তারেক মাসুদ, মিশুক মুনির
ফজলুল বারী: অমর চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ, সাংবাদিক মিশুক মুনির সহ পাঁচজন একই সড়ক দূর্ঘটনায় প্রান হারিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রতিদিন সড়ক দূর্ঘটনায় কুড়ি বা এরও বেশি মানুষ প্রান হারান। যারা বেঁচে থাকেন তাদের জীবন কাহিনী আরও করুন। সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব অথবা ট্রমাকে সঙ্গী করে তারা বাঁচেন। বিদেশে আমরা যখন রাস্তায় কোন গাড়ি দূর্ঘটনায় সংশ্লিষ্ট হই, আইন হচ্ছে পুলিশ না পৌঁছা পর্যন্ত আমাকে ঘটনাস্থলে থাকতে হবে। পুলিশ এসে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য নেবে। এরপর সংশ্লিষ্ট গাড়ি চালকের ফাইন-পয়েন্ট কাটা সহ নানা ব্যবস্থা হবে। দূর্ঘটনায় ইনজুরি থাকলে আগে হাসপাতাল, গাড়িটির পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যে সেটিকে পাঠিয়ে দেয়া হবে নির্দিষ্ট কিছু ওয়ার্কশপে। পাশাপাশি চলবে আইনানুগ অন্য সব কার্যক্রম। আর বাংলাদেশে বরাবর প্রথম কাজটি হয় গাড়ি চালকের পালিয়ে যাওয়া! এরজন্যে চাক্ষুষ প্রমানের অভাবে সিংহভাগ ঘটনার কোন বিচার হয়না। আর বিদেশে কোন ঘটনায় এমন পালিয়ে যাবার ঘটনা পাওয়া গেলে বেআইনি কর্মকান্ডের জন্যে জরিমানার পরিমান বাড়বে। গাড়ি চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সের সমস্যাও হয়ে যেতে পারে।
তারেক মাসুদ-মিশুক মুনিরদের হন্তারক গাড়ি চালককে শনাক্ত গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছিল। আর বিচারে জানা গেলো তার গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রন যন্ত্র সহ নানাকিছু ছিল বিকল অথবা বিকল করে রাখা ছিল! চালক ছিল নিদ্রাহীন! একটা শিফটের পর না ঘুমিয়ে সে আরেক শিফটের গাড়ি চালাচ্ছিল! অতএব এমন একজন গাড়ি চালকের গাড়ি চালনায় যা হবার তাই হয়েছে। প্রান গেছে তারেক মাসুদ-মিশুক মুনিরের মতো জাতীয় প্রতিভার। বাংলাদেশে খুব কমক্ষেত্রে সড়ক দূর্ঘটনার বিচার হয়। তারেক মাসুদ-মিশুক মুনির হত্যার বিচারে মিডিয়ার পাহারা ছিল। তাই বিচারটি হয়েছে। আর বিচারের পর বাংলাদেশ দেখলো আরেক নৈরাজ্য! তারেক মাসুদ-মিশুক মুনিরের খুনি গাড়ি চালকের সাজার প্রতিবাদে শুরু হয়ে গেলো পরিবহন ধর্মঘট! প্রথমে চুয়াডাঙ্গায়। এরপর বৃহত্তর খুলনার দশ জেলায়! এরপর দেখা গেল দেশে কোন আইন আদালত-সরকার বলে কিছু নেই! আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে পরিবহন ধর্মঘটের বিরুদ্ধে কোন একটি আদালত সুয়োমোটো রুল পর্যন্ত জারি করলোনা! আর আদালত কিছু বলেনি, বলছেনা দেখে সরকারও নীরব! ভোগান্তিক শিকার মানুষগুলো যে ভোটারও তা ভুলে গিয়ে চোখ-কান বন্ধ করে থাক থাকলো দেশের ক্ষমতাসীন সরকার!
একটি আদালতের রায় আপনার পছন্দ না হলে আপীলের জন্যে আপনি আরেক আদালতে যেতে পারেন। কিন্তু তা না করে আপনি শুরু করলেন পরিবহন ধর্মঘট? পরিবহন ধর্মঘট করে কী কোন একটি আদালতের রায় পাল্টানো যায়? তাহলে এই ধর্মঘটের টার্গেট কী? জিম্মি মানুষজনের ভোগান্তি লাগভে সরকার তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসবে? ধরা যাক সরকার আলোচনায় বসলো। এরপর কী তারা আদালতের সাজাপ্রাপ্ত আসামি ছেড়ে দেবে? না দিতে পারবে? এমন জেনেও সরকার কেনো এই বেআইনি ধর্মঘটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলোনা শুরুতেই? চলতি সরকারটিকেতো দেশের মানুষ কোন দূর্বল সরকার হিসাবে জানেনা। তাহলে এক্ষেত্রে সরকারি দূর্বলতার কারন কী?
দূর্ভাগ্যজনক তথ্য হচ্ছে এই ধর্মঘটী নেতাদের সবাই সরকারদলীয়! অথবা বাংলাদেশে এখন কারো বিরোধীদলীয় সমর্থক পরিবহন নেতা হবার সুযোগ নেই! আর এদের নেতা শাহজাহান খান সরকারের মন্ত্রী! জাসদ থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেবার আগে থেকে শাহজাহান খান পরিবহন শ্রমিকদের নেতা। তার প্রয়াত পিতা মাদারিপুরের আসমত আলী খান ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের অন্যতম। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের মতো আসমত আলী খানেরও খুব সাধারন জীবন এবং অসাধারন সামাজিক ভাবমূর্তি ছিল।
শাহজাহান খানের বিয়ের পর তাদের মাদারিপুরের বাড়িতে যাবার সুযোগ হয়েছিল। শাহজাহান খান তখন জনপ্রিয় জাসদ নেতা। তখন তার বাড়িতে গিয়ে দেখি একটি কক্ষের মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত শুধু বিয়ের উপহার সামগ্রীর বক্সে ঠাসা! এর একটি বাক্সের ওপর লেখা মাদারিপুর ধাঙ্গড় সমিতি। একজন নেতা কী জনপ্রিয়-জনবান্ধব হলে তার বিয়েতে স্থানীয় ধাঙ্গড় সম্প্রদায়ের সদস্যরাও দাওয়াত পান আর তারাও উপহার সহ দাওয়াত রক্ষা করতে আসে! সেই শাহজাহান খান পরে শুধু পরিবহন শ্রমিকদের নেতা হয়ে গেলেন! তাকে আওয়ামী লীগে নেয়া, মন্ত্রী করার পিছনেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল পরিবহন শ্রমিকদের ওপর তার প্রভাব। সেটিকে পুঁজি করে তিনি মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন। আর সরকারের লক্ষ্য ছিল তাকে কাজে লাগিয়ে পরিবহনখাতকে নিজেদের করায়্ত্ব রাখা। কিন্তু গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা কী? দেশের মানুষের টাকায় মানুষের চলাচলের ওপর নির্ভরশীল ফুলেফেঁপে ওঠা সরকার নিয়ন্ত্রিত পরিবহনখাত যখনতখন জিম্মি করে পরিবহনখাতকে! যে খাতের নেতা সরকারের মন্ত্রী শাহজাহান খান! আর সরকার বসে বসে তার মন্ত্রীর নেতৃত্বের পরিবহন খাতের হাতে জিম্মি দেশের মানুষের গালি খায়! অভিশাপ কুড়োয়! অবাক অচেনা এক মাতৃভূমি আমার!
এখন একটু আদালত প্রসঙ্গে আসি। শুধু চলতি পরবহন ধর্মঘট নয়, বাংলাদেশে আজকাল প্রায় দেখা যাচ্ছে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে দেশে হরতাল-ধর্মঘট হয়! আর আদালত চুপচাপ থাকে! কিছু বলেনা! আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে কী কী করনীয় আছে তা উল্লেখ করা আছে আইনে। নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়া যায়। তারেক মাসুক-মিশুক মুনিরের হন্তারক সাজাপ্রাপ্ত গাড়িচালকেরও উচ্চ আদালতে যাবার সুযোগ আছে। কিন্তু তা না করে রায়ের প্রতিবাদে পরিবহন ধর্মঘট!প্রথমে চুয়াডাঙ্গায় পরে খুলনা বিভাগের দশ জেলায়! কিন্তু আদালত চুপ কেনো? বেআইনি ধর্মঘটের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসনিক তৎপরতা নেই, এর কারন হয়তো প্রশাসন জানে এদের নেতা সরকারের প্রভাবশালী নেতা শাহজাহান খান। কিন্তু আদালতেরতো শাহজাহান খানের ভয় নেই। কিন্তু কতকিছুতে জনস্বার্থে আদালত যেখানে সুয়োমোটো রুল জারি করে এক্ষেত্রে আদালত কেন নীরব কবি? দেশের দক্ষিনাঞ্চলের এত মানুষের দূর্ভোগের বিষয়টি কী গুরুত্বপূর্ন জনস্বার্থ নয়? বাংলাদেশের আদালতের কাছে প্রশ্নটি রেখে আরও কঠিন কিছু বলা বাদ দিয়ে লেখাটি এখানেই শেষ করছি।
পুনশ্চঃ বাংলাদেশের মানুষ যে কত অসহায় জিম্মি জীবনযাপন করে, এত তাদের ধৈর্য তা বিদেশে না এলে এতোটা জানতাম-বুঝতামনা।
Related Articles
Land erosion by rivers brings miseries to millions of people
Rivers are the life-blood of Bangladesh. In fact Bangladesh’s land territory owes to its physical existence to rivers, that carried
SHUROLOK presents Musical Evening
SHUROLOK presents Ghoroa Ashor* SHUROLOK’s next Ghoroa Musical Evening is about celebrating the lives of Rabindranath, Nazrul and other poets
Alternative Idea to Transit facilities
India wants transit facilities through land territory of Bangladesh. The request is not new. Since 1972 India has sought for


