ক্রিকেটাঙ্গনের স্বৈরাচার
ফজলুল বারী: ডিসেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত লম্বা সময়ের বিদেশে ক্রিকেট সফর চললো বাংলাদেশ দলের। অস্ট্রেলিয়ায় অনুশীলন ম্যাচ-নিউজিল্যান্ড ট্যুর দিয়ে শুরু। এরপর এক টেস্টের ভারত সফর, শ্রীলংকা সফর, এবং সর্বশেষ আয়াল্যান্ড, চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ইংল্যান্ড ট্যুর। মাঝে বাংলাদেশ দলের কয়েক খেলোয়াড়ের পিসিএল-আইপিএল সফরেও দেশের মানুষ ক্রিকেটারদের সঙ্গে ছিলেন। এমন করে ক্রিকেট অনেক দিন ধরে বাংলাদেশের জনমানসের নতুন এক হৃদকম্পের নাম। এদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে ক্রিকেট ভক্ত। দেশে খেলা থাকলে সময়মতো মাঠে ছুটে যান। দল কোন একটি খেলায় জিতলে রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে নেতানেত্রীরা দলকে অভিনন্দন জানিয়ে বিবৃতি দেন। দুনিয়ার আর কোন ক্রিকেট প্লেলিং জাতি একটা খেলাকে কেন্দ্র করে এতোটা উন্মাতাল হয় তা জানিনা। ক্রিকেট নিয়ে বাংলাদেশের আরেকটি ঘটনাও আছে। বিশ্বের সব দেশে প্রধান একটা জনপ্রিয় খেলা থাকে যা কখনো বদলায়না। বাংলাদেশে যা আগে ছিল ফুটবল। কিন্তু বাংলাদেশেই শুধু প্রধান খেলাটির স্থান চ্যুতি ঘটেছে। ফুটবলের এক নাম্বার জায়গাটা দখল করে নিয়েছে ক্রিকেট।
এবং ক্রিকেট এখন বাংলাদেশের বিশাল এক অর্থনীতিরও নাম। নানা কারনে রাজনীতিবিমুখ দেশের শহর-গ্রামের বড় অংশের মানুষ এখন দেশের ক্রিকেট দলের ফ্যান। বিশেষ করে তরুন সম্প্রদায়। দেশের মানুষ ক্রিকেটার, ক্রিকেটদলের সাফল্যে আনন্দে ভাসেন। ব্যর্থতায় কাঁদেন। ক্ষিপ্ত যা খুশি মন্তব্যও করেন। এবং সব তুলনামূলক অবকাঠামো যাই থাকুক না কেনো আজকের সত্য হচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেট সামর্থ্য বেড়েছে। আমাদের দল কোন কোন দিন খুব ক্রিকেট খেলছে। কোন কোন দিন শুরুটা খুব ভালো হচ্ছে। মাঝখান থেকে খেই হারিয়ে ফেলছে দল! সবদেশের মতো বাংলাদেশ দলের নানান সীমাবদ্ধতা নিয়েও নিশ্চয় গবেষনা, চুলেচেরা বিশ্লেষন হয়। কিন্তু প্রতিকার কী হচ্ছে? বাংলাদেশের ক্রিকেট কর্তৃপক্ষের হাড়ির খবর যারা রাখেন তারা জানেন ক্রিকেটাঙ্গনেও এক ধরনের স্বৈরাচারের ভূত চেপে আছে! দল যখন সম্ভাবনা দেখিয়ে হেরে যায় তখন এই স্বৈরাচার নিয়ে আলাপ হয় বেশি। বলা হয় এই স্বৈরাচার দূর হলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের আরও বিকাশ ঘটবে।
আমি রাজনীতির রিপোর্টার। দেশে কোনদিন মাঠে গিয়ে খেলা দেখিনি। দেশের ক্রিকেটের বিজয়ের রাতগুলোয় বড়জোর টিএসসিতে ছুটে গিয়ে আনন্দ বিজয়োল্লাসের রিপোর্ট করতাম। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে কী যে হয়েছে যেখানে দেশের ক্রিকেটদল সেখানে ছুটে যেতে ইচ্ছে করে। বিদেশে আমরা যারা কাজের সংস্কৃতির ব্যয়বহুল জীবনে থাকি তাদের জন্যে এ তাদের জন্যে এটি যে কত কঠিন এক নেশা তা ওয়াকিফহালরা জানেন। আমাকে অনেকে মজা করে বলতেন, আপনি ভাই একটা পাগল ভাই। তাদের মজার জবাব দিয়ে বলি, ঠিক ধরেছেন, কিন্তু ছোটখাট পাগল হলে এসব করা যায়না। ভালো পাগল হতে হয়।
নিউজিল্যান্ড সফরের সময় মাসাধিককাল ধরে ক্রিকেট দলাকে খুব কাছে থেকে দেখেছি। উপমহাদেশের দলগুলোর জন্যে বিপদজ্জনক গন্তব্য নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট মাঠ সমূহ। নিউজিল্যান্ড সফরে বাংলাদেশ দল একটিও জয় পায়নি। কিন্তু চিন্তার বাইরে ভালো খেলেছে। নিউজিল্যান্ড সফর কাজে দিয়েছে শ্রীলংকা, আয়ারল্যান্ড সফর এবং ইংল্যান্ডে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে। দেশের বাইরে প্রথম নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইন্যাল খেলেছে বাংলাদেশ। আয়ারল্যান্ড সফর আর চ্যাম্পিয়নস ট্রফি উপলক্ষে দল যখন ঢাকা ছাড়ে তখন এ দলটি সেমি ফাইনাল খেলবে এমন বাস্তববাদী আশাবাদী খুব কম লোক ছিল। কিন্তু আবেগবাদীরা এরপর সেমিফাইনাল, ফাইন্যাল জয়ের দুঃসাহসও দেখিয়েছে! ‘যদি লাইগা যায়’বাদীর সংখ্যাও ছিলো বেশ।
নিউজিল্যান্ড সফরের সময় খুব কাছে থেকে দেখেছি চমৎকার সম্ভাবনাময় তরুন ক্রিকেটারদের। গত ক্রিকেট বিশ্বকাপের সময় সিডনির মিডিয়া ব্রিফিং’এ কোচ হাথুরু সিংহে বলেছিলেন সৌম্য সরকার হলো গিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যত। নিউজিল্যান্ড সফরের সময় আরও কয়েকজন ভবিষ্যতকে দেখেছি। দলের সিনিয়র ক্রিকেটারদের বিনয়, কারো কারো ড্যামকেয়ার ভাবও কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়। খেলোয়াড়দের প্রায় সবার সঙ্গে মিডিয়া কর্মীদের চমৎকার সম্পর্ক। আগে মিডিয়া হাউসগুলোতে রাজনৈতিক রিপোর্টারদের একচ্ছত্র দাপট ছিল। অফিসের খুব অবহেলিত অংশে থাকতো মফঃস্বল আর স্পোর্টস ডেস্ক। ক্রিকেট এখন পালটে দিয়েছে স্পোর্টস ডেস্কের বৈভব। যেহেতু দেশের মানুষজন এখন রাজনৈতিক রিপোর্টের চাইতে ক্রিকেটের রিপোর্ট বেশি পড়েন, দেখেন, মিডিয়া হাউসগুলোতে ক্রিকেট রিপোর্টারদের গুরুত্ব-কদরও বেড়েছে। বাংলাদেশ দল এখন যেখানে যেদেশে খেলতে যায়, প্রধান মিডিয়াগুলোর সাংবাদিকরাও দলের পিছু পিছু যান। এর কারনেও ক্রিকেট সাংবাদিকদের সঙ্গে ক্রিকেটারদের গড়ে উঠেছে বিশেষ একটি আন্তরিক সম্পর্ক। ক্রিকেটাঙ্গনের সদর অন্দরের নানা বিষয়ও তাদের নখদর্পনে।
বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গনের স্বৈরাচারের আলোচনায় দু’জনের নাম শুধু এখানে দিচ্ছি। আজকের যে ক্রিকেট বৈভব এর ভিত্তিটা কিন্তু অনেকটাই সাবের হোসেন চৌধুরীর হাতে গড়া। আইসিসি ট্রফি জয়, বাংলাদেশ দলের টেস্ট স্ট্যাটাস অর্জন, এসবের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকাটি ছিল সাবের হোসেন চৌধুরীর। কিন্তু আজ ক্রিকেট নিয়ে এত উৎসব-স্পন্দন! দেশের ক্রিকেটে সাবের হোসেন চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্বের অবস্থান করে রাখা হয়েছে ‘নো হো্যার’! এখনও দেশে বিদেশে ক্রিকেটের খেলার মাঠে-গ্যালারিতে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা একজন মানুষের সরব উপস্থিতি সবার চোখে পড়ে। ইনি সাজ্জাদুল আলম। ববি ভাই নামে তাকে চেনেন ক্রিকেটাঙ্গন, সাংবাদিক সবাই। বাংলাদেশে যখন ফুটবলের দাপট তখন ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকদের মাঠে নিয়ে এসে ডেকোরেটর থেকে ভাড়ায় আনা তাবু, চেয়ার-টেবিলে বসিয়ে অনেককে দিয়ে ক্রিকেট লেখানোর নানান কসরত করতেন ববি ভাই। এখনও তিনি বিসিবির নামকাওয়াস্তে সদস্য তিনি আছেন। কিন্তু ক্রিকেট রাজনীতির কারনে সাবের হোসেন চৌধুরীর মতো ববি ভাইকেও এক রকম নো হোয়্যার করে রাখা হয়েছে। অথচ দেশেবিদেশে এদের যত ব্যক্তিগত সম্পর্ক-যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে আরও অনেক কিছু করা যেত ক্রিকেট অবকাঠামোর। কিন্তু কূট রাজনীতি আর স্বৈরাচারের ক্ষমতা খর্ব হবার আশংকায় তাদের আপাতত নো হোয়্যার করে রাখা হয়েছে।
এসবতো গেলো ক্রিকেট সাংগঠনিক স্বৈরাচারের অংশ। খেলার মাঠের স্বৈরাচার কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। নিউজিল্যান্ড সফরের সময় সৌম্য সরকারের অফ ফর্ম চলছিল। কিন্তু এরপরও তাকে সুযোগ দেয়া হচ্ছিলো! এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে বলা হয়েছে খেলায় থাকতে থাকতে সৌম্যর ফর্ম ফিরে আসবে। এটি একটি ভালো দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু শ্রীলংকা সফরের সময় মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের সঙ্গে কী আচরন করা হয়েছে? এর নেপথ্যের কারন সৌম্য কোচ হাথুরু সিংহের গুডবুকে আছেন। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ নেই। কোচের গুডবুকে নাম না থাকায় গত বেশ কিছুদিন ধরে কত সম্ভাবনাময় ক্রিকেটারের যে অপমৃত্যু অথবা করুন মৃত্যু ঘটেছে বাংলাদেশে। নাসির তাদের একজন। অনেকে বলতে চাইবেন এতই কী ক্ষমতাশালী বাংলাদেশ দলের হেডকোচ? উত্তরটা হ্যাঁ, তবে কৌশলে। বিসিবির সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের ঘাড়ে বন্দুক রেখে শিকার করতে পছন্দ করেন কোচ!
এই গল্পটা ক্রিকেটারদের মুখে শোনা। হাথুরু সিংহে দায়িত্ব নেবার সময় তার একটি তত্ত্ব শুনিয়েছেন বিসিবি বসকে। তত্ত্বটি হলো বাংলাদেশ এর আগে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড এসব দেশ থেকে কোচ নিয়েছে। তারা খুব বন্ধু ভাবাপন্ন। এরজন্যে ক্রিকেটাররা তাদের তেমন মানতোনা। কিন্তু উপমহাদেশে নাকি দরকার একজন হেড মাস্টার কোচ। যাকে ক্রিকেটাররা মানবে, ভয় পাবে। হাথুরু সিংহে ভালো একজন কোচ তা নিয়ে কারও সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি হেড মাস্টার হতে গিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট দলটিকে ঐক্যবদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাকে ষোল আনা সমর্থন দিচ্ছেন বিসিবি সভাপতি। এর অপব্যহারের মাধ্যমে তিনি দলের নির্বাচক মন্ডলিকেও ঠুটো জগন্নাথ বানিয়ে রেখেছেন! বাংলাদেশ দলের হাড়ির খবর হচ্ছে কোচ যা চাইছেন তা তিনি বিসিবির সভাপতির নামে একটি দল বানিয়ে নিচ্ছেন। এতে করে তিনি অবজ্ঞা করছেন সিনিয়র ক্রিকেটারদের, নির্বাচক মন্ডলিকে! এরজন্য দারুন ফর্মে থাকা নাসির দলে ঢুকতে পারছেননা। অফ ফর্ম স্বত্ত্বেও ফর্মে থাকা ইমরুল কায়েসকে বসিয়ে রেখে সৌম্যকে খেলানো হয়! এসব নিয়ে সিনিয়র খেলোয়াড়-নির্বাচক মন্ডলির মধ্যে এক ধরনের অসন্তোষ আছে। কোচের ব্রিফিং’এ বিসিবি সভাপতি অনেক সময় মিডিয়াকে একপেশে অথবা অসত্য তথ্যও দিচ্ছেন! বাংলাদেশ দল তথা যে কোন ক্রিকেটদলের দরকার একটি সমন্বিত অবকাঠামো। যার যে কাজ সে তার কাজ করবে। কোচ সব পক্ষের সমন্বয়ক হবেন। কিন্তু এখানে কোচের টার্গেট ছিল একজন স্বৈরাচারী হেড মাস্টার হওয়া। বাংলাদেশ দল এসব অসঙ্গতি কাটিয়ে উঠতে পারলে আরও সাফল্য পাবে। দেশের দলটাকে খুব কাছে থেকে দেখে এ বিশ্বাস আমার হয়েছে।
Related Articles
An excellent Iftar party hosted by Bangladesh-Australia Association, Canberra
On Sunday 6th September 2009, the Bangladesh-Australia Association, Canberra organised its annual Iftar party at the Canberra Islamic Centre (CIC)
হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি – আমার কিছু মন্তব্য -১
আমি একাধিক পোষ্টে, একে একে হেফাজতের ১৩ দফা দাবির ওপর আলোচোনা করে আমার ব্যক্তিগত মতামত আর সাজেশন উপস্থাপন করছি, এই
21st Century Architect’s!
“My greatest challenge has been to change the mindset of people. Mindsets play strange tricks on us. We see things


