রিফাত হত্যা মামলার তদন্ত প্রশ্নবিদ্ধ – দায়িত্ব দিন পিবিআইকে
ফজলুল বারী: বরগুনার চাঞ্চল্যকর রিফাত হত্যা মামলার তদন্তের নানাকিছু এরমাঝে প্রশ্নবিদ্ধ। রিফাতের স্ত্রী মিন্নির বাবা অভিযোগ করে বলেছেন তার মেয়েকে শারীরিক নির্যাতন করে এ হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িয়ে জবানবন্দী আদায় করা হয়েছে। ন্যায় বিচার না পেলে আত্মহত্যার হুমকিও দিয়েছেন এই পিতা। ফেনীর নুসরাত হত্যাকান্ডের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পুলিশের বিশেষ তদন্ত শাখা পিবিআইকে দিয়ে সেটি পুনঃতদন্ত করা হয়। বরগুনার ঘটনার তদন্তের দায়িত্বও কী পিবিআইকে দেয়া যায়?
আওয়ামী লীগের সারাদেশে ভালো লোকজনের পাশাপাশি বেশকিছু খারাপ লোকও আছে। দলটি টানা ক্ষমতায় থাকার কারনেও খারাপ লোকগুলোর গায়েগতরে চর্বি বেশ বেড়েছে। মাঝে মাঝে উগড়ে উপচে ফেনী-বরগুনার মতো বেরোয় এদের পাপ। অথচ এরা মূলত শেখ হাসিনার পরিশ্রমী নেতৃত্বের ওপর ভর করে নানান দাপট-আকামকুকাম করে খায়। প্রভাব দেখিয়ে বেঁচেবর্তে থাকে। এদের পাপ-তাপে বদনাম হয় দলের। শেখ হাসিনার। এরপরও এদের পাপ-তাপ ধারন করে বেঁচে থাকেন দলনেত্রী। বরগুনার ঘটনাটি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর প্রভাবে তার ছেলে সুনাম দেবনাথের পাপের প্রকাশ। মাদকাসক্ত এবং মাদক ব্যবসায়ী নয়ন বন্ড গ্রুপটি সুনামের আশ্রয়প্রশ্রয়েই দিনেদিনে হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে। এরা লোমহর্ষক একটি ঘটনা ঘটিয়েছে। পুলিশ এখন ব্যস্ত গডফাদারের ফেসসেভিং’এ। পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন প্রতিদিন সকালসন্ধ্যা বলছেন, ধরে ফেলেছি। মাদকটাদক কিচ্ছুনা। এটি পোলাপানের গভীর ষড়যন্ত্র। ব্যক্তিগত রেষারেষির প্রকাশ। এতে করে আড়াল হচ্ছে গডফাদারের ইজ্জত। তার ইজ্জত মানে এমপি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ইজ্জত। দুষ্ট জনপ্রতিনিধি গায়ে দাগ পড়ে এমন কিছু করার সাহস বাংলাদেশের সব পুলিশ অফিসারের নেই। বুদ্ধিমানরা জানেন যারা এসব সুচারু করতে পরিচালনা করতে পারেন তাদের আপাতত আখের ভালো হয়।
খেয়াল করে দেখবেন তরুন এই গডফাদারের কাজকর্ম আবার কিছুটা বুদ্ধিজীবী কিসিমের। নানা বিষয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে নির্দেশনা দেন। যেমন রিফাত খুনের পর দেয়া স্ট্যাটাসে রিফাত ফারাজী-রিশান ফারাজীকে ইঙ্গিত করে বলেছেন এরাতো দেলোয়ার হোসেন ভায়েরা ভাই’র ছেলে। তিনি বিশুদ্ধ-ফুলের মতো পবিত্র চরিত্র। অথচ বরগুনার ওয়াকিফহালরা এখন সেখানকার রাজনীতিতে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের অবস্থান জানেন। আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারন সম্পাদকের দুই গ্রুপ। সভাপতি সুনামের বাবা ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু। সাধারন সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির ঐতিহ্যগতভাবে ক্যাডার রাজনীতির ধারক-বাহক। ছাত্রলীগের কান্ডারী নেতা জাহাঙ্গীর কবিরের ছেলে। জেলার ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্তৃ্ত্ব সাধারন সম্পাদকের দখলে। কিন্তু জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিরতো একটা গ্রুপ দরকার। বাবার প্রতি ভালোবাসায় সুনাম দেবনাথ এই গ্রুপটি গড়ে তুলেছিলেন নয়ন বন্ড জাতীয়দের নিয়ে। এই গ্রুপটিকে বরগুনার লোকজন ভয় পেতো। ভালোবাসতোনা। এদেরতো ভালোবাসা যায়ওনা। নিহত রিফাতও একসময় এই গ্রুপের সদস্য ছিলো। ছিটকে গেছে।
বরগুনার বর্তমান এসপি মারুফ হোসেনের সঙ্গে ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু বা তার ছেলে সুনাম দেবনাথের সম্পর্ক একসময় ভালো ছিলোনা। তাদের পছন্দের এসপি বিজয় বসাককে দলের শত্রুপক্ষ বরগুনা থেকে বিদায় করেছে। মারুফ হোসেন পুলিশ পদক পাবার পর সুনাম দেবনাথ তার প্রশংসা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। ভালোবাসার সূত্রপাত সেখান থেকে। রিফাতকে কুপিয়ে হত্যার ভিডিও দেশব্যাপী ভাইরাল-হৈচৈ সৃষ্টির পর এক মধ্যরাতে পুলিশ সুপার সুনামকে তার অফিসে বৈঠকে ডাকেন। সেই বৈঠক ফলপ্রসু হলে নয়নকে পুলিশের হাতে তুলে দেন সুনাম। এরপর পরিকল্পনা অনুসারেই তাকে মেরে ফেলা হয়। অতএব এখন পুলিশ সুপার বা নয়ন যেখানে যা বলছেন এর কোন সাক্ষী নেই। ধরা পড়ার আগে গোপন অবস্থান থেকে মিন্নিকে ফোন করে শাসিয়েছে নয়ন। মিডিয়ায় তার কথাবার্তার জন্য মিন্নিকে শাসানো হয়। এখন গোপন অবস্থান থেকে নয়ন যে মিন্নিকে ফোন করেছে এটিকে প্রমান ধরেই মিন্নিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সুনামের ফর্মূলায় সন্তুষ্ট হয়েছেন এসপি। মিন্নি বাইরে থাকাটা তাদের কারো জন্যে নিরাপদ নয়। প্রায় সে মিডিয়ার সাথে কথা বলে। এটি চলতে দেয়া যায়না।
পরিকল্পনা অনুসারে এসপি দুটি এডিটেড ভিডিও ফুটেজ প্রচারের ব্যবস্থা করেন। রিফাতকে কোপানোর ভাইরাল ফুটেজটি আশেপাশের কোন ভবন থেকে কে তুলে ফেসবুকে দিয়েছে সেই বেয়াদবটার সন্ধান এখনও পুলিশ বা সুনাম কেউ বের করতে পারেনি। সব অনাসৃষ্টির মূলতো সেই ফুটেজ। কারন এমন ঘটনা বরগুনায় আগেও ঘটেছে। ফুটেজ ভাইরাল হয়নি তাই কোন সমস্যা হয়নি। এখন সেই ফুটেজ দেখে যারা আহ-উহ করাদের মনে মিন্নি সম্পর্কে ঘৃনা ছড়িয়ে দিতে পুলিশ-সুনামের পক্ষে বাকি দুটি ফুটেজ প্রকাশ করা হয়। এর একটিতে দেখা গেছে স্বামী রিফাত কলেজগেটে আসার পর তাকে দেখেও মিন্নি ভিতরে ঢুকে গিয়েছিলেন। এরমানে রিফাতকে খুন করাতেই সেখানে ডেকে এনেছেন মিন্নি। এ নিয়ে মিন্নি বলেছেন তার স্বামী ফানি টাইপের ছিলো। তার শশুরও এসেছেন এটা ফান করে বলায় সে লজ্জা পেয়ে ভিতরে ঢুকে যায়। দ্বিতীয় ফুটেছে বলা হয় এতো বড় ঘটনার পর মিন্নি স্যান্ডেল খুঁজে রিকশায় করে চলে যাচ্ছে। অতএব সেই হলো গিয়ে আসল খুনি। এই ভিডিও ফুটেজ পুলিশ সুপার প্রথমে সময় টিভিকে দেন। এতে করে অন্য মিডিয়ার সাংবাদিকরা ক্ষেপে গেলে সবাইকে ফুটেজের কপি দেন। আগেই বলা হয়েছে বরগুনার সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত গডফাদার সুনাম দেবনাথের একধরনের বুদ্ধিজীবী ভাব-টাইপ আছে। নানাকিছুতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস-পোষ্ট দেন। তাদের এডিটেড ফুটেজ পোষ্ট করার সময় সেখানেও বলা হয় মিন্নিই আসল খুনি। যেন পুলিশ মিছেমিছি বা ভুল করে তার প্রিয় নয়ন বন্ডকে মেরে ফেলেছে। আহা!
পান্ডুলিপির এ পর্বে রিফাতের বাবাকে দিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করানো হয়। এর পুরো আয়োজন করেন সুনাম দেবনাথ। নানাকিছুতে তিনি এসপির সঙ্গে পরামর্শ-ভাব বিনিময়-মত বিনিময় করে যাচ্ছিলেন। এতে তার মামলার এক নাম্বার স্বাক্ষী এবং পুত্রবধূকে গ্রেফতার দাবি করেন রিফাতের বাবা। মিন্নিকে গ্রেফতারের দাবিতে মানববন্ধনের আয়োজন করেন সুনাম। সেখানে বক্তৃতায় তার শব্দচয়নে অনেকে চমকে যায়। মামলায় আর কোন আসামীর শাস্তি চাইছিলেননা তিনি। একটাই দাবি মিন্নিকে গ্রেফতার করে শাস্তি দিতে হবে। বরগুনার সূত্রগুলো বলছে একাত্তর টিভির একাত্তর জার্নালে সংযুক্ত হয়ে মিন্নি বক্তব্য দেয়ায় ক্ষিপ্ত হন সুনাম এবং এসপি। এ ঘটনার পর তাকে তারা আর বাইরে রাখাটা নিরাপদ মনে করেননি। মিন্নির পক্ষে যে কোন আইনজীবী কোর্টে দাঁড়াননি এর কারন হিসাবেই সুনাম দেবনাথের ফেসবুক স্ট্যাটাসকে অনেকে দায়ী করেন। এই যে ছোটবাবু সবকিছুতে স্ট্যাটাস দেন ফেসবুকে। আরেকপক্ষের বক্তব্য সুনাম আইনজীবীদের মধ্যে অত প্রভাবশালী নন। নুসরাতের ঘটনায় আসামীদের পক্ষ নেয়ায় আইনজীবীদের সমালোচনা হওয়াতে অনেকে হয়তো বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।
বরগুনার ঘটনার নানাকিছু সুনামের মতো করে অথবা সুনামের সুনাম রক্ষার কায়দায় বলে ফেলেছেন পুলিশ সুপার! বলেছেন এটি ব্যক্তিগত রেষারেষির ঘটনা। এখানে নিহত রিফাত সহ সবগুলোই যে মাদকাসক্ত, আগেপরে এরা সবাই যে মোটামুটি সুনাম সমিতির সভ্য, ব্যবসার খেদমতগার এই প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গেছেন। কারন পান্ডুলিপি সে রকমই লেখা। বলা হয়েছে খুনের প্রস্তুতি মিটিং’এও মিন্নি ছিলো! এসপি সাহেবরা অনেক বড়মাপের ব্যক্তিত্ব। মিন্নি টাইপ ছেলেমেয়েদের বয়স-যোগ্যতা মাথায় রেখে যদি ধারনাও করা যায় খুনের জন্যে তারা গভীর ষড়যন্ত্র বৈঠক করেছে তাহলে এসপি মারুফ হোসেনের এলাকাটি যে কি ভয়ংকর বিপদজ্জনক তা মানতে হবে!
যেখানে ছেলেপুলেরা এমন সিটিং দিয়ে মিটিং করে একজনকে খুনের পরিকল্পনা করে! এমনিতেই একটা কাঁচা বোকামির কাজ করে ফেলেছে পুলিশ। সেটি হলো অস্ত্রের অভাবে রিফাতকে রাম দাও দিয়ে কুপিয়ে মারলো নয়ন। আর পুলিশ বললো বন্দুক যুদ্ধের কথা! লাশের পাশে পাওয়া গেলো অস্ত্রও!
ঘটনাটি নিয়ে বরগুনার নানাপক্ষের সঙ্গে কথা বলে একটি ধারনা পাওয়া গেছে। মিন্নি রিফাত দু’জনও মাদকাসক্ত অথবা নয়ন বন্ড গ্রুপের সদস্য ছিল। নানাকিছুতে এরা তাদের বস নয়নের কাছে অভিযোগ করতো। বিচার দিতো। একটি ফোনসেট নিয়ে রিফাত-মিন্নির মধ্যে ঝগড়া হয়। মিন্নি এ নিয়ে তাদের লিডার নয়নের কাছে বিচার দেয়। তখন মিন্নিকে বলা হয়েছিল রিফাতকে বকে দেয়া হবে। কিন্তু এই বকে দেয়া মানে যে রিফাতকে কোপানো হবে এটি ভাবতে পারেনি হতভম্ভ মিন্নি। এই নয়নকে রিফাত একবার ধরিয়ে দেয়ায় তাদের সম্পর্কের অবনতি হয়। এরপর আবার রিফাত মিন্নিকে বিয়ে করেছে। নয়ন হয়তো এই সুযোগে জমানো ক্রোধের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে রিফাতের বিরুদ্ধে। বরগুনার অনেকে বলেছেন বকে দেবার কথা বলে ডেকে আনা রিফাতকে এভাবে কোপানো হবে এটি মিন্নি জানতোনা। আবার রিফাত যে মরে যাবে এটিও ভাবেনি নয়ন। কারন তার আগের ঘটনাটির শিকার বেঁচে গেছে। এই ঘটনার পরও রিফাত একা একা হেঁটে গিয়ে রিকশায় উঠেছে। মোটা দাগে বরগুনার ঘটনা, এক প্রভাবশালীব চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীর প্রশ্রয়ে পুষ্টদের অবক্ষয়ের ঘটনা। পান্ডুলিপির এ পর্বটির শিরোনাম ‘তাহার আড়াল’!
বরগুনার ঘটনার চলতি পর্বে সোশ্যাল মিডিয়া বিভক্ত। রিফাতকে কোপানোর ভিডিও দেখে ক্ষুদ্ধ-বেদনার্তদের চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দিতে এডিটেড যে দুটি ফুটেজ রিলিজ করা হয়েছে তাদের উদ্দেশ্য সফল। এপক্ষের ওয়ালে ছিঃ মিন্নি, কুলটা মিন্নি রব! এটিই বাংলাদেশের পুরুষতন্ত্র। যেখানে ছেলেরা সুযোগ পেলে প্রেম করে, আরো একটু ‘সুবিধামতো পাইলে’ ধর্ষন করে, সেক্সে রাজি না হলে, ‘মাগী দিবিনা ক্যান’ বলে ধর্ষনের পর খুনও করে ফেলে! আবার বাড়িতে সুবোধ ফুলের মতো পবিত্র চরিত্র! পারলে তাহাজুদের নামাজও পড়ে। আর সারাক্ষন খেয়াল রাখে নিজের বোনটি যাতে কারও সঙ্গে আবার প্রেমটেম না করে। অথবা নিজের স্ত্রী যাতে হেসে কথা না বলে কোন পরপুরুষের সঙ্গে! আদালতে মিন্নির পক্ষে আইনজীবীরা না দাঁড়ানোয় ক্ষিপ্ত ছোট একটি পক্ষ মিন্নির পক্ষ নিয়েছেন। কারন ‘সবার আইনী সহায়তা পাবার অধিকার আছে’, এই বানীতে দেশের সেরা লুটেরা-চোর-যুদ্ধাপরাধী সবার পক্ষে আইনজীবী থাকেন। ‘তাহার আড়াল’ পান্ডুলিপির এ পর্বে যখন মিডিয়া ব্রিফিং’এ বরগুনার পুলিশ সুপার কথা বলেন, তখন তার চেহারায় সুনাম দেবনাথের মুখ ভাসে। কারন এই পাপ-তাপ ‘তাহার’। এই চাঞ্চল্যকর মামলার প্রশ্নবিদ্ধ তদন্তে পিবিআইকে কাজে লাগানো যেতে পারে।
মিন্নির বাবার প্রতিবাদ।মিন্নির বাবার প্রতিবাদ।সূত্র: Etv
Posted by নজিপুর বার্তা on Friday, July 19, 2019
Related Articles
Our independence war and my experience
Fakhruddin A. Chowdhury I was about 24/25 years of age when I arrived here in Australia landed in Sydney alone.
I too am ‘sorry’ – Sabrina Quader
If I could apologise a thousand times over I would. Even though I was not even born in 1970, when
National Election: Some interesting insights
Bangladesh stands at a crossroads and the path to a new invigorated Bangladesh depends how the new political forces emerge


