টেলিভিশনে শুনি শুধু সহজ সহজ ভুল
ফজলুল বারী: দেশের টিভি চ্যানেলগুলোর অনেক আলোচনা কান পেতে শুনি। অনেকে খুব ভালো, বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনা করেন। চমৎকার চমৎকার ছেলেমেয়ে টিভি চ্যানেলগুলোয় চমৎকার সব কাজ করছে। আবার অনেক আলোচনা যেন শিশুতোষ। একটা অভিযোগ প্রায় শোনা যায় তাহলো, লোকবল সংকট। লোকবল যা আছে তাদের কাজ কী তারা ঠিকমতো করেন? না আদায় করার ব্যবস্থা আছে? এদের কোনদিন সিডনিতে পেলে ঘুরিয়ে দেখাবো নতুন এই পৃথিবী কিভাবে কম লোকবল দিয়ে বেশি কাজ করানোর সংস্কৃতির যুগে প্রবেশ করেছে। আমাদের ঘরের কাছের রেল স্টেশনগুলোতে একজন মাত্র স্টাফ। ইনিই টিকেট বিক্রি করেন, ইনিই স্টেশন ঝাড়ু দেন। আজকের যুগের ডিজিটাল ব্যবস্থার কারনে অবশ্য কাউন্টার থেকে টিকেট কেনার চল প্রায় উঠেই গেছে। স্টেশনের বুথ থেকে বা পাড়ার পত্রিকার দোকানেও নিজে নিজে টিকেট কেনা বা রিচার্জ করা যায়।
এসব ঝকঝকে সাফসুতরো স্টেশনগুলো দেখি আর ভাবি আমার দেশে এমন একটি স্টেশনের স্টাফ থাকতো কমসে কম তিরিশ জন। এই তিরিশ জন মিলে রেল আর যাত্রীদের কী সার্ভিস দেন তাতো সবার মুখস্ত অভিজ্ঞতা। দুনিয়াতে এখন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ কমাতে নতুন লোক নিয়োগে সংকোচন নীতি অনুসরন করা হয়। জরুরি কাজের প্রয়োজনীয় লোক হায়ার করা হয় বিভিন্ন বেসরকারি এজেন্সির কাছ থেকে। ঘন্টা ধরে এর পেমেন্ট পায় এজেন্সি। এখন এজেন্সি যাকে দিয়ে যত ডলারে কাজ করাতে পারে। এজেন্সি থেকে লোক নেয়াতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ছুটি সহ চাকরি বিধির নানাকিছুর দায়িত্ব সরকারের নয়। এর সবকিছু দেখভাল করে এজেন্সি। আর কাজ মানে এখানে ষোল আনা উসুল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চার ঘন্টার শিফটে কোন বিরতি নেই। আট ঘন্টার শিফটে চার ঘন্টার পর কুড়ি বা তিরিশ মিনিটের ব্রেক। বাংলাদেশের বেশিরভাগ সরকারি প্রতিষ্ঠানে আট ঘন্টার অফিস সময়ে কাজ হয় কয় ঘন্টা? নামাজ সহ কত কিসিমের ব্রেক থাকে? এখানে কর্মক্ষেত্রে ধর্ম চর্চা নিষিদ্ধ। বাড়িতে যত বেশি ধর্ম চর্চা করেন, কেউ আপত্তি করবেনা। সিডনিতে ছুটির দিন দেখে বিভিন্ন এলাকায় ট্রেন বন্ধ রেখে রেলপথ মেরামত-রক্ষণাবেক্ষনের কাজ করা হয়। ওই লোকবল-যন্ত্রপাতিও রেলওয়ের নয়। বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে হায়ার করা সবকিছু।
আমরা পারলে ঈদের দিনেও কাজ করি শুনে দেশের অনেকে যেন বিস্ময়ে ধপাস করে মাটিতে পড়ে বলেন, ওম্মা ঈদের দিনেও কাজ করেন বুঝি! ঈদেও তারা ছুটি দেয়না! এতো খারাপ দেশ! কিভাবে বুঝাই আমাদের ব্যয়বহুল কঠিন জীবন। কাজ করলেই টাকা। সে জন্যে শিফট পেলে আমরা তাই সহজে তা হাতছাড়া করতে চাইনা। সে কারনে মুসলিম এলাকাগুলোর মসজিদে সকাল সাতটায়ও ঈদের প্রথম জামাত হয়। যেন তেমন লোকজন ঈদের নামাজ পড়ে কাজে চলে যেতে পারেন। কাজে যেতে সুবিধার জন্যে অনেক মসজিদে জুম্মার প্রথম জামাতটা সংক্ষেপে ছোট সুরায় শেষ করা হয়। দ্বিতীয় জামাতটি হয় ধীরেসুস্থে। এসব দেশের মসজিদে যারা নামাজ পড়ান এটি তাদের মূল পেশা নয়। মূল পেশা অন্য চাকরি। অনেকটা টিউশনির মতো নির্দিষ্ট দিনগুলোর নির্দিষ্ট ওয়াক্তগুলোয় অথবা জুম্মার নামাজ-ঈদের নামাজ পড়িয়ে আলাদা একটি আয় করে ঈমাম সাহেব চলে যান তার মূল চাকরিতে। এরজন্যে এখানে কারো অন্যের পিছনে লেগে থাকার আলাদা সময় বা শিফট নেই।
কিছুদিন আগে ঢাকার একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখলাম জরিমানা আদায়ে ক্রেডিড কার্ড ব্যবহারের পদ্ধতির উদ্বোধন করে বলছেন, এটা নাকি বিদেশে আছে। তিনি ভুল বলেছেন অথবা তাকে ভুল তথ্য দেয়া হয়েছে। সে কারনে তার উদ্বোধন করা ক্রেডিড কার্ড ব্যবহার করে জরিমানা আদায়ের কোন ফলোআপও কেউ জানেনা। আসল তথ্য হচ্ছে বিদেশে যেমন অস্ট্রেলিয়ার কোথাও অন দ্য স্পট নগদ জরিমানা আদায়ের ব্যবস্থা নেই। দেশের পুলিশ কর্তার প্রস্তাবনার ব্যবস্থাটি অবাস্তব এবং দুর্নীতির সুযোগ করে দিতে বাধ্য। মনে করুন এখানে ট্রেনে একজন যাত্রীকে পাওয়া গেলো যার ভ্রমন কার্ডে পর্যাপ্ত ক্রেডিট নেই অথবা ট্রেনে চড়ার সময় এন্ট্রি পয়েন্টে কার্ডটি টাচ করা হয়নি। তখন চেকার তার ফোন নাম্বার নিয়ে তাকে রিং দিয়ে নিশ্চিত হবেন এটি তার ফোন। এরপর তার বাসার ঠিকানা নিয়ে তার হাতে জরিমানার একটি টিকেট ধরিয়ে দেয়া হবে। তার বাসার ঠিকানায় যাবে জরিমানার চিঠি। এমন অভিযোগের স্পট ফাইনের পরিমান দু’শ ডলার।
চিঠিতে তাকে জরিমানা শোধের নির্দিষ্ট একটি তারিখ দেয়া হবে। ওই তারিখের মধ্যে জরিমানা শোধ না করলে প্রশাসনিক ব্যয় সহ যাবে দ্বিতীয় চিঠি। প্রশাসনিক ব্যয় মানে আপনার জরিমানার পরিমান বাড়লো। এভাবে তিনটি চিঠি যাবে। এরপর ব্যাংক একাউন্ট ফ্রিজ সহ জরিমানা আদায়ের উদ্যোগ নেয়া হবে। অথবা আপনি চিঠি পেয়ে যদি তাদেরকে ফোন করে বলেন এতো টাকা একসঙ্গে দেয়া আপনার জন্যে কষ্টকর, তখন আপনার সঙ্গে আলোচনা করে কিস্তিতে জরিমানা শোধের ব্যবস্থা করে দেবে। মোটকথা টাকা আপনাকে দিতেই হবে। এমন এদেশের কোন জরিমানাই স্পটে বা নগদ পরিশোধের ব্যবস্থা নেই। বেশিরভাগ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নগদ লেনদেনের ব্যবস্থা নেই। লেনদেন হয় ডেভিড বা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে।
নানান টেলিভিশনে নানাজনের বয়ানে শুনি সরকার গাড়ি চালকদের ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ করে তুলছেনা! অথচ উন্নত বিশ্বের কোথাও সরকার এটা করেনা। সবাই গাড়ি চালাতে শেখেন বেসরকারি উদ্যোগের প্রশিক্ষকের তত্বাবধায়নে। এই প্রশিক্ষক আবার বিশেষ সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত। তাকেতো ট্রাফিক আইনের আপডেটসব জানতেই হবে। তবে তার লাইসেন্স প্রাপ্তির প্রথম যোগ্যতা হচ্ছে পূর্ববর্তী পাঁচবছর তার কোন ট্রাফিক অফেন্স থাকতে পারবেনা। অস্ট্রেলিয়ায় গাড়ি চালনা শেখা খুবই ব্যয়বহুল। প্রতি ঘন্টায় পরিশোধ করতে হয় চল্লিশ বা পঞ্চাশ ডলার। প্রথম দিন থেকে এই প্রশিক্ষক ব্যস্ত রাস্তায় ছাত্রকে নিয়ে বেরোন। ছাত্র কতদিনে পরীক্ষা দেবার উপযুক্ত হবে তা প্রশিক্ষক তার ধারনা থেকে ঠিক করেন। ড্রাইভিং পরীক্ষা নেন সরকারি পরীক্ষক। শতভাগ নির্ভূল চালনা দেখে পাশ মার্ক দেবেন পরীক্ষক।
আর বাংলাদেশে হাজার হাজার লোক বাস-ট্রাক চালাচ্ছে যাদের ভারী যানবাহন চালানোর লাইসেন্সই নেই। শুনলে ভয়ে গা কাটা দিয়ে ওঠে। এখানে আমি গাড়ি চালাই কিন্তু বাস-ট্রাক চালাতে পারবোনা। কারন বাস-ট্রাক চালানোর প্রশিক্ষণ-লাইসেন্স সব আলাদা। বাংলাদেশের জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স এখন অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। যেহেতু এদেশে বিদেশের লাইসেন্স দিয়ে গাড়ি চালানো যায় তাই বাংলাদেশি ছাত্ররা বাংলাদেশ থেকে লাইসেন্স নিয়ে আসে যাদের সিংহভাগ বাংলাদেশে কখনো গাড়ির স্টিয়ারিংই ধরেনি। সিডনির রাস্তায় পুলিশ বাংলাদেশি লাইসেন্স পেলে এখন হাইকমিশনের ভেরিফাইড সার্টিফিকেট চায়। কারন বাংলাদেশের আট রকম লাইসেন্স তারা পায় রাস্তায়, কোনটা আসল কোনটা নকল নিশ্চিত হতে চায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের চিঠি। কোন দেশে গাড়ি চালানোর পরীক্ষায় পাশ ছাড়া কাউকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া হয়, এটা এরা কল্পনায়ও ভাবতে পারেনা।
বাংলাদেশের নতুন ট্রাফিক আইন চালুর পর অনেকে মিডিয়ায় বলছেন, বেতন পান পাঁচ-ছয় হাজার, পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা কি করে দেবেন। অস্ট্রেলিয়ায় এটা বলার সুযোগ নেই। জরিমানার কথা জেনেশুনে আপনি রাস্তায় নামবেন। আপনাকেতো কেউ হাতেপায়ে ধরেনি যে দয়া করে গাড়ি চালাবেন। উন্নত বিশ্বে উচ্চহার জরিমানার ব্যবস্থা করা হয় যাতে আপনি ভয় পেয়ে বাধ্য হয়ে আইন মেনে চলবেন। এখানে একেকটা জরিমানার অংকে আমাদের সপ্তাহের আয়-বাজেটে টান পড়ে। তাই আমরা সাবধান থাকি জরিমানার ফাড়ায় যাতে পড়তে না হয়। চালকদের ডিমেরিট পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশে আলোচনা হচ্ছে। আমাদের একটি পয়েন্ট খোয়া গেলে তা ফেরত আসে তিন বছর চার মাস পর। অর্থাৎ আমার ১৩ টি চলে গেলে আমি তিন বছর চারমাস গাড়ি চালাতে পারবোনা। আর গাড়ি না চালাতে পারলে আমরা চাকরি সহ নানাকিছুতে অচল। আমাদের এখানে নানা চাকরি পেতে ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকা-গাড়ি চালানো মাস্ট। বাংলাদেশের সড়ক নৈরাজ্য আর রাস্তার মৃত্যু মিছিলের রাশ ধরে টানতে চাইলে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইনের কড়াকড়ি বাস্তবায়নের কোন বিকল্প নাই।
Related Articles
Quarantiny – 14 Days in Isolation 2020 – Chapter 1
14 Days in Isolation 2020 due to COVID-19 (Dedicated to the front-line fighters helping us to win our COVID-19 war)
Internet – the good, the bad and the ugly
A society is a dynamic institution created by mankind to pursue common social goals. While an individual seeks to maximize
International Mother Language Day
The UN International Mother Language Day celebrated on 21 February commemorates the lives sacrificed by Bengalis to defend their right


