ভার্চুয়াল চিঠি (পর্ব – ছয়)

ভার্চুয়াল চিঠি (পর্ব – ছয়)

?প্রেম মানে প্রেম ! সেটা যেমনই হোক , পত্রমিতালী, কিংবা চোখে চোখে আঁখমিচুলি, কিংবা ভার্চুয়াল , সবকিছুর মোহ আবেগে যেমন হোক আর সত্যিকার প্রেম ও ভালোবাসার কোন পরিমাপ কিংবা সীমা-পরিসীমা নেই। ভালোবাসার বিষয়টি অন্তহীন। পাললায় ওজন করে কিংবা পরিসংখ্যানের মধ্য দিয়ে তাকে নির্ণয় করা যায় না। উপলব্ধি ও অনুভবের মধ্য দিয়ে প্রেম ও ভালোবাসাকে কিছুটা নির্ণয় করা যায়। মানুষের মধ্যে যে, প্রবল প্রেমশক্তি ও দৈবী প্রেরণা আছে পৃথিবীতে মানুষের মাঝে তার উৎকৃষ্ট বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। পৃথিবীতে অনেক মনীষীগণ নিষ্ঠাবান চিত্তদিয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মধ্য দিয়ে মহামানবে পরিণত হয়েছেন। প্রেম-প্রীতি ভালোবাসার জন্যে অনেকে দেশান্তুী হয়েছেন।
অনেক মনীষী নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে অন্য দেশে গিয়ে সত্য ও সুন্দরের জন্য প্রেমের জন্য পথে পথে ঘুরেছেন । 
কে না হতে চায় প্রেমের গৌতম বুদ্ধ , সিদ্ধার্থ । কে না চায় প্রেমিকার কাঁঠালীচাপার ঘ্রাণ নিতে । প্রেমসুধা বুক ভরে পান করে তৃষ্ণা মিটাতে । 
বন্ধুরা ভার্চুয়াল চিঠির প্রস্তাব পর্বের অংশে দু দুটো চিঠি পর পর প্রেমিকের দিয়ে সাজানো হলো , এরপর প্রেমিকার 
রিপ্লে দিয়ে শেষ হবে প্রস্তাব পর্ব । তারপর যথারীতি পরিণয় পর্ব । যারা ধারাবাহিক ভাবে পড়ছেন, এবং বিভীন্ন গ্রুপে শেয়ার করেছেন আগের পর্ব গুলো , কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি , আর আমার প্রিয় অনলাইন পোর্টাল গুলোকে বিশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি , এবং বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শুভেচ্ছা । পড়তে থাকুন ভার্চুয়াল প্রেমের অনুভূতি গুলো , পত্রে পত্রে ।

সংখ্যা -৬ 
পুনরায় প্রেমিকের ইনবক্স ,

?দূরতমাসু,

আকাশের ইনবক্সে সবুজ জ্যোৎস্নার কাছে গৃহত্যাগী হয়ে যাই। নীলিমার নীলে ও রোদ্দুরে পাখিদের অবারিত ডানা মেলা ওড়াউড়ির মতো তোমার জ্যোৎস্নায় উড়ি।এভাবে সাজাই আকাশে প্রেমের রন্দেভুঁ!

আমাদের প্রেম কোন গার্হস্থ্য খোয়াড়ে বাঁধা পড়বেনা, রাই। আমাদের প্রেম পৌঁছে যাবে কজমিক উচ্চতায়।

প্রেমের পরিক্রমা সঙ্গীতের আলাপ, বিস্তার ও জলদের মতো। তোমাকে এফ বিতে দেখতে দেখতে কেটে গেল তিন তিনটে বছর। বিস্তার ও জলদে যদি যায়, যাক না আরো কিছু যুগ ধ্রুপদী গানের মতো বিস্তারে ও জলদে। বাজুক না আমাদের তন্ময় সময়। শুধু সুরের সংগে তাল লয় যেন কেটে না যায় — সমর্পণ ও তন্ময়তা যেনো মীড়ে মীড়ে অন্তরতর বহে যায় সুরেলা সময়।

প্রেম তা সে বৃন্দাবনে বাহু ও বুকলগ্ন বাৎসায়নিক অভিসার হোক বা ইনবক্সে স্পর্শহীন ভার্চুয়াল শব্দে শব্দে প্রিল্যুড বেয়ে ইন্টারল্যুডে এসে থামুক না কেন, শরীরে প্রেম বেজে ওঠে ঝাঁক ঝাঁক পাখোয়াজ। তার গীতিময় গমকের শব্দ কি শুনতে পাও?

সম্পন্ন অভিসারে বুকে এসো। বুকে এসে মিশে যাও দেহকাব্যের দ্রবন। সম্পন্ন অভিসারে এতোকাল পড়ে থাকা কবন্ধ শরীরে আমার জেগে উঠবে বাহুর উত্থান। এসো, অতৃপ্ত প্রেম বাসনার কাছে এসো, হৃদয়ে এসোনা ছুঁয়ে যাও। স্পর্শ ছাড়া প্রেমের অভিযাত্রা — সে তো দূর থেকে দূরবীনে দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘার শিখরে তুষারে ঝরে পড়া চাঁদের আগুন। আমি তোমার আগুনে দিতে এসেছি আত্মাহুতি।

তোমার শরীর আমার কাছে বুনো আকাঙ্খার শিকার নয়। তোমার শরীর আমার কাছে সেই একটি কবিতা যাকে আমি লিখতে পারিনি আজো। ঈর্ষা হয়, উনিশ বছর বয়সে নেরুদা লিখেছিল ‘টুয়েন্টি লাভ পোয়েমস অ্যান্ড এ সং অব ডিজপেয়ার’ কবিতার ইরোটিকার্ট। প্রথম প্রথম সামাজিক জীবজন্তুরা তাকে কবিতা বলে গ্রহণ করতে পারেনি। ভর্ৎসনা করেছিল। যেমন শার্ল বোদলেয়রের লা ফ্লার দ্যু মাল এর কবিতাকে যৌন বিকারের কবিতা বলেছিল। ভাবখানা এমন যেনো, তারা সবাই এসেক্সুয়াল, অযৌন।
দূরতমা, এসো, এই রাত্রির রাস পুর্ণিমায় এসো। স্নাত হই জ্যোৎস্নার আলোয়। ভিজে যাই লালনের তান্ত্রিক জ্যোৎস্নার জলে। 
আমার কাছে তোমার আকর্ষণ কোন ভাবেই তোমার শরীরের বাঁক আর অঙ্গের স্ফীতি নয়। নারী সৌন্দর্য নির্ভর করে না অঙ্গের জোয়ারে আর ত্বকের রঙে। নারীদেহের সুন্দরতা কমপ্লেক্সান বা ত্বকের রং নির্ভর কিছু নয়।একটুখানি অববায়িক। প্রায় পুরোটাই ইনট্যান্জিবল, অধরা। সুন্দর নির্ভর করে তার ইন্টেলেকচুয়ালিজম, ধীমতিত্ব, ব্যক্তিত্ব ও ফিল্যানথ্রোপির বোধের ওপর। 
তোমার শরীর সুন্দরকে যখন দেহকাব্য বা শরীর কবিতা বলি, গতরে শুধু কাম খুঁজি না; খুঁজি কবিতার পঙক্তি — গড়তে থাকি ভালোবাসার শরীর পর্বে পর্বে স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, ব্ল্যাংক-ভার্স, অক্ষরবৃত্ত ছন্দে। গেঁথে তুলি অঙ্গ তোমার নিপুন উপমা, মেটাফর ও রূপকল্পে। তোমার সুন্দরে খুঁজি কবিতার ভাস্কর্য, খুঁজি ভাস্কর্যের কবিতা। তোমার শরীর তো ভাস্কর্য আর কবিতার যৌথ বিন্যাস — তার গভীরে বাজে সংগীত! 
সুন্দর কখনো কখনো টাইরান্ট ও বটে। সুন্দর অত্যাচার করে। এই যে তুমি বুকের ভিতর থেকেও অনঙ্গ। এই যে তুমি এসেও আসো না। একবারও অাসো না ! রুদ্ধশ্বাসের মতো কস্ট যাতনায় হাহাকার করতে থাকে নিশিদিন।
তুমি যাই হও না কেন, “তোমার অরূপ মূর্তিখানি ফাল্গুনের আলোতে বসাই আনি।” 
তোমার শরীর-কবিতা সে তো কবির শিল্পদেশ। তোমার দেহকাব্য আমার নির্বাসিত জীবনের ভিতর আরেক নির্বাসন। উড়ছি আবার অনেক আকাশ, বৈরী মেঘের দেশ।মেঘনা থেকে অতলান্তিক সাগর সাঁতরে পৌঁছেছি স্বপ্নের উপকূলে উন্মূল জীবন। আবার ভাসছি তোমার দিকে, তোমার সমুদ্রের দিকে। কিন্তু নোঙর ফেলবো কোথায়? নোঙর ফেলার তট জুড়ে জমেছে দৃষ্টিভূক কুয়াশার কাঁচ। তোমাকে স্পর্শের সীমানায় পাইনা খুঁজে। জানি, কুয়াশার ওপারে রোদ্দুর, কুয়াশার ওপারে তোমার রোদেলা শরীর, শিল্পের দারুচিনি দ্বীপ। শুধু চলেছি নির্বাসনের ভিতর আরেক নির্বাসন। 
প্রিয় সুন্দর! তুমি হঠাৎ কোথা থেকে এসে আমার 
চোখ দুটোকে পৃথিবীর তাবৎ রূপ থেকে তুলে এনে তোমার রূপে বসিয়ে দিলে। এখন তো কিছুই দ্যাখে না চোখ তোমাকে ছাড়া। 
“ন্যায় অন্যায় জানি নে, জানি নে, জানি নে, 
শুধু তোমারে জানি
ওগো সুন্দরী। নেবে মোর প্রাণঋণ — বাঁধা রবে চিরদিন।”
জলনিতল থেকে উঠে এলে তুমি উদ্ভিন্ন যৌবন, বার্থ অব ভেনাস। সমুদ্র মন্থন করে যেমন তুমি উঠে আসো জোয়ারপ্রবণ, তেমনি মন্থনে এসো, জেগে উঠি যমজ মানব। গেয়ে উঠি ভালোবাসার কবিতা ও কামের কোরাস, যমজ ম্যাড্রিগাল।
দাও ধ্রুপদ দাও শরীর 
আধখানা স্বর্গের আধখানা মর্ত্যের।

চিঠিখানা শেষ করবার সময় নেরুদার অগনন কবিতার পঙক্তিমালা আমাকে দুলিয়েছে প্রবল। কোনটা রেখে কোনটা বলি। দিশেহারা! শেষে এই লাইন দুটো বলে ফেললাম। 
“I love you as certain dark things are to be loved, in secret, between the shadow and the soul”
কাল ফের গৃহত্যাগী হবো তোমার জ্যোৎস্নায়। সাজিয়ে রেখো আকাশে প্রেমের রন্দেভূঁ।

প্রতীকী ছবি
Najmin Mortuza

Najmin Mortuza

দার্শনিক বোধ তাড়িত সময় সচেতন নিষ্ঠাবান কবি। চলমান বাস্তবতাকে ইতিহাস-ঐতিহ্যের পরম্পরায় জারিত করে তিনি কাব্য রূপান্তরে অভ্যস্ত। কাব্য রচনার পাশাপাশি ক্ষেত্রসমীক্ষাধর্মী মৌলিক গবেষণা ও কথাসাহিত্য সাধনায় তাঁর নিবেদন উল্লেখ করার মতো। গবেষণাকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ফোকলোর ও লিখিত সাহিত্যঃ জারিগানের আসরে "বিষাদ-সিন্ধু" আত্তীকরণ ও পরিবেশন পদ্ধতি শীর্ষক গ্রন্থের জন্য সিটি-আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার ২০১২ অর্জন করেছেন।


Place your ads here!

Related Articles

Mujibul Huq: As I knew him

On 13th January, I learned with great sadness former Cabinet Secretary Mujibul Huq had passed away in Dhaka. He was

ফাঁসির মঞ্চ যুদ্ধাপরাধী সাঈদিকে ডাকছে

ফজলুল বারী: ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বিচিন্তায় প্রতি সপ্তাহে রাজাকারদের তালিকা ছাপা হচ্ছিল। এই তালিকাটি ছিল আমার সারাদেশ পায়ে হেঁটে

London: Ditio Bangla

লন্ডনঃ দ্বতিীয় বাংলাঅধ্যাপক নজরুল ইসলাম হাববিীশব্দ বাক্যের প্রাণ। বাক্য রচনার চোখ। চোখ দিয়ে আমরা যেমন দেখি, একজন লেখক বাক্য দিয়ে

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment