শুভ জন্মদিন রনি
ফজলুল বারী: শুভ জন্মদিন রনি। প্রিয় প্রজন্ম নুরুল আজিম রনি। চট্টগ্রামের আলোচিত বিতর্কিত ছাত্রনেতা। গেলোবার তার জন্মদিনে সিডনিতেও আমরা একটা কেক কেটেছিলাম। বাংলাদেশিদের হাব অস্ট্রেলিয়ার সিডনির লাকেম্বা। লন্ডনে যেমন ব্রিকলেন তথা বাংলা টাউন, নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইট তেমনি সিডনির লাকেম্বা। এখানকার গ্রামীণ রেষ্টুরেন্টের লাগোয়া ফুটপাতে রাখা টেবিলে কেক কেটে আমার প্রিয় প্রজন্মদের জন্মদিন পালনের রেওয়াজটি বেশ আলোচিত। এখানে আটাশ ডলারে একটা কেক কিনতে পাওয়া যায়। কিন্তু যার জন্মদিন পালন হয় তার কাছে এর আনন্দটি আটাশ লাখ ডলারের বেশি। আজকাল ফেসবুকের মাধ্যমে সহজে জানা যায় প্রিয়জনের জন্মদিন। রনির জন্মদিন উদযাপন নিয়ে দুটো মজার ঘটনা ঘটে। জন্মদিনটা রনির শুনেই এক বিএনপি কর্মী প্রিয় প্রজন্ম সেখান থেকে উঠে চলে গেলো। কেক কাটা খাওয়াদাওয়া শেষে আমার এক প্রিয় প্রজন্ম বোন জিজ্ঞেস করলো এই রনির না একটা ভিডিও ভাইরাল হয়েছে ভাইয়া। জবাব দিয়ে বলি একটা নয়, দুটো ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। আমরা তার ভালো দিকটার পক্ষে। মন্দ দিকটার নয়।
এই রনিকে আমি কখনো সামনা-সামনি দেখিনি। দেশের সঙ্গে বহু বছরের গ্যাপ। আজকালকার নেতা, সাংবাদিক সহ অনেককেই সামনা-সামনি দেখিনি। কিন্তু তাদের কাজগুলো মুগ্ধ হয়ে দেখি। আমি আবার একটা কথা বড়াই করে বলি। তাহলো বেয়াড়া-বেয়াদব ছেলেমেয়ে বলে যারা চিহ্নিত তারা তুলনামূলক মেধাবী হয়। এদের একটু ভালোবাসা-বন্ধুত্ব-অভিভাবকত্ব দিয়ে এদের মাধ্যমে অনেক ভালো কিছু করানো সম্ভব। চট্টগ্রামের বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছিরের ইন্টারভ্যু যখন আমি প্রথম ঢাকার পত্রিকায় করি তার ইমেজটি ছিল একজন সন্ত্রাসী নেতার। অনেকগুলো মামলায় তিনি তখন পলাতক অথবা জামিনে ছিলেন। একবার চট্টগ্রাম অঞ্চল নিয়ে জনকন্ঠের হয়ে রিপোর্ট করতে গিয়েছিলাম। সিরিজ রিপোর্টটির শিরোনাম ছিল ‘বঞ্চনার চট্টগ্রাম’। সব এলাকার মানুষই মনে করে তারা বঞ্চিত। এমন রিপোর্ট এলাকার লোকজনকে স্পর্শ করে।
বিএনপি-জামায়াত তখন ক্ষমতায়। আবার চট্টগ্রামের মেয়র তখনও এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তখন জনকন্ঠের কিছু তরুন ভক্ত অনুরোধ করলেন আমি যাতে আ জ ম নাছিরের একটা ইন্টারভ্যু করি। তাদের ইচ্ছা তরুনদের প্রতিনিধি হিসাবে আ জ ম নাছির যেন একদিন চট্টগ্রামের মেয়র হোন। এরাই তখন আ জ ম নাছিরের সঙ্গে আমার বৈঠকের ব্যবস্থা করেন। চট্টগ্রামের এক আবাসিক হোটেলে বৈঠকটি হয়। তখনও চট্টগ্রামের ছাত্রলীগ দুই ভাগ। একভাগ এ বি এম মহিউদ্দিনের পক্ষে। আরেক ভাগ আ জ ম নাছিরের পক্ষে। সেই বিভক্তি এখনও বহাল। এই নুরুল আজিম রনি ছিল এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ভাবশিষ্য। এখন প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ভক্তরা এখনও তাকে ডাকেন চট্টলবীর। আর রনিকে তার ভক্তরা ডাকেন ছোট মহিউদ্দিন এবং ছাত্রবীর। এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এখন আ জ ম নাছিরের একচ্ছত্র আধিপত্য। এরপরও এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারীদের এখনও কোনঠাসা করে রাখতে প্রতিদিন যা যা দরকার তা করেন আ জ ম নাছির। চট্টগ্রামের ছাত্র এবং অভিভাবক প্রিয় ছাত্রনেতা নুরুল আজিম রনি এখনও তার প্রতিদিনের আক্রোশের লক্ষ্যবস্তু। শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এটা জানেননা তা নয়। কিন্তু অদ্ভুত বাংলাদেশের রাজনীতি। এসব সুরাহায় কারও মন নেই যেনো। মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে ব্যারিষ্টার নওফেলকে আওয়ামী লীগের অন্যতম কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে। চট্টগ্রামের এসব বিভক্তির রাজনীতির সাতেপাঁচে নেই ব্যারিষ্টার নওফেল। রনিরাও অভিভাবকত্বহীন।
একবার রনির মুক্তির দাবিতে চট্টগ্রাম জুড়ে ছাত্র আন্দোলন চলছিল। অবাক দেখি চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও রনির মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন সহ নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। শুধু চট্টগ্রাম নয়, রনির মুক্তির দাবিতে কর্মসূচি পালিত হচ্ছিল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।দেশের মূলধারার মিডিয়ায় নয় এসব কর্মসূচি ফলাও করে প্রচার হচ্ছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। মূলত ওই সময়েই রনি ছেলেটা আমার নজরে আসে। জানার চেষ্টা করি সারাদেশে যেখানে ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে নানান বদনাম, এই ছেলেটি এমন বিপুল ছাত্রপ্রিয় কেনো। রনি তখন চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক।
তখন জানতে পারি ছাত্রদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফী আদায় সহ নানান জনপ্রিয় অভিযোগের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ বা দেশের মূলধারার ছাত্র সংগন যখন সোচ্চার নয়, এই ছেলেটি তেমন অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে করে চট্টগ্রাম অঞ্চলের শুধু ছাত্রছাত্রী নয়, অভিভাবকদের কাছেও জনপ্রিয়। কিন্তু এই রনিকে তখন গুরুতর একটি অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগটি হলো স্থানীয় এক নির্বাচনে অস্ত্র সহ প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ। বাংলাদেশে যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তখন এর নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ থাকে বিস্তর। এরা হয় গ্রেফতার হয়না অথবা গ্রেফতার হলেও জামিন পেয়ে যায়। রনি গ্রেফতার হয়েছে। জামিন দেয়া হয়নি। ব্যতিক্রমী ঘটনার কারন খুঁজতে গিয়ে দেখি পিছনে আ জ ম নাছির।
এখন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেও অনেক কাজ করা যায়। রনির ছাত্র প্রিয় ভাবমূর্তিতে অভিভূত হয়ে কাজ করা শুরু করলাম তার পক্ষে। তখন কোন একটি ঈদ সমাগত। রনির অনুসারীরা অবস্থান নিলো চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে। তাদের দাবি ঈদের আগে রনিকে মুক্তি না দিলে তারা ঈদ করবে রাস্তায়। ঢাকার আমার প্রিয় আইনজীবীদের একজন স ম রেজাউল করিম। এখন পূর্তমন্ত্রী। তার সঙ্গে কথা বললাম ফোনে। তিনি কথা দিলেন ঈদের আগে ছেলেটির জামিনের চেষ্টা করবেন। রেজা ভাইও বললেন এই ছেলেটির প্রতি তার ভালোবাসার কারন সে ছাত্রদের ইস্যুভিত্তিক দাবিদাওয়া আদায়ে সক্রিয়।
ঈদের আগে যদি রনির মুক্তি না হয় সে আশংকায় তার জন্যে একটি ঈদের পাঞ্জাবি পাঠানোর উদ্যোগ নিলাম জেলখানায়। সে প্রয়োজন আর পড়লোনা। রেজা ভাই হাইকোর্টে তার জামিন করালেন। ঈদের আগে যাতে তার মুক্তি হয় সে কারনে স্পেশাল ম্যাসেঞ্জার দিয়ে হাইকোর্টের আদেশ পৌঁছালেন চট্টগ্রাম কারাগারে। মুক্ত রনিকে নিয়ে সেদিন স্মরনীয় আনন্দ মিছিল হয়েছিল চট্টগ্রামে। মিডিয়ায় সে মিছিলের ছবি সেভাবে আসেনি। কারন আ জ ম নাছির। এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর চট্টগ্রামে তার দালাল হিসাবে চিহ্নিত সাংবাদিকদের বেশিরভাগ বুদ্ধিমানের মতো কেবলা বদল করেছেন। মুক্ত রনি আমাকে ফোন করেছিল। আমি তখন তার কল রিসিভ করিনি। আমার চোখে কেনো যেন পানি চলে এসেছিল।
এরপর চট্টগ্রামের বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষকে রনির মারধরের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। এখানেও অভিযোগ ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফী আদায়। তখন ঢাকার যমুনা গ্রুপের মিডিয়ায় রনির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক রিপোর্ট হচ্ছিল। কারন সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি। শিক্ষা ব্যবসাটি তাদের পারিবারিক। একটা কথা প্রায় লিখি। তাহলো শেখ হাসিনার পরিশ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশে আজ অনেকে মন্ত্রী এমপি। নুরুল ইসলাম বিএসসিও মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন শেখ হাসিনার কৃপায়। কিন্তু এরপরও শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের জিম্মি করে শিক্ষা ব্যবসার মায়া ছাড়তে পারেননি। অতিরিক্ত ফী আদায় নিয়ে বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে তার গায়ে হাত তুলে রনি। পরে বিষয়টির মিটমাটও হয়।
কিন্তু মিটমাট মানলেননা মেয়র। ঘটনার বেশ পরে ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে সেটি ছড়িয়ে দিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। রনি মারধর করেছে বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষকে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে মামলা হয় চাঁদাবাজির। কারন মেয়র এমন ডিকটেশন দিয়েছেন। এরপর আরেক ঘটনা। শিক্ষা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এক কোচিং সেন্টারের মালিককে মারধর করে রনি। এ ঘটনারও মিটমাট হয়। কিন্তু মেয়র মিটমাট মানেননা। ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল করতে হবে। চাঁদাবাজির মামলা দিতে হবে। তাই হয়। মোটকথা ছেলের বয়সী রনিকে এই মেয়র যে ভীষন ভয় পান প্রতিটি ঘটনার নেপথ্যে তার উপস্থিতি সেটা মনে করিয়ে দেয়। মজার ব্যাপার এই মেয়রের বিরুদ্ধে এক সময় যা যা মামলা ছিল সে রকম মামলাই এই ছেলেটির বিরুদ্ধে তিনি একের পর এক দেয়াচ্ছেন।
সর্বশেষ এক মামলায় হাজিরা দিতে গেলে বিচারক জামিন না মঞ্জুর করে তাকে বলেন আবার জেলখানায় গিয়ে কিছুদিন থেকে জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে আসো। রনির ছেলেরা আবার নামলো রাস্তায়। আবার আমি স্মরনাপন্ন হলাম প্রিয় বন্ধু এডভোকেট স ম রেজাউল করিমের। আবার তিনি হাইকোর্টের মাধ্যমে তার জামিন করালেন। আবার তাকে নিয়ে স্মরনীয় আনন্দ মিছিল হলো চট্টগ্রামে। এই হলো আমার প্রিয় প্রজন্ম চট্টগ্রামের নুরুল আজিম রনি। তার মন্দ ভূমিকার আমি সমালোচনা-শাসন করি। ভালো কাজগুলোকে করি সমর্থন।
রনিরা কেনো বারবার লোকজনের গায়ে হাত তুলে তাদের সব অর্জন পন্ড করে? এ প্রশ্নতো আমারও। কারন বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ-বিএনপি এ দুটি দল এখনও কদমবুচি পার্টি। হাত তোলা চড় থাপ্পড়ে শাস্তি দেয়া পার্টি। ওবায়দুল কাদের অথবা বগুড়ায় মির্জা ফখরুলের চড় থাপ্পড়ের ছবিও ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। চট্টগ্রামের মেয়র কিছুদিন আগে এক ডিপ্লোমা প্রকৌশলীকে চড়-থাপ্পড় মেরেছিলেন। তারা তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেও কামিয়াব হতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর গনরূমে বিচার সালিশে চড়থাপ্পড় মারা হয়।
আমার রনি এখন ছাত্রলীগের কোন পদে নেই। কিন্তু ছাত্রদের দাবিদাওয়ার আন্দোলন করে বলে সে শুধু চট্টগ্রাম নয় এই মুহুর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ছাত্রনেতা। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ কোনদিন এই রনির পক্ষে দাঁড়ায়নি। অথবা রনিকে ধারন করার ক্ষমতা নেই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের। শুধু প্রধানমন্ত্রীর অফিসে বসে কিছু স্বজন নীরবে আমাকে সমর্থন দেন। আমাকে রনির পক্ষে দেখে মেয়র ভক্তরা মাঝে মাঝে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হন। রনি নাকি আমাকে নিয়মিত টাকা দেয়। আমি থাকি বিদেশে। ডলারে রোজগার করি। এই পিচ্চি আমাকে টাকা দেবে কিভাবে। বরঞ্চ আমিই বিভিন্ন সময়ে তাকে টাকা দিতে চেয়েছি। সে কখনো আমার টাকা নিতে রাজি হয়নি। ভালোবাসার রনির ছেলেদের প্রতি ঈদে আমি পাঞ্জাবি দেবার চেষ্টা করি। এ কাজটাও করি চট্টগ্রামের এক সাংবাদিকের মাধ্যমে। কিন্তু রনির এত ছেলেমেয়ে। তাদের সবাইকে ঈদের পাঞ্জাবি দিতে পারিনা। সর্বশেষ ঈদে রনি বললো তার পাঞ্জাবিটাই আরেকজনকে দিয়ে দিতে হয়েছে। এমন রনিদের ভালোবাসা দিতে হবে। অভিভাবকত্ব দিতে হবে। তবেই আমাদের রনিরা বিপথে যাবেনা। শুভ জন্মদিন রনি। অনেক ভালো থাকিসরে ভাই।

Related Articles
বাংলাদেশের ভোট : আদর্শ ব্যবস্থা কী?
বাংলাদেশের সংসদ এবং বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন পদ্ধতি বর্তমানে যেমনটা রয়েছে সেরকম করে কি নির্বাচনের উদ্দেশ্য পূরণ করছে? না করলে
ড. জাফরের পদত্যাগ আমাদের যে বার্তা দিল
সম্প্রতি হরতাল, অবরোধ, ভাংচুর, ককটেল, সর্বোপরি নিরীহ জনগনের মৃত্যুসহ যাবতীয় রাজনৈতিক ডামাডোল দিয়েও যখন সরকার-বিরোধীদলসহ কাউকেই ক্ষমতার লড়াই থেকে একচুল
Is this an explosive prism view of the future of human civilisation?
By nature human are tribal. It’s an evolutionary trait with the similar “fight and flight” coding. Civilisation development has changed


