ভার্চুয়াল চিঠি (পর্ব – তিন)
ভালোবাসার ভাষা বদলে গেছে। আগের দিনের ভালোবাসা আর এখনকার ভালোবাসার বিস্তর ফারাক । ফোনে মিসড কল। তা থেকে পাল্টা ফোন।
তারপর একাধিকবার ফোন। ফেসবুকে দিনরাত কথামালা। কবিতা কিংবা গল্প ছবি ভিডিও ক্লিপ আদান প্রদান । সম্পর্ক বেশ মাখোমাখো পর্যায়ে পৌঁছালে ঠিক !
কিন্তু মাত্র একটা মাস যেতে না যেতেই সব শেষ।
সম্পর্কটা এখন আর আগের মতো নেই।
প্রেমিক ফেসবুকে সবুজ বাতি জ্বলে সারারাত। প্রেমিকা নক করে না। প্রেমিকা জেগে থাকে।
জানে প্রেমিকের আর দরকার নেই । সে অনেক মেয়ের সাথে সারারাত চুটিয়ে আড্ডা দেবে।
তবুও প্রেমিকাকে নক করবে না। প্রেমিকও বালিশে মুখ গুজে ভাবে একই কথা। মেয়েটা না জানি কতগুলো ফেসবুক ফ্রেন্ড। কত জনের সাথে চ্যাট করে কে জানেপ্রেম আর কোথায়? প্রেম হয়ে পড়েছে ইনবক্সবন্দী।
যেন সব প্রেম ওই ইনবক্সে। আগে আমরা যখন প্রেম করতাম তখন এক নজর দেখার জন্য বুক হু হু করতো। সামনে দিয়ে একবার হেঁটে যেতে গেলেও পা কাঁপতো। একটা চিঠির জন্য কত কাহিনীই না করতে হতো।
এখন কোন ইমোশন নেই। ভিডিও চ্যাট হচ্ছে। ডেটিং এর জন্য কোন নিরাপদ জায়গার দরকার হচ্ছে না।
ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ সব সেরে নিচ্ছে সবাই। যে সম্পর্ক হৃদয় স্পর্শ করে না সেটা কি আদৌ কোন সম্পর্ক?
কারো জন্য কারো যেন অপেক্ষার সুযোগ নেই।
আসলেই তো তাই। কারো জন্য কারো অনুশোচনা কিংবা দু:খবোধেরও কোন সুযোগ নেই।
বিশ্বাস নেই। ভালবাসা নেই। সবাই ব্যস্ত। তাই হুটহাট ডিভোর্স। ব্রেকআপ।
এখন আর কেউ শরৎ-কাহিনী খোলা রেখে কারো জন্য অপেক্ষা করে না।
কিংবা স্কুলের সামনে , কারো চোখের পাতা কারো পথ চেয়ে নাচে না। সবাই চেয়ে থাকে ওই সবুজ বাতির দিকে।
কখন চ্যাটলাইন অ্যাকটিভ দেখাবে!
এই যদি হয় অবস্থা তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের কী হবে? কিন্তু যে প্রেম প্রবাহে আমি তুমি আমরা ভাসছি সেটা তো অস্বীকার করবার কোন জো নেই কারো ।
ফেসবুকে প্রেমের গাড়ি চলছে যাত্রাবাড়ি … ইমো ইমোশন , আহ ! উফ! ইস !
এই হলো আবেগের শব্দ … আর এসব ভালো লাগার অনুভূতি থেকে পরস্পর পরস্পরের কত কিছু মনে নেওয়া, মেনে নেওয়া! এই পর্যায়ে শহীদ কাদরীর কবিতার লাইন গুলো মনে পরলো “প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিকই, কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না।”
তবুও মনের দখিন দুয়ার আমরা খুলেই দেই অনায়াসে , এক এই একটু দমকা বাতাস খেতে একটু প্রেম দোলা খেতে ।
ভালোবাসা-মুগ্ধতার অনির্বচনীয় শান্তি শেষমেশ সবকিছু কি ভাসিয়ে নেয় না?
প্রশ্ন আমারও এতো কিছুর পরেও সবাই এতো প্রেমে পড়ছে কেন … ইনবক্স প্রেমেপ্রেমোময় হররোজ ।
না বয়স না সমাজ না ধর্ম না কর্ম না মান না সম্মান সব কিছু বাজী রেখে ।
চুপচুপ অনামিকা চুপ .. লুকাছুপি চলছেই দেদার ।
আর এই বিষয় গুলো মাথায় রেখেই ঘটে যাওয়া রোজকার হাজার হাজার প্রেম বাণী , চমকিত চুমু , উপহার , ছলাকলা , কারো বা নিজেই নিজেকে দেয়া কান মলা , ইনবক্স কি শুধুই সেলফি সেলফি সেন্ড সেন্ড খেলা .. !
সব প্রেম পরিণতি হয়তো পায় না, হয়তো চায়ও না। তা বলে প্রেমের সময়ে বুকের গভীরে যে ধুকপুকানি, তা একবিন্দু মিথ্যাও নয় মোটেও ,
আছে কিছু গল্প … সেই গল্পই আমি লিখছি , পড়ুন ধারাবাহিক পর্ব গুলো প্রস্তাব পর্বের .. আজ দ্বিতীয় চিঠি লিখছি । উত্তরে যা বলেছে ……..
মেয়েটির ফিরতি ইনবক্স মেসেজ
প্রস্তাব পর্ব চিঠি -২
? আপনার মেসেজ পড়ে কি মনে হলো জানেন তো ?
আপনি যেন প্ল্যান করে সোনার মাছি মারতে এসেছেন ।
আমি তো সুখে আছি , বেশ আছি ,
যেমন আছি ঠিক আমার মতোই তো আছি ,
কি দরকার ছিল আপনার ,টরে টক্কা করার ।
ইসস ! চিঠি তো নয় যেন অন্তর ঢেলে মর্মর মূর্তি গড়েছেন । ফেসবুকে কোন প্রেম নেই আজকাল সব ভাণ !
সেটা তো আপনার বোঝা হয়ে গেছে এরই মধ্যে .. যেমন টা আমার বোঝা শেষ ।
ভরসা নামের তলানীটুকুও টিস্যু পেপারে সেদিন মুছে ফেল্লাম । মনে মনে আমরা কত দূরেই তো চলে যাই , কিন্তু পেছন ফিরে যখন তাকাই তখনই কেবল বুঝতে পারি কতটা পথ ফেরত আসতে হবে ।
শুনে রাখুন , ফেসবুকে প্রেমের বসন্তগুলো যেমন হুটহাট আসে ,তেমনি কৌতুকও ঝুলে থাকে ইনবক্সের সবুজ ল্যাম্প পোষ্টে ।
সোজা বাংলায় একটা কথা স্পষ্ট বলে রাখছি , এক অসুখে দুজনে অন্ধ হলে পৃথিবীতে আলো বলে কিছু আর থাকবে না যে ।
আপনার মিষ্টি কথার বৃষ্টিতে আমি ভিজিনি জুবুথুবু সেটা অস্বীকার করছি না ! ভিজিয়ে দিয়েছেন , চিঠিটা বার কতক পড়েছি , ভেবেছি , ভাবতে ভাবতে ঝডো় কাকের মতো ইনবক্সের জানালায় থুবরে থেকেছি ।
ভেবেছিলাম ব্লক করে দেই ব্যস ল্যাঠা চুকে গেল !
করতে গিয়েও পারলাম না কেন ?
প্রশ্ন টা নিজে করেছি বহু বহু বার । অঙুলও কি অবিশ্বাসী হয় কখনো -কখনো ?
হে প্রেম হে নৈশব্দ তুমি তো সোনার মাছি সত্যি সত্যি খুন করেছো ।
আচ্ছা কি করে পারে প্রেম ,কান পেতে রাখতে , কারও বুকের দেয়ালে ?
মানুষ হিসেবে আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি , তা মাঝে মাঝে আমি নিজেই জানি না , তার পরে আছে কত কত সম্পর্কের দাবী , রক্তের দাবী , বন্ধুত্বের দাবী মান সম্মান , সমাজ , সবকিছু মিলে আমি আসলে পিঠমোড়াবাঁধা ।
আমার দ্বারা এমন দগদগে প্রেম -ফ্রেম হবে না । প্লিজ আপনি অন্য কোথায় …..।
আমি ব্যক্তি হিসেবে ভীষণ ভিতু আমার দ্বারা হৃদয় ছেঁড়াখোঁড়া করা সম্ভব নয় ।
প্রেম প্রবাহ যেভাবে নেমে আসে , নামতে নামতে থমকে যায় , ধাক্কা খেতে হবে বলে এই ভয়ে , ধুরমুর করে গড়িয়ে যেতে হবে বলে চুরমার হতে হবে বলে ,এই ভয়ে থমকে, থেমে, পা তুলে দাঁড়াই সাবধানে !
ভাস্করের, ছেনি-কাটা ঘোড়ার উড়ন্ত ব্রোন্জ যেভাবে দাঁড়ায় ঠিক
সেইভাবে।
বিশ্বাস করুন আমিও নিজেকে বলি একবার ভালোবাসতে চেষ্টা করো !
দেখবে কেউ তো আছে বুকের ভেতর তোমার জন্য এক সূর্য ওম পোষে ।
থই থই পিচ্ছিল পথে তোমার চলার পথে পাথরের পাল একের পর এক বিছিয়ে নিরাপদ করে দেবে যাত্রাপথ ।
কবিতার ছন্দে সাজাবে সলমা-চুমকি-জরি-মাখা প্রতিমা । প্রেমের পূজো দেবে , তোমাকে নিয়ে
বহুদূর হেমন্তের তারার বাগান , পর্যন্ত দেখে আসতে পারবে দূর আকাশে ।
কিন্তু আমার হয় না রে সে মনের মতো মন ।
বিশ্বাস করুন এতো সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে আমার আর প্রেম করা হয়ে উঠে না ।
বেজে উঠে সাবধানী হা হা কার ।
ঐদিকে যেও না তুমি আর ।
আপনাকে একটা কথা না বল্লে আসলে অন্যায় হবে , আপনি বেশ লিখেন ,,,
আপনার দীর্ঘ চিঠিটা ছিল আমার জন্য অস্থির ফেসবুকে শান্ত উপহার । কবিতা , ছবি আঁকা গান গাওয়া , আমি এক চিঠিতেই পেয়েছি ।
তবে একটা কথায় বেশ চটে গিয়েছিলাম , যদিও রুপক যমক আর কমরসে আপনি শব্দ বেঁধেছেন তাতে কি ! আমিও বাংলা বুঝি , ইশারা ঠাঁর ঈঙ্গিত গুলো ঠিক প্রথমেই যেভাবে জাহির করেছেন তাতে মনে হয়েছিল লোকটা পেশাদার নারী হান্টার ।
সরি এভাবে বলার জন্য ।
কিন্তু কি আর করা বলুন !
আপনি যেভাবে আল্লাহ হুমা লাব্বায়েক বলে মনের চাতালে পা রাখলেন ।
, তারপর সরাসরি বুকের শিথানে মাথা .. ঠোঁটের মৌতাতে যে করে চাক কাটলেন , একটু বেশী শুধু নয় বড্ড বেশী হয়েগেছে ।
আপনি তো সরাসরি চিতা দৌড় দিয়ে দিলেন মশাই ।
পরিশেষে শুধু এই টুকু বলছি ,
আপনার শৈল্পিক মনের কাছে আমি ঋণী ।
, মানুষটা কেমন সেটা ভাববার অবকাশ আমার নেই , এই নিয়ে এগুবো কি এখানেই থেমে যাবো , ঠিক বুঝতে পারছি না , আমি শত্রুতা চাই না শান্তি চাই ,
যদি ব্লক করে দেই তবে বুঝবেন আমার যাত্রা এই পদ্মা মেঘনাতেই সলিল সমাধী হলো ।
খুব ভালো থাকবেন ।~*~

Najmin Mortuza
দার্শনিক বোধ তাড়িত সময় সচেতন নিষ্ঠাবান কবি। চলমান বাস্তবতাকে ইতিহাস-ঐতিহ্যের পরম্পরায় জারিত করে তিনি কাব্য রূপান্তরে অভ্যস্ত। কাব্য রচনার পাশাপাশি ক্ষেত্রসমীক্ষাধর্মী মৌলিক গবেষণা ও কথাসাহিত্য সাধনায় তাঁর নিবেদন উল্লেখ করার মতো। গবেষণাকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ফোকলোর ও লিখিত সাহিত্যঃ জারিগানের আসরে "বিষাদ-সিন্ধু" আত্তীকরণ ও পরিবেশন পদ্ধতি শীর্ষক গ্রন্থের জন্য সিটি-আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার ২০১২ অর্জন করেছেন।
Related Articles
সিডনিতে সাঁতার কাটতে গিয়ে সাগরে তলিয়ে গেলো বাংলাদেশি ছাত্র রাহাত
ফজলুল বারী: তিন বন্ধু। রাহাত-বাপন-ফয়সল। তিন বাংলাদেশি ছাত্র। তিনজনই বাংলাদেশের কুমিল্লার। অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে এসে তিন জন একসঙ্গে থাকতেন সিডনির ওয়ালি
Questioning the Effectiveness of Technical Cooperation in Bangladesh
An Overview of Technical Cooperation Vision 21 Plan, also known as the Perspective Plan (2010 – 2021), provides a road
English Department admission test result for Dhaka University (DU)
There was a huge storm in the teacup after the Dhaka University (DU) admission test result had published where only


