রেনুর নিষ্পলক চাহুনী ও আমাদের মানবিকতা!

রেনুর নিষ্পলক চাহুনী ও আমাদের মানবিকতা!

রেনু, দুই সন্তানের মা ছিলেন। এইতো গত পরশুরাতেও তিনি নিজের ঘরে ছোট ছোট সন্তানদের পাশে নিয়ে ঘুমিয়েছেন। রাজকন্যা- রাজকুমারের-দৌত্য-দানবের গল্প শুনিয়েছেন। সেই মা’টাও সন্তানদের সাথে তাঁর ছোট বেলার গল্প করতেন, নিজের বাবা-মা’য়ের গল্প করতেন, ভাইবোনদের গল্প শুনাতেন।

নিশ্চয় তিনি সন্তানদেরকে ভবিষ্যতে সুন্দর দিনের স্বপ্ন দেখাতেন। সন্তানদের উৎসাহিত করতেন – ভালো করে পড়াশুনা করতে, ভালো মানুষ হতে বলতেন।

এখন, রেনু শত ক্ষত দেহে নিয়ে একা শুয়ে আছেন কবরে। তাঁর সন্তান দু’জন অন্য কারোর কোলে- থেকে থেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। “আম্মু আম্মু – কৈ তুমি” করে করে এ-ঘর ও-ঘর খুঁজছে। আবার খেলছে। ক্ষুদা লাগলে – বাচ্চা দুটো আবার ডাকছে “আম্মু আম্মু – কৈ” বলে রান্না ঘর-বাথরুম-বারান্দা কিংবা শুবার ঘরে খুঁজছে।

কেন- এইভাবে বাচ্চা দুটোকে একা করে দিলেন। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বাবা-মা’য়ের বিবাহ বিচ্ছেদে – সন্তানরা এমনিতে নিঃস্ব হয়ে যায়, নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে (সঠিক পারিবারিক ও সামাজিক কাউন্সেলিং এর অভাবে)। এই বাচ্চা দুটো তাদের মা’কে আঁকড়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখতো নিশ্চয়। তাদের ছোট্ট পৃথিবীর সকল বিপদে-আপদে-অসুখে-বিসুখে এই বাচ্চা দুটো রেনু’মা কে আঁকড়ে থাকতো।

বাচ্চাদুটোকে কেন এমন নৃশংসভাবে মা-হারা করলেন। একজন “একলা মা”- বাংলাদেশের মতো জায়গায়- কত ভয়াবহ কষ্ট করে টিকে ছিলেন – দুটো সন্তানকে ঘিরে। সেটা যেই কোনো সুস্থ মানুষের বোধগম্য হওয়ার কথা।

অথচ, কিছু অসভ্য-বর্বর অমানবিক মানুষ তাকে জ্যান্ত মেরে ফেললো। এমন কি মরে যাওয়ার পরেও – তাকে পেটানো হলো। কি নির্মম! – সেই সব আবার মোবাইল দৃশ্যায়ন করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়া হলো। কি নিষ্ঠূর!

আমি এই ঘটনার কোনো সঠিক উত্তর পাইনি। দেশে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। শিক্ষার হার বেড়েছে, জিডিপি বেড়েছে, অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, ঘরে ঘরে টেলিভিশন, হাতে হাতে মোবাইল ফোন সাথে ইন্টানেট হয়েছে, সবার বাসস্থান, চিকিৎসা, বস্ত্র ইত্যাদি সব কিছুতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে।

কিন্তু, মানবিকতা দিন দিন তলানীতে চলে আসছে। – রেনু সহ অন্যান্য সকল সন্দেহ বসত গণপিটুনির শিকার মানুষগুলোর দিকে তাকালেই সেটা বুঝতে পারি। শুধুমাত্র সন্দেহ করে- আমরা এতটা নির্মম হতে পারি যে – মানুষ খুন করে ফেলছি। তাদেরকে আইনের হাতে তুলে দেয়ার কথা মাথায় আসছে না।

আমি রেনুর জায়গায় নিজেকে অনেকবার দেখার চেষ্টা করেছি ও দেখেছি। আমিও একলা মা ছিলাম ও আছি। অভিভাবকত্বের সকল দায়িত্ত্ব আমাকে একাই পালন করতে হয়েছে। আমি আমার সন্তানদের নিয়ে স্কুলে ভর্তি থেকে শুরু করে, দেশ বিদেশ সব জায়গায় ঘুরেছি ও ঘুরি। এখনও একাই সব করি। ভাগ্গিস, এমন নির্মম ও নিষ্ঠুর মানুষদের চোখে আমি পড়িনি। যারা – চাইলেই আমাকেও “ছেলে ধরা” সন্দেহ করে মেরে ফেলতে পারতো।

একটু মানবিক হউন, দয়া করুন।

রেনুর নিষ্পলক চাহুনীতে আপনারা পুড়ে শেষ হয়ে যাবেন। শিশু তুবার কান্নার জলে – ভেসে যাবেন।


Place your ads here!

Related Articles

হরতালের বিকল্প ভাবুন

নির্দলীয় সরকারপ্রধানের দাবিতে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি যে আপোষহীন, তা তাদের বিগত কয়েকদিনের কর্মসূচিতেই প্রতীয়মান। দলটি তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বেশ

‘প্রভাত ফেরী – কবিতা বিকেল বাংলা সংস্কৃতি উৎসব’ “বাংলা ফেস্ট সিডনী” অনুষ্ঠিত হবে ২রা নভেম্বর ২০১৯

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কবিতা বিকেল প্রবাসে শুদ্ধ বাংলা সংস্কৃতির চর্চা ও প্রসারে কাজ করে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় গত বছর থেকে সিডনির

Zaglul Ahmed Chowdhury: As I knew him

Zaglul Ahmed Chowdhury’s tragic demise due to the road accident on 29th November was the most wrenching piece of news

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment