমকোর্টে তখন আপীল বিভাগের কয়েকজন বিচারক একসঙ্গে অস্ট্রেলিয়া সফরে আসেন। সেই বিচারকদের একজনের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তার একটি মন্তব্যে চমকে উঠি! আমাকে তিনি বলেন, সাঈদির ফাঁসির রায় মনে হয় বহাল থাকবেনা! কারন সরকার এ ইস্যুতে দেশে আর গোলমাল চাচ্ছেনা! অবাক হয়ে শুনেছি আর হজম করেছি সেই বক্তব্য! পরে কী হয়েছে সবাই জানেন। এরপর আবার রিভিউতে যখন আমৃত্যু সাজা বহাল থাকলো তখন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের হতাশা, ট্রাইব্যুনালের দূর্বল প্রসিকিউশন টিমকে দোষা্রূপের পর সাঈদির নানা বিষয় আবার সামনে এসেছে। যুদ্ধাপরাধী সাঈদির হেড উকিল, খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেন খুশিতে বলেছেন, রিভিউতে ফাঁসি না হওয়ায় সাঈদির জান বাঁচলো। এতে করে ভয় রইলো সাঈদির জীবদ্দশায় বিএনপি ক্ষমতায় ফিরতে পারলে তাকে ছেড়ে দেয় কিনা! অথবা দূর্বল ঈমানের আওয়ামী লীগও তা করে বসে কিনা! শেখ হাসিনার পাশে তেঁতুল হুজুরের ছবি এটি কী কিছুদিন আগে কেউ কল্পনায় ভেবেছেন?
Related Articles
Prahelika 1 2: Contemporary Bangla music at its Best
Obaidur Rahman is a Dhaka based Bangladeshi singer/musician/songwriter and very recently this young artist has came out with his self-produced
Questioning the Effectiveness of Technical Cooperation in Bangladesh
An Overview of Technical Cooperation Vision 21 Plan, also known as the Perspective Plan (2010 – 2021), provides a road
Brothers set to be Japan’s Prime Minister and the Opposition Leader
Japanese voters have swept the conservative government of Liberal Democratic Party headed by Prime Minister Taro Aso. The LDP except


