দালাই লামা – অনাগতের আলো – তিন পর্বের শেষ পর্ব
[দালাই লামা – অনাগতের আলো – তিন পর্বের প্রথম পর্ব]
[দালাই লামা – অনাগতের আলো – তিন পর্বের দ্বিতীয় পর্ব]
শেষ পর্ব:
ধরা যাক, বর্তমানে আপনি সামান্য কারণেই অতি তাড়াতাড়ি ও খুব সহজে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। পরিষ্কার ধারনা ও সচেতনতার সাহায্যে এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। আপনার রাগ সচরাচর যদি দশ মিনিট স্থায়ী হয় তবে এটাকে আট মিনিটে নামিয়ে আনতে চেষ্টা করুন। পরের সপ্তাহে এটাকে পাঁচ মিনিটে এবং পরের মাসে এটাকে দু’মিনিটে এবং এর পরে এটাকে শূণ্য মিনিটে নামিয়ে নিন। আমাদের মনকে প্রশিক্ষিত ও উন্নত করার এটাই পথ।
এই হচ্ছে আমার অনুভূতি এবং আমি নিজেও এ ধরনের অনুশীলন করে থাকি। এটি পরিষ্কার হয়েছে যে , প্রত্যেক মানুষের মানসিক শন্তির প্রয়োজন রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে কি করে এটি লাভ করা যায়। দয়া, ভালবাসা, মৈত্রী ও করুনার মাধ্যমেই আমরা মানসিক শান্তি লাভ করতে পারি। এর ফলে লাভ হবে অনাবিল শান্তিতে ভরা একটি পরিবার। মাতা-পিতা, সন্তানদের মাঝে থাকবে নির্ভেজাল আন্তরিকতা, শান্তিপূর্ণ সহবস্তান, ¯স্বামী স্ত্রীর মাঝে কদাচিৎ বাক বিতন্ডা এবং বিবাহ বিচ্ছেদ জনিত দু:শ্চিন্তাহীন জীবন।
জাতীয় পর্যায়ে এ দৃষ্টিভঙ্গি আনতে পারে অকৃত্রিম প্রেরণাযুক্ত জাতীয় ঐক্য, সদভাব ও সমন্বয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আনতে পারে পারষ্পরিক বিশ্বাস ও সম্মান এবং বন্ধুত্বপূর্ণ ও খোলামেলা আলোচনার ক্ষেত্র। ফলশ্র্রুতিতে লাভ হবে বিশ্ব সমস্যা সমাধানের যৌথ প্রচেষ্টার শুভ সূচনা। এভাবে সকল সমস্যারই সমাধান সম্ভব।
সর্বাগ্রে আমাদের নিজেদের মধ্যে পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দ আমাদের সমস্যা সমাধানে তাদের সব্যাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকেন। কিন্তু একটি সমস্যা সমাধানের সাথে সাথে অন্য একটি সমস্যা সৃষ্টি হয়। ঐ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলতে চলতেই অন্যত্র নতুন সমস্যা তৈরি হয়। তাই একটি ভিন্ন পথ বা কৌশল প্রয়োগের চেষ্টা চালানোর এখনই সময়। এ কথা অনস্বীকায যে, বিশ্বব্যাপী মানসিক শান্তি আন্দোলন পরিচালনা একটি অতীব কঠিন কাজ। অথচ এটিই একমাত্র বিকল্প। যদি এর চেয়ে কোন সহজ এবং বাস্তবভিত্তিক পদ্ধতি পাওয়া যেতো, তবে ভালো হতো কিন্তু তাতো নেই। অস্ত্রের সাহায্যে যদি প্রকৃত ও স্থায়ী শান্তি অর্জন করা যায় তবে তা গ্রহণযোগ্য এই যদি হয়, তবে সকল কল- কারখানাগুলোকে অস্ত্র কারখানায় রূপান্তর করা হউক। স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে সুনিশ্চিত হলে প্রতিটি ডলার এই উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হউক। কিন্তু তাও তো অসম্ভব।
অস্ত্র-শস্ত্র গুদামজাত অবস্থায় পড়ে থাকে না। নতুন অস্ত্র আবিষ্কার ও তৈরি হলে পরে সহসা অথবা দেরীতে কেউ না কেউ এসব অস্ত্র ব্যবহার করবেই। কেহ কেহ এমনও ভাবেন আমরা যদি এগুলো ব্যবহার না করি তবে মিলিয়ন ডলার ব্যয় নিরর্থক হয়ে যাবে। অতএব যে কোন ভাবে এর ব্যবহার উচিত হবে। এর কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য হলেও একটি বোমা ফেলা হউক। ফলে বহু নির্দোষ মানুষের প্রাণ যাবে। আমার এক বন্ধু বলেছিল, শুধুমাত্র অর্থ আয়ের জন্যেই বৈরুতে একজন ব্যক্তি অস্ত্র ব্যবসায় লিপ্ত আছে। সেই ব্যক্তির কারণেই প্রতিদিন দশ বা পনের বা একশ লোক রাস্তায় মারা যাচ্ছে। এই ব্যক্তির কাছে মানবিক জ্ঞান, পারস্পরিক সম্মান ও বিশ্বাস বোধের অভাবের কারণেই এ’ কাজ করা সম্ভব হচ্ছে। তার মধ্যে দয়া ও ভালবাসা থাকলে এ কাজ করা সম্ভব হতো না।
সুতরাং মানসিক চেতনা পরিবর্তনের মাধ্যমে শান্তি স্থাপনের প্রচেষ্টা যতোই কঠিন হউক না কেন, দীর্ঘস্থায়ী বিশ্ব শান্তি লাভের ইহাই একমাত্র পথ। আমরা জীবদ্দশায় যদি এ লক্ষ্য অর্জিত না হয়; তবু আমার বিবেচনায় এটাই সঠিক পথ। আরও বহু মানুষ এ পৃথিবীতে জন্মাবে- পরবর্তী বংশধর এবং তদ পরবর্তী বংশধর আসা অব্যাহত থাকবে। আমার মতে প্রস্তাবিত পদ্ধতির প্রয়োগ জটিলতা ও দুর্বলতাথাকা সত্ত্বেও এর ব্যবহারের চেষ্টা চালানো যথাযথ হবে। এ কারনে আমি যেখানেই যাই না কেন সেখানে এই বিষয়ে কথা বলি। আমার উৎসাহ বেড়ে যায় যখন দেখি নানা পেশার ও বিভিন্ন স্তরের বহু লোক এটিকে ভালভাবে গ্রহণ করছে।
মনুষ্য জাতির জন্যে আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব কর্তব্য আছে। অপর মানুষকে আপন ভাই বোনের মতো জ্ঞান করাও তাদের মঙ্গলের উদ্দেশ্যে উদ্বিগ্ন হবার এই আমাদের উপযুক্ত সময়। আপনি যদি আপনার সকল সুযোগ সুবিধা পুরোপুরি ত্যাগ নাও করতে পারেন তবু অপরের দু:খ কষ্টকে ভুলে যাওয়া উচিত হবে না। সকল মানুষের মঙ্গল ভবিষ্যত নিয়ে আমাদেরকে অবশ্যই ভাবতে হবে।
আপনি যদি আপনার স্বার্থপরতা রাগ এবং তদজাতীয় দোষগুলো কমাবার চেষ্টায় ব্রতী হন এবং অন্যের প্রতি বেশী বেশী দয়াশীল ও মৈত্রী ভাবাপন্ন হন, তবে শেষ পর্যন্ত আপনি এ সকল কর্মের বিপরীত কর্মে নিয়াজিত থাকা সময় অপেক্ষা বেশী সুখে বাস করবেন। এ জন্যেই আমি কখনও কখনও জ্ঞানী স্বার্থপর ব্যক্তিকে এ পথ অনুশীলন করতে বলে থাকি বোকা স্বার্থপর ব্যক্তি সবসময় আপন স্বার্থ নিয়েই চিন্তা করে। ফল দাঁড়ায় শূন্যেরও নীচে। কিন্তু একজন জ্ঞানই স্বার্থপর ব্যক্তি অন্যের মঙ্গল চিন্তা করে এবং যথাসাধ্য সাহায্য করে। ফলে সুখ ভোগ করে।
এই আমার সহজ ধর্ম। জটিল কোন দর্শনের প্রয়োজন নেই। এমনকি মন্দিরের নেই কোন প্রয়োজন। আমাদের বিবেক ও হৃদয়ই হচ্ছে আমাদের মন্দির। দয়া হচ্ছে আমাদের দর্শন।
অনাগতের আলো
তেনজিন গিয়াৎছো, মাননীয় চতুর্দ্দশ দালাই লামা
ভাষান্তর: কাজলপ্রিয় বড়ুয়া, ক্যানবেরা
Related Articles
People can take pride in progress of an independent Bangladesh
25th March night was the moment of truth when Bengalis faced a demonic power of the Pakistan military. It was
Exhibition of Contemporary Art of Bangladesh in Canberra
High Commission of Bangladesh in Australia; University of Canberra and Bengal Gallery of FineArts, Dhaka in collaboration with Bangladesh Australia
কাহিনী সামান্য ৩
নারীবাদ, শাবানা আজমী ও আরও… শাবানা আজমী খুব সংবেদনশীল, সহৃদয় একজন মানুষ। শুধু মেয়েদের জন্যই নয় বস্তিবাসীর অধিকার নিয়েও সহজেই


