অষ্ট্রেলিয়ায় বাঙ্গালি সংস্কৃতি টিকাতে বাঙ্গালি-অষ্ট্রেলিয়ান মনোভাব নয় বরং অষ্ট্রেলিয়ান-বাঙ্গালি মনোভাবকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করতে হবে
কেনবেরাতে আমি প্রায় ১৪ বছর যাবৎ রয়েছি। এখানে আমার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সাথে। বাংলাদেশি, ফিজিয়ান, ভারতীয়, নেপালী, থাই গোষ্ঠীর কর্তা ব্যক্তিদের (বয়স্কদের) সাথে যখনই প্রবাসে সংস্কৃতি চর্চার ভবিস্যত নিয়ে কথা হয়েছে তাদেরকে চিন্তিত দেখেছি।। বাংলাদেশি অনেক কর্তা ব্যক্তি (বয়স্ক) যারা বিভিন্ন বাংগালি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত তাদের অনেককেই বলতে শুনেছি – “নতুন (তরুণ) প্রজন্ম বাঙ্গালি সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী নয়।” যারা এধরণের হতাশা জনক কথা বলেন প্রকারন্তরে বয়স্করা নিজেরাই যে প্রবাসে তাদের হেরিটেজ সংস্কৃতির ভবিস্যতের অন্তরায়- সেটা ভুলে যান।
অষ্ট্রেলিয়াতে বাংলাদেশি এমন কোন সাংস্কৃতিক সংঘটন আছে বলে আমার জানা নেই যে সংঘটনের কর্তা ব্যক্তি (অফিস বেয়ারার) কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। তাছাড়া আমরা বয়স্করা আমাদের স্বাচ্ছন্দের কথা ভেবে আয়োজন করি গেট-টুগেদার – আমাদের সামাজিক গেট-টুগেদারে নতুন প্রজন্মের ইচ্ছাকে গুরুত্বই দেওয়া হয়না। অথচ অষ্ট্রেলিয়াতে বাংলা সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ওদের উপর। যাদের উপর আমাদের সংস্কৃতির ভবিস্যত নির্ভর করছে সেই তরুন দের দিয়ে তরুনদের উপযোগি সংস্কৃতির চর্চার ক্ষেত্র তৈরী করা গেলেই কেবল মাত্র প্রবাসে হেরিটেজ সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
সম্প্রতি অষ্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পার্লামেন্টে হয়ে যাওয়া এয়ারোস্পেস ফিউচার ২০১৮ সন্মেলনে আমার যে অভিজ্ঞতা সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই বলছি, তরুনেরা তরুনদের জন্য কাজ করে আনন্দ পায়।
বয়স্করা যখন বয়স্কদের ইচ্ছা অনুযায়ী তরুনদেরকে দিয়ে কাজ করাতে চেষ্টা করে সেই কাজ তরুনদের মনের মত হয় না। ওরা সেই কাজে আনন্দ হাড়িয়ে ফেলে। বরং ওদেরকে ওদেরমত কাজ করতে দিয়ে বয়স্করা যখন ওদের উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করে সে কাজে ওরা স্বাচ্ছন্দ বোধ করে।
উদাহরন হিসাবে, সম্প্রতি কেনবেরাতে হয়ে যাওয়া এয়ারোস্পেস ফিউচার ২০১৮ সন্মেলনে আমার অভিজ্ঞতার কিছু কথা লিখব। এই সন্মেলনে তরুনরা কাজ করেছে তরুনদের জন্য। সন্মেলনের আয়োজনে ছিল অষ্ট্রেলিয়ান ইয়ুথ এয়ারোস্পেস এসোসিয়েশন-যার সকল সদস্যই কোন না কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ম্যাথ নিয়ে পড়াশুনা করেছে অথবা করছে। আয়োজকদের সকলেই ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সের।
২০০৮ সালে হাইস্কুল ক্যাম্পের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল এই এসোসিয়েশনটির যাত্রা। অষ্ট্রেলিয়ান এয়ারোস্পেস ইন্ডাষ্ট্রির বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা সম্পর্কে তরুণরা যাতে অবগত থাকে সেই লক্ষকে সামনে রেখে এসোসিয়েশনটির তরুন সদস্যরা প্রতি বছর সম্মেলন করে। সম্মেলন কমিটির আয়ুষ্কাল ১২ মাস। সম্মেলন শেষে কমিটেড ছাত্রদের নিয়ে গঠন হয় নতুন কমিটি।
তরুনদের এই সন্মেলনে বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে ইন্ডাষ্ট্রি, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষনা প্রতিষ্ঠান সহ বিভিন্ন ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান।
এসোসিয়েশনটির তরুনরাই তাদের সম্মেলনের রূপরেখা ঠিক করে। সম্মেলনের ভেন্যু ঠিক করা থেকে থেকে শুরু করে সম্মেলনের ডেলিগেটস সহ গেষ্টস্পীকারদের সাথে যোগাযোগ করা, সম্মেলন চলাকালীন সময়ে তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা, সম্মেলনের খরচ যোগাতে ডোনার ঠিক করা – সব কিছুই এসব তরুণরাই তরুণদের স্বার্থে করে থাকে। প্রয়োজনে এরা সাহায্য চেয়ে নেয় বড়দের কাছে। এভাবেই এসব তরুণেরা এয়ারোস্পেস ফিউচার ২০১৮ শিরোনামে কেনবেরাতে তাদের ৪দিন ব্যাপী সম্মেলন করেছিল যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ডেলিগেটরা এসেছিল।
ওদের সেই সম্মেলনের উদ্বোধন করেছিল অষ্ট্রেলিয়ান ফেডারেল গভর্মেন্টের মন্ত্রী সিনেটর জেড সেসিলজা। ৪ দিনের এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিল অষ্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল উনিভার্সিটির ভাইস চ্যাঞ্চেলর, বোয়িং ও লকহিড মার্টিন সহ সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা বৃন্দ। ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহ যোগাতে ওদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন অষ্ট্রেলিয়ার এস্ট্রোনট যিনি প্রথম স্পেসে গিয়েছিলেন । এয়ারোস্পেস ফিউচার ২০১৮ সম্মেলনকে ঘিরে একুশে রেডিও একটি অনুষ্ঠান প্রচার করে।
অষ্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পার্লামেন্টের মূরাল হলে তরুনরা তরুনদের জন্য সন্মেলনের যে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করেছিল তাতে প্রায় ২৫০+ জন ডেলিগেট ছিলেন। একুশে রেডিওর পক্ষ্যে আমি যখন ফেডারেল পার্লামেন্টে পৌঁছালাম তখন পার্লামেন্ট হাউসের করিডোর থেকে শুরু করে মুরাল হল পর্যন্ত ছাত্র ছাত্রীরা দাঁড়িয়ে থেকে ডেলিগেটদের সুস্বাগতম জানাচ্ছিল।
অষ্ট্রেলিয়াতে আমার সৌভাগ্য় হয়েছে অনেক সম্মেলনে উপস্থিত হওয়ার কিন্তু তরুণদের পরিচালনায় আন্তর্জাতিক মানের সম্মেলনে আমার উপস্থিতি এটাই প্রথম। তরুনরা যেভাবে দক্ষতার সাথে সন্মেলনটি পরিচালনা করেছিল- তাতে আমি অভিভুত। কোথাও কোন ত্রূটি চোখে পড়েনি। ওদের দক্ষতা দেখে আমি অবাক হয়েছি ।
তরুন্ দের সুযোগ দিলে ওরা যে অনেক ভাল্ কাজ করতে পারে তার প্রমান এয়ারোস্পেস ফিউচার ২০১৮ সম্মেলন। তাই আমি বিশ্বাস করি, অষ্ট্রেলিয়ায় বাঙ্গালি সংস্কৃতি টিকাতে অষ্ট্রেলিয়ায় বেড়ে উঠা বাঙ্গালি ছেলেমেয়েদের সাথে বাঙ্গালি‑অষ্ট্রেলিয়ান মনোভাব নয় বরং অষ্ট্রেলিয়ান‑বাঙ্গালি মনোভাবকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করতে হবে।
Related Articles
The Copenhagen Launch Fund: Decision at the Commonwealth Summit
The heads of state/government of 53-member states of the Commonwealth met in Port of Spain, capital city of Trinidad &
অস্ট্রেলিয়ায় নতুন রাজনৈতিক দল ‘অস্ট্রেলিয়ান মুসলিম পার্টি’
অস্ট্রেলিয়ায় আগামী জাতীয় নির্বাচনে মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য প্রথমবারের মতো একটি নতুন রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করেছে। দলটি আগামী জাতীয় নির্বাচনে
হিমু ভাবনা: সব কটা জানালা খুলে দাও না (ধ্রুপদ)
ডঃ মোহাম্মদ শহিদুর রশিদ ভূইয়াঁ ছিলেন শেরে বাংলা এগ্রিকালচার উনিভার্সিটির জেনেটিক্স ও প্লেন্ট ব্রিডিং এর প্রফেসর। উনি ফুল ও এর


