বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা কি যথেষ্ট করতে পারছে ক্লাইমেটচেঞ্জ কে টেকেল করতে?
পরিবেশগত অবনত আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক সমস্যাগুলোর মাঝে একটা। আমার মনে হয় এই সমস্যাটা ডমেস্টিক রাজনীতিই হোক আর বৈশ্বিক রাজনীতিই হোক সব জায়গায়ই একটা পোলারাইজেশন তৈরী করেছে। কিছু মানুষ সমর্থন করছে কার্যকরি উদ্যোগ নেওয়ার জন্য। আর কিছু মানুষ এই সমস্যাটা স্বীকারই করছে না। স্বীকার করলেও দ্রুত এবং কার্যকরি উদ্যোগ নিতে বাধা দিচ্ছে কিংবা বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে এমনভাবে কাজে লাগাচ্ছে যে কার্যকরি উদ্যোগ নেওয়া যাচ্ছে না। এটা বিভিন্ন দেশের লিবারেল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছে। এর পিছনে অনেক কারণ রয়েছে; এনার্জিসিকিউরিটি, এফোরডিবিলিটি, দেশীয় শিল্পের সাথে বিদেশী শিল্পের প্রতিযোগিতা অন্যতম কারণ। আবার অতি পূঁজিপতি এবং বড় বড় করপোরেশনগুলোর পারভেসিভ লবিং পলিসি মেকারদের প্রভাবিত করে। এইসব বড় বড় করপোরেশনগুলোর মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিও আমাদের মত সাধারণ মানুষদের গণতন্ত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণের সামর্থ্যকে ছোট করে দেখে কিংবা অতটা করতে দেয় না কিংবা প্রভাব ফেলতে দেয় না। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের মত লিবারেল গনতন্ত্রের দেশগুলোর যদি এই অবস্থা হয় তাহলে বাংলাদেশের অবস্থাটা ভেবে দেখার বিষয়। লিবারেল গনতন্ত্রের মূল মন্ত্র হচ্ছে জনগণের শাসন কিংবা জনগণ দারা শাসন। কিন্তু এইসব দেশগুলোতে এটা কতটা হচ্ছে প্রশ্ন থেকেই যায় বড় বড় করপোরেশনগুলোর মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজির কারণে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে আনলিমিটেড ডোনেশন করতে পারবে যে কেউ যে কোন রাজনৈতিক দলকে! এইসব কর্মকান্ডের কারণে লিবারেল গনতন্ত্রের দেশগুলো পরিবেশ অবনতি রোধে ভবিষ্যতমুখী পলিসি প্রণয়ন করতে পারছে না। আবার কিছু কিছু দেশ পলিসি প্রণয়ন করলেও নিজেরাই সে টা মানছে না কিংবা মানার তাগিদ অনুভব করছে না। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি অস্ট্রেলিয়া প্যারিস একর্ডে যে অঙ্গীকার করেছিল সেটা সে নিজেই পূরণ করতে পারছে না। কার্বন ইমিশন কমানোর টার্গেট পূরণ করতে পারছে না। শুধু যে অস্ট্রেলিয়াই পারছে না তা না। বড় বড় কার্বন ইমিশন করা দেশগুলোর অধিকাংশই তাদের প্যারিস একর্ড অঙ্গীকার পূরণ করতে পারছে না কিংবা পূরণ করার তেমন তাগিদ অনুভব করছে না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন আমরা পরিবেশ অবনতির কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারছি না? প্রথমেই আমরা যা নিয়ে ভাবব যে ক্লাইমেট লিডারশীপ নাই কিংবা তৈরী হচ্ছে না। হলেও যথেষ্ট না। আর এর সবচেয়ে বড় কারণ বিংশ শতকের লিবারেল গণতন্ত্র দিয়ে আমরা একবিংশ শতাব্দীর সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় আছি। আমি এটা বলছি কারণ বিংশ শতাব্দীর লিবারেল গনতন্ত্র বিশেষ করে রিপ্রেজেনটেটিভ গনতন্ত্র বর্তমানকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয় এবং বর্তমানের সমস্যাগুলোকে সমাধানেই সচেষ্ট থাকে। এই ব্যবস্থা একটু বেশি দূরের ভবিষ্যত দেখতে পায় না কিংবা সরকার তার গৃহীত পলিসির সূদুর প্রসারি প্রভাব দেখতে পায় না। এই ব্যবস্থায় জেনুইন ইন্টারজেনারেশনাল প্রতিনিধি নাই বললেই চলে। তাহলে ষাট বছর বয়েসী একদল মানুষ কিভাবে অনুধাবন করবে বিশ বছর বয়সী মানুষেরা কী কী বিষয়ে চিন্তিত? তাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটা সুন্দর পৃথিবী রেখে যাওয়ার স্বপ্ন সেই যাট বছর বয়সী মানুষেরা বুঝতে পারছে না। আমরা যে গভর্ন্যান্স মেকানিজম দিয়ে আমাদের শাসন ব্যবস্থা সাজিয়েছি সটা ঠিকমত একুশ শতাব্দীর সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারছে কি না চিন্তা করছি না। আমরা শুধু ভাবছি নেতার ব্যক্তিগত আদর্শ নিয়ে। কোনকিছু না হলে নেতার আদর্শকে দোষ দিচ্ছি কিংবা বাজে রাজনীতিকে দোষ দিচ্ছি। অথচ একবারও ভাবছি না এই নেতারা যে সিস্টেমে থেকে রাজনীতি করছে, বিভিন্ন পলিসি তৈরী করছে সেই সিস্টেম একুশ শতকের উপযুক্ত কি না, এর কোন আপডেট ভার্সন দরকার কি না সেটা নিয়ে একদমই ভাবছি না। ভাবছি কি? পলিসি গ্রিডলক এবং ডিসফালশনের জন্য রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে দোষারোপ না করে আমরা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এবং তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে ক্রমাগত দোষেই যাচ্ছি।
এই যে অস্ট্রেলিয়া প্যারিস একর্ডে অঙ্গীকার করা টার্গেট পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে এটাকে পুলিসিং করবে কে? এমন কোন শক্ত প্রতিষ্ঠানও নাই। প্রশ্ন সমস্যাটা বুঝলাম কিন্তু সমাধান আসলে কিভাবে করা যাবে। সমাধান বের করা অনেক কঠিন। আমার মতে বেশ কিছু পদক্ষেপ আমরা নিতে পারি ক্লাইমেট চেঞ্জ সমস্যার সমাধানের জন্য।
১. মাল্টিলেটারাল প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো শক্তিশালী করা। এটা খুবই জরুরী বিশেষ করে ছোট দেশগুলোর জন্য কিংবা ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য। বিশেষ করে যেইসব দেশে ক্লাইমেট চেঞ্জ এর প্রভাব প্রথমেই সরাসরি পরবে।
২. লিবারেল গনতন্ত্রের সমস্যা উত্তরন এর জন্য জেনুইন ইন্টার জেনারেশন কে সংযোগ করতে হবে এই বিতর্কে অংশগ্রহণ করার জন্য।
৩. সরকারের পলিসি তৈরীর মেকানিজমের বাইরে স্বাধীন কিছু সংস্থা গঠন করতে হবে যেগুলো বিভিন্ন পলিসি ডিসিশন নিবে একদম আনবায়াসড থেকে। সরকার এখানে কোনধরনের প্রভাব খাটাতে পারবে না। যেমন ইনফ্রাস্ট্রাকচার অস্ট্রেলিয়া কিংবা পার্লামেন্টারি বাজেট অফিস এই ধরনের প্রতিষ্ঠান তৈরী করতে হবে।
৪. ক্লাইমেট লিডারশীপ তৈরী করতে হবে। যেমন সুডিশ তরুণী গিটা থানবার্গ কিংবা আল গোর।
৫. বিকল্প ট্রান্সপোর্ট ব্যাবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে। কারণ অস্ট্রেলিয়ায় এক পঞ্চমাংশ কিংবা তারও বেশি কার্বম ইমিশন হয় এই ট্রান্সপোর্ট সেক্টর থেকে। অস্ট্রেলিয়ায় $৬০০০০ এর নিচে ইলকট্রিক কার রয়েছে বড়জোর চার-পাঁচটা। যেখানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এই অপশনটা আরো বেশি। এইবার ভাবুন বাংলাদেশে কী করতে হবে। আমার মনে হয় বাংলাদেশে রেলনেটওয়ার্ককে আরো বড় করতে হবে এবং শক্তিশালী করতে হবে।
৬. এগ্রিকাল সেক্টর আরো একটা বড় কার্বম ইমিটার। মানুষ কি না খেয়ে থাকবে? আমাদের ভাবতে হবে আমাদের খাদ্যাভাসে কী কী পরিবর্তন আনলে এই সেক্টর থেকে কার্বন ইমিশন কমবে।
৭. জ্বালানী নিরাপত্তার জন্য রিনিউএবল এনার্জির ব্যপক প্রয়োগ করতে হবে। সরকার এখানে আরো বেশি বিনিয়োগ করতে পারে। বিভিন্ন পলিসির মাধ্যমে এটা উৎসাহিত করা যেতে পারে।
৮. এভিডেন্স এবং রিসার্চ বেসড পলিসি প্রণয়নে উসাহিত করতে হবে।
৯. আন্তরাষ্ট্রীয় সংলাপে জোর দিতে হবে। কারণ এই সমস্যাটা শুধু এক জায়গায় সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে না। গ্লোবাল সমস্যার একটা গ্লোবাল রেসপন্স থাকতে হবে।
১০. পলিসি মেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে এবং পলিসি ম্যাশিনারীকে এই অদৃশ্য সমস্যাকে একটা দৃশ্যমান সমস্যা হিসেবে সামনে নিয়ে আসতে হবে। এর জন্য লিবারেলগনতন্ত্রের ম্যাশিনারীগুলোকে আরো বুঝতে হবে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে।
১১. আমাদের প্রতিটা কনজাম্পশানের হিসাব করতে হবে। কিভাবে এটা ক্লাইমেট চেঞ্জকে আরো তরান্বিত করছে।
আমাদের সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক।
Related Articles
জাতীয় পার্টির দেবর-ভাবীর সমঝোতার ভবিষ্যত
ফজলুল বারী: দেশে আমার রিপোর্টিং বিটগুলোর একটি ছিল জাতীয় পার্টি। এরজন্য এ দলটির সদর-অন্দর খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।
Bangladesh’s 22nd year of Peacekeeping Mission across the World
This year, Bangladesh has stepped into 22nd year of participation in UN peacekeeping mission across the world. Bangladesh armed forces


