এত বছর প্যারিসে আছি, এমন ভয় কখনও পাইনি! – শাহবুদ্দিন

এত বছর প্যারিসে আছি, এমন ভয় কখনও পাইনি! – শাহবুদ্দিন

ভয়ঙ্কর রাত কাটালাম। ভয়ঙ্কর! এখনও থেকে থেকে শিউরে উঠছি। আতঙ্ক কেমন একটা ঘোর লাগিয়ে দিয়েছে। রাত তখন সাড়ে ৮টা। ডিনারের জন্য আমরা প্রস্তুত হচ্ছি। আমার মেয়ে চিত্র তখনও ফেরেনি। বাস্তিলের দিকে গিয়েছে। প্রত্যেক উইকএন্ডে-ই সে বন্ধুদের সঙ্গে বাস্তিলের দিকে যায়। তরুণ প্রজন্মের ভিড়ভাট্টাই ও দিকে বেশি। উইকএন্ডে ভিড় আরও বেশি থাকে। আমিও সন্ধেবেলা বাস্তিলের দিকেই গিয়েছিলাম। তরুণ চিত্রীদের একটা প্রদর্শনী চলছে। সেটা দেখে তাড়াতাড়িই বাড়ি ফিরেছি। জানি চিত্রর ফিরতে রাত হবে। সে ডিনার করেই ফিরবে। তাই আমি আর আমার স্ত্রী ডিনারের জন্য তৈরি হচ্ছি। চিত্র ফোন করল। ত্রস্ত কণ্ঠস্বর। সে জানাল, খুব বিপদ। বাস্তিল এলাকার একটি ক্যাফের বেসমেন্টে সে লুকিয়ে রয়েছে আরও অনেকের সঙ্গে। সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। চিত্র বলছিল, ‘‘খুব গোলাগুলি চলছে। মনে হচ্ছে যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে।’’

আমার তো বিশ্বাস হচ্ছিল না। স্ত্রীকে বললাম টিভি চালাতে। নিউজ চ্যানেল দেখে আমরা হতবাক। একটু আগেই যেখান থেকে ঘুরে এলাম, সেখানে এ কী অবস্থা! রীতিমতো যুদ্ধ চলছে। সেনাবাহিনী ছোটাছুটি করছে। গোলাগুলি চলছে। জানতে পারলাম ভয়ঙ্কর জঙ্গি হামলার শিকার হয়েছে প্যারিস।

খুব টেনশন শুরু হয়ে গেল। শুধু ভাবছি মেয়েটাকে কখন দেখতে পাব। আদৌ দেখতে পাব তো? খুব অসহায় লাগছিল আমাদের। তবে চিত্র মাঝেমধ্যে সুযোগ মতো ফোন করে নিজের খবর দিচ্ছিল। ওরা ক্যাফেতে বেশি ক্ষণ লুকিয়ে থাকতে পারেনি। আলো নিভিয়ে সবাই বেসমেন্টে চলে গিয়েছিল ঠিকই। কিন্তু যুদ্ধ এমন ভয়ঙ্কর আকার নিচ্ছিল যে ওরা ভয় পেয়ে যায়। যে রাস্তায় ওই ক্যাফেটা, সেই রাস্তাতেই বাতাক্লাঁ কনসার্ট হল। ফলে, বিস্ফোরণ, গোলাগুলি, আর্তনাদ, মৃত্যু— সব চলছিল চিত্রদের ঘিরেই। ওদের মনে হচ্ছিল ক্যাফেটাতেও বোমা হামলা হতে পারে। তাই পিছনের দরজা দিয়ে লুকিয়ে বেরিয়ে, হামাগুড়ি দিয়ে কোনওক্রমে পিছন দিকের একটা গার্ডেনে পৌঁছয় চিত্ররা। তার পাশে সার সার বাড়ি। কিন্তু সব অন্ধকার। শুধু স্ট্রিট লাইটগুলো জ্বলছে। জঙ্গি হামলার ভয়ে বাড়ি-ঘর, দোকানপাট, ক্যাফে-রেস্তঁরায় সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। দরজা-জানালা সব বন্ধ। কারও বাড়ির ভিতরে লুকিয়ে যে প্রাণ বাঁচাবে, তারও উপায় নেই। কিছু ক্ষণ পর চিত্রর ফোন পেলাম। শশব্যস্তে ফোন ধরেছি। দম বন্ধ হয়ে আসার জোগাড়। চিত্র জানাল, এক মহিলা নিজের বাড়িতে তাদের আশ্রয় দিয়েছেন। সেখানেই তাদের লুকিয়ে থাকতে হবে আরও কিছু ক্ষণ। হতে পারে অনেক ক্ষণ। পুলিশ কাউকে বাইরে বেরতে নিষেধ করেছে। আমি বললাম, ‘‘যেখানে আছো, সেখানেই চুপ করে বসে থাকো। একদমই বাইরে বেরনোর চেষ্টা করবে না।’’

চিত্র বন্ধুদের থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। প্রবল আতঙ্কে পালানোর সময় কে কোথায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গিয়েছে, কেউ জানত না। একে একে আশ্রয় খুঁজে নেওয়ার পর তারা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করা শুরু করে। মোবাইলে। কারও পক্ষেই একা বাড়ি ফেরা সম্ভব ছিল না। একা কাউকে রাস্তায় দেখলে সেনা তাকেও জঙ্গি বলে ভাবতে পারে। তাই সবাই এক জায়গায় জড়ো হতে চাইছিল।

রাত ১২টা নাগাদ পুলিশ জানাল, জঙ্গিরা শেষ। চিত্ররাও তত ক্ষণে একত্র হতে পেরেছে। তবে প্যারিস পুরোপুরি জঙ্গিমুক্ত কি না, তা তখনও নিশ্চিত নয়। আতঙ্ক গিলে ফেলেছে গোটা শহরটাকে।

মেয়ে সুস্থ রয়েছে জানতে পেরেই আমার অন্য বন্ধু আর পরিচিতদের খোঁজ নিতে শুরু করি। বাস্তিল চত্বরে বিভিন্ন ক্যাফে, রেস্তঁরাতে অনেক বাঙালি কাজ করেন। বেশিরভাগই বাংলাদেশের। ফোন করে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করি। জানতে পারি তাঁরাও অক্ষতই রয়েছেন। বন্ধু-বান্ধবরা আমাদেরও বার বার ফোন করছিলেন। খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। প্রশাসন এবং রেডক্রস-সহ নানা সংগঠন ততক্ষণে ঘটনাস্থলে পৌঁছে গিয়েছে। জখমদের উদ্ধারের সঙ্গে আটকে পড়া মানুষদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করছিল তারা। চিত্রকে অবশ্য আমার এক বন্ধু নিজের গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দিল। তখন ভোর চারটে। মেয়েকে গাড়ি থেকে অক্ষত নামতে দেখে বুক থেকে যেন পাথর নামল।
এত ভয় আগে কখনও পাইনি। এত অসহায় আগে কখনও মনে হয়নি নিজেকে। মুম্বইতে যে রকম হামলা হয়েছিল, প্যারিসে হুবহু সে রকমই দেখলাম। মুম্বইয়ের ঘটনা টিভিতে দেখেছিলাম। ভয়ঙ্কর! এ বার প্যারিসে নিজেই সেই পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেলাম। এমন জঘন্য কাজ কারা ঘটাতে পারে! কোন ধরনের মানুষ তারা? অথবা আদৌ মানুষ কি? আমার সত্যিই আতঙ্কের ঘোর কাটছে না। গোটা রাত ঘুমতে পারিনি। এখন কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ব, তেমন মানসিক স্থিতিতে পৌঁছতে পারছি না।


Place your ads here!

Related Articles

Eighth wonder of the world – John Huxley

With military bands, teams of terracotta warriors and a thunderous roll of drums, China last night welcomed the world to

Indigenous freedom fighters ignored : Claims Chin Sangma

"We risked our life for the country’s liberation but instead of getting recognition, we are ill-treated as aboriginal tribes," said

Bangladeshi Australian Prabir Maitra win the Election, 1st time in Australia in LG/FG Election history!

এমন দৃষ্টান্ত এর আগে দ্বিতীয়টি ছিল না। অর্থাৎ এর আগে অস্ট্রেলিয়ার কোনো নির্বাচনে কোনো বাংলাদেশি প্রার্থী জয়ী হননি। সে দৃষ্টান্তের

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment