আগস্টের ছয় তারিখে ওপেনহেইমারের ‘লিটল বয়’এর তান্ডব

আগস্টের ছয় তারিখে ওপেনহেইমারের ‘লিটল বয়’এর তান্ডব

দিলরুবা শাহানা: একদিন পৃথিবীতে ডাইনোসররা ঘুরে বেড়াতো কোথায় তারা আজ? নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে তাইতো। মানুষ এভাবে নিশ্চিহ্ন হবে না কারন মানুষ সেরা জীব, বুদ্ধিমান প্রাণী তার সবকিছু বিস্মৃতির অতলে হারায় না। তাই মানুষের বিস্ময়কর সুকীর্তির পাশাপাশি কুকীর্তির  স্মৃতি জাগানিয়া ছয় আগস্ট প্রতি বছর মানুষের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে।

গভীর বিশ্বাস এই একমাত্র আত্মরক্ষার যুদ্ধ ছাড়া আর কোন যুদ্ধই কোন মঙ্গল বয়ে আনেনা।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে ৯ই মে’ জার্মানীর পতন ঘটে তৎকালীন সোভিয়েট বাহিনীর হাতে। পাঁচবছর ব্যাপী চলা যুদ্ধে হিটলার বাহিনী ৬০লক্ষ ইহুদী মানুষকে হত্যা করে এবং এই যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে সরাসরি অস্ত্রের আঘাতে ও পরোক্ষে ক্ষুধামন্দায় কোটির উপর সোভিয়েত জনগণ প্রাণ হারায়। তখনকার ইউএসএসআর আজকের রাশিয়া ও তার প্রতিপক্ষ ন্যাটো আবার যুদ্ধ শুরু করেছে উক্রাইন(ইউক্রেন)কে ঘিরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়াতে নারী-পুরুষের আনুপাতিক হারে যে খামতি দেখা দেয় তাতে অনেক নারীই ঘরবাঁধার জন্য পুরুষ সঙ্গী পাননি। সে সব স্মৃতি ভুললে চলবে না, চর্চ্চা করতে হবে বারবার।

সম্প্রতি প্রয়াত বিশ্ববন্দিত চেক লেখক মিলান কুন্ডেরা জরুরী একটি কথা বলেছেন লেখক হওয়া মানে সত্য আবিষ্কার করা। কিংবা ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই হচ্ছে ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে মনে রাখার লড়াই।

কুন্ডেরার ভাষ্যকে এভাবেও বলা যায়‘মানুষের বড় লড়াই হচ্ছে বিস্মৃতির সাথে স্মৃতির লড়াই’।

কি ঘটেছিল ছয় আগস্ট ১৯৪৫সালে? ছয় আগস্ট একই সাথে মানুষের কীর্তি আর কুকীর্তির বয়ান। মানুষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে এসে অসাধারন এক অর্জন করে।  পারমানবিক  বোমা তৈরীতে সক্ষম হয় আমেরিকা। তার সফল মহড়াও হয় জুলাই মাসে নিউ মেক্সিকোতে। অল্প কয়দিন পরেই ১৯৪৫এর ছয়ই আগস্ট ‘লিটল বয়’ নামের পারমানবিক বোমাটি আমেরিকা নিক্ষেপ করে জাপানের হিরোশিমায়।

সে বোমার তান্ডবে তাপমাত্রা হয় ৪০০০ডিগ্রী সেলসিয়াস। তিন কি চার কি.মি. জায়গা তাৎক্ষনিকভাবে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। বোমার রেডিয়েশনে বংশানুক্রমে মানুষ ভুগেই যাচ্ছে । নয়ই আগস্ট আমেরিকার দ্বিতীয় পারমানবিক বোমা ‘ফ্যাট ম্যান’ আঘাত হানে জাপানের নাগাসাকি শহরে। এসব নিয়ে অনেক বই লেখা হয়েছে, সিনেমা বানানো হয়েছে। সময়ে সময়ে ঝড় তুলে বিষয়গুলো।

খুব সতর্কতা ও সাবধানে তৈরী এ্যাটোমিক আর্খাইবের(ARCHIVE) হিসাব মতে ওই মূহূর্তে, ওই জায়গায় মারা যায় ৬৬,০০০হাজার মানুষ।

পারমানবিক বোমায় সৃষ্ট রেডিও এ্যাক্টিভ পার্টিকেল নিয়ে ‘কালো বৃষ্টি’ ঝরে ব্যাপক এলাকায় দূষণ ছড়ায়। ইউএস-জাপানীজ রেডিয়েশন এফেক্টস রিসার্চ ফাউন্ডেশন ইঙ্গিত দেয় যে পারমানবিক বোমা নিক্ষেপের প্রথম ৪মাসের মাঝে ৯০,০০০ হাজার থেকে ১৬৬,০০০ মানুষ মারা যায়।

পারমানবিক গবেষণায় অনেক অর্থব্যয় শুধু নয় তারও চেয়ে বড় মানবিক মূল্য চুকাতে হয়।

 আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি ঘটনা তুলে ধরছি একবার আমার এক রুশ বান্ধবীর সাথে তার পরিচিত বন্ধু বা আত্মীয় একজনকে দেখে কি রকম এক ভীতিকর অস্বস্থি হল। দীর্ঘদেহী, শক্ত সমর্থ স্বাস্হ্যবান এক যুবক কিন্তু ওর মাথায় কোন চুল নাই, ভুরু নাই, চোখের পাপড়িও নাই। পরে বান্ধবীর কাছে ছেলেটির বিষয়ে কৌতূহল প্রকাশ করলে ও জানায় এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কাহিনী। এক সময়ে ছেলেটির বাবা পরমানু বিজ্ঞানী হিসাবে কাজ করছিলেন । গবেষণার কাজ করতেন পারমানবিক কেন্দ্রে। তখন ভদ্রলোক বিয়েও করেন নি। পরে উনি পেশা বদল করে শিক্ষকতায় যোগ দেন। বিয়ে করেন, সন্তান হয়। অজান্তে কখন যেন ভদ্রলোক পারমানবিক রেডিয়েশনের  বা বিক্রিয়ার শিকার  হয়েছিলেন তা ধরা পড়েনি কখনো। তারই ফলশ্রুতিতে তার সন্তানের জন্ম হয় নির্লোম মানব হিসাবে। এই হচ্ছে পারমানবিক শক্তির ভয়ংকর প্রভাব। এ ঘটনাই বলে হিরোশিমা-নাগাসাকির মানুষেরা কি ভয়ংকর ও ভয়াবহ সব অভিজ্ঞতা পার হয়েছেন।  এখনও হয়তো হচ্ছেন কে জানে?

মানুষ কিন্তু লড়াই করে বিস্মৃতির বিরুদ্ধে। তাইতো  হলিউডের বিখ্যাত চিত্রপরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান আজও সিনেমা বানিয়ে পারমানবিক বোমার স্রষ্টা বৈজ্ঞানিক ওপেনহেইমারের বিবেকের যন্ত্রণার বয়ান তুলে ধরেন যা আমাদের চেতনার জগতকে ধাক্কায় নাড়িয়ে দেয়। ওপেনহেইমারের আত্মগ্লানি খাঁটী, নিখাদ। নোলান তা তার সিনেমাতে এই কষ্টের ছবি নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন।

তবে মানুষ সৃষ্টির সেরা  জীব এটা অনস্বীকার্য। তাইতো  পারমানবিক কর্মকান্ড বিষয়ে মানুষের বিরামহীন প্রচারণা ও প্রতিবাদের ফলে ১৯৯৬ COMPREHENSIVE NUCLEAR-TEST-BAN TREATY স্বাক্ষরের জন্য তৈরী হয়। এই আন্তর্জাতিক চুক্তি নিউক্লিয়ার টেষ্ট যে কোন জায়গায় যে কোন সময়ের জন্য নিষিদ্ধ করছে।

মিলান কুন্ডেরার কথা মত ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াই মানে বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির লড়াই চালাতেই হবে। মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের জয় হবে যদি যদি তা বিস্মৃতর আড়ালে না হারায়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয় হবে যদি মানুষ সংগঠিত অন্যায়  ভুলে না যায়।

যুদ্ধের কারনে তিউনিসিয়ার দেশত্যাগী  শিক্ষিত মানুষ খালেদ ভিনদেশে ট্যাক্সী চালায়। ওর ট্যাক্সীতে যেতে যেতে শুনলাম ওর ভাষ্য। যুদ্ধ খুব খুব খারাপ! আফ্রিকায় কলোনিয়ালিজমের উপর তথ্যপূর্ণ  ছোট্টখাটো  এক ভাষন শুনালো। বললো সে আফ্রিকাতে যু্দ্ধ ছিল, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়ালো এখন ইউরোপে যুদ্ধ!

আমরা আশা করবো ১৯৪৫এর ছয়ই আগস্টের মত আবার যেন কোন ‘লিটল্ বয়’ কোন তান্ডব, কোন ধ্বংসযজ্ঞ  শুরু না করে।


Place your ads here!

Related Articles

Evening Stars by Abrar Ahmed

Evening Stars Happiness and laughter is All I offer to you,Pride and pleasurePeace and joy, all wrapped in love, I

আমাদের দেশটা

যদিও জানি আমাদের দেশটাতে হাজারও রকম অসুবিধা আছে কিন্তু যেমনই হোক না কেন তবুও তার সৌন্দর্য্য অপরিসীম! হোক না সমস্যায়

Bangladesh joins the proposed Chinese sponsored Infrastructure Bank

The idea of the Chinese President came to fruition 24th October as 21Asian countries have signed in Beijing the Memorandum

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment