দালাই লামা – অনাগতের আলো – তিন পর্বের প্রথম পর্ব
আমি দয়া ও মৈত্রীর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপনাদের সাথে কিছু কথা বলবো। এই প্রসঙ্গে আমি যখন কথা বলি তখন আমি নিজেকে একজন বৌদ্ধ অথবা দালাই লামা এমন কি একজন তিব্বতী বলেও মনে করি না, শুধু ভাবি আমি একজন মানুষ। আমি আশা করবো আপনারাও নিজেদেরকে একজন আমেরিকান অথবা পশ্চিমদেশীয় অথবা কোন এক বিশেষ জনগোষ্ঠীর সদস্য না ভেবে শুধুমাত্র একজন মানুষ হিসেবেই নিজেকে গণ্য করবেন। অন্য সব পরিচয় গৌণ। আলোচনার সময় আপনি ও আমি যদি পরস্পরকে মানুষের মর্যাদা দেই তবেই তো আমরা সমতার ভিত্তিস্তরে পৌঁছতে পারবো। আমি যদি বলি, আমি একজন ভিক্ষু, আমি একজন বৌদ্ধ। এসব আমার মানব চরিত্রের তুলনামূলক পরিচিত মাত্র। আসলে মনুষ্যত্বই মানুষের প্রাথমিক পরিচয়।
আপনি যদি মানুষ হিসেবে জন্ম নেন, আমৃত্যু মানুষই থাকবেন, অন্য কোন ভিন্ন প্রাণীতে রূপান্তর সম্ভব নয়। অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলো যেমন, আপনি শিক্ষিত অথবা অশিক্ষিত, ধনী অথবা গরীব, এসবই গৌণ বিষয়।
আজ আমরা বহু সমস্যার সম্মুখীন। আমাদের বিশ্বাস, ধর্ম, গোত্র, আর্থিক মর্যাদাসহ বিবিধ প্রয়োজনে কিছু কিছু সমস্যা আমরা নিজেরাই তৈরি করেছি। তাই, সকল মানুষ সমান এবং সমান মর্যাদা ও প্রশংসা পাবার যোগ্য এই নৈতিক ভিত্তির উপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবার মুক্তমন নিয়ে বর্তমান সমস্যাগুলোর সমাধান খোঁজার জন্য গভীরভাবে চিন্তা করার এখনই উপযুক্ত সময়। ভিন্ন কৃষ্টি দর্শন, ধর্ম অথবা বিশ্বাসের পার্থক্য ভুলে গিয়ে আমাদের মাঝে পারষ্পরিক বিশ্বাস, বোঝাপড়া, সমান ও সহযোগীতার শক্ত সেতু গড়ে তুলতে হবে।
¯স্বাভাবিকভাবে, সকল মানুষই সুখ চায়, কেউ দু:খ চায় না। প্রত্যেক মানুষেরাই সুখী হবার সমান অধিকার আছে। অতএব, মানুষ হিসেবে আমরা সকলেই সমান। এই বোধটা সকলের মাঝে জাগিয়ে তোলা প্রয়োজন। আমরা এক মানব পরিবারের সদস্য। অপ্রধান (গৌণ) কারনে আমরা একে অন্যের সাথে বিবাদে লিপ্ত হই এবং অপ্রয়োজনীয় তর্ক, জোচ্চুরি, বা মনো কষ্টের কারণ হই।
দুর্ভাগ্যবশত: বহু শতাব্দী ধরে মানুষ মানুষকে কষ্ট ও আঘাত দেবার উদ্দেশ্যে এহেন কোন অপকর্ম নেই যা করেনি। বস্তুত, সাংঘাতিক ও মর্মান্তিক সকল ব্যবস্থা অথবা উপকরণ ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে আরও বেশী সমস্যা, আরও অতিরিক্ত কষ্ট এবং অধিকতর অবিশ্বাসের জন্ম হয়েছে। এ সবের মধ্যে দিয়ে মানুষে মানুষে বেশী বেশী ঘৃণা ও বিভেদ তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে পৃথিবী ছোট থেকে ছোটতর হচ্ছে। আর্থিকভাবে এবং বহু পারস্পরিক ¯স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সম আদর্শের ভিত্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সম্পর্ক ঘণিষ্ঠতর হচ্ছে এবং অনেক বেশী মাত্রায় পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এ কারণে ঘন ঘন আন্তর্জাতিক বৈঠক বসছে। কোন এক দুর্গম জায়গার সমস্যাও বৈশ্বিক সমস্যার সাথে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ঘটনার নিজস্ব ব্যাপকতাই জানান দিচ্ছে যে, সমস্যা সমাধানের যে সব মাপকাঠি আমাদের মাঝে বিভেদের জন্ম দেয় সেগুলোর চেয়ে মানুষের কষ্ট মুক্তির বিবেচনাকেই অধিক গুরুত্ব দেবার প্রয়োজনীয়তা জরুরী হয়ে পড়েছে। তাই আমি একজন মানুষের পরিচয় নিয়েই আপনাদের সাথে কথা বলছি। আমি আন্তরিকভাবে আশা করবো আপনারাও একইভাবে চিন্তা করবেন, আমি একজন মানুষ এবং অন্য একজন মানুষের কথা শুনছি।
আমরা সকলেই সুখ চাই। নগরে, ফসলের মাঠে এমনকি অগম্য গ্রাম গঞ্জে প্রত্যেকই খুব ব্যস্ত, কেন এই ব্যস্ততা? কারণ প্রত্যেকই সুখী হবার চেষ্টায় নিয়োজিত। এ ধরনের প্রচেষ্টা যথার্থ। তবে মনে রাখা প্রয়োজন সুখ খোঁজার রাস্তাটি সঠিক হতে হবে। বিবেচ্য সমস্যা সম্পর্কে ভাসা ভাসা ধারনা নিয়ে অতি মাত্রায় জড়িয়ে পড়ে কোন সমস্যার সমাধান হবে না।
আমাদেরকে ঘিরেই যতো সংকট ও ভয় বিরাজ করছে। উচ্চতর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বদৌলতে আমরা জাগতিক উন্নতির বেশ উঁচু ধাপে পৌঁছে গেছি। দুইটি উন্নতির জন্য উপযোগী ও প্রয়োজনীয় শক্তি। এরপরও আপনি যদি আমাদের বাইরের উন্নতির সাথে ভিতরের উন্নতির তুলনা করেন তবে এটি পরিষ্কার হবে যে, আমাদের মানবিক (ভিতরের) উন্নতিতে ঘাটতি রয়েছে। বহু দেশে সন্ত্রাস, হত্যা, ইত্যাদি স্থায়ী সংকটে পরিণত হয়েছে। সাধারণ জনগন নৈতিক অবক্ষয় ও অপরাধমূলক কার্যকলাপ বেড়ে যাবার অভিযোগ তুলেছে। আমরা জাগতিক উন্নতির উন্নত ধারা অব্যাহত রাখলেও একই সাথে মানসিক উন্নতির প্রচেষ্টাগুলোকে অবহেলা করে চলেছি।
(অসমাপ্ত – বাকিটা দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বে)
অনাগতের আলো
তেনজিন গিয়াৎছো, মাননীয় চতুর্দ্দশ দালাই লামা
ভাষান্তর: কাজলপ্রিয় বড়ুয়া, ক্যানবেরা
Related Articles
বাংলাদেশ, বার বার ঘুইরে মাগুর চ্যাং – এক ভয়াবহ ভবিষ্যৎ কি অবধারিত
(দ্বিতীয় পর্ব) | (প্রথম পর্ব) না আমাগো আর কোনো গতি ছিল না, আরেকটু ব্যাখ্যা কইরা বলি, বিশেষ কইরা সব কিছুর
Why October 27 is significant in terms of the Constitution?
As per Bangladesh Constitution, October 27 starts the period of 90 days within which the tenth parliamentary election will be
Foreign Secretary-level meeting in Islamabad: Sticky Issues remain unresolved
On 1st November, Bangladesh and Pakistan begin a two-day fifth round of annual consultation at Foreign Secretary’s level in Islamabad


