নির্বাচনে দন্ডিত খালেদা নেই, তারেক নেই – এখন কী আদালতে দাঁড়াবেন ড কামাল?

নির্বাচনে দন্ডিত খালেদা নেই, তারেক নেই – এখন কী আদালতে দাঁড়াবেন ড কামাল?

ফজলুল বারী: দেশের নির্বাচনী রাজনীতির চেহারা ক্ষনে ক্ষনে পাল্টাচ্ছে। জোটরক্ষা নিয়ে প্রধান দু’দল আওয়ামী লীগ-বিএনপির পেরেশানি নিয়ে লিখবো ভেবেছিলাম। এরমাঝে আদালতের একটি আদেশে এতদিনকার ধারনা নিশ্চিত হলো যে খালেদা জিয়া আগামী নির্বাচন করতে পারছেন না। তাঁর বাংলাদেশের নাগরিকত্ব-পাসপোর্ট ত্যাগকারী বিলাতে রাজনৈতিক আশ্রিত পুত্র তারেক রহমানকে প্রার্থী করার চেষ্টাও করেনি বিএনপি। কারন দন্ডিত তারেক বাংলাদেশে এসে আইনের কাছে আত্মসমর্পনও করেননি। চেয়ারপার্সন-ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানবিহীন নির্বাচন করতে চলেছে বিএনপি।

খালেদা জিয়ার নির্বাচন করার যোগ্যতার বিষয়টি মনোনয়ন বাছাই পর্বে জানার কথা ছিল। কিন্তু আমান উল্লাহ আমান সহ বিএনপির পাঁচ নেতার সাজা স্থগিতের আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ায় খালেদার বিষয়টিও সামনে চলে এলো। হাইকোর্ট মঙ্গলবার জানিয়েছে সাজা স্থগিত, বাতিল না হওয়া পর্যন্ত ফৌজদারী মামলায় দু’ বছরের সাজাপ্রাপ্ত কেউ নির্বাচন করতে পারবেননা। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আবার সুপ্রিমকোর্ট থেকে স্থগিত-বাতিলের পরে জামিন নিতে হবে। আমান উল্লাহদের আবেদন বাতিল করতে গিয়ে হাইকোর্ট মোটা দাগে পরোক্ষভাবে খালেদার কথাও বলে দিয়েছে। উল্লেখ্য ঠিক একই আইনে এরশাদ একবার নির্বাচন করতে পারেননি। সাজার পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হবার পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে আবার অংশ গ্রহনের সুযোগ পান। মঙ্গলবার হাইকোর্টের আদেশের পর এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, সুপ্রিমকোর্ট থেকে খালেদা জিয়া যদি খালাসও পান তবু তিনি আগামী পাঁচবছর নির্বাচন করতে পারবেননা।

মঙ্গলবার বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশের পাশাপাশি কিছু অভিমত দেন। আবেদনকারী বিএনপির পাঁচ নেতা ছিলেন আমান উল্লাহ আমান, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, ওয়াদুদ ভূঁইয়া, মো. মসিউর রহমান ও মো. আবদুল ওহাব। আদেশের পর দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান সাংবাদিকদের বলেন, দুই বছরের বেশি সাজা হলে সাজা মাথায় নিয়ে কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না বলে আদালত অভিমত দিয়েছেন। আদালত বলেছে সাজার রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল বিচারাধীন, আবেদনকারী জামিনে আছেন, জরিমানার আদেশ স্থগিত হয়েছে—এসব দণ্ড বা সাজা স্থগিতের যুক্তি হতে পারে না। সংবিধান সর্বোচ্চ আইন। দণ্ডিত সাজাপ্রাপ্তদের নির্বাচন করার বিষয়ে সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদে বাধা আছে। বিএনপি নেতা এ জেড এম জাহিদ হোসেনের আইনজীবী খায়রুল আলম চৌধুরী বলেছেন, আদালত বলেছে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ ধারা অনুসারে দণ্ড স্থগিতের সুযোগ নেই বলেছেন আদালত। দণ্ড ও সাজার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আদালতে কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির করা আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় ওই ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। উল্লেখ্য দুটি দুর্নীতি মামলায় ১৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন বিএনপির চেয়ারপারসন । জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় নিম্ন আদালতের রায় স্থগিত, সাজা ভোগ বাতিল ও জামিন চেয়ে উচ্চ আদালতে তিনি আপিল করেছেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় উচ্চ আদালত তার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন।

দণ্ডিত সাজাপ্রাপ্তদের নির্বাচন করার বিষয়ে ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদ সংবিধানে সংযোজন করেছিল ড কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন সংবিধান প্রনয়ন কমিটি । এরপরও আইন যেহেতু তার পেশা সে কারনে ড কামাল এবং তাঁর আইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময়ে এমন সাজাপ্রাপ্তদের নির্বাচনে প্রার্থীতার পক্ষে হাইকোর্ট-সুপ্রিমকোর্টে দাঁড়িয়েছেন। ড কামাল অবশ্য এরশাদের নির্বাচনে প্রার্থীতার পক্ষে আদালতে দাঁড়াননি বা তার পক্ষে দাঁড়ানো তাঁর সম্ভবও ছিলোনা। ড কামাল এখন ঐক্য বিএনপির জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুরব্বি নেতা। খালেদার নির্বাচনের পক্ষে ড কামাল এখন আদালতে দাঁড়ান কীনা সেদিকে নজর থাকবে সবার। ড কামাল অবশ্য এরমাঝে খালেদা জিয়াকে কৌশলে দন্ডিত না রাজবন্দী হিসাবে উল্লেখ করেছেন। যদিও খালেদার জন্যে তাঁর এই নতুন শিরোনাম খুব একটা আলোচনায় আমল পায়নি। খালেদার পক্ষে অবশ্য আদালতে দাঁড়াবার মতো খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ সহ বড় অনেক আইনজীবী আছেন। কিন্তু খালেদার পক্ষে এদের অবদানের সাফল্য শূন্য। সে কারনে বিএনপি এখন এ ইস্যুতে ড কামালকে কোর্টে নিয়ে যেতে চাইবে। তাঁর পক্ষে এখন না করা কঠিন হবে। কারন পানিতেতো তিনি নেমেছেনই। পা ভেজাবেননা এটা কী করে হয়।

খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র হাতে নিয়ে কেঁদে বিএনপির মির্জা ফখরুল বলেছেন এই প্রথম তারা দলনেত্রীকে ছাড়া নির্বাচনে যাচ্ছেন। এরশাদ আমলে বিএনপির ছত্রখান অবস্থায় গৃহবধু থেকে রাজনীতিতে এসে স্বামীর দল বিএনপির নেতৃত্বে আসেন খালেদা জিয়া। এরপর থেকে ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে তিনি অংশ নিয়েছেন এবং এমপি হয়েছেন। ২০০৪ সালের নির্বাচন তারা বর্জন করলেও তা প্রতিহত করতে পারেননি। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে মা প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্রয়ে হাওয়া ভবনের অসাংবিধানিক প্যারালাল শাসন গড়ে তোলেন তারেক রহমান। মূলত তারেক-কোকোর দুর্নীতির প্রেক্ষিতেই দলটি ক্ষমতাচ্যুত হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ। এতিমখানা দুর্নীতি মামলায় খালেদা ও বিএনপির কৌশল বুঝেও আওয়ামী লীগ তাদেরকে সময়ক্ষেপনের সুযোগ দিয়েছে। সেই সময়ক্ষেপন আজ বুমেরাং হয়েছে বিএনপির জন্যে। খালেদা জিয়া-তারেক রহমান ছাড়াই তাদেরকে নির্বাচন করতে হচ্ছে।


Place your ads here!

Related Articles

তোরা মানুষ হ

বৈষম্যহীন সমাজের ধারণা ইউটোপিয়ান তা বুঝি I ধনী গরিব/শ্রমজীবী মানুষের ব্যাবধান কিছুটা কমে, কিছুটা সামাজিক ন্যায়বিচার ভিত্তিক, সামাজিক কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের

প্রিয় ছাত্রলীগ এবার থামো!

ফজলুল বারী: কয়েকদিন ধরে মনটা বেশ খারাপ। প্রিয় সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কিছু নেতার বক্তৃতা-বিবৃতির ভাষায় বাংলাদেশ বিরোধী শক্তির বিরোধিতা উধাও!

1 comment

Write a comment
  1. Md Shamim
    Md Shamim 28 November, 2018, 14:52

    ২০০৪ সালের নির্বাচন তারা বর্জন করলেও তা প্রতিহত করতে পারেননি। এটা বুঝলাম না।

    Reply this comment

Write a Comment