বাংলাদেশের পরিবেশ রক্ষা সংগ্রাম: বাপা-বেন কৌশল – ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন

বাংলাদেশের পরিবেশ রক্ষা সংগ্রাম: বাপা-বেন কৌশল – ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন


মৌলিক উপলব্ধি: বিজ্ঞান মতে, নিজস্ব অস্তিত্বের গন্ডীতে ও সকল পরিসরেই পরিবেশ একটি ব¯‘তান্ত্রিক স্বত্তা, এখানে কল্পনা বা আবেগ বলে কিছু নেই, বরং সবটাই বিজ্ঞান; একটি জটিল রাসায়নিক প্রμিয়ার কালানুμমিক অংশ আমরা সবাই ও সব কিছু। আনুমানিক ৪৬০ কোটী বছর আগে পৃথিবীর সৃষ্টি, তার ০৬ কোটী বছরের মধ্যেই তাতে প্রাণের উদ্ভব হয়। জটিল প্রাণীর বসবাসযোগ্য একটি সুন্দর পরিবেশের এই জগৎ সজ্জিত হওয়ার দীর্ঘ আয়োজনের মধ্যে মানুষ একটি অন্যতম উপাদান। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জৈব-যন্ত্র, মানুষ নামের সর্বো”চ বুদ্ধিমত্তাসম্পনড়ব এই প্রাণীটির উদ্ভব হয়েছে একটি চলমান প্রμিয়ার অংশ হিসেবে। অর্থাৎ আমরা এই পৃথিবীতে বিশেষ কোন অতিথি নই, সামগ্রিক জৈব-রাসায়নিক প্রμিয়াজাত অন্যতম উপাদান। কিš‘ সময়ের ব্যবধানে, হাতে শক্তি পাওয়ার পর পৃথিবী ও প্রকৃতির প্রতি মানুষের আচরণ বর্তমানে ভোগবাদী ও দায়িত্ববোধহীন এক অতিথির মত। আমরা আজ পৃথিবীর জীবন রক্ষাকারী সকল ব্যব¯’া, সকল জীবন-চμ ও জীব জগতের ভারসাম্য বিনষ্ট করছি, চড়াও হয়েছি বাকী সকল কিছুর উপর। অতএব আজ এটি পরিস্কার যে, পরিবেশ ও পৃথিবীর অস্তিত্ব রক্ষা করতে হলে মানুষকে থামতে হবে, ভোগবাদী দর্শনমুক্ত সংযমী বিবেকবান মানুষই পৃথিবী ও পরিবেশ রক্ষার প্রধান চাবিকাঠি। অন্যথায় পরিবেশের অবি”েছদ্য অংশ হিসেবে মানব জাতির বিলুপ্তিও অনিবার্য। জনৈক মনীষি বলেছিলেন “মানব জাতিকে রক্ষার জন্য সেনাবাহিনীর কিছুই করার নেই, রাষ্ট্রীয় বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তিপত্রের মূল্য অত্যন্ত সীমিত, কেবলমাত্র আতড়বজ্ঞানই তাকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে পারে।” এই আতড়বজ্ঞানের উপলব্ধিই বিশ্বব্যাপি পরিবেশ আন্দোলনের মূল নীতি। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন(বাপা) ও বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন)’র প্রতিষ্ঠা লগড়ব থেকে তাদের সকল নীতি ও কার্যμমে এই চেতনাটিই মূল ভিত্তি হিসেবে কার্যকর রয়েছে।অধিকারবোধ: বাপা-বেন তাদের আন্দোলনের প্রেক্ষিত হিসেবে প্রকৃতির অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়াসকেই ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে যার মধ্যে মানুষও সমগুরুত্বপূর্ণ। আর টেকসই নীতি ভিত্তিক জনমানুষের সার্বিক উনড়বয়ন ও সু-শাসনের ধারণা, প্রকৃতি ও পরিবেশের অস্তিত্বকে শেষ পর্যন্ত অন্যতম মানবাধিকারে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের মানুষ তার সার্বিক জীবন-জীবিকা, অর্থনৈতিক মৌলিক অধিকারের দাবীতে দীর্ঘকাল যাবৎ আন্দোলন-সংগ্রাম করে এসেছে। কিš‘ পরিবেশ কোন সময়ই সচেতনভাবে তার অধিকারের অন্তর্ভুক্ত কোন বিষয় ছিলনা। অন্যদিকে আমাদের পরিবেশ ধ্বংসের জন্য প্রধানতঃ দায়ী আমাদের সরকারী নীতিগত ভ্রান্তি বিলাস, সামগ্রিক অনৈতিকতা ও বিত্তবান-ক্ষমতাদর্পী-অর্থলোভী ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর স্বে”ছাচারিতা। আমাদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য অক্ষত প্রাকৃতিক পরিবেশ আজ নিঃসন্দেহে একটি অন্যতম মৌলিক অধিকার। বাপা-বেন চেতনায় তার পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন কার্যμমও একটি অধিকারবোধ ভিত্তিক প্রয়াস। কারণ অধিকারবোধই যেকোনও সামাজিক আন্দোলনের শক্তি ও মাত্রাকে অদম্য, বেগবান ও সফল করে থাকে।
জন্ম-প্রেক্ষাপট: বাপা ও বেন পরিবেশ নিয়ে কাজ বা আন্দোলন করার প্রথম সংগঠন নয়। তার পূর্বে নব্বই দশকের এর প্রথম দিকে বাংলাদেশের এনজিও সেক্টরে অর্থায়ন প্রকল্প ভিত্তিক পরিবেশ সংশ্লিষ্ট কার্যμম ছিল। বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরাম (এফইজেবি) জন সচেতনতা, পরিবেশ নীতি ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে কাজ শুরু করে নব্বই এর দশকের প্রথম দিকেই। সে সময় সরকারী ফ্লাড একশন প্ল্যান (ফ্যাপ) নামক নদী-জলাশয়-পরিবেশ বিধ্বংসী প্রকল্পে ক্ষতিগ্র¯’তার বিরুদ্ধে স্বত:স্ফুর্ত সামাজিক প্রতিবাদ হয়, তাতে সারাদেশের কিছু কিছু ¯’ানে সাধারণ মানুষ ও বেসরকারী সংগঠনসমূহ উদ্যোগী ভুমিকা পালন করে, এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবি সমিতি (বেলা)’র একটি সফল আইনী লড়াইএ বিজয় নাগরিকদের জন্য দৃষ্টি আকর্ষনীয় বিষয় ছিল। কোয়ালিশন ফর এনভায়রণমেন্টাল এনজিওস (সেন) নামক একটি পরিবেশ-দারিদ্র সংশ্লিষ্ট সংগঠনের ব্যানারে কিছু অর্থায়ণ ভিত্তিক কার্যμম ছিল। নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে একদল প্রগতিশীল চিকিৎসক জনস্বা¯’্য সংকট নিরসনে পরিবেশ সংরক্ষণকে

মূল লক্ষ্য রেখে ডক্টরস ফর হেলথ এন্ড এনভায়রণমেন্ট (ডেন) নামক একটি চিকিৎসকদের সংগঠণের সূত্রপাত করেন।
তারপরও দেশের পরিবেশ সচেতনতা বলতে গেলে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে একেবারেই তলানীতে ছিল। বি”িছনড়ব ও মূলতঃ অর্থায়ন ভিত্তিক কিছু প্রয়াস দিয়ে দ্রুত অবনতিশীল পরিবেশ রক্ষায় কোন কার্যকর ভুমিকা পালন করতে পারছিলনা। নব্বই’র দশকের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশে ও প্রবাসে প্রায় একই সময়ে দুটি গূরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় তার একটি হ”েছ কয়েকজন প্রথিতযশা বাংলাদেশী সু-নাগরিকের পরি”ছনড়ব ও সু-পরিবেশের আকাংখায় সৃষ্ট ‘পরিবেশ রক্ষা শপথ (পরশ)’। আর দ্বিতীয়টি হ”েছ, আমাদের একগু”ছ প্রবাসী দেশপ্রেমিক বাংলাদেশীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন)। বেন নেতৃবৃন্দ বি”িছনড়ব ও ছোট ছোট উদ্যোগ সমূহকে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় প্ল্যাটফরমে পরিণত করার প্রস্তাব পেশ করেন, পরশের নেতৃবৃন্দ তাতে একমত পোষণ করেন – গঠিত হয় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নামক একটি জাতীয় আন্দোলন। পরশ ও বেন, পূর্বোল্লেখিত বেসরকারী উনড়বয়ন কর্মীদের কোয়ালিশন ফর এনভায়রণমেন্টাল এনজিওস (সেন) ও দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তিন বিদ্যাপিঠ বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় এর সচেতন শিক্ষকদের এর যৌথ উদ্যোগে এবং আরো ৭০টি ছোট বড় সামাজিক ও উনড়বয়ন সংগঠনের সমর্থনে আয়োজিত ‘প্রথম আন্তর্জাতিক বাংলাদেশ-পরিবেশ সম্মেলনে’র সিদ্ধান্ত হিসেবে ২০০০ সনের জুলাই মাসে বাপার যাত্রা শুরু। এই সম্মেলনে গৃহিত ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংμান্ত ঢাকা ঘোষনা ২০০০’ শুধুমাত্র বাপা কার্যμমের মূল নৈতিক ভিত্তিই নয়, তা এ’দেশের পরিবেশ বিষয়ক প্রথম এক যুগান্তকারী দলিল।
কর্মকৌশল: একটি প্রকট বাস্তবতার নিরিখেই বাপার জন্ম হয়েছিল। উদ্যোক্তারা সঠিকভাবেই ভেবেছিলেন যে, পরিবেশ রক্ষায় ব্যাপক জন-অংশগ্রহন ভিত্তিক, রাজনৈতিক দল নিরপেক্ষ, সম্পূর্ণ বিজ্ঞান মনষ্ক একটি সামাজিক আন্দোলনই সাফল্যের কার্যকর কৌশল হতে পারে। তাই বাপার জন্ম প্রμিয়াতেই মানুষের সু-পরিবেশ আকাংখা; দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবি, প্রবাসী, উনড়বয়নকর্মী ও বিজ্ঞানীদের যৌথ প্রচেষ্টায় একটি সঠিক সামাজিক উদ্যোগই মূল শক্তি হিসেবে নিয়োজিত ছিল। বিগত দুই দশক ধরে সকল মূহুর্তে এবং আজও বাপা তার সকল কাজেই এই জন-প্রয়োজনীয়তা, মাঠকর্মী ও মেধাবৃত্তির অংশীদারত্বকেই অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। এটিই বাপার প্রারম্ভিক ও চলমান অন্যতম প্রধান কর্মকৌশল।
কাজের কৌশল হিসেবে বাপা ও বেন প্রথম থেকেই প্রায় সকল বিষয়েই যৌথ পদক্ষেপ গ্রহন করে আসছে। বাপা-বেন ঐক্য একটি আদর্শ ¯’ানীয় সাংগঠনিক সফলতার মডেল। বাপার আন্দোলনের সবগুলোরই তাত্ত্বিক অব¯’ান নির্ধারণের প্রাথমিক কাজটি বেন করে থাকে, আর তার গণসমর্থন নিশ্চিত করা ও তা নিয়ে আন্দোলন পরিচালনা বাপা’র দায়িত্ব। বেন সদস্যদের চাঁদা বাপা’র আর্থিক সক্ষমতায়ও আংশিক কিš‘ নিশ্চিত ভুমিকা পালন করছে। একই সাথে বাপা সদস্যদের অর্থ, ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের মূল্যবান সময় এতে উৎসর্গিত হয়ে আছে।
জ্ঞান আহরণ: বাপা-বেন কর্ম কৌশলে প্রথম থেকেই পরিবেশগত জ্ঞান আহরণকে সর্বো”চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে, নচেৎ বিষয় সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবে আন্দোলন ভুল পথে পরিচালিত হতে পারে। অতএব বিগত বিশ বছরে বাংলাদেশের পরিবেশ বিষয়ে তিনটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক সার্বিক পরিবেশ সম্মেলন, সুন্দরবন সম্মেলন, জাতীয় পরিবেশ স্বা¯’্য সম্মেলন, এক স্বা¯’্য আন্দোলন, ভারতীয় আন্তঃনদী সংযোগ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন, টিপাইমুখ ড্যাম প্রতিরোধ সম্মেলন, জাতীয় নদী কনভেনশন, টেকসই কৃষি কনভেনশন, বিশেষ জ্বালানী সম্মেলন, আদিবাসী পরিবেশ সম্মেলন, জলবায়ু পরিবর্তন বিরোধী সম্মেলন, চলনবিল কনভেনশন, কয়লা কনভেনশণ, বড়াল নদী রক্ষা সম্মেলন, নগরায়ন সম্মেলন, পলিথিন ও প্লাস্টিক বিষয়ক কনভেনশন, সিলেট বিভাগীয় আদিবাসী পরিবেশ সম্মেলন, দক্ষিণ এশীয় পানি সম্পদ সম্মেলন, সুন্দরবন রক্ষা কনভেনশন, পরিবেশ আন্দোলন সংগঠন ও বাস্তবায়ন সমস্যা সম্মেলন, টেকসই উনড়বয়ন ও পরিবেশ সম্মেলন; বন্যা, জলাবদ্ধতা ও ভুমিধ্বস সম্মেলন, বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা সম্মেলন, পরিবেশ আন্দোলন ও রাজনীতি অর্থাৎ সর্বমোট ২৬টি বৃহৎ বা মাঝারী বিশেষজ্ঞ ও জনতার সমাবেশ; অসংখ্য সেমিনার -আলোচনা-মাঠ পর্যায়ের কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে বাপা-বেন বায়ু ও শব্দ দূষণ, নদী রক্ষা, নগরায়ন, জ্বালানী, পানি ও

স্যানিটেশন, পরিবেশ-স্বা¯’্য, খাল-বিল-হাওর-বাওর-জলাশয়, গাছ-বন-আদিবাসী, পলিথিন-প¬াষ্টিক, নিরাপদ খাদ্য-পানীয়, কৃষি, বর্জ্য ব্যব¯’াপনা, জলবায়ু পরিবর্তন, নারী ও পরিবেশ, পশু-পাখী-জীব-বৈচিত্র, মাঠ-পার্ক, উপকুলীয় পরিবেশ, ঐতিহ্যবাহী ¯’ান ও ¯’াপনা, পরিবেশগত সংকটাপনড়ব এলাকা, পরিবেশ অর্থনীতি, প্রভৃতি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ; নদী-জ্বালানী-বন-হাসপাতালবর্জ্য-টেকসই কৃষি-শব্দ দূষণ-জলবায়ু পরিবর্তন-আদিবাসী পরিবেশ, চলনবিল, সুন্দরবন ইত্যাদি বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন ও তার ভিত্তিতে আন্দোলন পরিচালনা করে আসছে। বাপা পরিচালিত কয়লা ভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিরোধী আন্দোলন বাপা’র এক অনবদ্য কাজ। এর মধ্য দিয়ে কয়লার পরিবেশ ও জনস্বা¯’্য বিধ্বংসী ১৩টি প্রমানক দলিল তৈরী হয়েছে যার ১২টি বিশ্ব খ্যাত জ¦ালানী বিজ্ঞানীরা প্রণয়ন করেছেন। বাংলাদেশের পরিবেশ সংμান্ত সর্বো”চ সংখ্যক নীতি ভিত্তিক দলিল শুধুমাত্র বাপা-বেন সম্মেলনেই তৈরী হয়েছে। এ সকল অনবদ্য দলিলের সবকটিই সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে প্রেরণ করা হয়েছে, দেশবাসীর উদ্দেশ্যে প্রচারিত হয়েছ্।ে
বিশেষজ্ঞ ও সামাজিক সংযুক্তিঃ এসকল অনুষ্ঠানেই বাপা-বেন সকল সময় বিষয়-ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ, ভুক্তভোগী সম্প্রদায় ও সকল আগ্রহী সাধারণ মানুষের অংশগ্রহন নিশ্চিত করে আসছে। তাই যে কোন বিষয়ে বাপা-বেন এর নীতিগত অব¯’ান সবসময়ই জন সম্পৃক্ত ও স্বকীয়তাপূর্ণ থেকেছে। মুক্ত প্রবাহ ভিত্তিক বাপা নদী রক্ষা আন্দোলন জাতীয় পরিসর ছাড়িয়ে অনেক আগেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপ্তি লাভ করেছে। আদিবাসী পরিবেশ আন্দোলন বিশেষ করে পাহাড়ী এলাকায় ভিনড়বমাত্রার গণ-আ¯’া অর্জন করেছে। বাপা’র নগরায়ন আন্দোলন, দেশবাসীর নগর-ভাবনায় ভিনড়ব মাত্রা যোগ করেছে। টেকসই কৃষি, সমন্বিত জ্বালানী ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমণে বাপা নীতি সকলের জন্যই আগ্রহ উদ্দীপক।
বাপা-বেন যখনই কোন নীতি নিয়ে কথা বলে তা হয় নিখাদ বিজ্ঞান ভিত্তিক যুক্তি সম্পনড়ব ও সংকট উত্তরণের সবচেয়ে প্রজ্ঞাবান প্রস্তাবনা। আমাদের অভিজ্ঞতা হ”েছ, সময়ের দাবী ভিত্তিক সঠিক বিষয় নির্ধারণ, পরি¯ি’তির বিস্তারিত তথ্য লাভ, কৌশল প্রণয়ন, তার বাস্তবায়নকল্পে আন্দোলন সংগঠিত করার বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রμিয়ার পূর্ণাঙ্গ চর্চা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহনে সহায়ক হয়, আন্দোলনও জনপ্রিয় ও জনসম্পৃক্ত হয়। সফল সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এর বিকল্প নাই। আর বাংলাদেশে এ প্রμিয়াটিকে ধারাবাহিকভাবে মেনে চলার ক্ষেত্রে বাপা-বেনই সম্ভবত প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মাঠ পর্যায়ে বাপা সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত একটি সংগঠন, ঐকমত্য ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহন তার একটি অন্যতম প্রধান কর্মকৌশল।
সাংগঠনিক দৃষ্টিভঙ্গী ও আন্তঃসম্পর্ক: বাপা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের গণ-সম্পৃক্ত সামাজিক আন্দোলনের নেতৃ¯’ানীয় সংগঠন। তবে এটি বাপা কর্মীদের কোন ভাবনা বা আলোচ্য বিষয় বা আত্মতৃপ্তির বিষয় নয়। বরং বাপা ও বেন সবসময়ই তাদের কাজের আতড়বসমালোচনা মূলক মূল্যায়ন করে থাকে। পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে বাপা সারা দেশের মানুষের ভরসা¯’ল, এ সংগঠনটি এদেশের মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা ও উনড়বয়ন প্রচেষ্টায় প্রবল প্রয়োজনভিত্তিক এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, তাতে কোন সন্দেহ নেই। বাপা সদস্যদের মন-মানসিকতা, সাংগঠনিক মননশীলতা ও কার্যμমে তার লক্ষ্য অর্জনের আকুতি সকল সময়ই প্রকট। বিষয় নির্ধারণ, সততা, কাজের ধরণ, স্বকীয় বৈশিষ্ট, গণসম্পৃক্তি ও আন্তরিকতার বিচারে চলমান সামাজিক আন্দোলনসমূহে বাপা নিঃসন্দেইে অগ্রণী অব¯’ানে রয়েছে। একই কারণে বাপা কার্যμম সম্পূর্ণভাবেই দলীয় রাজনীতির সংস্পর্শমুক্ত, বাপা রাজনৈতিক দল নিরপেক্ষ। তবে বাপা সদস্যগন নিঃসন্দেহে রাজনীতি সচেতন; তারা পংকিল, পশ্চাৎমূখী, গণবিরোধী, শোষণমূলক, দূর্ণীতিগ্র¯’ রাজনীতি বিষয়ে যথেষ্ঠ সতর্ক এবং সৎ-পরিবেশবান্ধব-দেশপ্রেমিক রাজনীতির প্রতি ইতিবাচক। কারণ আমরা যাই বলি বা করি না কেন, শেষ বিচারে সংরক্ষিত পরিবেশ রাষ্ট্র গঠনের পরিপূরক বিষয়, আর রাজনীতি ও রাষ্ট্রযন্ত্রই পরিবেশ রক্ষায় সিদ্ধান্ত গ্রহন এবং বাস্তবায়নকারী সঠিক ও শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ।
বাপা ও সরকার: বাপা সরকারের কোন অংশ নয়, বাপা সরকার বিরোধী কোন সংগঠনও নয়। তাই ক্ষেত্রবিশেষে বা অনেক বিষয়েই বাপা রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সাথে পরামর্শমূলক ও ইতিবাচক অংশীদারিত্বে যুক্ত হয়ে থাকে।

বাপা’র জন্ম থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে আমন্ত্রিত হলে যে কোন পরিবেশ সংশ্লিষ্ট বিষয়েই সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করে আসছে। নীতি নির্ধারণী কাজে বাপা সরকারের ডাকের অপেক্ষায় থাকে, কিš‘ সেই ডাক সবসময় আসেনা। সরকারের কোন কোন দপ্তর বাপাকে অনেক কিছুতেই এড়িয়ে চলতে পছন্দ করে বা নাম সর্বস্ব অন্য কোন সংগঠনকে যুক্ত করতে চায়, তাতে তাদের কোন লাভ হয় কি না জানিনা, তবে রাষ্ট্রীয় সঠিক নীতি বা কাজ ক্ষতিগ্র¯’ হয়। পলিথিন ব্যাগ, নদী, নগরায়ন, ড্যাপ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, শহুরে অগিড়বকান্ড, দূর্যোগ ব্যব¯’াপনা, জ্বালানী, বন সংরক্ষণ, আদিবাসী পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, ট্যানারী অপসারণ, শহুরে জলাবদ্ধতা, নগরায়ন কৌশল, পরিবেশ বান্ধব রাষ্ট্রীয় বাজেট, ¯’ায়িত্বশীল উনড়বয়ন, রামপাল কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ, সুন্দরবন সুরক্ষা, বন্যা, জলাবদ্ধতা, ভূমি-ধ্বস, নিরাপদ খাদ্য, ইত্যাদি বিষয়ক সরকারী সভাসমূহে বাপা গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শমূলক মতামত প্রদান করেছে।
বিগত ১৯ বছরে পরিবেশ ও বন সহ বেশ কয়টি মন্ত্রণালয়ের বিভিনড়ব নীতি ও আইন বিষয়ক ২০ টি কমিটি বা সভায় বাপার সμিয় অংশগ্রহন ছিল। বাপা সরকারী নদী টাস্কফোর্স ও তার সকল উপ-কমিটিতে এক আন্তরিক, সμিয় ও উ”চকন্ঠ সদস্য ছিল। জাতীয় নদী কমিশনের সাথেও বাপার সুসম্পর্ক রয়েছে। সারা দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারী উদ্যোগে নদী রক্ষা কমিটি তৈরী হ”েছ, আর তাতে বাপা’র প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এসবের মাধ্যমে বাপা নদী বিষয়ে তার মৌলিক নীতিগত অব¯’ান প্রকাশ ও প্রয়োগে কর্মতৎপর ও অনেক ক্ষেত্রেই সফল। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন বিরোধী ১০ সদস্যের নিগোসিয়েশণ টিমের বেসরকারী সদস্য হিসেবে বাপা সাধারণ সম্পাদক পাঁচ বছর (২০০৯ থেকে ২০১৩) যাবৎ কাজ করেছেন, চারটি জাতিসঙ্ঘ জলবায়ু সম্মেলনে যোগদান করেছেন, সেখানে তার কাজই ছিল সরকারের নীতিগত অব¯’ান ও কার্যμমের পর্যবেক্ষণ ও মত প্রদান। একই সাথে সরকার বহির্ভূত সকল গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের সাথেও বাপার সম্পর্ক সকল সময়ই ভাল ও পরস্পরের জন্য সহযোগীতামূলক। এর মধ্য দিয়ে বাপা তার মাঠের আন্দোলনের বক্তব্য ও দাবীসমূহ স্ব-ভাষাতেই প্রয়োজনমত রাজনৈতিক দলসমূহের নির্বাচনী ম্যানিফেষ্টো, অনুষ্ঠান, দ্বি-পক্ষীয় বা বহু-পক্ষীয় বৈঠকে উপ¯’াপন করে আসছে। সরকার ও রাজনীতিকদের সাথে বাপার সবটা কাজই একটি একটি দৃঢ় অধিপরামর্শমূলক ভূমিকা পালনের লক্ষ্যে পরিচালিত, এখানে বাপার একটি ‘ঐক্য ও সংগ্রাম’ এর কৌশল কার্যকর রয়েছে। এ সকল কাজেই তাত্ত্বিক দিকসমূহ চিহ্নিত করণে বেন তার প্রয়োজনীয় ভুমিকা পালন করেছে।
উনড়বয়ন ও বাপা: প্রায় ১৭ কোটীর অধিক মানুষের এই দেশ শুধুমাত্র পরিবেশ রক্ষার আপ্তঃবাক্যে সন্তুষ্ট থাকতে পারেনা, তার যুগোপযোগী উনড়বয়নও প্রয়োজন। বাপা-বেনের মতে সে উনড়বয়নটুকু শর্তহীন বা নির্দয় ব্যবসা নির্ভর হলে হবেনা, তা হতে হবে পরিবেশ বান্ধব। বাপা যেমন তার নামটিকে উনড়বয়ন-বিরোধী সংগঠনের তালিকা বহির্ভুত রাখতে চায়, তেমনি শুধুমাত্র জিডিপি বৃদ্ধির অন্ধ তাড়নায় দেশের পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংস করে অবকাঠামো নির্মানের সকল মোহ থেকেও দেশকে মুক্ত রাখতে চায়। বাপা নীতি ও কার্যμম বিশ্ববাসী ও জাতিসঙ্ঘ গৃহিত টেকসই উনড়বয়ন লক্ষ্যমালার সাথে সম্পূর্ণভাবে সামজ্ঞস্যপূর্ণ। বলা যায়, জাতিসঙ্ঘ টেকসই উনড়বয়ন লক্ষ্যমালা নির্ধারণের ১৯ বছর আগে থেকেই বাপা একই নীতি ভিত্তিক উনড়বয়নের জন্য প্রচারাভিযান চালিয়ে আসছে।
বাপা ও সামাজিক আন্দোলণ: সামাজিক আন্দোলনের মাঠেও বাপা-বেন একই রকম ‘ঐক্য ও সংগ্রাম’ এর কৌশল মেনে চলার পক্ষপাতি। সারাদেশের শত শত বেসরকারী, সামাজিক, জনকল্যানকর, পরিবেশ ও উনড়বয়নকামী সংগঠন; বিভিনড়ব সরকারী-সেরকারী বিশ্ববিদ্যালয়, পেশাজীবি সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান বাপার দীর্ঘ ১৯ বছর কালের অগ্রযাত্রার আন্তরিক ও সহায়ক সাথী। সরকারী-বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বিশেষতঃ বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ-বিদ্যালয়সমূহ বাপার সকল সম্মেলন ও পরিবেশ অলিম্পিয়াড কর্মসূচিতে সাংবৎসরিক সহযোগী। বাপা ব¯‘তঃ বেসরকারী সংগঠন সমাজে যথেষ্ঠ বন্ধু বৎসল ও সহায়ক সংগঠন হিসেবে সমাদৃত। আর আগেই বলেছি – দেশপ্রেমিক, জনস্বার্থ সচেতন প্রবাসী বাঙ্গালীদের প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন)’ বাপার প্রায় সার্বক্ষনিক সহযোদ্ধা, পরামর্শক ও সার্বিক সহায়তাকারী বন্ধু-সংগঠন। বাপা প্রμিয়ায় এহেন নিখাদ দেশপ্রেমে উজ্জ্বীবিত ও উ”চশিক্ষালোকে আলোকিত স্ববাসী-প্রবাসী ব্যক্তি, সংগঠন ও সামাজিক আন্দোলন কর্মীদের এই অভূতপূর্ব সমন্বয় এখন শুধু বাংলাদেশ নয়, অন্যান্য

দেশেও বিরল। পরিবেশ সংরক্ষণ ও উনড়বয়ন প্রয়াসে এই নিঃস্বার্থ, মহতী ও অবিরাম ঐক্যতান বাপার একটি অনন্য অনুকরণীয় কর্মকৌশল। এই ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে সারা দেশের চার শতাধিক বেসরকারী সামাজিক সংগঠন বাপা-বেন এর সাথে যুক্ত থাকছে।
পরিবেশ সংশ্লিষ্ট বেশ কয়টি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নাগরিক আন্দোলন বা সংগঠনের সাথে বাপা’র সম্পর্ক ও কার্যμম রয়েছে। বৃহৎ আন্তর্জাতিক সংগঠন সমূহও প্রয়োজনমত বিশেষ করে নীতিগত বিষয়ে বাপার সহায়তা গ্রহন করেন। আমরাও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের নৈতিক, তত্ত্বগত ও কৌশলগত সহায়তা পেয়ে থাকি।
আত্মনির্ভরশীলতাঃ সবাই জানেন, বাপা কোন ফান্ডিং পদ্ধতি সমর্থিত অর্থ-সংগ্রাহক সংগঠন নয়। দেশী-বিদেশী, সরকারী-বেসরকারী দাতাগোষ্ঠী, কর্পোরেট, পরিবেশ সংহারক এবং সাধারণভাবে অনৈতিকতাপূষ্ট যে কোন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কোন আর্থিক বা বৈষয়িক সহায়তা গ্রহন একেবারেই বাপার নীতি বিরুদ্ধ। বাপার শত শত সদস্যের অবদান ও শ্রম সম্পূর্ণভাবেই স্বে”ছাসেবী ও অলাভজনক চেতনা নির্ভর। সদস্যদের নিজস্ব অর্থায়ন, সৎ পরিবেশ প্রেমিক মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের আন্তরিক স্বে”ছা-সহায়তা, প্রবাসী ও স্ববাসীদের নিজ আয় থেকে প্রদত্ত সহযোগীতাই বাপার অর্থ-প্রাপ্তির প্রধান উৎস। পরিবেশ রক্ষার কাজে দেশব্যাপি বাপা কর্মীদের নিজ পকেটের মূল্যবান অর্থ খরচের চর্চা এবং দেশী বিদেশী প্রখ্যাত দাতাগোষ্ঠীর অনেক অর্থায়ন-প্রস্তাব বাপা কর্তৃক সবিনয় প্রত্যাখান অনেকের কাছেই এখনও অবিশ্বাস্য বিষয়। প্রতিষ্ঠালগড়ব থেকে শুরু করে আজ অবধি বাপা তার এই নীতিটিকে একটি স্বদেশ-সেবার মডেল হিসেবে দাঁড় করাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকার কারনে একটি অবিস্মরণীয় কৃতিত্বের অধিকারী হতে সক্ষম হয়েছে। কারণ বাপার মতে সামাজিক আন্দোলন স্ব-নির্ভর না হলে কোনμমেই সার্বভৌম ও জন-স্বার্থমূখী হতে পারেনা। বাপা কর্মীদের পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে অংশগ্রহন প্রμিয়াটি তাদের মানসিক সদি”ছা, কায়িক পরিশ্রম, অর্থ খরচ ও মূল্যবান সময়ের নিঃস্বার্থ বিনিয়োগ নির্ভর। বাপা কর্মপদ্ধতি, স্বে”ছাপ্রণোদনার সর্বো”চ সদ্ব্যবহার এবং উ”চ নৈতিকতায় পরিপুষ্ট যা দৃঢ়তা ও আন্তরিকতার বিচারে অতুলনীয়।
বাপার মতে ‘অর্থ মানেই অনর্থের মূল’ নয়, তবে অধিক অর্থ ও তার অপব্যবহার অনেক অনর্থের মূল হয়ে উঠতে পারে। অতএব বাপার অর্থসংগ্রহ প্রμিয়াটি অঢেল বিত্তলাভের প্রণোদনা নির্ভর নয়, সংযমী প্রয়োজনীয়তা ভিত্তিক ও সীমিত তহবিল সৃষ্টির লক্ষ্যে পরিচালিত। বাপা একটি সদস্যভিত্তিক সংগঠন, বাপা সকল মানুষেরই প্রতিষ্ঠান। অতএব কোন বৃহৎ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সশব্দ বড় মাপের দান নয়, সকল বাপা সদস্য ও দেশের সর্বস্তরের নাগরিকদের স্বপ্রণোদিত ছোট ছোট আন্তরিক আর্থিক বা বৈষয়িক সহায়তা বাপা কর্তৃক সু-সমাদৃত। এ ক্ষেত্রে বাপার সহযোগী বেন এর সদস্যবৃন্দ তাদের পকেটের অর্থ দিয়ে একটি পরিমিত অর্থায়ন নিয়মিত করে থাকেন। বাংলাদেশের পরিবেশ সংরক্ষণে বেন এর এই মহত্ব বাপার টিকে থাকার গ্যারান্টি। একটি মৌলিক সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদী ন্যূনতম আর্থিক স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে, কয়েক বছর হল বাপা একটি এন্েডামেন্ট তহবিল গঠন করেছে। তাতে স্বল্প সংখ্যক মানুষের বৃহৎ অংকের অর্থ সহায়তা নয়, বরং ব্যাপক জনগোষ্ঠীর নিকট থেকে ক্ষুদ্র বা মাঝারি সহায়তা প্রাপ্তিই বাপার মূল আকাঙ্খা। যেনতেন ভাবে অনেক অর্থ সংগ্রহ করে ধনী সংগঠনে পরিনতি হওয়া বাপার কোন নীতি নয়। কারণ বাপা জানে অধিক অর্থ অনর্থেও মূল হতে পারে। সবটা মিলে বাপার একটি লিখিত অনন্য আর্থিক নীতিমালা রয়েছে যা বাপা দৃঢ়ভাবে মেনে চলে। অর্থায়ন প্রশেড়ব নীতিনিষ্ঠতা যে কোন সংগঠনেরই শক্তির পরিচায়ক। বাপা সম্ভবতঃ এ ক্ষেত্রে প্রবল নীতিসিদ্ধ শক্তিধর একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। একই সাথে বাপার অর্থ-খরচ প্রμিয়াও বিশুদ্ধ, স্ব”ছ ও দিন-ভিত্তিক হিসাব পদ্ধতি নির্ভর। বাপার যেকোন সদস্য তার পরিচয় দিয়ে যে কোনদিন বাপা দপ্তরে যেয়ে সংগঠনের সর্বশেষ আর্থিক লেন-দেন এর হিসাব দেখতে পাবেন। এক্ষেত্রেও বেন এর দৃঢ় নিরীক্ষণমূলক সহযোগীতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছে।
গণ-সম্পৃক্তিঃ বাপা’র আরেকটি স্বকীয়তা হ”েছ, সদস্য-অসদস্য নির্বিশেষ যে কোন মানুষ এ সংগঠনের কাজে শরীক হতে পারেন। বাপার সদস্য নন এমন কোন ব্যক্তির বাপার কাজে সাংগঠনিক রীতি-সিদ্ধ সামান্য অংশগ্রহনকেও

সর্বো”চ সম্মান ও মূল্যায়ন করা হয়। বাপার কাজে একক উদ্যোগের চেয়ে অংশীদারিত্ব-কৌশল অধিক সমাদৃত। কেন্দ্রীয় বাপার মাসিক গড় ন্যূনতম কর্মসূচির সংখ্যা ১৫ থেকে ২০টি। বর্তমানে বিভিনড়ব বিষয় ভিত্তিক বাপার সর্বমোট ৬৮ টি বিষয় ভিত্তিক কমিটি রয়েছে। বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে: নদী ও খাল, জলাশয়, নগরায়ন ও নগর প্রশাসন, খনিজ সম্পদ ও সমন্বিত জ্বালানী, নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তা অধিকার, পরিবেশ স্বা¯’্য ও জনসংখ্যা, বায়ু শব্দ আলো ও দৃষ্টি দূষণ, উন্মুক্ত ¯’ান ও পার্ক, অর্থ বানিজ্য ও উনড়বয়ন, বর্জ্য ব্যব¯’াপনা, আদিবাসী পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও দূর্যোগ ব্যব¯’াপনা, টেকসই ভূমি ব্যব¯’াপনা ও কৃষি, পানি স্যানিটেশন ও নিষ্কাশন, ঘরোয়া পরিবেশ ও জেন্ডার, পরিবেশ সংকটাপনড়ব এলাকা ও জীববৈচিত্র, উপকূল ও সামুদ্রিক পরিবেশ, বন ও বন্যপ্রাণী, নিরাপদ সড়ক; শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, গণমাধ্যম ও প্রচার, এনডোমেন্ট তহবিল, আইন, নিউজ লেটার ও প্রকাশনা, পরিবেশ অলিম্পিয়াড, সম্পদ ও অডিট, জরুরী রিলিফ সেল, নীতি মূল্যায়ন ও প্রস্তাবনা, সামাজিক পরিবেশ ও সংস্কৃতি, বাপা উপদেষ্টা পরিষদ ও বাপা ন্যায়পাল – এসবে যুক্ত সাড়ে তিন শতাধিক পরিবেশ কর্মীর অনেকেই বাপার সদস্য নন। কিš‘ আমাদের এসব কমিটিতে আরো এর দ্বিগুন সংখ্যক পরিবেশ কর্মীকে যুক্ত করার ব্যব¯’া রয়েছে। বাপা লোক সংকটে রয়েছে; তা নিরসনে বাপা-বেন আন্তরিক নাগরিকদের স্বাগত জানা”েছ।
বহুদিন বাপার কোন শাখা খোলার সিদ্ধান্ত ছিলনা। অনুমতি লাভের পর গত ১০ বছরে ঢাকার বাইরে বাপার ৩৫টি আঞ্চলিক শাখা খোলা হয়েছে। আরো ১০টি শাখা গঠন প্রμিয়াধীন রয়েছে। শাখা খোলা বিষয়ে বাপা একটি চরম সংরক্ষণবাদী নীতিতে চলে, কারণ শাখার কাজ বা নেতৃত্ব সঠিক না হলে তা শেষ পর্যন্ত ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াতে পারে, ২/৩টিতে ছোটখাট সংকটও রয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিনড়ব জেলায় কিছু ত্যাগী ও পরীক্ষিত সামাজিক কর্মী বাপা জাতীয় কমিটির সদস্য পদ লাভ করেছেন, তাদের মাধ্যমে বুঝে শোনে বাপার শাখা খোলার প্রμিয়া চলমান রয়েছে। শাখার প্রশেড়ব সবসময়ই বেন সাবধানী ও সংরক্ষণমূলক নীতি অবলম্বনের কথা বলে এসেছে, বাপা কিছুটা দ্রুততা অবলম্বন করতে যেয়ে কিছু বাপা শাখা সংকটাপনড়ব হয়েছে।
আগেই বলেছি, দেশব্যাপি ছয় শতাধিক ছোট-বড় সামাজিক সংগঠন বিভিনড়ব ইস্যুভিত্তিক বাপা পরিচালিত কার্যμমে যুক্ত রয়েছে। তাদের সহায়তায়ই বাপা তার জাতীয় নদী আন্দোলন, আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বিরোধী আন্দোলন, টিপাইমূখ বিরোধী আন্দোলন, জলবায়ু পরিবর্তন বিরোধী প্রচার অভিযান, জলবায়ু পরিবর্তন বিরোধী সামাজিক ঐক্য, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন বিরোধী নেট ওয়ার্ক, আদিবাসী পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন, পলিথিন ও প¬াষ্টিক বিরোধী জোট, চলনবিল রক্ষা আন্দোলন, বড়াল রক্ষা আন্দোলন, হাওর রক্ষা আন্দোলন, এক স্বা¯’্য বাংলাদেশ আন্দোলন, জাতীয় স্বা¯’্য অধিকার আন্দোলন, চিকিৎসা ভোক্তা অধিকার ফোরাম, পানি ও স্যানিটেশন নেটওয়ার্ক, পানির বাণিজ্য-করণ বিরোধী সামাজিক ঐক্য, জাতীয় বিল রক্ষা আন্দোলন, বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলন, বুড়িগঙ্গা রিভার কিপিং কর্মসূচি, ওসমানী উদ্যান রক্ষা নাগরিক কমিটি, নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগরায়ন জোট, ধানমন্ডী মাঠ রক্ষা আন্দোলন, সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি, নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক সামাজিক ঐক্য, এসডিজি বাস্তবায়ন, উত্তম দেব নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, বাংলাদেশ কয়লা নেটওয়ার্ক প্রভৃতি ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন পরিচালনা বা অংশীদারিত্ব করে আসছে।
এসব তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের পাশাপাশি বাপায় সকল প্রকার বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবি, পেশাজীবি, বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ, আইনজীবি, ¯’পতি, নির্বাহি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী প্রভৃতি মেধাবৃত্তিক ব্যক্তিবৃন্দও যুক্ত রয়েছেন। আসলে বাপার আন্দোলনে যুক্ত হতে বা সহায়তা করতে বাপার সদস্যপদ গ্রহন কোন পূর্বশর্ত নয়। উপরোল্লেখিত ৬৮টি বাপা কমিটির অন্ততঃ এক তৃতীয়াংশ পদে বাপা বহির্ভূত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার নিয়ম রয়েছে। প্রতিটি কমিটিতে ১৫ জন করে মোট এক হাজার আগ্রহী মানুষের পরিবেশ কাজের সুযোগ করে রাখা হয়েছে। প্রায় দেশের সকল মানুষের সম্পৃক্ততায় সামাজিক আন্দোলন সংগঠনের একটি জাতীয় প্ল্যাটফরম হিসেবে বাপাকে গড়ে তোলাই প্রধান আমাদের লক্ষ্য। অতএব এর দুয়ার সকল বাপা বহির্ভূত আন্তরিক পরিবেশ কর্মীদের জন্য খোলা রাখাকে বাপা-বেন যৌক্তিক কৌশল বলে মনে করে।

দেশীয় উদ্যোগের পাশাপাশি বাপা ভারতের মণিপুর ভিত্তিক টিপাইমূখ বাঁধ বিরোধী আঞ্চলিক ঐক্য, গৌহাটি ভিত্তিক আরণ্যক, ম্যানিলা ভিত্তিক পরিবেশ ও গনস্বার্থমূখী বেটার এইড মুভমেন্ট ও আন্তর্জাতিক কয়লা নেটওয়ার্ক, লন্ডন ভিত্তিক বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন বিরোধী ক্যাম্পেইন, সানফ্রানসিস্কো ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিভার্স, নিউইয়র্ক ভিত্তিক ওয়াটার কিপার এলায়েন্স, আর্থ জাষ্টিজ, ৩৫০.অর্গ, পেনাং ভিত্তিক প্যাষ্টিসাইড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক, দিল্লী ভিত্তিক ওয়াটার ওয়াচ নেটওয়ার্ক, মহিশূর ভিত্তিক ন্যাশনাল এলায়েন্স ফর পিপলস মুভমেন্টস, অ্যামস্টারডাম ভিত্তিক বোথ এন্ডস, যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক পিস এন্ড জাষ্টিস এবং বাংলাদেশে কর্মরত কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংগঠনসহ ১৮টি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নাগরিক উদ্যোগেরও সμিয় অংশীদার যাদের মাধ্যমে নদী, জলাশয়, বন, জলবায়ু, আর্থিক বিনিয়োগ ইত্যাদি বিষয়ে আন্তর্জাতিক সরকারী সম্পর্কের পরিপূরক আন্তঃজনতা ঐক্যের প্রμিয়া অব্যাহত রেখেছে। বাপা সাধারণ সম্পাদক ইন্টারন্যাশনাল রিভার্স এর দক্ষিণ এশীয় পরামর্শক বোর্ড ও আন্তর্জাতিক কয়লা নেটওয়ার্ক এর বৈশ্বিক কমিটির অন্যতম সদস্য। পরিবেশ যেহেতু শুধু রাষ্ট্রীয় বিষয় নয়, অতএব তার সংকট সমাধানে এই সার্বিক আন্তর্জাতিক ঐক্যবদ্ধ জন-প্রয়াসও বাপা কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। বৈদেশিক নেটওয়ার্ক সৃষ্টি ও ব্যব¯’াপনায় বেন এরও গূরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বাপা ও জনতাঃ বাপার সর্বোৎকৃষ্ট সম্ভাবনা ও শক্তির উৎসটি হ”েছ দেশের সকল স্তরের মানুষের আন্তরিক সহমর্মিতা ও সমর্থন। মানুষ বাপার শুভাকাংখী, বাপা একটি জনপ্রিয় সংগঠন। তার অন্যতম প্রধান প্রতিফলন আমরা দেখি সমাজের সকল মানুষের মধ্যে। জাফলং-শ্রীমঙ্গল পাহাড়ী বন থেকে সেন্টমার্টিন,কক্সবাজার,কুয়াকাটা,বরগুণা,নড়াইল,সুন্দরবন,কক্সবাজার,মহেশখালী,মাতারবাড়ী,সেন্টমার্টিনস,রাঙ্গামাটি,খাগড়াছড়ি,শ্রীমঙ্গল,জাফলঙ,তাহিরপুর-নীলফামারী,চলন বিল – সকল ¯’ানেই বাপার পদচারণা রযেছে। সারা দেশের গ্রামীণ-শহুরে, বাঙ্গালী-আদিবাসী মানুষের মধ্যেও বাপা একটি সুপরিচিত, নির্ভরযোগ্য, আন্তরিক প্রয়াসের নাম। পরিবেশ বিপর্যয় ও তদ্বিষয়ক জনদূর্ভোগ লাঘবে প্রশাসনিক উদাসীনতা, অবহেলা, অনিয়ম, দূর্ণীতি, ব্যর্থতা প্রতিদিনই অধিক সংখ্যার মানুষকে বাপার দিকে ঠেলে দি”েছ। অনেক টেলিফোন ও ই-মেইল প্রতিনিয়ত বাপায় আসছে তাদের ¯’ানীয় পরিবেশ সংকটের সমাধানের দাবী নিয়ে। বড়াল রক্ষা আন্দোলন ও বাপা-বেন ও এর ডাকে রাজশাহীর বড়াল নদী রক্ষায় ২ লক্ষাধিক গ্রামীণ মানুষ ২২০ কিমি দীর্ঘ্য নদী পাড়ে অবি”িছনড়ব মানববন্ধনও করেছে।
বাপা-বেন এর মূল কর্মকৌশল হ”েছ সংকট লাঘবের লক্ষ্যে মানুষ, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, সরকার এমনকি পরিবেশ বিরোধীদের সচেতনতা বৃদ্ধি। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ তার সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ প্রদর্শন করছে অভিযোগ প্রেরণের মাধ্যমে। আর বাকী সবাই সকল বিষয় জেনেও না জানার ভান করছেন, স্বার্থসিদ্ধি ভঙ্গের ভয়ে তারা জেগেও ঘুমিয়ে আছে। তবে জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাত্রাটি μমবর্ধমান বিধায়, বাপা অদূর ভবিষ্যতে সারাদেশে, বাস্তব প্রয়োজনে, জনমানুষের স্বে”ছা অংশগ্রহনে সিক্ত একটি প্রবল গণ আন্দোলনের প্রত্যাশা অবান্তর মনে করছেনা। আমার বিশ্বাস, বেশী দিন দূরে নয় যখন দেশের সাধারণ নির্বাচনে ‘পরিবেশ সংরক্ষণ” একটি একক শক্তিশালী জনদাবীতে পরিণত হবে।
বাপা ও গণমাধ্যমঃ দক্ষিণ এশীয়ার ত্রিদেশীয় এক গবেষণায় দেখা যায়, পরিবেশ সংরক্ষণের সংগ্রামে এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের তুলনায় বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ভূমিকা অপেক্ষাকৃত দূর্বল। তারপরও সকল পর্যায়ের সংবাদকর্মীগণই বাপার অগ্রণী বন্ধু। গণমাধ্যমের সকল মানুষই বাপার সুহৃদ, বন্ধু, সমর্থক ও এক অর্থে এক একজন দৃঢ় কর্মী। একটি বিষযে আমি নিশ্চিত, প্রতিষ্ঠা লাভের প্রথম থেকেই বাপার সকল প্রচেষ্টায় আমাদের পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন, রেডিওর কর্মী ও নির্বাহিগন যে অকুন্ঠ সমর্থন প্রদান করে এসেছেন তা প্রধানতঃ দেশ ও পরিবেশ বিষয়ে তাদের শুভ চেতনা, সহ-মর্মিতা ও দায়বোধ থেকে উৎসারিত; শুধুমাত্র পেশাগত দায়িত্বপালন নয়। অনেক গণমাধ্যমের মালিকপক্ষ পরিবেশ বিনষ্টকারী অব¯’ানে থাকলেও তাদের সংবাদকর্মীগণ অনেক চাপের মূখেও বহুলাংশে বাপার পক্ষেই তারা কাজ করেছেন ও করছেন। শক্তিশালী ও জনপ্রিয় বাপা তাদের সাহস ও নিরাপত্তার অন্যতম উৎস। আমাদের দেশের বাস্তবতায় যে কোন সামাজিক আন্দোলনই তার সহযোদ্ধা হিসেবে দেশের গণমাধ্যমকে পাশে পাওয়ার

প্রচেষ্টা গ্রহন একটি অবশ্যকরণীয় বিষয়। বাপা এ বিষয়ে প্রবলভাবে আন্তরিক। বিষয় ভিত্তিক তাত্ত্বিক আলোচনা ও বিতর্ক পরিচালনায় বেন এর উ”চ শিক্ষিত বিশেষজ্ঞদলের নিয়মিত সাহসী ও শক্তিশালী ভূমিকা বাপার বৃহৎ ভরসা¯’ল। এক কথায় পরিবেশ রক্ষার সংগ্রামে সংবাদ কর্মীরাই বাপার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বন্ধু।
সীমাবদ্ধতা ও সমস্যাঃ আর দশটি সংগঠনের মত বাপার নিজস্ব দূর্বলতা, দৈন্যতা, ব্যর্থতা, অক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতাও কম নয়। পরিবেশ লুন্ঠনে সংঘবদ্ধ শক্তিশালী মহলের উপ¯ি’তি ও প্রশাসনিক উদাসীনতার বিপরীতে যে কোন সামাজিক সংগঠনে কম বেশী ব্যর্থতার স্বীকার হবে, এটাই বাস্তবতা। আমাদের মত দেশে একটি সামাজিক সংগঠনের উ”চ নৈতিকতা অর্জন সহজ বিষয় নয়, কারণ নৈতিকতা প্রশেড়ব দৃঢ়তা যে কোন সংগঠনকে অধিক আর্থিক ও বৈষয়িক চ্যালেঞ্জের মূখোমূখি করতে পারে, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তার বড় উদাহরণ। বাপার বন্ধু দেশের সকল মানুষ, তবে বাপার উপর মনঃক্ষুনড়ব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও আশা করি কম নয়। কারণ পরিবেশ রক্ষার প্রশেড়ব বাপার শক্ত অব¯’ান অনেকের জন্য বেশ পীড়াদায়ক। বাপাকে শুধু ¯’ানীয় বা জাতীয় পর্যায়ে নয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পরিবেশবিমূখ, যান্ত্রিক উনড়বয়নের অন্তঃপ্রাণ, সামাজিক-রাষ্ট্রীয়-কর্পোরেট দানবের চাপের ফাঁক ফোঁকর গলিয়ে পথ চলতে হয়। তবে বাপার মতে, জাতীয় বা আঞ্চলিক রাজনীতির পরিপূরক, দেশী, বিদেশী, সরকারী, বেসরকারী কর্তৃপক্ষীয় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থনপুষ্ট কোন কোন ফরমায়েশী সংগঠনের বিপরীতে একটি সৎ, নীতিনিষ্ঠ সংগঠন গড়ে তোলার কাজটি দুরূহ হলেও সেটিই আসল প্রμিয়া এবং বাপার টিকে থাকা ও μমবিকাশ প্রমান করে যে, তা আসলেই সম্ভব।
এটি সর্বজনদিতি যে, বাপা একটি সদস্য ভিত্তিক সংগঠন, সদস্যরাই এর মৌলিক ভিত্তি। বর্তমানে সর্বমোট সদস্য হ”েছ: চার শতাধিক। বাপা’র সকল সদস্য বা বিভিনড়ব পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ সমান সμিয় নহেন। এই নি®িঙঊয়তা বাপা’র এক বিশাল দূর্বলতা। অন্যদিকে বিশেষ করে বাপার নেতা হওয়ার ‘ফ্যান্টাসী’ ভাবনা অনেক নতুন বা অপ্র¯‘ত ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা যায়, কিš‘ স্বশিক্ষা, স্ব-উপার্জন ও সৎ সাহসে বলীয়ান ব্যক্তির সংখ্যা সহজলভ্য নয়। বাপার প্রতিজন সদস্যই তার নিজস্ব ¯’ানে বা গন্ডীতে পরিবেশ বিপর্যয় প্রতিরোধের শক্তিশালী কেন্দ্র বা এক কথায় ‘চেঞ্জ মেকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন। নাম মাত্র সদস্য বাপা’র বা পরিবেশের কোন উপকারে আসবেনা। সার্বিক বিচারে পরিবেশ একটি নিরেট বিজ্ঞান, অতএব তার সকল সংকটও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ভিত্তিক যা সকলের নিকট সব সময় সহজবোধ্য নয়। পরিবেশ কর্মীদেরকে এসকল বিষয় সহজ ভাষায় রূপান্তর করে মানুষের মধ্যে ছড়াতে হয়, পরিবেশ বিনষ্টকারক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে সরকারকেও যুক্তি দিয়ে বুঝাতে হয়, তাদের ভুল ধারণাকে পরাভূত করতে হয়। বাপার জন্যও এটি বড় একটি চ্যালেঞ্জ। আমাদের নেতা কর্মীদের ধারাবাহিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কোন ব্যব¯’া নেই, স্ব-শিক্ষাই তাদের সম্বল। এটি বাপার এক বৃহৎ দূর্বলতা।
পরিবেশ বিষয়ক তথ্য সংগ্রহ, তথ্য সম্ভার সৃষ্টি, তথ্য প্রচার, গণমাধ্যমে লেখালেখি, গবেষণা, তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার, অধিক প্রকাশনা ও প্রচার বিষয়ে আমাদের সক্ষমতায় ঘাটতি রয়েছে, এটি কাটিয়ে উঠা প্রয়োজন। কারণ স্বশিক্ষিত ও নিবেদিত প্রাণ পরিবেশ কর্মী খুব একটা চোখে পড়েনা। দেশী-বিদেশী অনেক ছাত্র-ছাত্রী পরিবেশ-তথ্যের প্রশেড়ব বাপার উপর নির্ভরশীল, ভারত-কানাডা-সুইডেন-জাপান-সিঙ্গাপুর-অষ্ট্রেলিয়া-জার্মানীর বেশ কিছু শিক্ষার্থী ও তরুণ শিক্ষক ইতিমধ্যেই বাপাতে সংক্ষিপ্ত ইন্টার্ণশীপ করেছেন। অজস্্র দেশী বিদেশী গবেষক, গণমাধ্যম কর্মী সারা বছর বাপায় আসা যাওযা করেন তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য প্রাপ্তির আকাংখায়। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশীয় গুণীজনদের পাশাপাশি বেন সদস্যদের সহায়ক ভূমিকা প্রায় নিয়মিত বিষয়।
আমরা জানি যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যব¯’া, রাজনৈতিক কর্মীদের পরিমিতি ও মানবতা বোধ, সংযত জীবনযাত্রা, দূর্ণীতি পরিহার – সবকিছুই পরিবেশ সংরক্ষণে সহায়ক বিষয়। আমরা প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় বুঝেছি, অতীত ও বর্তমান সকলসময়ই পরিবেশ দূর্ণীতি ও সুশাসনের সর্বো”চ শিকার। বেশ কিছু পরিবেশ বান্ধব সিদ্ধান্ত, আইন, আদালতের রায় শেষ পর্যন্ত সরকারী অবহেলায় এখনও বাস্তবায়িত হ”েছনা, প্রশাসনের এধরণের মনোভাব ও নির্লিপ্ততা বাপা-বেনের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। অতএব ভাল গণতন্ত্র ও সুশাসন সম্ভবতঃ এর মূল সমাধান। অতএব বাপা অরাজনৈতিক

সংগঠন হলেও দেশের সু¯’ গণতন্ত্র চর্চা ও বিকাশ, সুশাসন আমাদেরও কাম্য। কারণ সামাজিক আন্দোলন গণতান্ত্রিক সমাজের অঙ্গ, অতএব গণতন্ত্র সংকটাপনড়ব হলে বাপা ও বেন এর মত সংগঠনও দূর্বলতাবোধে আμান্ত হয়। জাতীয বা বৃহৎ নির্বাচনের প্রাক্কালে বাপা ভোট প্রার্থীদেরকে পরিবেশ-অর্থনীতি-প্রশাসন প্রশেড়ব জনতার জবাবদিহিতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে।
শেষ কথাঃ সবশেষের সত্য কথাটি হ”েছ, বাপা-বেন এর আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক বলয়ের সামনে এখনও একটি স্বল্প শক্তির আন্দোলন। আমরা এখনও ভুল নীতি ভিত্তিক ও পরিবেশ বিনষ্টকর পুরাতন ধ্যান-ধারণা ক্ষমতাশ্রয়ী রাজনৈতিক নেতা, কর্মী, প্রশাসনিক ব্যক্তিদের মনোজগতে সফল বৃহৎ পরিবর্তন তৈরী করতে পারিনি। বাপা-বেন এর নিরন্তর প্রচেষ্টার পরও, প্রকৃতি ও পরিবেশ বিনাশী কার্যμম বন্ধ করার কথা অনেকে এখনও ভাবতেও পারেননা। আমাদের দেশের ব্যাপক পরিবেশ ধ্বংসযজ্ঞের সামনে বাপা বা অন্যান্য সকল পরিবেশবাদীদের সম্মিলিত শক্তিও পরি¯ি’তি নিয়ন্ত্রণ বা উত্তরণে যথেষ্ঠ নয়। তবে সূখের কথা হ”েছ, আমাদের দেশের বেশ কয়টি সামাজিক আন্দোলনে ব্যাপক জনসম্পৃক্তিই শেষ পর্যন্ত মানুষের জয়কে নিশ্চিত করেছে। আমরা নিশ্চিত যে মানুষ শাণিত হ”েছ, তাদের নিজস্ব যাপিত জীবনে পরিবেশ বিপর্যয়ের ধাক্কা জনিত সংকট ও বাপা-বেন এর প্রচারের কারণে। অতএব নিজ স্বার্থেই মানুষ আরো প্রতিবাদী হবে; এ দেশের সুন্দর ভবিষ্যত নির্মানের স্বার্থে দেশের জনগনই আমাদের পরিবেশ রক্ষা ও উনড়বয়নের সংগ্রামে মূল ভূমিকা পালন করবে। বাপা-বেন এই জন চেতনার ছুরিতে ধার দি”িছ মাত্র। আমাদের জনগন পঞ্চাশের দশকের ভাষার সংগ্রাম, ষাটের দশকের স্বাধিকার, সত্তরের দশকের স্বাধীনতা, মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে দেশ গঠন, আশির দশকের ভোটের অধিকার ও নব্বই এর দশকে গণতন্ত্রের জন্য সফল সংগ্রাম পরিচালনা করেছেন। বাপা আশাবাদী যে, আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে ও পরিবেশ সংরক্ষণের সংগ্রামে অদূর ভবিষ্যতে আবার আমাদের সংগ্রামী জনগন ব্যাপক জাতীয় আন্দোলনে সম্পৃক্ত হবে। আগামী দশটি বছর হবে সারা বিশে^র আপামর জনতার পরিবেশ অধিকার রক্ষার দশক তথা বিশ^ রক্ষার দশক। জীবাশ্ম জ¦ালানীর অধিক ব্যবহার ও শিল্পায়ন, চলমান জলবায়ু পরিবর্তন সংকট, সারা বিশে^র তাপমাত্রা বৃদ্ধি, উত্তরের বরফ গলে সমুদ্রের পানির বৃদ্ধি, অধিক ঝড়-বৃষ্টি, গত তিন বছরে অন্য মাত্রায় চলে যা”েছ। জাতিসংঘ মহাসচিব এক বিবৃতিতে বলেছেন কার্বন নিঃসরণ ব্যাপক মাত্রায় না কমালে ১০ বছর পর এসব প্রাকৃতিক দূর্যোগের ক্ষতির মাত্রা ও সংখ্যা হবে ভয়াবহ ও অপরিবর্তনীয়। সারা বিশে^র অন্য সকল ঐতিহাসিক সাফল্যের মত পরিবেশ অধিকারের সংগ্রামেও মানুষকে বিজয়ী হতে হবে, নিশ্চয়ই আমরাও বিজয়ী হব। চৈনিক দার্শনিক কসফুসিয়াস বলে গেছেন যে, তুমি যদি অতি দ্রুত কিছু পেতে চাও তবে মাটিতে বীজ ছিটিয়ে দাও, অল্প কদিনে ফসল পেয়ে যাবে; যদি বেশী সময় অপেক্ষা করতে পারো তবে গাছ লাগাও, কয়েক দশকে ফল ও দামী কাঠের জোগান পাবে; আর যদি চির¯’ায়ী কিছু পেতে চাও তো তোমার জনতাকে উদ্বুদ্ধ কর, সমাজের ¯’ায়ী পরিবর্তন নিশ্চিত হবে। পরিবেশ প্রশেড়বও ব্যাপক জন সচেতনতাই কোন সাফল্যকে ¯’ায়ী করার কার্যকর কৌশল। তবে তার পূর্বশর্ত হ”েছ, পরিবেশ কর্মীদের অধিক সংখ্যক মানুষের কাছে যেতে হবে, মানুষের বিবেককে জাগ্রত করতে হবে, ব্যাপক জনতার অংশ গ্রহনে পরিবেশ আন্দোলনকে আরো বেগবান করতে হবে। এটিই বাপা-বেন এর প্রধান কৌশল ও দায়িত্ব এবং এ দায়িত্ব আমরা অবশ্যই পালন করবো।
—সমাপ্ত—
লেখকঃ ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন, নির্বাহি সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা),
৯/১২, ব্লক-ডি, লালমাটীয়া, ঢাকা-১২০৭। ই-মেইল: memory14@agni.com,
২২ ডিসেম্বর, ২০২০
১০


Place your ads here!

Related Articles

Proposed Framework for Ganges-Brahmaputra-Meghna Basin Compact – Khalequzzaman, Zahidul Islam, and Kazi Saidur Rahman

Only six years left before the 1996 Ganges Water Sharing Treaty (the Treaty) expires. It may appear that six years

Consequences of creating ‘Forever Chemicals: PFAS’-Bangladesh should consider regulating the chemicals to protect human and the environment – Hossain M Azam

Bangladesh Environment Network (BEN) and Bangladesh Poribesh Andolon (BAPA) want to raise concerns of another class of chemicals (PFAS) making

বাংলাদেশের পরিবেশ আন্দোলনের কুড়ি বছর – দীপেন ভট্টাচার্য

আন্দোলন হিসেবে পরিবেশ আন্দোলন বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে দেরিতে এসেছে। পরিবেশগত যত ধরণের সূচক আছে – বায়ু দূষণ, পানীয় জল দূষণ, আর্সেনিক,

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment