ডেল কার্নেগির জীবনবোধ

ডেল কার্নেগির জীবনবোধ

কৈশোরে নদী ভাঙনের পর যখন আমরা শহরতলিতে স্থানান্তরিত হলাম তখন বেশ কিছু উপনাম ছিল, যেমনঃ বেকুব, তিন মাথারি, গারা, কালো ভূত, বামন আমার ডাক নাম ইয়াকুব সেটার সহজ রুপ হচ্ছে বেকুব। আমাকে অবশ্য বেসিরভাগ মানুষই ইয়াকুপ বলে ডাকতো । শুধুমাত্র নামকরণ কর্তা মানে আমার দাদি আর আমার পরিবারের অন্য সদস্যরা ছাড়া সবাই ইয়াকুপই বলতো । তিন মাথারি বলার কারণ আমার মাথাটা স্বাভাবিকের তুলনায় একটু বেশি বড় ছিল আর সেটার আকৃতি ছিল ত্রভূজের মত সেই কারণে এহেন নামকরণ। কালো ভূত বলার কারণতো খুবই সহজ ছিল আমার গায়ের রঙ অতিরিক্ত কৃষ্ণ বর্ণ হবার জন্যে। গারা হল গ্রামীণ বাংলার এক ধরণের প্রাণী যেটা শিয়ালের মত দেখতে। রাতের বেলা সেটা মুরগীর ঘর থেকে মুরগি চুরি করে নিয়ে যেত। কিন্তু প্রাণীটার চোখ না কি অনেক বড় ঠিক আমার মত? মাধ্যমিক পরীক্ষার আগ পর্যন্ত আমার উচ্চতা কম থাকার কারণে বামন নামটা পেয়েছিলাম। আর আমি যেহেতু কারণে অকারণে হাসি আর হাসলেই আমার বত্রিশ পাটি দেখা যায় তাই আরো একটা সুন্দর উপনাম ছিল, দাঁতাল। এগুলো নিয়ে তেমন কোন দুঃশচিন্তা ছিল না। সত্যি কথা বলতে কি এগুলো আমাকে ঠিক কি কি কারণে বলা হত সেগুলো নিয়েই আমি তখন একটু দ্বিধান্বিতই ছিলাম। তবে ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছিলাম কারণগুলো। কারণ শৈশবে আমি এসব নাম শুনি নাই, গ্রামের মানুষের আদরে আদরে বেড়ে উঠেছিলাম তাই বুঝে উঠতে পারি নাই আমার চেহারায় একই সাথে এতগুলা গুণ আছে। যাইহোক এগুলো আমার মাথা ব্যাথার কারণ না হলেও মাকে দেখেছি মাঝে মধ্যে আচলে মুখ লুকিয়ে কাদতে।

উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় পাড়ার এক বড় ভাই আমাকে একটা চটি বই দেন। বইটার নাম “জীবন যেইভাবে আনন্দময়”। লেখকের নাম ডেল কার্ণেগি। বইটার প্রচ্ছদ এখনও আমার চোখে ভাসে। সৌম্য চেহারার চশমা পরা একজন ভদ্রলোকের মুখচ্ছবি। সেই মুখটাতে হালকা মুচকি হাসি আর দৃষ্টিতা অনেক গভীর। এই হাসিটার সাথে আমার শৈশবের পরিচিত কৃষকের হাসির হবহু মিল খুজে পেলাম এবং উনাকে অনেক বেশি আপন মনে হয়েছিল। বইটার নাম আমাকে খুবই আকৃষ্ট করলো আরা যেহেতু আউট বই পড়ার প্রতি আমার বেশি আগ্রহ তাই পড়া শুরু করলাম। প্রত্যেকটা আর্টিকেলই খুবই বাস্তবসম্মত। উনি প্রত্যেকটা আর্টিকেলেই কোন না কোন বাস্তব গল্প বলে সেটাকে ঠিক কিভাবে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা যায় সেটা হাতে কলমে বুঝিয়ে দিয়েছেন। বইটার প্রত্যেকটা আর্টিকেল পড়ি আর মুগ্ধ হয়ে যায় আরে এটাতো আমার জীবনের গল্প। কিছু কাজ খুবই সচেতনভাবে আমার চরিত্রের মধ্যে গেথে গেল। তার একটা হল হাসি। উনি বলেছিলেন পরিস্থিতি যাই হোক না কেন একটা মুচকি হাসি অনেক সমস্যার সমাধান অনেক বেশি সহজ করে দেয়। এরপর আমি আমার জীবনে এই প্রশ্ন অনেকবার শুনেছি যে আমি সবসময় হাসি কিভাবে? আর একটা গল্প এমন ছিল একজন মেয়ে সে অনেক ভালো গান করতে পারে কিন্তু গাইতে গেলে তার দাঁত দেখা যায় যেটাতে তাকে খারাপ দেখায় বলে তার ধারণা। সেই কারণে সে যতদূর সম্ভব দাঁত ঢেকে গান করার চেষ্টা করে। এতে তার গান শ্রুতি মাধুর্য হারিয়ে ফেলে। একদিন লেখকের সাথে দেখা হওয়ার পর লেখক বলেছিলেন সবাই তোমার গান শুনতে আসে আর তুমি যদি দাঁত বের হয়ে যাবার ভয়ে খারাপ গান কর তাহলে কিন্তু তুমি শ্রোতা হারাবে। আর সৃষ্টিকর্তা তোমাকে এই চেহারা দিয়ে পাঠিয়েছেন যেটা তোমার হাতে না। কিন্তু তোমার সুন্দর গান তোমার অর্জন। তাই তুমি তোমার খারাপ চেহারার কথা চিন্তা করে কেন গুটিয়ে থাকবে। এরপর থেকে মেয়েটা অনেক সুরেলা গান করতো এবং দিনে দিনে তার শ্রোতা সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল।

এই বিদেশ বিভূইয়ে একটা জিনিস আমার মনকে অনেক নাড়া দিয়েছিল। সেটা হল এখানে বসবাসরত বিভিন্ন দেশের মানুষের মুখের হাসি। এরা প্রায় সবাই অনেক সুন্দর করে হাসতে পারে। পথে ঘাটে, দোকানে পাটে, হাটে বাজারে এরা সবাই অনেক বেশি সুন্দর করে হাসে। কথা বলার সময়ও তাদের মুখটা থাকে হাসি হাসি। এদের আরো একটা জিনিস আমাকে প্রচন্ড রকমের মুগ্ধ করেছিল এবং করে যাচ্ছে। সেটা হল Sorry আর Thank you এই শব্দ দুইটা। আমি এখন মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যে শুধুমাত্র এই দুইটা শব্দ জানা থাকলে পৃথিবীর যেকোন দেশে অনেক সুন্দর ভাবে চলাফেরা করা সম্ভব। হয়তো ভুলটা অপর পক্ষেরই তারপরও আপনি যখন Sorry বলবেন তখন দেখবেন পরিস্থিতি অনেক দ্রুত পাল্টে যাবে। অথবা অকারণেও আপনি Sorry বলতে পারেন। এটা বললে আপনার সম্মান কমবে না বরং বেড়েই যাবে। এর মানে হল আপনি যার বক্তব্য শুনছেন সেটা ঠিকমত বুঝতে পারেন নাই। যার সহজ অর্থ করলে দাঁড়ায় আপনি অনেক মনযোগ দিয়ে বক্তার কথা শুনছেন। এবং এটা বক্তাকে আরো সুন্দরভাবে কথাগুলো বলতে উৎসাহিত করবে। আর কারণে অকারণে Thank you আপনি বলতেই পারেন। আপনিই হয়তো কারো কোন ছোটখাটো উপকার করলেন তারপরও আপনিই যদি Thank you বলেন দেখবেন মানুষ আসলে কত ভালো। এরপর আপনি অপর পক্ষের কাছ থেক যে হাসিটা দেখতে পাবেন সেটা স্বর্গীয়। এদের এই অভ্যাসগুলো দেখি আর আমার বারবার মনে পড়ে যায় ডেল কার্ণেগির সেই চটি বইটার কথা যেটা আমি বাংলাদেশে ফেলে এসেছি। আর মনেপড়ে যায় বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসরত খেটে খাওয়া মানুষের আচার-ব্যবহার। আমার মনেহয় ইনারা সবাই যেন এক একজন ডেল কার্ণেগির শিষ্য। তাই এখানে আমাকে আলাদা করে ডেল কার্ণেগির লেখা পড়ে জীবনবোধ তৈরি করার দরকার নাই। এখানে গায়ের রঙ বা শরীরের গড়ন নিয়ে এখন পর্যন্ত কোন বৈষম্য আমার চোখে পড়ে নাই। তাই মনেপ্রাণে দোয়া করি পরকালে ভালো থাকুন ডেল কার্ণেগি আর পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের মধ্যে বেচে থাকুক উনার জীবন দর্শন।

[পাদটীকাঃ ফেসবুকের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়াতে বসবাসরত একজন বাঙালি অতি আধুনিক এবং সংস্কৃতিমনা ভদ্রলোকের সাথে পরিচয়ের শুরুতেই উনি বললেন ভাই আপনিতো নৌকায় করে এদেশে এসেছেন। আপনার গল্পটা যদি বলতেন তাহলে একটা গল্প লিখতাম। আমি বললাম জি ভাই, নৌকাতে করেই এসেছি কিন্তু নৌকাটা আকাশ দিয়ে এসেছে আর নৌকার পাখাছিল, ছাদ ছিল, জানালা ছিল। উনি উনার ভূল বুঝতে পেরে বললেন ভাই, দুঃখিত। আপনার চেহারা দেখে আমার বোট পিপল বলে ভ্রম হয়েছিল। আমি বললাম, ভাই ব্যাপার না এটাতে আমার অভ্যাস আছে।]

Md Yaqub Ali

Md Yaqub Ali

আমি মোঃ ইয়াকুব আলী। দাদি নামটা রেখেছিলেন। দাদির প্রজ্ঞা দেখে আমি মুগ্ধ। উনি ঠিকই বুঝেছিলেন যে, এই ছেলে বড় হয়ে বেকুবি করবে তাই এমন নাম রেখেছিলেন হয়তোবা। যাইহোক, আমি একজন ডিগ্রিধারী রাজমিস্ত্রি। উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতে অস্ট্রেলিয়াতে আমার আগমন ২০১৫ সালের মার্চে। আগে থেকেই ফেসবুকে আঁকিবুকি করতাম। ব্যক্তিজীবনে আমি দুইটা জীবের জনক। একটা হচ্ছে পাখি প্রকৃতির, নাম তার টুনটুনি, বয়স আট বছর। আর একজন হচ্ছে বিচ্ছু শ্রেণীর, নাম হচ্ছে কুদ্দুস, বয়স দুই বছর। গিন্নী ডিগ্রিধারী কবিরাজ। এই নিয়ে আমাদের সংসার। আমি বলি টম এন্ড জেরির সংসার যেখানে একজন মাত্র টম (আমার গিন্নী) আর তিনজন আছে জেরি।


Place your ads here!

Related Articles

হাউস ওয়াইফ হতে চাই না

ভুল করে কোনদিন লিখিনি আমার জীবনের লক্ষ্য হাঊজ ওয়াইফ হওয়া। গালভরা শব্দ। মনে হয় খুব সন্মানের । আমার কাছে খুব

Australian Prime Minister visits China: Woos China for its investment

How an opposition leader ‘s views are changed when that person becomes the Prime Minister. The glaring example is Australian

শেখ হাসিনাকে যে কারনে তারা হত্যা করতে চেয়েছে ২১ আগষ্টে

ফজলুল বারী: দুই হাজার চার সালের ২১ আগষ্টের জনসভার এসাইনমেন্ট আমার ছিলোনা। জনকন্ঠের তরফে এসাইনমেন্টটি ছিল উত্তম চক্রবর্তীর। শেখ হাসিনার

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment