‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ’ এবং ‘একুশে’র বিশ্বায়ন’
প্রেক্ষাপটঃ “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” এবং “একুশে’র বিশ্বায়ন”
সম্প্রতি প্রবাসে, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়াতে “শহীদ মিনার” প্রতিষ্ঠা এবং এনিয়ে বাংলাদেশীদের মধ্যে বেশ সরব আলোচনা-সমালোচনা, চাপা বিরো্ধ-উচ্ছ্বাস-সমন্বয়ের ঝড়ো বাতাস বইছে। তুলনামূলকভাবে সমসাময়িক কালে সিডনী ক্যানবেরা-ভিত্তিক প্রচার মাধ্যমে এনিয়ে সর্বাধিক লেখালেখি এবং তার পাশাপাশি একুশের আয়োজন বেশ জমজমাট ছিল বললে অত্যুক্তি হবেনা। ক্যাম্বেলটাউন এলাকায় ‘শহীদ মিনার’ প্রতিষ্ঠার অনুকুলে স্থানীয় এমপি’র ঘোষণা এই আবেগপ্রবণ বিষয় নিয়ে কৌতূহলী জমজমাট আলোচনায় নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে। গত ১৩ই সেপ্টেম্বর এসিটি লেজিসলেটিভ কাউন্সিল কর্তৃক “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” উদযাপন, “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” নির্মাণ এবং প্রতিটি “লাইব্রেরীতে একুশে কর্নার” প্রতিষ্ঠার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঐতিহাসিক মাইলফলক একুশপ্রেমী বাঙালিদের মনে নতুন জোয়ারের সূচনা করেছে। যেভাবে জোয়ারে ভেসেছিল সিডনীবাসী বাঙালিরা ২০০৫-২০০৬ সালে পৃথিবীর প্রথম “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” প্রতিষ্ঠার অহংকারে; ২০০৬ এবং ২০০৭ সালে উদযাপিত হয়েছিল ৭-৮টি মহান একুশ উদযাপন অনুষ্ঠান। যার আবেগের ছোঁয়ায় সিক্ত করেছিল স্বদেশের মানুষকে দৈনিক প্রথম আলো এবং সংবাদ পত্রিকা’র প্রকাশনা, আর বিবিসি বাংলা বিভাগের ১৯শে ফেব্রুয়ারির সাক্ষাৎকার প্রচারনা এবং সুসংবাদ একুশের চেতনায় উজ্জীবিত করেছিল সারা পৃথিবীর বাঙালি সমাজকে। “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” এর অভ্যুদয় বিশ্বের সকল ঝুঁকিপূর্ণ মাতৃভাষা রক্ষার আমাদের বাংলা ভাষা আন্দোলনের শহীদ মিনারেরই প্রতিমূর্তি বা বৈশ্বিক প্রজন্ম, অথবা আন্তর্জাতিক সংস্করণ হিসেবে শহীদ মিনারের চেতনারই বহুমাত্রিক(সকলভাষা ভিত্তিক)বিকাশ। যা শহীদ মিনারের মত শুধুই কোন একক(এক্ষেত্রে বাংলা) বা নির্দিষ্ট কোন মাতৃভাষা রক্ষার প্রয়োজন ভিত্তিক না হয়ে পৃথিবীর সংকটাগ্রস্থ যে কোন মাতৃভাষা সংরক্ষণের প্রতীক; একান্তভাবেই ইউনেস্কোর বিশ্বব্যাপ্ত ভাষা অবক্ষয় প্রতিরোধে গৃহীত “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” উদযাপনের সিদ্ধান্তের আলোকে প্রত্যেক ভাষাভাষীর উপযোগ্যতার পাশাপাশি গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের কৌশল হিসেবে উদ্ভাবিত, এবং প্রণীত সমন্বিত রূপায়ন।
বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যেভাবে শহীদ মিনার এর সৃষ্টি, এবং বাংলা ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে শহীদ মিনার যেভাবে উজ্জীবিত রেখে গণসংযোগ ও সচেতনাকে প্রতিনিয়ত প্রখর থেকে প্রখরতর করে অনুপ্রেরণা যোগিয়েছে, ঠিক একই ধ্যান ধারনায় পৃথিবীর সকল সংকটাগ্রস্থ মাতৃভাষা সমূহের সংকটের প্রেক্ষাপটের বৈচিত্রময় বিষয়াদি বিবেচনায় “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” এর স্থাপত্য কৌশলী সমন্বিত নকশার ভিত্তি রূপায়িত হয়েছে। যার স্থাপত্যকলার শীর্ষে বৈশ্বিক বার্তা, “কনসারভ ইউর মাদার ল্যাংগুয়েজ” এর মাধ্যমে বিশ্বায়নের যুগে বিশ্বায়নের বহুবিধ উপাদানের সাথে তাল মিলিয়েই স্থানীয় প্রতিটি ভাষাভাষীর কাছে মাতৃভাষা সংরক্ষণের গুরুত্বের কথা মনে করিয়ে ইউনেস্কোর পক্ষে যেকোন মাতৃভাষার সার্বজনীন এবং প্রজন্মান্তরের প্রয়োজনীয়তার কথা প্রচার করবে। যেকোন সংকটাগ্রস্থ মাতৃভাষা সংরক্ষণে অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্তমূলক উজ্জীবনী শক্তি প্রদায়ক হিসেবে ‘বাংলা’ ভাষাকে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” এর প্রথম ভাষা, বা সকলভাষার শীর্ষ অবস্থানে স্থায়ী স্থান দেয়া হয়েছে। অঘোষিত হলেও ইংরেজি বিশ্বব্যাপী সাধারণ ভাষার মর্যাদাপূর্ণ হওয়ায় দ্বিতীয় অবস্থান, এবং স্থানীয় প্রধানভাষাকে আদিভাষা হিসেবে তৃতীয় স্থানে স্থায়ী অবস্থান নির্ণীত হয়েছে। পরবর্তী অবস্থানগুলি নির্মাণাধীন এলাকার বসবাসকারী ভাষাভাষীদের জনসংখ্যার ভিত্তিতে বিন্যস্থ হবে। পৃথিবীর যেকোন স্থানে নির্মিতব্য “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” এর নকশায় ভাষা বিন্যাসের এই নীতির অনুসরন মহান একুশের চেতনা সঞ্চারণ এবং স্থানীয় ভাষা সংরক্ষনে বিশেষ সহায়ক কৌশল হিসেবে প্রতিফলিত হবে।
পৃথিবীর প্রথম “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” এর প্রতিষ্ঠা কালে বাঙালিদের মানসপটে অনুরক্ত শহীদ মিনার এর চেতনাই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে, যার ফলশ্রুতিতে বহু আলোচনা সমালোচনার দেওয়াল পেড়িয়ে বহুজাতিক সমাজে মাতৃভাষাভিত্তিক সাধারণ সমস্যা এবং বিশ্বব্যাপী মাতৃভাষা অবক্ষয়ের বাস্তবতার সমন্বয়তার অনিবার্য প্রয়োজনে শহীদ মিনারের পরিপূরক হিসেবে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” এর নকশা, স্থাপত্যের পরিমাপ, বায়ান্ন-একুশ-শহীদ মিনার এবং দার্শনিক বিষয়াদি স্বর্ণখোদাই করে প্রস্ফুটিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠাকালে(২০০৫-০৬)এই উদ্যোগ, সংকলন, সমন্বয়, বাস্তবায়ন এবং উত্তরণ বাঙালিদের, বাংলার বা একুশের বৈশ্বিক বিজয় হিসেবে সর্বমহলকে উৎসাহিত করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে এই বিজয়ের অংশীদারি হতে। বাংলাদেশ সরকার এই মহান কর্মকাণ্ডে শরীক হতে দশ হাজার মার্কিন ডলার অনুদান দিয়েছে। এই মহতী ঐতিহাসিক অর্জনের সময়ে অনুভূত প্রতিক্রিয়ার প্রামানিক দলিল হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে অতিসম্প্রতি “বাংলাকথা”য় প্রচারিত জনাব আওয়াল খানের গবেষণা ভিত্তিক “নির্মাণের এক যুগেও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধের সঠিক নাম জানে না অনেকে” প্রবন্ধে। এই প্রবন্ধে তিনি প্রামান্য দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন ২০০৬ সালে প্রকাশিত একুশে একাডেমীর মাতৃভাষায় প্রকাশিত “বানী” সমূহের স্ক্যানকপি। প্রতিটি বানীতেই “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” নামটিই স্পষ্ট এবং বৈশ্বিক অর্জন হিসেবে প্রশংসিত; কোথাও ‘শহীদ মিনার’ হিসেবে বর্ণীত নয়। অথচ আমরা আমাদের ব্যক্তিগত বা তথাকথিত দলীয় বা গুষ্টির হীন স্বার্থে আমাদেরই অর্জিত ঐতিহাসিক গর্বিত অর্জনকে কলুষিত করার হাতিয়ার হিসেবে আমাদের আবেগ জড়িত ‘শহীদ মিনার’কে ব্যবহার করার মত ঘৃণ্য অপচেষ্টায় যে লিপ্ত রয়েছি সেটাই তার সাবলীল উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে। তার মেধা ও সৃজনশীল বিশ্লেষণ দিয়ে তিনি প্রমান করতে চেষ্টা করেছেন কিভাবে বিশ্বনন্দিত এবং প্রতিষ্ঠিত জাতীয় গর্ব বা ঐতিহ্যকে আমরা অপমান বা অপদস্থ করতে পারি।
অধিকিন্তু “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” প্রতিষ্ঠালগ্ন উপলক্ষে প্রকাশিত (২০০৬ সংখ্যা)একুশে একাডেমীর প্রকাশিত মাতৃভাষা ম্যাগাজিনে প্রকাশিত মি ইয়ান মার এর লেখা, “ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাংগুয়েজ ডে মনুমেন্ট”; ডঃ মোহাম্মদ আবদূর রাযযাক এর লেখা, “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ, সিডনী; জনাব সিরাজুস সালেকিনের লেখা, “আমি সেই অহংকারে অহংকারী”; ডঃ মমতা চৌধুরীর লেখা, “ফাগুনের রক্ততিলক”; শ্রী রজত পণ্ডিতের লেখা, “এর চেয়ে বড় আনন্দ কি হতে পারে”; জনাবা কবিতা পারভেজের লেখা, “সেই স্রোতধারা–”; জনাবা মলি আহমেদের লেখা, “এই অর্জন যেন আমাদের চিরদিন থাকে”; শ্রী অজয় দাশগুপ্তের লেখা, “একুশ প্রবাসে আমাদের দায়বদ্ধতা”; ডঃ কাইউম পারভেজের লেখা, “একুশ এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস”; জনাব কামরুল আহসান খানের লেখা, “একুশের অঙ্গীকার”; জনাব আনিসুর রহমানের লেখা, “আন্তর্জাতিকতার ছাপ দেখতে চাই”; জনাব লুতফর রহমান শাওনের লেখা, “অঙ্গীকার, প্রেরণা আর শোকের প্রতীক অমর একুশে”; জনাব জয়নাল আবেদিনের লেখা, “গর্বে বুকটা কিছুটা হলেও ফুলে উঠে”; জনাবা ডালিয়া নিলুফারের লেখা, “আমাকেও সাথে নিও…”; এবং শ্রী আশীষ বাবলুর লেখা, “ঠিকানা এসফিল্ড, সিডনি’র প্রত্যেকটি প্রবন্ধই পৃথিবীর প্রথম “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” এর প্রতিষ্ঠার আনন্দ উল্লাসের আলোকে আশাবাদ, প্রত্যয় এবং অহংকারি বর্ণনায় অলংকৃত।
প্রবাসে শহীদ মিনারের পরিপূরক হিসেবে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” নামটিই হয়ে উঠেছিল সিডনিবাসী বাঙালি সকলেরই কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য নাম।(চলবে…)
Nirmal Paul
নির্মল পাল; ইমেইলঃ nirmalpaul@optusnet.com.au; প্রতিষ্ঠাতা এবং চেয়ারপারশনঃ এমএলসি মুভমেন্ট ইনটারন্যাশন্যাল ইনক; প্রাথমিক নকশা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নকারী দলনেতাঃ পৃথিবীর প্রথম “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ”; প্রকাশিত গ্রন্থঃ “বিশ্বায়নে শহীদ মিনার”; বৈশ্বিক দর্শনঃ “লাইব্রেরীতে একুশে কর্নার”, (স্থানীয় বর্ণমালা সংরক্ষণ কেন্দ্র)
Related Articles
পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্ববৃহৎ সামাজিক উৎসব নিয়ে ককবরক (ত্রিপুরা) গান
তুরু রুতু তুরু রু সুমুর সুফতিয়ৈ: পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্ববৃহৎ সামাজিক উৎসব নিয়ে ককবরক (ত্রিপুরা) গান ছবিতে: বাম দিক থেকে – মেয়ে
Un-leash the Power to Grow
Dear Sir or Madam, It has become fashionable for politicians, civil servants and donors alike to talk about the growth
Iftar program, hosted by the Society Of Bangladeshi Doctor’s Queensland
Iftar program, hosted by the Society Of Bangladeshi Doctor’s Queensland on 16th March ’24. Brisbane. QLD. Our purpose of this





