মানবাধিকার লংঘন এর সমাধান কী?

মানবাধিকার লংঘন এর সমাধান কী?

বাংলাদেশে মানবাধিকার লংঘন এখন সাধারণ একটা বিষয়ে পরিণত হয়েছে! নিহত একরামুল এর পরিবার যে অভিযোগ করেছে এটা খুবই গুরুতর। সরকার এর উচিৎ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ এর নামে ল এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি গুলোর মানবাধিকার লংঘন এর বিষয়ে কিছু একটা করা। শুধু এই অভিযানে না সবমসময়ই আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে মানবাধিকার লংঘন এর খবর পাই।

আমার মনে হয় এই মানবাধিকার লংঘন এর অভিযোগগুলোর দুই তৃতীয়াংশই ল এনফোর্সমেন্ট এজেন্সিগুলোর দিকে। এই কারণেই সাধারণ মানুষের ল এনফোর্সমেন্ট এজেন্সিগুলোর প্রতি আস্থা খুবই কম। সাধারণ মানুষ তাদেরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে ভাবে মনে হয়। যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে আমরা মাঝে মাঝে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষ এর মারমুখী আচরণ লক্ষ্য করি।

এই বিভিন্ন ল এনফোর্সমেন্ট এজেন্সিগুলোতে কারা কাজ করে? আমাদেরই ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীরা কাজ করে। এরা আমাদের বাইরের কেউ না। এরা আমাদের সমাজের বাইরের কেউ না। এটা এক অর্থে আমাদের সমাজেরই প্রতিনিধিত্ব করে এবং আমাদের সমাজের মানুষগুলোর ব্যাপারে একটা ধারণা দেয়। আপনি-আমি কি তাদের থেকে খুব ভাল? তাদের থেকে খুব সৎ?

আমরা খেয়াল করলে দেখব, আমাদের সমাজে যে যত বেশী ‘হ্যাডম’ দেখাতে পারে সে তত বেশী কদর পায়। যে যত বেশী অবৈধ সুবিধা নিতে পারে সে তত নিজেকে জাহির করে বেড়ায়! যেন এটা খুবই গর্বের কাজ! এই হ্যাডমওয়ালাদের আমরা সামাজিক ভাবে হেয় করি না! আর আমাদের ল এনফোর্সমেন্ট এজেন্সিগুলো আমাদের সেবা দেওয়ার পরিবর্তে এই ‘হ্যাডম’ দেখাতেই ব্যস্ত বেশী। এটা একটা কালচারাল সমস্যা। শুধু শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়াকে দোষ দিয়ে পার পাওয়া যাবে না আমাদের। বিভিন্ন সরকারের আমলে আমরা এই মানবাধিকার লংঘন এর অভিযোগ শুনে থাকি।

এখন নিজেকে একটা প্রশ্ন করুন এই একরামুল এর জায়গায় যদি ‘গোপিনাথ’ হত তাহলে কি এত রাগ হত আপনার-আমার? বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন এর বিষয়ে আপনি-আমি কী করেছিলাম? মানবাধিকার লংঘন কি শুধু

বাংলাদেশে ‘ক্রসফায়ার’ এর মাধ্যমে মানবাধিকার লংঘন এর অভিযোগ বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। এটা হরহামেশাই হচ্ছে। এর কোন সুরাহা হচ্ছে না। কেন? এর সমাধান কী? বিষয়টা ‘শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়া’ এর বাইরে গিয়ে চিন্তা করুন। বিষয়টা এমন না যে আগামীকাল খালেদা জিয়া সরকার প্রধান হলে দেশের সবাই সাধু হয়ে যাবেন আর দেশের ল এনফোর্সমেন্ট এজেন্সিগুলো নরওয়ে-সুইডেনের মত মানবিক আচরণ শুরু করে দিবে।

কক্সবাজার এ আওয়ামীলীগ -বিএনপি কিংবা যারাই রাজনীতি করেন তাদের কে কে এই ইয়াবা ব্যবসার সুবিধা ভোগ করেছেন? কারা করেন নি? কারা আসলে এই ইয়াবার মদদ দিয়েছে? স্থানীয় সাংসদ বদি সহ আরো অনেকের বিরুদ্ধেই অভিযোগ রয়েছে। বিচারটা কার করবেন? কিভাবে করবেন? আমি ‘ক্রসফায়ার’ কে জাস্টিফাই করছি না। সমর্থনও করছি না। কিন্তু এর সমাধান কিভাবে করবেন? কিভাবে ল এনফোর্সমেন্ট এজেন্সিগুলো সহ দেশের সাধারণ মানুষকে রাতারাতি সাধুতে রূপান্তরিত করবেন? ‘শেখ হাসিনা’র চলে যাওয়াই কি এর সমাধান? আমার মনে হয় না। আমরা ত খালেদা জিয়া’র সরকারকেও দুই-দুইবার দেখেছি।

আমরা যদি খেয়াল করি তাহলে দেখব, বাংলাদেশের অধিকাংশ আইন-কানুন দেশের সাধারণ জনগণকে বলে দিচ্ছে সে কী কী করতে পারবে এবং পারবে না। এর ভিত্তিতেই বিচার ব্যবস্থা সাজানো হয়েছে। এখন বাংলাদেশ একটা রাজনৈতিক এনটিটি। আমি মনে করি তারও একটা স্ট্যাটমেন্ট থাকা দরকার সে কী কী করবে এবং কী কী করবে না। এটাকে ‘Bill of Rights’ বলে। যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে। যে কোন সভ্য দেশে এটা থাকা দরকার। (অস্ট্রেলিয়ায় নাই!) মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হলে এই বিল অভ রাইটস খুব কাজে দেয়।

আর একটা বিষয় হচ্ছে, পুলিশ/রেব এর বিরুদ্ধে যখনই মানবাধিকার লংঘন এর অভিযোগ শুনি তখন পুলিশকে দিয়েই এর অনুসন্ধান করানো হয়! এতে কতটুকু সুবিচার পাওয়া যাবে আমার সন্দেহ হয়। এই ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার উদাহরণ দিতে পারি। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন রাজ্যে ‘Office of Police Integrity (OPI) ‘ এর মত পুলিশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাধীন সংস্থা রয়েছে যারা পুলিশ করাপশন এবং তাদের মিসকনডাক্ট নিয়ে তদন্ত করে এবং বাংলাদেশেও এই রকম একটা সংস্থা করতে পারে যেখানে মানুষ তাদের অভিযোগ করতে পারবে। বিশেষ করে ‘একরামুল’ এর মত গুরুতর বিষয়ে।

এখন আমার জীবনে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা শেয়ার করি। ২০০৭ সালে অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে গেলাম। তখন একদিন হঠাৎ করে মাঝরাতে আমার আব্বা অসূস্থ হয়ে পরেন। মোটামুটি একটা ইমার্জেন্সি সিচুয়েশান। এত রাতে হাসপাতাল/ক্লিনিকেই বা কিভাবে নিয়ে যাব। সিলেট শহর ত আর ঢাকার মত না যে সবসময়ই কিছু পাওয়া যাবে। তখন সিলেটের টিলাগড় পয়েন্টে গিয়ে গাড়ি-সিএনজি খোঁজছিলাম। সেদিক দিয়েই টহল পুলিশের এক গাড়ি যাচ্ছিল। আমাদের দেখে থামল এবং জিজ্ঞেস করল ঘটনা কী। সব বলার পরে তারাই স্ট্যান্ডে গিয়ে গাড়ির ব্যবস্থা করে দিল। এমনি আমাদের সাথে করে প্রথমে একটা ক্লিনিকে গেল। সেখানে কাজ না হওয়ায় দ্বিতীয় আর একটা ক্লিনিকে গেল আমাদের সাথে। তারপর ডাক্তার কে নিয়ে এসে চিকিৎসা নিশ্চিত করে তারপর তারা গিয়েছিল। পরে একদিন এএসে আআবৃবার অফিসেও দেখে গিয়েছিল সেই সাব-ইন্সপেক্টর পুলিশের সেই টহলের সাব-ইন্সপেক্টর এবং তার টহল দলের সব পুলিশ সদস্যদের সাহায্যের কথা জীবনেও ভুলব না। আমার আব্বার সাথে বয়সে অনেক ছোট সেই সাব-ইন্সপেক্টর এর চমৎকার একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়েছিল তারপর।

বাংলাদেশের ল এনফোর্সমেন্ট এজেন্সিগুলোকে আমাদের প্রয়োজন। এদের ছাড়া দেশ চলবে না। রাজনীতিবিদদেরকেও আমাদের দরকার। এদের ছাড়াও দেশ চলবে না। তাই ভাবুন কিভাবে এর সমাধান করা যায়। এসব নিয়ে আলোচনা করুন। কিভাবে একটা মানবিক সিস্টেম দাঁড়করানো যায় সে ব্যাপারে ভাবুন।


Place your ads here!

Related Articles

অগ্নিতে নগ্নিকা- দিলরুবা শাহানা

ঘটনা দু’টি একই দিনে বা একই সময়ে ঘটেছিল। একটা বাগদাদে ঘটলো। আরেকটা ঘটেছিল, যতদূর মনে পড়ে, ব্রাজিল বা কলম্বিয়াতে। ইরাকের

Bangladesh and Poznan Climate change Conference

Bangladesh attended the 14th Conference of the Parties to the UN Framework Convention on Climate Change.(UNFCCC) and the 4th meeting

ক্যানবেরার অনন্য বাঙালি জিল্লুর রহমান চলে গেলেন।

বাংলা ভাষার স্কুল নিয়ে বাঙালি সমাজের সাথে যিনি নিয়মিত যুদ্ধ করতেন সেই জিল্লুর রহমান আর নেই। শিক্ষকদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি বাবা

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment