যন্ত্রের দৌরাত্ম্য

যন্ত্রের দৌরাত্ম্য

যন্ত্র যেমন একদিকে আমাদের জীবনযাপনকে সহজ ও সুন্দর করেছে ঠিক তেমনি মাত্রারিক্ত যন্ত্র নির্ভরতা আমাদেরকে ঠেলে দিচ্ছে খারাপ পরিণতির দিক। যন্ত্র দিনেদিনে যেভাবে মানুষের উপর তার কর্তৃত্ব তৈরি করছে এভাবে চলতে থাকলে একসময় হয়তোবা মানুষ পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়বে।

অফিসে কম্পিউটার, সফটওয়্যার যেমন একদিকে আমার আপনার কাজকে সহজ করে দিয়েছে ঠিক তেমনি অফিসের ডিজিটাল হাজিরা বই একেবারে ঘড়ির কাঁটা ধরে আপনার হাজিরার রেকর্ড রাখছে। এক সেকেন্ডের জন্য দেরি হলেও সেটাকে দেরি হিসেবেই কাউন্ট করছে এবং মাস শেষে আপনাকে এরজন্য জবাবদিহিও করতে হবে।  কিছু অফিস আছে যেখানে তিন দিন দেরিতে আসলে অর্ধেক দিনের বেতন কেটে নেয়ার মত অদ্ভুত নিয়মও চালু আছে। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা মোবাইল অপারেটরে কাজ করতে যেয়ে আমার সেই অভিজ্ঞতা হয়েছিল। বিশেষকরে আপনার রিপোর্টিং বস যদি আপনার খুঁত খোঁজায় ব্যস্ত থাকে তাহলে এই সামান্য ভুলের জন্য আপনি চাকুরি পর্যন্ত হারাতে পারেন।

যাতায়াতের ক্ষত্রে বিভিন্ন এপ যেমন আপনাকে ট্রেন, বাসের সময়সূচি জানিয়ে দিচ্ছে ঠিক তেমনি মাত্র অনু সেকেন্ডের ব্যবধানে আপনার মুখের উপর বাস ট্রেনের দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বাসগুলো এখনো ড্রাইভার দ্বারা পরিচালিত হয় তাই হয়তোবা আপনি তার কাছে থেকে মানবীয় ব্যবহার পেতে পারেন। কিন্তু টাইম টেবল মেনে চলা দূর পাল্লার ভ্রমণের জন্য ট্রেনের কাছ থেকে আপনি কোনভাবেই এক সেকেন্ড সময় পাবেন না।  আপনি প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছেন কিন্তু এক সেকেন্ড দেরি করার জন্য ট্রেনে উঠতে পারছেন না।  আমার সাথে বহুবার এমন হয়েছে তাই জানি তখন কেমন অনুভূতি হয় মনে। আর সেটা যদি হয় অফিসে যাওয়ার পথে তাহলে আপনি নির্ঘাৎ অফিসে দেরিতে পৌছাবেন। আর দেরিতে পৌছালে কপালে কি আছে সেটা আগেই বলেছি।

যন্ত্র অথবা প্রযুক্তি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে যোগাযোগ মাধ্যমে। এখন খুব সহজেই পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষ অন্য প্রান্তের মানুষের খবর নিতে পারছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে হয়ে যাচ্ছে একে অপরের বন্ধু। কখনো কখনো সেই সম্পর্ক গড়াচ্ছে প্রেম ভালোবাসা এমনকি বিবাহ পর্যন্ত কিন্তু সেই সম্পর্ক টিকে আছে এমন সংখ্যায় খুবই কম।  কারণ ভার্চুয়াল জগতে প্রযুক্তির কল্যাণে এখন মিথ্যা কথা বলা বা প্রতারণা করাটা খুবই সহজ কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর ভার্চুয়াল সম্পর্কে আপনি যেহেতু সেই মানুষটার সংস্পর্শে আসতে পারেন না তাই আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্কটাকে অনেক গভীর মনেহলেও আদতে এই সম্পর্কগুলো হয় খুবই ঠুনকো।

প্রযুক্তি আসার সাথে সাথে মানুষ তার মুখের ব্যবহার কমিয়ে দিয়ে আঙুলের ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে। বাসে, ট্রেনে, শপিং মলে শতশত, হাজার হাজার মানুষ চলাফেরা করলেও কি অদ্ভুত নীরবতা বজায় রাখছে মানুষ। দিনেদিনে ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে এসেছে যে বাসে বা ট্রেনে যদি একজন আরেকজনের সাথে একটু কথা বলে তাহলে বাকি মানুষেরা এমনভাবে তাদের দিকে তাকায় যেন কথা বলা দুজন মানুষ এইমাত্র অন্য গ্রহ থেকে টুপ করে খসে পড়েছে। যারফলে বাধ্য হয়েই তাদেরকে চুপ করে যেতে হয়।  স্বামী স্ত্রী পরিবার পরিজন নিয়ে কোথায় বেড়াতে যেয়েও সবাই ফোন ট্যাব নিয়ে এতই বেশি ব্যস্ত থাকে যে আসলে সেটাকে বেড়ানো বলা চলে না।  স্বামী স্ত্রী একে অপরকে ভালোবাসার মেসেজ দিচ্ছে কিন্তু কাছে যেয়ে একটু ছুয়ে দিয়ে সেই কথাটা বলছে না।

প্রযুক্তি ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে মানুষের বিনোদনে। এখন বিনোদন বলতেই ভার্চুয়াল বিনোদনকে বুঝায়। এতে একদিকে যেমন খরচ বাচে অন্যদিকে সময়ও বাচে। তাই মানুষ এখন বাসায় বসে ইউটিউবে নাটক দেখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে বাইরে যেয়ে পার্কে বা রাস্তায় হাটাহাটি করার চেয়ে। বিশেষকরে বাচ্চারা দিনেদিনে যেভাবে ইউটিউব আর ট্যাবে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে তাতে করে ওরা একসময় হয়তো বলেই বসবে ধান গাছ থেকেই কাঠ হয়।  অতি সম্প্রতি এমন একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে। একটা ক্ষেতে গিয়েছি সেখানে এক ভদ্রলোক বেছেবেছে একেবারে করলার সাইজের লাউ তুলে এনেছেন কারণ উনি জানেন কচি জিনিসই ভালো হয়।  আর একজন ধুন্দল বাছতে যেয়ে একেবারে বয়স্কগুলো নিয়ে এসেছেন।  দুজনেরই চেহারা দেখে মনেহল উনারা কখনওই গ্রামে যান নাই তাই জানেন না বিষয়গুলো। আসলে প্রযুক্তি যত দ্রুত শহরগুলোতে পৌছে যায় গ্রামে যেতে একটু বেশি সময় লাগে। আশংকার বিষয় হচ্ছে এখন আর এই তফাৎটা নেই এখন শহর গ্রাম দুজায়গায় প্রযুক্তির কালো ছোবলে সমানভাবে আক্রান্ত।

আর বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যেয়ে মানুষ সেই জায়গার ছবি তোলা নিয়ে ইদানিং এতই বেশি ব্যস্ত থাকে যে সেই জায়গার সৌন্দর্য আর তাদের চোখে ধরা পড়ছে না। আমি বলছি না যে ছবি তোলার দরকার নেই কিন্তু ছবি তুলতে যেয়ে যদি জায়গাটা দেখার আনন্দই মাটি হয়ে যায় তাহলে আর বেড়াতে যেয়ে কি লাভ হল। বাসায় বসে সেই জায়গায় বেড়ানোর ভিডিও দেখে নিলেই হত। বেড়াতে যেয়েও বড় মানুষেরা তাদের স্মার্ট ফোনের পিছনেই এত বেশি সময় কাটায় যে বাচ্চারা হাত থেকে ছুটে যেয়ে হরহামেশায় বিভিন্ন দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাড়াচ্ছে। আর অধিক সময় ধরে কম্পিউটার টিভি বা মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের সমস্যা দেখা দিচ্ছে খুব কম বয়স থেকেই। এখনকার যুগে বেশিরভাগ বাচ্চায় চোখে চশমা নিয়ে ঘুরে।  চশমা নেয়ার জন্য প্রাকৃতিকভাবে চোখের অসুখ যতটা না দায়ি তার চেয়ে বেশি দায়ি মোবাইল, ট্যাব আর ইউটিউব। ওরা খালি চোখে প্রাণভরে পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখার আগেই চোখের উপর চেপে বসছে চশমার নিয়ন্ত্রণ।

প্রযুক্তির আরো একটা খারাপ দিক হচ্ছে এটা বাড়ন্ত পৃথিবীর জনসংখ্যাকে কর্মহীন করে দিচ্ছে।  প্রযুক্তির উৎকরর্ষতা একদিকে যেমন দক্ষ জনগোষ্ঠীর কর্মের সুযোগ করে দিচ্ছে অন্যদিকে একইভাবে মানুষকে কর্মহীনও করে দিচ্ছে। প্রযুক্তির উৎকরর্ষতার ফলে অবশ্যই কাজের গুণাগুণ অনেক ভালোভাবে বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে কিন্তু একইসাথে যন্ত্রের ভুলগুলো শুধরানোও অসম্ভব হয়ে পড়ছে। জানিনা মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে কি না তবে বিভিন্ন প্রকার এপের ব্যবহারের ফলে যে মানুষের মস্তিষ্ককে কম কাজ করতে হচ্ছে সেটা সহজেই বলা যায়।  কারণ এই এপগুলো বা কোন সফটওয়্যারের ব্যবহার আপনি একবার শিখে ফেললে আর তেমন কোন কাজ মস্তিষ্ককে করতে হচ্ছে না।

তবে আমার কাছে প্রযুক্তির সবচেয়ে খারাপ প্রভাব মনেহয়েছে বিভিন্ন প্রকার মানবঘাতি দাঙ্গাতে এর ব্যবহার দেখে। মানুষ মাত্রই আমরা সবাই কম বেশি কান পাতলা স্বভাবের। আর কিছু মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘাপটি মেরে বসে আছে সেই কানপাতলা স্বভাবের ফায়দা নিতে। ভার্চুয়াল জগতে সত্য মিথ্যা মিলিয়ে কিছু একটা ছেড়ে দিয়ে সেটার ফায়দা নিচ্ছে।  বিশেষকরে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই প্রভাব দিনে দিনে প্রকট আকার ধারণ করেছে। কেউ একজন ফেসবুকে একটা কিছু দিয়েছে কি দেয় নাই কিন্তু দিয়েছে বলে প্রচার করে তাদের বাড়িঘরে আক্রমণ করে লুটতরাজ, দাঙ্গা ঘটানো হচ্ছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে তদন্ত হলে শেষপর্যন্ত দেখা যায় আদতেও এমন কোন বিষয় ছিল না।  আগে কান কথার মাধ্যমে এটা ছড়াতো তাই অনেক সময় লাগতো সেটা ছড়াতে। তার আগেই হয়তো কেউ জেনে ফেলে সেটা প্রতিকারের ব্যবস্থা নিয়ে ফেলতো কিন্তু এখন প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়ার আগেই ক্ষতিটা হয়ে যাচ্ছে।

Md Yaqub Ali

Md Yaqub Ali

আমি মোঃ ইয়াকুব আলী। দাদি নামটা রেখেছিলেন। দাদির প্রজ্ঞা দেখে আমি মুগ্ধ। উনি ঠিকই বুঝেছিলেন যে, এই ছেলে বড় হয়ে বেকুবি করবে তাই এমন নাম রেখেছিলেন হয়তোবা। যাইহোক, আমি একজন ডিগ্রিধারী রাজমিস্ত্রি। উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতে অস্ট্রেলিয়াতে আমার আগমন ২০১৫ সালের মার্চে। আগে থেকেই ফেসবুকে আঁকিবুকি করতাম। ব্যক্তিজীবনে আমি দুইটা জীবের জনক। একটা হচ্ছে পাখি প্রকৃতির, নাম তার টুনটুনি, বয়স আট বছর। আর একজন হচ্ছে বিচ্ছু শ্রেণীর, নাম হচ্ছে কুদ্দুস, বয়স দুই বছর। গিন্নী ডিগ্রিধারী কবিরাজ। এই নিয়ে আমাদের সংসার। আমি বলি টম এন্ড জেরির সংসার যেখানে একজন মাত্র টম (আমার গিন্নী) আর তিনজন আছে জেরি।


Place your ads here!

Related Articles

খালেদা জিয়ার আসল অসুখ

ফজলুল বারী: শারীরিক অসুস্থতার গ্রাউন্ডে সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগে খালেদা জিয়ার জামিনে মুক্তির শুনানি হয়েছে। খালেদার আইনজীবীরা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন

মঞ্চে জীবন নাটক

হ্যাপি রহমান, সিডনি: প্রায় এক দশক আগে এমনই কোন এক গ্রীষ্মকালে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে সপরিবারে প্রথম এসেছিলাম । গন্তব্য শহর থেকে

করোনায় মৃত্যুর হৃদয়বিদারক বর্ণনা দিলেন ইতালির চিকিৎসক

(Source: Dilruba Shahana ) করোনাভাইরাসে ঝরে যাচ্ছে একের পর এক প্রাণ। মরণঘাতী এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়াদের তালিকায় চীনের

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment