পরবাসিনী রোজার ‘বাংলা আগুন’এ কবি গুরুর ‘আলোক-লোক ফাঁকা’

পরবাসিনী রোজার ‘বাংলা আগুন’এ কবি গুরুর ‘আলোক-লোক ফাঁকা’

-দিলরুবা শাহানা

পরবাসের জীবন একেক জনের কাছে এক এক রকম হয়ে ধরা দেয়। তার কারণ হল একেক জনের দেখার চোখ এক এক রকম। কেউ উপরি উপরি দেখে। কেউ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। তো ঘটনা শুনবো পরবাসে থাকা এক নারীর মুখ থেকে। ঘটনা প্রায় নব্বই বছর আগের। হাঙ্গেরীয় এক নারী যার নাম রোজা হায়নসসী কিছুদিন পরবাসে ছিলেন। ঘটনা চক্রে রোজা তিন বছর ভারতবর্ষের শান্তিনিকেতনে ছিলেন। রোজার স্বামী গোলিয়া গেরমানাস হাঙ্গেরীতে ইসলাম বিষয়ে নেতৃস্থানীয় পন্ডিত ছিলেন। কবি গুরুর আমন্ত্রণে শান্তিনিকেতনে ইসলাম বিষয়ে শিক্ষাদানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন গেরমানাস। এই সূত্রে শান্তিনিকেতনে উক্ত বিষয়ে ১৯২৯ থেকে ১৯৩২ পর্যন্ত শিক্ষকতা  করেন। রোজা ছিলেন অধ্যাপক গোলিয়ার স্ত্রী। তিনিও সে সুবাদে স্বামীর সঙ্গে শান্তিনিকেতনের বৈচিত্রময় জীবনের সাথে পরিচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনেক ঘুরাঘুরি করেছেন, পৃথিবীর নানা কোনে তাঁর বিচরণ হয়েছিল। এই পৃথিবীর পয়ত্রিশটা দেশে কবি ভ্রমণ করেছেন। তারমাঝে ১৯২৬শে কবি হাঙ্গেরী সফর করেন। উল্লেক্ষ্য কবি যেখানেই গিয়েছেন কিছু না কিছু তার নজরে পড়েছে এবং কিছু না কিছু তুলে এনেছেন। যেমন সিলেটে গিয়ে মনিপুরী নৃত্য আর সৈয়দ মুজতবা আলীকে পেলেন। হাঙ্গেরী গিয়ে গোলিয়া গেরমানাসকে পেলেন।

ভারতে আসার ব্যাপারে গোলিয়ার স্ত্রী রোজার উত্তেজনা ছিল ঠিকই তবে একই সাথে তারই ভাষ্যে শোনা যায় ‘শামুক যেমন পাহাড়ের গায়ে লেপটে থাকে, সন্তান যেমন মা-বাবাকে আঁকড়ে ধরে তেমনি হাঙ্গেরীতে কাটানো শৈশবের স্মৃতি, লকসপার্কের খেলার মাঠ, প্রাসাদ দেয়ালের পাশে পজমারের পায়ে চলার পথ গেঁথে ছিল মনে’। স্বামীর পান্ডিত্যের পরিধিতে অংশ নিতে অপারগ রোজা। তাই অন্যান্য ইউরোপীয় ও পাশ্চাত্য ঘেষা ভারতীয়দের সাথে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকলেও ভারতের গরমের কারণে রোজা ছিলেন অতিষ্ঠ।  তবে একটি কাজ রোজা আবেগ ঢেলে নিয়মিত করতেন তা হল ডায়রী লেখা। ভারত থেকে নিজ দেশে ফেরার সময়ে স্বামীর বইপত্রের সাথে রোজার গিয়েছিল আঠারো খন্ড ডায়রী।

নিঃসন্তান রোজার ডায়রীতে লিপিবদ্ধ শান্তিনিকেতনের জীবনের নানা ঘটনাবলী ও পর্যবেক্ষনই তার বই ‘বাংলার আগুন’(হাঙ্গেরীয় ভাষায় যে পুস্তকের নাম ‘বেঙ্গালি তুজ’)এর বিষয়বস্তু। রোজা একটিই বই লিখেছেন বা একখানা ডায়রী মাত্র লিখেছেন যা আজ হাঙ্গেরীয় সাহিত্যে ক্লাসিকএর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় বুদাপেষ্টে ১৯৪৪সালে। দীর্ঘ ২৮বছর পর দ্বিতীয় সংস্করন প্রকাশিত হয় ১৯৭২এ। দু’টো সংস্করণই প্রকাশিত হয় হাঙ্গেরীয় ভাষায়। তারপর কেটে  যায় ২১বছর। বইটির ইংরেজী অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে ঢাকার ইউপিএল(UPL) থেকে। পাবলিশার্স পেজে বা প্রকাশকের পাতায় বিবৃত যে ১৯৭২এ প্রকাশিত  হাঙ্গেরীয় ভাষার ‘বেঙ্গালি তুজ’এর উপর ভিত্তি করেই  কৃত অনুবাদ  এটি।

এই অনুবাদ কর্মের ভূমিকা লিখেছেন সুপরিচিত খ্যাতিমান রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ যার নাম উইলিয়াম রাদিচে।

পশ্চিমা দৃষ্টিকোন থেকে ভারতকে দেখা সহজ কাজ নয়। রোজার ভাষ্য থেকে তার পর্যবেক্ষণে ধরা পড়া  অনেক বিরক্তিকর ও ভীতিজনক ঘটনা জানা হয়। তার মাঝে শান্তিনিকেতনে তাদের রান্নাঘরের পরিবেশ,  দার্জিলিংয়ের যে আফিমের আড্ডায় তার স্বামী ঘুরে আসেন তার বর্ননা, সুরুলে দূর্গাপূজার সময় বাঁধভাঙ্গা ভীড়, শান্তিনিকেতনের বিদেশী বাসিন্দা ফরাসী বেনোর বাঙ্গালি বউয়ের আতুর ঘরে আটকে থাকা  ইত্যাদি।

আকর্ষক বিষয় হচ্ছে রোজার বইতে শান্তিনিকেতনে নানা জাতির মানুষের উপস্থিতির চিত্র। তাতে রয়েছে প্রাচ্য-প্রতিচ্যের মানুষের  পরস্পরের মূল্যবোধের প্রতি কৌতুহল, আগ্রহ, আকর্ষণ। আর রয়েছে মানুষে মানুষে দ্বন্ধ, দুঃখ। আর এই বিচিত্র লোক সমাবেশে ঋষিকবির অপূর্ব উপস্থিতি!

ইংরেজী অনুবাদের মুখবন্ধে উইলিয়াম রাদিচে লিখেছেন যে, পাঠক যারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শান্তিনিকেতনের সাথে পরিচিত তারা রোজার বাস্তবের সাথে কল্পনার মিশ্রণে ধাঁধাঁয় পড়ে যাবে, রাগান্বিত হবে।

রোজা বলেন ‘বইয়ের শেষ পাতায় পৌঁছে গেলে সমস্ত রহস্য খুলে যায় সাথে সাথে আকর্ষণও শেষ’। তবে রোজার বই সম্বন্ধে বলা হয় ভিন্ন কথা। রাদিচে মুখবন্ধে বলেন ‘এই বই বেঁচে  থাকে বার বার’।

রোজার দৃষ্টিতে যে রবীন্দ্রনাথ ধরা দিয়েছেন তা জাগতিক-আধ্যাত্মিক, পার্থিব-অপার্থিব মেশানো যাদুময় এক উপস্থিতি বা অপূর্ব এক অবয়ব। ‘বেঙ্গালি তূজ’ বা ‘Fire Of Bengal’ অথবা ‘বাংলার আগুন’ বইয়ের এক চরিত্রের মুখ দিয়ে লেখিকা যে ভাষ্য তুলে ধরেন তা হল ঋষিকবি নাকি ধ্যানে বসে ঘাসের বেড়ে উঠা শুনতে পেতেন। এই বর্ননা থেকে মনে হয়  পার্থিব-অপার্থিব মিলেমিশে  একাকার হয়ে রয়েছে যে স্বত্বায় তার উজ্জ্বল উপস্থিতি হচ্ছেন বা ছিলেন কবিগুরু।

লেখিকার পর্যবেক্ষণ গভীর ও সূক্ষ। নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা জাতপাতের কারণে উপেক্ষা ও ঝামেলা এড়ানোর জন্য ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছেন এমন ঘটনাও শান্তিনিকেতনেই রোজার চোখে ধরা পড়েছে। এই সহজ সরল বর্ণনা  থেকে উপলব্ধি করা  যায় যে শুধুমাত্র জোরজুলুম করে ধর্মান্তরিত করা হয় কথাটা সবসময় বোধহয় ঠিক নয়।

মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়েনও বইয়ে বর্নিত হয়েছে। তেমনি এক ঘটনা হল শান্তিনিকেতনে ইংরেজী পড়াতে আসেন অক্সফোর্ড শিক্ষিত অতনু রায়। সঙ্গে আসেন তার পশ্চিমা স্ত্রী হেলগা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অতনু রায়ের ডেনমার্ক থেকে আগতা স্ত্রী হেলগার নতুন নামকরণ করেন হিমঝুড়ি। লেখিকা বলেন হিমঝুড়ি অর্থ Flower of cold land। ভারতের সবকিছুর প্রতি বিদেশিনী হেলগা বা হিমঝুড়ির ছিল বিপুল আগ্রহ ও কৌতুহল। হিমঝুড়ি যত বেশী আবরণে-আচরণে ভারতীয় বাঙ্গালি হতে চায় ততোই পশ্চিমা হতে আগ্রহী  অতনু রায়ের হতাশা বাড়ে। এক পর্যায়ে হিমঝুড়ি গান্ধীজির স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দেয়। তখন অতনু রায় শান্তিনিকেতনের  আরেক বাসিন্দা  জার্মান  মেয়ে গার্ট্রুডের প্রতি ঝুঁকে পড়ে।

গার্ট্রুডকে নিয়ে দ্বন্ধ শুরু হয় অক্সফোর্ড শিক্ষিত অতনু রায় ও ক্যাম্ব্রিজ শিক্ষিত নবাবপুত্র আলি হায়দারের মাঝে। আলি হায়দার গোলিয়া গেরমানাসের কাছে ইসলাম বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের জন্য শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন। এই দ্বন্ধের অবসান হয় গার্ট্রুডের হত্যার মাঝ দিয়ে। অতনু রায় ফিরে  আসে হিমঝুড়ির কাছে। সে সময়ের শান্তিনিকেতনে অতনু রায়-হিমঝুড়ি ছিল এশিয়া-ইউরোপের মিলনের প্রতীক। এই জুটির পুত্রের জন্ম শান্তিনিকেতনে আনন্দের বন্যা বয়ে আনে।

রোজার ভাষ্য থেকে জানা যায় কবিগুরু পুত্রবধু প্রতিমাসহ প্রতিদিন  বৈকালিক ভ্রমণ শেষে এই নবজাতককে দেখতে যেতেন।  এমনি এক বিকালে রোজার উপস্থিতিতে কবি এলেন। বাচ্চাটিকে আদর করে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে মুহূর্তে কবি ধ্যানমগ্ন হলেন। ধ্যান ভেঙ্গে কবি কাগজ-কলম চাইলেন। রোজা সুযোগ হাতছাড়া করলেন না। ডায়রীর পাতা খুলে কলম সহ এগিয়ে দিলেন। ওই ডায়রীর পাতায় কবি বাংলা ও ইংরেজী দুই ভাষাতেই লিখলেন

                              ‘শিকড় ভাবে সেয়ানা আমি,

                                                 অবোধ যত শাখা,

                               ধূলিমাটি সেই তো খাঁটি,

                                                  আলোক-লোক ফাঁকা।

                              The root is sure that the branch

                                                      is a fool,

                        that the dust is real

                               and the heaven with its light

                                                       is emptiness.

Fire of Bengal বইয়ের বাইরের মলাটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজ হাতে রোজার ডায়রীতে লিখে দেওয়া কবিতাটি স্থান পেয়েছে।

এই বইটির সাথে কেমন এক রহস্যময় ব্যাপার যেন জড়িত। হাঙ্গেরীয় ভাষায় যখন বইটির ম্যানুস্ক্রীপ্ট তৈরী হয়েছে তখন ১৯৪২সাল। তা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময় ।  তার স্বামী গেরমানাস ইহুদী হওয়ার অপরাধে জার্মানদের হাতে সে সময় বন্দী ছিলেন। একে জার্মানদের হাতে স্বামী কারাগারে নিক্ষিপ্ত তার উপর যুদ্ধের নিষ্ঠুর ভয়াবহতার  মাঝে জীবনের  ভার বইতে না পেরেই হয়তো  বই  প্রকাশের আগেই লেখিকা আত্মহত্যা করেন।

ইংরেজী অনুবাদকারীদ্বয়ের একজন হলেন ইভা উইমার। তিনিও বইটির প্রকাশ দেখে  যেতে পারেন নি। ইভার স্বামী ডেভিড গ্রান্ট ছিলেন অক্সফোর্ডের ইংরেজীর শিক্ষক। ইভাও স্বামীর সাথে মিলে  পাঁচ বছর ধরে অনেক শ্রম ব্যয় করে বইটির ইংরেজী অনুবাদ কর্ম শেষ করেন। কিন্তু রোজার মতই ইভারও বইটির প্রকাশ দেখার সুযোগ হয় নি।  বই প্রকাশের আগেই  স্বল্পকালীন অসুস্থতায় ইভা মৃত্যুবরণ করেন। ভাবলে বিষাদ ঘনায় মনে যে দুজনের কেউই তাদের মেধা ও শ্রমের  ফসল দেখে যেতে পারেন নি! তবে একটি  চিরন্তন সত্য হল জীবন নিভে যায়, মানুষ আর ফেরে না কখনো তবে তার সৃষ্ট বইখানি থেকে যায় যুগের পর যুগ। বই বিষয়ে কবির উচ্চারণ ‘রুটি ও মদ শেষ হয়ে যায়, প্রিয়ার কালো চোখ ধূসর ঘোলাটে হয়ে যায়, তবে বইখানি অনন্ত যৌবনা’।                               


Place your ads here!

Related Articles

গল্পকনিকা

ফিরে এসো নিরঞ্জন শীত। বড় তীব্র শীত। চাখানার মাটির বারান্দায় খড়ের উপর চট বিছানো শয্যায় কাঁথামুড়ি দিয়ে বিলু পাগলা। পা

কিছু অপরাধ তামাদি হয় না

গায়ক আপেল মাহমুদকে নিয়ে লেখা প্রকাশের পর অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন যে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এর ভোরে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সাথে

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment