আবুল বাজানদারের চিকিৎসা সংগ্রাম

আবুল বাজানদারের চিকিৎসা সংগ্রাম

ফজলুল বারী: ভুল স্বীকার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসায় ফিরে এসেছে বৃক্ষ মানব আবুল বাজানদার। আমার শুভাকাংখীরা এই নিউজটির লিঙ্ক ঝড়ের বেগে আমার ইনবক্সে দিচ্ছিলেন। কারন তারা এই চিকিৎসা সংগ্রাম নিয়ে আমার একটি অংশগ্রহন জানেন। ২০১৬ সালে আমি যে দেশে গিয়েছিলাম, এর অন্যতম কারনও ছিল আবুলকে দেখা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবার ইতিহাসে হাসপাতালে সবচেয়ে দীর্ঘতম সময় ধরে থাকা রোগী আবুল এক পর্যায়ে চিকিৎসা নিয়ে তার ব্যক্তিগত হতাশা এবং আরও কিছু কারনে এক সকালে কাউকে না বলে হাসপাতাল থেকে চলে গেলে আইনত ফেরারী হয়। তার এভাবে হাসপাতাল থেকে চলে যাবার ঘটনা আমাদের মধ্যেও হতাশা ও ক্রোধ তৈরি করে। হাসপাতাল থেকে চলে যাবার পর ডাক্তারদের ভালোটা না বলে যেভাবে শুধু মন্দটা বলছিল তাও আমাদের হতাশা বাড়াচ্ছিল। কারন আমরা জানতাম তাকে আবার হাসপাতালে ফিরে আসতে হবে এবং তার চিকিৎসা করবেন ডাক্তাররাই। আবুল যে আবার হাসপাতালে ফিরেছে এর পিছনে তার সমস্যাটি প্রায় আগের রূপ নেবার পাশাপাশি ক্ষুধাও গুরুত্বপূর্ন। এখানে সে তিনবেলা খাবার পাচ্ছিল। চিকিৎসার বাইরে আরও যখন যা লাগতো তা আমরা দিচ্ছিলাম। পরিবারের ভরনপোষন নিয়েও ভাবতে হচ্ছিলো। একবার বললো, অত হাজার টাকা যদি দেই তাহলে তার বাবা ফলের ব্যবসা করবেন। সে টাকাও দেয়া হয়। কোন চাহিদাই তার অপূর্ন রাখা হয়নি।  কিন্তু বাড়িতে চলে যাওয়ায় এর সব যোগান বন্ধ হয়। তার ফোনকলও আমরা ধরতাম না। তাই বলা চলে চিকিৎসার পাশাপাশি ক্ষুধা লাগবের জন্যেও সে ফিরে এসেছে হাসপাতালে।

আবুল কিভাবে আমাদের কাছে এসেছিল, তার চিকিৎসার পিছনে আমাদের ভূমিকা এসব মোটামুটি অনেকে জানেন। আবার লিখছি। আমাদের ভূমিকাটি মূলত সোশ্যাল ওয়ার্কারের। বিদেশে যারা থাকেন হাসপাতালগুলোতে দীর্ঘ সময় চিকিৎসা নিয়েছেন তারা এসব সোশ্যাল ওয়ার্কারদের ভূমিকা জানেন। অস্ট্রেলিয়ার মতো কল্যান রাষ্ট্রে এই সোশ্যাল ওয়ার্কারও সরকার থেকে দেয়া হয়। চিকিৎসা দেন ডাক্তাররা। আর সোশ্যাল ওয়ার্কাররা স্বজনহীন রোগীদের নানা সহায়তা সার্ভিস দেন। বাংলাদেশে যেহেতু সোশ্যাল ওয়ার্কার সার্ভিসের সরকারি কোন ব্যবস্থা নেই, আমাদের মতো একটু পাগল টাইপের লোকজন তাদের সহায়তা দিতে গেলে উল্টো একদল প্রশ্ন তোলেন এদের স্বার্থ-ধান্ধাটা কী! প্রশ্ন যারা রাখার তা তারা রাখবেই। আমাদের মতো পাগল টাইপ কিছু সোশ্যাল ওয়ার্কার দেশজুড়ে আছেন বলে অনেক অসহায় রোগী-মানুষ কিছুটা হলেও বেঁচে থাকার অবলম্বন পায়।

আবুলের সন্ধান প্রথম আমাকে দেন খুলনার সাংবাদিক সুনীল চৌধুরী। তিনি এস এ টিভির খুলনা ব্যুরো প্রধান। আবুলের হাত পায়ের কিছু ছবি তিনি আমার ইনবক্সে দিয়ে অনুরোধ করে বলেন তার চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা করা যায় কিনা। সুনীল চৌধুরীর কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে আমি আবুলের সঙ্গে ফোনে কথা বলি। আবুল অস্ট্রেলিয়া থেকে আমার ফোন পেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। আমাকে বলে, চিকিৎসার জন্যে সে দু’বার ভারতে গিয়েছিল। আমি যদি তাকে কিছু টাকা দেই সে আবার চিকিৎসার জন্যে ভারতে যেতে চায়। আমি আবার যে কোন সামর্থ্যহীন মানুষের বিদেশে চিকিৎসার বাইরে চিকিৎসার বিরুদ্ধে। বিদেশে চিকিৎসা ব্যয় সম্পর্কেও আমাদের দেশের অনেক মানুষের ধারনা কম। আমি আবুলকে বলি আমি দেশে তার চিকিৎসার পথ বের করার চেষ্টা করবো।

আবুলের ছবিগুলো আমি আমাদের বড়ভাই ডাঃ শরফুদ্দিন আহমদের কাছে পাঠাই। মূলত তার নেতৃত্বেই এখন আমরা এই চিকিৎসা সহায়তার কাজটি করি। শরফুদ্দিন ভাইকে অনুরোধ করে বলি দেখেন এই ছেলেটির চিকিৎসার কী ব্যবস্থা করা যায়। শরফুদ্দিন ভাই আবুলকে ফোন করলে সে একই কথা বলে, টাকা দিলে ভারত যাবে চিকিৎসা করাতে। শরফুদ্দিন ভাই তাকে বলেন, আগে আমরা দেশে চেষ্টা করে দেখি। শরফুদ্দিন ভাই প্রথমে তার খুলনার ডাক্তার বন্ধুদের দিয়ে বোর্ড করিয়ে আবুলকে দেখার ব্যবস্থা করেন। তারা তাকে দেখে রেফার করেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্লাস্টিক সার্জারি অ্যান্ড বার্ন ইউনিটের ডাঃ সামন্ত লাল সেনের কাছে। ডাঃ সামন্ত লাল সেন শরফুদ্দিন ভাই’রও বিশেষ ঘনিষ্ট। খুলনার ডাক্তাররা রেফার করেও তিনিও আবুলের ব্যাপারে ডাঃ সেনকে বলে রেখেছিলেন। আবুলকে ঢাকায় আনার উদ্যোগ নিতেই আমরা একজন স্বেচ্ছাসেবক পেয়ে গেলাম। আমার প্রিয় প্রজন্ম নিয়াজ মাহমুদ ঢাকায় বাস টার্মিনালে আবুল পরিবারকে রিসিভ করে তোলে চানখাঁর পুলের একটি হোটেলে। এসব ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসের ঘটনা। আবুল ঢাকা পৌঁছার পর দিন সকালে নিয়াজ তাকে ডাঃ সামন্ত লাল সেনের কাছে নিয়ে যায়।

ডাঃ সামন্ত লাল সেন আবুলকে দেখেই মিডিয়ার লোকজন ডাকেন। সবাইকে তিনি বলেন আবুলের চিকিৎসা হবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সরকারি খরচে। তার থাকার ব্যবস্থা করা হয় প্লাস্টিক সার্জারি ও বার্ন ইউনিটের একটি কেবিনে। দেশিবিদেশি মিডিয়ার কভারেজের কল্যানে বৃক্ষ মানব আবুল বাজানদার হয়ে ওঠে রীতিমতো ভিআইপি রোগী। তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম আবুলকে দেখতে এসে বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবুলের চিকিৎসার খোঁজ খবর রাখছেন। তার চিকিৎসা হবে প্রধানমন্ত্রীর খরচে। এসব খবরে আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। কারন তার চিকিৎসাটা কী, কতদিন লাগতে পারে, এসব নিয়ে আমাদের কোন ধারনাও ছিলোনা। ডাক্তারদেরও না। কারন এমন বিরল রোগীর চিকিৎসা তারাওতো এর আগে করেননি। আবুলের চিকিৎসা নিয়ে আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসক-গবেষকদের সঙ্গেও ঢাকার চিকিৎসকদের একটি সংযোগ গড়ে ওঠে। চিকিৎসার এমন একটি আশ্বাস তৈরি হওয়াতে আমরা অন্য বিষয়গুলোতে মন দেই। কারন আবুলের পরিবারটি ভিক্ষা করতো। মিডিয়ার কারনে সেলিব্রেটি রোগী যাওয়ায় পরিবারটির ভিক্ষাও বন্ধ হয়ে যায়। আমার একটা কাজ ছিল প্রতিদিন একাধিকবার আবুলকে ফোন করে তাকে নানান ভরসা দেয়া।

এরমাঝে আবুলের স্ত্রী একদিন আমাকে বলেন হাসপাতাল থেকে তাদের যে দুধ দেয়া হয় তা গরম করার ব্যবস্থা না থাকায় তাদের বাচ্চাটির ঠান্ডার সমস্যা দেখা দিয়েছে। আবুলের বাচ্চাটির জন্যে একটি দুধের পাত্র কে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে পারবেন এমন একটি পোষ্ট ফেসবুকে দিতেই কাজী বাহার নামের এক যুবক যোগাযোগ করে বলেন তিনি দুধের পাত্রটি পৌঁছে দিতে চান। সেদিন থেকে কাজী বাহার হয়ে গেলেন এ চিকিৎসার অন্যতম সঙ্গী। এরপর থেকে এমন একদিন বাদ যায়নি যেদিন বাহার পরিবারটির খোঁজ নিতে হাসপাতালে যাননি। এমনকি আবুল যতদিন হাসপাতালে ছিলেন ততদিন ঈদেও বাড়ি যাননি বাহার। আবুলের চিকিৎসা সহায়তায় ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত থাকতে থাকতে বাহারও এখন দেশেবিদেশে সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচিত একটি মানবিক নাম। আবুলের চিকিৎসা রিপোর্টিং এর জড়িত ঢাকার মিডিয়ার লোকজনও তাকে এক নামে চেনেন।

২০১৬ সালের মার্চের শেষ সপ্তাহে আমি দেশে গেলাম আবুলকে দেখতে। তাকে দেয়া কথামতো  বিমান বন্দরে নেমে প্রথম গেলাম ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আবুলের কেবিনে। এরপর যতদিন ঢাকায় ছিলাম প্রতিদিন একবার হাসপাতালে যাবার চেষ্টা করেছি। ততদিনে তার বেশ কয়েকটি অপারেশন হয়েছে। আমি বুঝতে পারি হাসপাতালে সময় কাটানো আবুলের বড় একটি সমস্যা। তখন ডাক্তারদের অনুমতি নিয়ে তার কেবিনে একটি টিভি, ওভেনের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। তার টিভিতে কেবল সংযোগও দেয়া হয়। আবুলের চিকিৎসকদের অন্যতম ছিলেন দেশের স্বনামখ্যাত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর কবীর চৌধুরী। তিনি আবুলকে গ্রামের বাড়িতে বাড়ি তৈরির জন্যে জমি কিনে দেন। তার জন্যে একটি হুইল চেয়ার কিনে দেন দেশের স্বনামখ্যাত এক সাবেক ব্যাংকার। এভাবে আবুলের অবস্থাটি এমন ছিল যে তার পরিবারের জন্যে লিখলেই লোকজন টাকা দিতেন। এসব টাকা আসতো আবুলের বিকাশ নাম্বারে অথবা ডাঃ শরফুদ্দিন ভাইর ব্যাংক একাউন্টে। কিন্তু তার জন্যে টাকা চেয়ে লিখলে ডাক্তাররা ক্ষুব্ধ হন দেখে আমরা সে লেখাও বন্ধ করে দেই। ডাক্তারদের কারো কারো ধারনা হয় আবুলকে নিয়ে আমরা লাখ লাখ টাকা কামাচ্ছি! কিন্তু আবুলকে কে কত টাকা দিয়েছেন তা সংশ্লিষ্টরাই জানেন। ডাক্তারদের অসন্তোষ আমরা কখনোই চাইনি। কারন চিকিৎসা তারা দেবেন। এরপর আবুলের জন্যে প্রতিমাসে একটি টাকা পাঠাতে থাকি ডাঃ শরফুদ্দিন ভাইর ব্যাংক একাউন্টে। তিনি সেখান থেকে যখন যা প্রয়োজন তা পাঠিয়ে দিতেন হাসপাতালে। যে কোন রোগীর চিকিৎসার সঙ্গে এর ম্যানেজমেন্ট খরচের কথা ওয়াকিফহালরাই জানেন।

সেই আবুলের একে একে ২৫ টি অপারেশন হয়। একদিকে শেঁকড় অপারেশন করলে তা আরেকদিকে ওঠে। এরমাঝে মিডিয়ার একটি রিপোর্ট আবুলের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে। আমেরিকা থেকে প্রাপ্ত গবেষনা রিপোর্টে জানানো হয় আবুলের সমস্যাটি ভাইরাসজনিত নয়, জিনগত। তাই তার সমস্যাটি আবার ফিরে আসতে পারে। যার হাতেপায়ে পঁচিশটি অপারেশনের ব্যথা তার চিকিৎসা নিয়ে এমন অনিশ্চয়তার খবরে কার ভালো লাগে। ডাঃ সামন্ত লাল সেনরা ভেবে রেখেছিলেন আবুলকে যেহেতু তাদের চোখে চোখে রাখতে হবে তাই বার্ন ইউনিটের নতুন ভবন উদ্বোধনের পর সেখানে তাকে চাকরি দেয়া হবে। হাসপাতালের সিনিয়ররা এমন তাকে তাকে স্নেহ করতেন। জুনিয়র কেউ কেউ সে রকম করতেন না। এমন নানাকিছুকে ইস্যু করে সে যখন আমাদেরও না জানিয়ে যখন হাসপাতাল থেকে চলে গেলো, ডাক্তারদের বিরুদ্ধে মিডিয়ায় বলতে থাকলো তা আমাদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি করে। আবুলের নানা বক্তব্য নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের বিনীতভাবে বলেছি আবুলের শ্রেনী চরিত্র যেন তারা ভুলে না যান। গ্রামের পড়াশুনা না করা ছেলে আবুল। তার সবকিছু শিক্ষাদীক্ষা প্রাপ্তদের মতো কি করে হবে।

 কিন্তু এসবের মাঝেও নেপথ্যে আমরা তার চিকিৎসার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। প্রথম আলোর সাংবাদিক শিশির মোড়লও একটি উদ্যোগ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছিলেন। এরমাঝে আবুল নিজে নিজেই ফিরে এসেছে হাসপাতালে। ঢাকায়তো তার বাহারের মতো নিকটজন কেউ নেই। তাই ঢাকায় পৌঁছে বাহারের সঙ্গে সে যোগাযোগ করলে বাহার যোগাযোগ করে আমার সঙ্গে। আমি তাকে ডাঃ শরফুদ্দিন ভাইর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলি। এরমাঝে আমি শরফুদ্দিন ভাইকে ফোনে বলেছি ডাঃ সামন্ত লাল সেনের সঙ্গে দেখা করতে। তাকে বুঝিয়ে বলতে চিকিৎসার কাজ তারা তাদের মতো করে করবেন। নেপথ্যে থেকে সোশ্যাল ওয়ার্কারের ভূমিকায় আমরা আমাদের সহায়তা দেবো। আরেকটি অনুরোধ করেছি এবার যেন আবুলের কাউন্সিলিং এর কাজটি ঠিকমতো হয়। বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কাউন্সিলিং এর ভূমিকাটি সে রকম নেই। সে কারনে প্রধানমন্ত্রীর রোগী হওয়া স্বত্ত্বেও এতো চেষ্টা স্বত্ত্বেও আবুলের মতো রোগী এভাবে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। আবুলের চিকিৎসা সংগ্রাম নিয়ে আমাদের চেষ্টা যাতে আবার পন্ড না হয় সে চেষ্টাই আমরা করে যাবো। আমাদের সঙ্গে থাকুন প্রিয় দেশবাসী।


Place your ads here!

Related Articles

21st February: A Day of Mourning, Pride Action

21st February is a day of national mourning, pride, reflection and action. It is the Language Martyr’s Day. It is

Bangladesh, China India at the Climate Summit at the UN

The UN climate summit was held on 23rd September which was the largest high-level climate meeting since 2009. Hosted by

Dancing is my passion – Purabi Permita Bose

Purabi Permita Bose a very well-known person as a Bangladeshi traditional dancer in Sydney community. She got her first lesson

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment