নবম ওয়েজবোর্ডে বেতন-ভাতা না দিলে সংশ্লিষ্ট পত্রিকা-মিডিয়া বন্ধ করে দিতে কী রাজি হবেন সাংবাদিকরা?

নবম ওয়েজবোর্ডে বেতন-ভাতা না দিলে সংশ্লিষ্ট পত্রিকা-মিডিয়া বন্ধ করে দিতে কী রাজি হবেন সাংবাদিকরা?

ফজলুল বারী: সাংবাদিকদের নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে সকলপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেবার আশ্বাস দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ও সড়ক যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। নবম ওয়েজবোর্ডের বেতন-ভাতা সাংবাদিকদের যৌক্তিক দাবি। কারন বাংলাদেশে এখন দূর্মূল্যের বাজার। সবার আয় যেমন বেড়েছে, জীবনও ব্যয়বহুল। কিন্তু ওবায়দুল কাদেরের আশ্বাস একটি অবাস্তব আশ্বাস। ওবায়দুল কাদের এক সময় দৈনিক বাংলার বানীতে চাকরি করতেন। পত্রিকাটি কি কারনে বন্ধ হয়ে গেছে তা তিনি জানেন। যে পত্রিকা চলছিলোনা, সেটির বাজার কাটতি ছিলোনা সেটি জোর করে চালানো যাচ্ছিলোনা। বাংলার বানী হাউস থেকে দ্য বাংলাদেশ টাইমস, সাপ্তাহিক সিনেমা নামের আরও দুটি পত্রিকা বেরুতো। একই কারনে সে দুটিও বন্ধ হয়ে গেছে।

বাংলার বানী হাউসের কর্নধার শেখ ফজলুল করিম সেলিম আওয়ামী লীগের অন্যতম শীর্ষ নেতা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই। ধান্ধাবাজি করে তিনি পত্রিকাগুলো চালানোর চেষ্টা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এরজন্যে তাকে আমি শ্রদ্ধা করি। কাজেই সরকার যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে থাকেন তাহলে যেখানে যে পত্রিকা বা মিডিয়ার বাজার কাটতি নেই, পাঠক যেটি কেনেনা বা দেখেনা, যেখানে কেউ স্বেচ্ছা প্রনোদিত হয়ে বিজ্ঞাপন দেয়না, সেটিকেও বাংলার বানীর মতো বন্ধ হবে অথবা বন্ধ করে দিতে হবে। কারন সাংবাদিকদের ঠকিয়ে পত্রিকা-মিডিয়া বের করাও একটি দুর্নীতি। এখন বাংলাদেশে ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের শর্তে বিভিন্ন পত্রিকায় সরকারি বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। দেশের নানাকিছুর মতো এই প্রক্রিয়াটিও দুর্নীতিগ্রস্ত। এরমাধ্যমে ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়িত হয়েছে এমন একটি সনদপত্রের ভিত্তিতে সরকারি বিজ্ঞাপন দেয়া হয় সংশ্লিষ্ট পত্রিকায়। এই সনদপত্র কারা কিভাবে দিচ্ছেন সেটিও ওয়াকিফহালরা জানেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুর্নীতির মাধ্যমে প্রাপ্ত সনদপত্রের কারনে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ওই পত্রিকাগুলো সরকারি বিজ্ঞাপন পেয়ে চললেও এর সবক’টিতে ওয়েজবোর্ডে বেতন দেয়া হচ্ছেনা। অথবা পত্রিকাগুলোর সে সামর্থ্যও নেই। কারন পত্রিকাগুলোর যে বাজার কাটতি নেই। পাঠক যে সেগুলো কিনে পড়েননা। আবার বাজার কাটতির পত্রিকাগুলো সরকারি বিজ্ঞাপন ছাড়াই ভালো আছে। এগুলোর কোন কোনটি সাংবাদিকদের এখনই অষ্টম ওয়েজবোর্ডের চেয়ে বেশি বেতন দিচ্ছে। সে কারনে পুরো বিষয়টিতে স্বচ্ছতার স্বার্থে এমন একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন ছাড়া এখানে কেউ কোন পত্রিকা প্রকাশ বা মিডিয়া চালাতে পারবেনা। যেমন অস্ট্রেলিয়ায় একজন জুনিয়র রিপোর্টারকে সপ্তাহে সাড়ে সাতশ ডলারের নীচে বেতন দেয়া যায়না। সপ্তাহে ওই পরিমান বেতন ছাড়া কেউ কোন পত্রিকা বা মিডিয়ায় কাজও করেননা। কারন এসব দেশে সবাই এমন কাজ কেউ করেননা যার আয়ে তারা নিজেরা বা পরিবার নিয়ে চলতে পারেনা।

জীবনের প্রয়োজন আর গতির কাছে আলগা আবেগ এখন অচল। কাজেই মর্যাদাপূর্ন পেশা জীবনের স্বার্থে দেশের সাংবাদিকরাও কী এ রকম একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন? যে নবম ওয়েজবোর্ড অনুসারে বেতন না দিলে তারা সে রকম কোন পত্রিকা বা মিডিয়ায় কাজ করবেননা। বা নবম ওয়েজবোর্ডবিহীন কোন পত্রিকা বা মিডিয়া এখানে চলতে দেবেননা। নিজস্ব নুন্যতম মজুরির গ্যারান্টি ছাড়া গার্মেন্টস শ্রমিকরাও এখানে কাজ করেননা। সাংবাদিকরা করবেন কিনা সে সিদ্ধান্ত তাদেরকেই নিতে হবে। জনবহুল এবং ঘটনাবহুল বাংলাদেশে জেলা-উপজেলা পর্যায়েও এখন সাংবাদিকতা একটি ফুলটাইম পেশা। কাজেও সিদ্ধান্ত নিতে হবে সব সাংবাদিককে। তারা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারলে যারা নবম ওয়েজবোর্ডে বেতন দেবেনা দিতে পারবেনা তারা তাদের প্রতারনামূলক দোকানগুলো অবশ্যই বন্ধ করতে বাধ্য হবে। দূর্ভাগ্যজনক সত্য হচ্ছে চাকুরি হারানোর আশংকায় অথবা বকেয়া বেতন পাবার আশায়-অপেক্ষায় বাংলাদেশের সিংহভাগ সাংবাদিক ন্যায্য মজুরি অথবা নিয়মিত বেতন না পাওয়া স্বত্ত্বেও এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে বাধা দেন। উল্টো সংবাদপত্র-মিডিয়া তথা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দমনপীড়নের অভিযোগ তোলেন। নিয়মিত বেতন না পেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে তাদের অনেকে অমানবিক জীবনযাপন করেন। বকেয়া বাড়িভাড়ার কারনে বাড়িওয়ালার ভয়ে লুকিয়ে বাড়িতে ঢোকেন-বের হন। বেতন দিতে না পারায় তাদের অনেকের ছেলেমেয়েদের স্কুলের পড়া বন্ধ হয়। অথবা এসব সামাল দিতে গিয়ে তাদের অনেকে দুর্নীতিতে জড়ান। এতে করে দুর্নীতিবাজ সাংবাদিকদের কারনে সমাজে ত্যাগী সাংবাদিকদের ত্যাগ-তিতীক্ষাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

বাংলাদেশে কোনদিন তার পত্রিকা-মিডিয়া থেকে বেতন পাননি এমন সাংবাদিকের সংখ্যাও কম নয়। তবু যে পত্রিকা মিডিয়া তাদের বেতন দেয়না-দিতে পারেনা সেগুলো তারা বন্ধ করে দিতে চান না! অস্বচ্ছল, বাজার কাটতিবিহীন অলাভজনক পত্রিকা-মিডিয়া মালিকরা এর সুযোগ নেন। অথচ বাজার অর্থনীতির শর্ত হচ্ছে বাজারে যার চাহিদা থাকবে সেই টিকে থাকবে অন্যগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। বাজার অর্থনীতির দুর্নীতিমুক্ত অথবা কম দুর্নীতির দেশগুলোয় আর দশটা প্রতিষ্ঠানের মতো বাজার কাটতিবিহীন অলাভজনক পত্রিকা-মিডিয়াও নিজে নিজে বন্ধ হয়। সরকারকে তা বলে বন্ধ করতে হয়না। সরকার শুধু আইনের প্রয়োগ দেখে। আর বাংলাদেশের বাজার অর্থনীতির দেশের বেশিরভাগ সাংবাদিক বা মিডিয়া কর্মীর এ সংক্রান্ত চিন্তাটা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি চিন্তার! সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে রাষ্ট্র যেমন ভূর্তকি দিয়ে আর দশটি প্রতিষ্ঠানের মতো নিজস্ব সীমিত সংখ্যক পত্রিকা-মিডিয়া চালায় আর কী। এমন চিন্তার বাকশালের চারটি পত্রিকা আবার বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক গালির নাম। বাংলাদেশের অনেক বাঘা দুর্নীতিবাজ, করফাঁকিতে চ্যাম্পিয়ন ব্যক্তিরা নিজেদের বর্ম হিসাবে যার যার একেকটি পত্রিকা-টিভি মিডিয়া অথবা অনলাইন মিডিয়া গড়ে তুলেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি তাঁর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির অভিযানে এসব দুর্নীতিবাজ মিডিয়া মালিকদের হাত দিতে না পারেন তাহলে তাঁর অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ অথবা ব্যর্থ হবে।


Place your ads here!

Related Articles

শক্তির চেয়ে কি আসক্তি বড় ?

ফিজিক্সে শক্তির নিত্যতা সূত্র বলে একটা সূত্র পড়েছিলাম, “মহাবিশ্বের মোট শক্তির পরিমান সমান । নতুন কোন শক্তি তৈরী বা ধ্বংস

জন্মদিন

আমার জন্মের সময়টা হেমন্তকাল আর মাসটা ছিল অগ্রহায়ণ তারিখটা ছিল ২৩। গ্রামদেশে অগ্রহায়ণ মাসেই প্রচন্ড শীত পড়ে। রবিবার রাত্রি বারোটার

Justice of the Peace – origin and role

A Justice of the Peace (JP) is essentially an officer appointed by the government (federal or state) to carry out

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment