দালাই লামা – অনাগতের আলো – তিন পর্বের দ্বিতীয় পর্ব

দালাই লামা – অনাগতের আলো – তিন পর্বের দ্বিতীয় পর্ব

[দালাই লামা – অনাগতের আলো – তিন পর্বের প্রথম পর্ব]

দ্বিতীয় পর্ব:
প্রাচীনকালে যুদ্ধের পরিণাম সিমীত ছিল। জাগতিক উন্নতির কারনে বর্তমানের যুদ্ধেও ক্ষয়ক্ষতি অকল্পনীয়। আনবিক বোমার শক্তি সম্পর্কে আমারা কিছুটা ধারনা থাকলেও হিরোশিমা ভ্রমনকালে এর ধ্বংসযজ্ঞও দেখা এবং বোমাহত ব্যক্তির সাথে কথা বলা আমার পক্ষে খুবই কষ্টকর ছিল। এসব দেখে ও শুনে আমি হতবাক হয়ে যাই। সত্যি এক ভয়ঙ্কর ক্ষেপনাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছিল। আমরা যদিও অন্য প্রাণীকে আমাদের শত্রু ভেবে থাকি, গভীরভাবে চিন্তা করলে মানুষও আমাদের একটি শত্রু । অথচ প্রতিটি মানুষ সুখ চায়, এবং প্রত্যেক মানুষেরই সুখী হবার অধিকার রয়েছে। হিরোশিমার সেই বিভৎস রূপ দেখে সেই মুহুর্তে আমারা চর্চ্চিত জীবন চর্যা যেন আরও শক্তিশালী হল। রাগ (রোষ) এবং ঘৃণা কোন সমস্যার সমাধান করতে পারে না।

ক্রোধ দিয়ে ক্রোধকে জয় করা যায় না। কোন ব্যক্তি যদি আপনার প্রতি রাগ ভাব দেখান এবং আপনিও একইভাবে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন তবে এর ফল হবে মারাত্মক। বিপরীতভাবে, আপনি যদি রাগ দমন করেন এবং উল্টো দৃষ্টিভঙ্গি যথা, করুনা, ধৈর্য্য ও সহনশীলতা গুণের আশ্রয় নেন, তবে আপনি একাই শুধু শান্তিতে থাকবেন তা নয়, অপর ব্যক্তির ক্রোধও ধীরে ধীরে ঝিমিয়ে পড়বে। হিংসা অথবা ঘৃণার প্রতিযোগিতা করে বৈশ্বিক সমস্যার মিমাংসা হবে না। বরং এসব সমস্যাগুলোর সমাধান মৈত্রী, প্রেম ও প্রকৃত দয়া প্রয়োগের মাধ্যমে খুঁজতে হবে। আমাদের মজুদকৃত মারাত্মক যুদ্ধাস্ত্রগুলো আপিনা-আপনি যুদ্ধ শুরু করতে পারে না। অস্ত্র চালু করার বোতাম টেপার কাজটি মানুষের আঙ্গুলই করে থাকে। এ কজাটি করার আগে মানুষেরই চিন্তার প্রয়োজন পড়ে। আঙ্গুলের সক্ষমতার উপর বোতাম টেপার কাজটি নির্ভর করে না। দায়ত্বিটা মানুষের চিন্তার ফসল।

আপনি যদি চিন্তা ও এর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার নীল নকশা নিয়ে বিশদ চিন্তা করেন তবে মনের মাঝেই এর অস্তিত্ব খুঁজে পাবেন। কারণ একমাত্র মনই যে কোন কাজের পিতা-মাতার ভূমিকা পালন করে। অতএব প্রাথমিক ভাবে মনকে দমন করা খুবই জরুরী। আমি এখানে মনকে দমন করার জন্য ধ্যান অনুশীলনের কথা বলছি না। আমি বলছি মনের মাঠে রাগ কমানোর কাজে নিজেকে চাষাবাদে নিয়োজিত করার কথা। অন্যের অধিকারের প্রতি অধিকতর সম্মান প্রদর্শনের কথা, গণ মানুষের সমস্যা সমাধানের জন্য অধিকতর উদ্দিগ্ন হবার কথা, সকল মানুষই সমান এ সম্পর্কে অধিকতর পরিষ্কার ধারণা অর্জনের কথা। যেমন, ধরুন রাজনৈতিক পূর্ব ব্লক সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে পশ্চিমা দেশের সাধারন দৃষ্টিভঙ্গি, সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণের প্রতি আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে ভাই বোনের। রাশিয়ার জনগনও আপনাদের মতোই মানুষ। একই ভাবে, রাশিয়াও আপনাদেরকে ভাই বোন জ্ঞানে গ্রহণ করা উচিত। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি দ্রুত কোন সমস্যার সমাধান হয়তো দেবে না, তবে আমাদেরকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। টেলিভিশন ও অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমের সাহায্যে জনগণকে এই দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানানো ও উদ্বুদ্ধ করার কাজটি আমাদেরকে শুরু করতে হবে। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিজেদের জন্যে অর্থ আয় ছাড়াও সংবাদ মাধ্যমগুলোকে মানব কল্যানের ক্ষেত্র অধিকতার অর্থবহ ভূমিকাপালনের নিবিশেষ দায়িত্ব নিতে হবে। অর্থ উপার্জনই একমাত্র কাম্য নয়। অর্থের প্রয়োজন অবশ্যই আছে তবে এর আসল উদ্দেশ্য মানব কল্যান। অনেক সময় আমরা মানুষের কথা ভুলে গিয়ে অর্থ আয়ের বিষয়টিকে বেশী গুরুত্ব দিয়ে ফেলি। এধরনের কাজ অযৌক্তিক।

এ কথা সত্য যে, আমরা সকলেই সুখ চাই। আবার এ কথাও অনস্বীকার্য যে, রাগ নিয়ে শান্তি সম্ভব নয়। অথচ মৈত্রী ও করুনার মাধ্যমে মানসিক শান্তি লাভ সম্ভব। মানসিক অস্তিরতা কেউ চায় না। অজ্ঞতা, মানসিক চাপ, ইত্যাদি কারনেই মন অস্তিরতায় ভোগে। খারাপ দৃষ্টিভঙ্গি আপনা আপনি তৈরী হয় না। বরং মূর্খতার শক্তি থেকেই সৃষ্টি হয়।

বিদ্বেষের কারণে, আমরা বিচার ক্ষমতার মতো অন্যতম মানবিক গুন হারিয়ে ফেলি। কোনটি ভাল, কোনটি মন্দ বিচারের জন্য মস্তিষ্কের মতো একটি ভাল সম্পদ আমাদের রয়েছে। এর ব্যবহারে, আমরা শুধু বতমান সমস্যাই সমাধান করতে পারি তা নয়, বরং আগামী দশ, বিশ অথবা শত শত বছর পরের জটিল বিষয় নিয়েও ভাবনা চিন্তা করতে সক্ষম। কোন বিষয়ে পূর্ব ধারণা ছাড়াও আমাদের সাধারণ জ্ঞান দিয়ে ঐ বিষয়টির ভালমন্ত বিচার করতে আমরা সক্ষম। আমরা যদি এরূপ এরূপ সিদ্ধান্ত নেই; তবে ঐরূপ ঐরূপ ফল বা প্রতিক্রিয়া ঘটবে মনে রাখতে হবে। আমাদের মন বিকারযুক্ত অথবা বিদ্বেষপূর্ন থাকলে বিচার শক্তি লোপ পাবে। তা যদি একবার হারায় পরিনাম দু:খময় হবে। কাঠামোগত ভাবে আপনি একজন মানুষ হলেও মানসিকভাবে আপনি একজন সম্পূর্ণ মানুষ নন। আমরা মানুষ একথা মেনে নিয়েই আমাদের বিচার সহায়ক মানসিক শক্তির সুরক্ষা করতে হবে। বিনষ্ট সুরক্ষা ফিরে পাবার জন্য কোন বীমা পলিসি গ্রহণেরও কোন সুযোগ আমাদের নেই। আমাদের মাঝই বীমা কোম্পানীর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে।

কারণ আমাদের মাঝে রয়েছে সদচরিত্র, বিবেক এবং বিদ্বেষের কুফল ও দয়ার সুফল সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ও উপলব্ধি। এসব চিন্তাগুলো বার বার করতে হবে। যদ্দিন এ ভাবধারায় নিজেকে প্রশ্নাতীতভাবে একমত মনে হবে তদ্দিন এ প্রক্রিয়া অব্যহত রাখতে হবে। পরবর্তীতে আমি নিজেই বুঝতে পারবো যে এই বিষয়ে এখন আমি অভিজ্ঞ। অর্থাৎ অন্য কেহ আমাকে ভিন্ন পথে নিতে পারবে না। তখনই বুঝতে হবে মনও সংযম করার পদ্ধতি আমাদের লাভ হয়েছে।

(অসমাপ্ত – বাকিটা তৃতীয় পর্বে)

দালাই লামা – অনাগতের আলো – তিন পর্বের দ্বিতীয় পর্ব
অনাগতের আলো
তেনজিন গিয়াৎছো, মাননীয় চতুর্দ্দশ দালাই লামা
ভাষান্তর: কাজলপ্রিয় বড়ুয়া, ক্যানবেরা


Place your ads here!

Related Articles

বহে যায় দিন – Every person is born with talent

> বহে-যায়-দিন সকল প্রকাশিত পর্ব > ছয় ।। Every person is born with talent এ কথা সত্যি যে প্রত্যেক মানুষের ভেতর

Amendment of the Bangladesh Constitution

Following the August 29, 2005 High Court verdict that declared the fifth constitutional amendment illegal, the Appellate Division of the

Aren’t Rohingyas Bengalis, and Arakan integral to Bangladesh?

Every society has certain taboos – cultural/religious, social, and political – set apart and designated as restricted or forbidden to

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment