স্মৃতির খেরোখাতা
“যতই তার রুপের খ্যাতি পূণ্যযশ বাড়ে
ততই মেয়ে একলা হয়, দু:খী বারে বারে”
এই যে আমার রোজকার লেখা যারা পড়ছেন তাঁরা নন, যারা এখনো পড়েননি তাদের দিকেই, আমি বাড়িয়ে দিয়েছি হাত, দেশ বিদেশের আলো এসে পড়া স্মৃতি, বিস্মৃতির এই বারান্দায়, এক মুহুত্ব এসে বসবার জন্য, আমার তরফ থেকে সাদর আমন্ত্রণ। আমার সাতাশ এপ্রিল এই দিন থেকে আজ অবধি, ঝন্ঝাবিক্ষুদ্ধ দিন গুলোতে উঠে দাঁড়ানোর প্রাণশক্তি কিভাবে জুগিয়ে দিয়েছিল এই রোজনামচা -“নাজ যখন ঝরিল হাসপাতালের শিথানে অবসন্ন”
সব মিলিয়ে নানা ভাবে নানা সুরে লেখাগুলো বলেছে জীবন থেকে, বেঁচে থাকার নির্যাস, সম্পূনর্রুপে গ্রহণ করার কথা। দু:খ কষ্ট তো জীবনকে নতুন করে চিনতে শেখায় । এমনিতেই কাল বড় নিষ্ঠুর, কে কাকে রাখবে , কাকে মুছে দেবে বলা মুশকিল। অনেক দিনের বা একটি মুহুত্বের্র দেখার কোন ঘটনার স্মৃতি যদি, মনে অনুরণিত হয়, তারই উপলব্ধী ও ইম্প্রেশন হলো স্মৃতি কথা।
স্মৃতি মানেই অতীতের ঠিকানা, স্মৃতি মানে গভীর অন্তঃস্থল থেকে, উঠে আসা হারানো কিংবা না হারানো সুখের অথবা দু:খের, অনুভুতিময় না লেখা কাহিনী ! এক চাওয়া পাওয়ার কাহিনী, এক দেখা বলার কাহিনীর অমোঘ দলিল হলো এই স্মৃতির সরণি।
এই প্রথম আমার হাসপাতাল যাপন নয়, এর আগেও আমি বহুবার হাসপাতাল যাপন করেছি, আমার তিনবার প্রসব কালীন সময়, তারপর রায়ার জন্য দেশের বাইরে প্রায় একমাস, এরপর বৈবাহিক সুত্রে পাওয়া আর এক বাবা (শ্বশুর) উনার সাথে দীর্ঘ দিন, হাসপাতালের ভাত,পানি কষ্ট, ঘুমহীনতার সাথে আমার নিবিড় সম্পর্ক।
আমার প্রথম পুত্র সন্তান জন্মের দুদিন পর স্বর্গারোহণের পর, আমি শোকে উম্মত্ত হয়েগিয়েছিলাম, শরীর মন দুটোই ভেঙ্গে গিয়েছিল। যেটুকু কতর্ব্য না করলেই নয়, ততটুকু ছাড়া আর কিছু করি নাই। দুটো বছর আমি আমার বাইরের জগতের সাথে কোন সম্পৃক্ততা রাখিনি, কারো সাথে দেখা করা গল্প করা, কিছুই ভাল লাগতো না, নিজেকে নিয়ে পালিয়ে বেড়াতাম সবার মাঝে থেকেও একা একা, সেই দুবছর আমি আমার সন্তান হারানোর ব্যথাসহ আমার প্রাণের শহর ছেড়ে ঢাকায় এসেছিলাম। সে সময় অনেকগুলো অভাবের মুখোমুখি রোজ হয়েছি, চারপাশ থেকে শুনেছি কত কথা কত হাসি, কত কান্না কত উপহাস কত অভিসম্পাত, কত অনুকম্পা, সন্তান হারানোর দগদগে ঘা তখনো আমাকে কষ্ট দিতো, যা সারাজীবন বয়ে বেড়ানোর ঘা!
সে সময়টাতে আমি নিজের চারপাশে একটা ডিমের খোলোস এটে নিজেকে বন্দী করলাম ভেতরে, একমনে লেখতে থাকলাম, যদিও লেখার অভ্যাস আমার ছোটবেলা থেকে, কাউকে কখনো দেখাতাম না, কেবল একটা মাত্র পাঠক ছিল আমার। তিনি আমার বাবা! আমাকে ঘটনার সুত্র ধরে দিয়ে বলতেন মা এটা নিয়ে লেখ তো! আমি গড় গড় করে লেখে যেতাম পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা! আব্বা বলতেন এটা পরিক্ষার খাতা না রে বেটি! সময় বাঁধা নাই, তাড়িয়ে তাড়িয়ে লেখ চিন্তা করে লেখ, শব্দের গাঁথুনিটা মনেগ্রাহী হতে হবে। তবেইনা লেখার সাথর্কতা! আমি ছোট বেলায় খুব খেলাড়ু ছিলাম, চৈত্রের দুপুর কি আর শ্রাবণের ধারা কি আমি হলাম ঝাপতালের কোলা ব্যঙের মত, যেই না বন্ধুদের আওয়াজ পেতাম আর কে পায় মোরে!
আমার সবচেয়ে প্রিয় খেলা ছিল মাটির রাস্তায় গরুর গাড়ি ট্রাক যাওয়ার। পর এক স্তর ধুলোর গালিচা পরে, সেই ধুলোয় পা ডুবিয়ে হাটতে আমার কি যে আনন্দ আহা এখনো ভাবলে শিহরণ অনুভব করি। হাঁটু অবধি ধুলো গুলো এমন করে জড়িয়ে থাকতো দেখলে মনে হতো মোজা পড়ে আছি! আব্বা পুকুরে নিয়ে গিয়ে পা ধুয়ে দিতো সাথে ঝামা ইটের টুকরো, বলতো আজ তোর পা এটা দিয়ে ঘষে দিবো, কেমন নোংরা করিস! আমাকে পুকুর জলের আয়না দেখিয়ে বলতো দেখ কত বিশ্রী দেখতে তুই, সেই বিশ্রীর মধ্যে শ্রী ঝুলে থাকতো!
এরপর শুরু হলো নিয়মের জীবন, আর দিন দুপুরে রোদে বৃষ্টিতে খেলা নাই। রোজ দুপুরে আব্বা আমাদের দু ভাইবোন কে দুহাতে জড়িয়ে শুয়ে পরতেন, বাইরে তখন বন্ধুরা পুকুর পাড়ে কুমির তোর জলে নেমেছি খেলায় মত্ত। আমি তাকাই ভাইয়ের দিকে ভাই তাকায় আমার দিকে। আব্বার হাত বেড়ীর মত বাঁধা, কার শক্তি খোলার। প্রথম প্রথম আমরা খুব কষ্ট পেলেও পরে আমরা অপেক্ষা করতাম আব্বার ফেরার, আমি ঘর মুখি হোলাম তখন পঞ্চম শ্রেনীতে উঠেছি কেবল। সে সময় আব্বার কাছে শুনলাম ধ্রুপদী সংঙ্গীত, পঞ্চ সংগীতের শ্রষ্টাদের নাম, লালন, হাসন, আব্বাসউদ্দীন, আব্দুল আলীম! আরো কত নাম, সাথে গানের বানী ও সুরের তারতম্য। খেয়াল ঠুমরী গজলের সাথে পরিচয় হলো, পরিচয় হলো রুনা লায়লা, নিয়াজ মাহমুদ, বশির, জাব্বার, তালাত মাহমুদ, রেশমা, মোহাম্মদ রফি, মেহেদী আরো কত বরেণ্য শিল্পি, যাদের ক্যাসেট শুনে শুনে আমি আমার কিশোরী বয়স পার করেছি, যে সময় টাতে সবাই হিন্দী সিনেমার গান আদনান বাবু, সোলস মাইলস নিয়ে মেতে আছে আমার বাসায় এমন ক্যাসেট পাওয়া গেলে আব্বা ফিতা কেটে রেখে দিতো ।
আমার গান শোনার কানটা ঠিক অন্য রকম হয়ে গেল। ভাল লাগতে শুরু করলো কীতর্ন সুর। এমনি করে শুরু হলো সিনেমা দেখার, আমার ১০/১১ বছর এমন হবে আব্বা আমার এক জন্মদিনে শরৎ সমগ্র এনে দিল, আমি আর আমার ছোট বেলার বন্ধু সুরাইয়া মহা আনন্দে বই নিয়ে পড়তে বসে একে অপরের চোখ চাওয়া- চাওয়ি করি, কিছুই তো বুঝি না, পরে আব্বা পড়ত আমরা শুনতাম উনি বুঝিয়ে দিতেন! দেবদাস প্রথম শেষ হলো তারপর একদিন , দিনাজপুর বোস্তান সিনেমা হলে দেখে এলাম আব্বা সহ বুলবুল আহাম্মেদ অভিনীত দেবদাস। বাসে বসে জিজ্ঞেস করতো অমি সিনেমা দেখে কি বুঝলাম। প্রেম আসলে কি? বলেছিল মা প্রেমভাব বুঝতে হবে! প্রেম হীন কিছু নেই, প্রে ই সব – ইবাদত বন্দেগী জিন্দেগী। আব্বার কাছে প্রথম জেনেছিলাম নারী হয়ে জন্ম নেওয়ার মাঝে কত সম্মান, ইতিহাসের নারী মিথের নারী – কুন্তি দ্রোপদী সীতা রুপবান পাবর্তী লাইলী মা ফাতেমা, রাবেয়া বসরী উদাহারন টেনে বলতো!
আমার বাবা উর্দূ হিন্দী উড়িয়া অসমিয়া ভাষা জানে, আব্বার কাছেই আমার হিন্দী উর্দূ শেখা প্রথম। তখনকার সময় ডি ডি ন্যাশনাল চ্যানেলে ইন্ডিয়ান প্রাদেশীক মুভি গুলো বাবা মেয়ে দেখতাম সে সময় শিখেছিলাম বানিজ্যিক মুভি আর ব্যতিক্রম মুভি সম্পর্কে। আমার সিনেমাপ্রীতি বেড়ে গেল, তারপর একদিন সৈয়দপুর মনে নেই সাল টা, ঝড়ের দিনে আব্বা আমাকে রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত, সিনেমা দেখিয়ে আনলেন, আব্বার চোখে জল, কিন্তু আমার কান্না পাচ্ছে না, হয়ত গভীরে যেতে পারিনি, ঘটনার মমর্মূলে আঘাত হানেনি, সেদিন বাসায় ফেরার পথে বললো, শ্রীকৃষ্ণ ভগবান ও রাধার কথা, তাদের প্রেম কথা। দুদিন পর বাসায় একটা পুরোনো ক্যাসেট দেখলাম বুঝলাম পলাশ ঠাকুর কাকু দিয়েছে নিঘার্ত, আব্বার বন্ধু! পরদিন স্কুলে থেকে ফিরছি আমি আর রুনা, গেটের কাছে এসে থমকে যাই, একটা মধুর সুর, মন ব্যকুল করা, ভেতরে এসে বুঝলাম আব্বা অন্য মুডে আছে! ওই যে গানটা আমার মনে গেঁথে গেল আজো ভুলিনি!
” শ্যাম তেরে বানসী পুকারে রাধা নাম
লোক কারে মিরা কো ইঁউ হি বদনাম”
এই গান শুনে আব্বা শুনালো মিরা ও রাধা দুই নারীর কৃষ্ণের প্রতি ভক্তি ও ভালবাসা, জানলাম প্রেম তত্ত্ব। একজন মানুষ কে কত রুপেই না ভালবাসা যায়। আমি ভাল গাইতে পারি না কাউকে শোনাবার মত গানের গলা নেই আমার, কয়েকটা সিলেকটিভ গান পারি যে গুলো নিজের জন্য গাই। ছোট বেলায় আব্বাকে শোনাতাম, এখন হয়ত ভুলে গেছি!
এমন অনেক স্মৃতি আছে আমার হাসপাতালে আসার পর রোজ নিয়ম করে বাংলাদেশে ফোন করি! আম্মা ফোনে কথা বলে আব্বা বলতে পারে না, কথা বললেই জড়িয়ে যায় গলা, লাউড স্পিকারে শোনে, আমার ব্যথার উহ্ টা আমি আব্বার কন্ঠে শুনতে পাই! তার অনেক বয়স হয়েছে, রোগে শোকে জড়ায় আমার বাবাও শেষ পথের যাত্রী। ইদানীং কিছু ই মনে রাখতে পারে না। আজ সকালে যখন ফোন দিলাম বল্লাম ভাল আছি, বললো কি করছি, বল্লাম গান শুনতেছি কি গান শুনিস মা? তখন বেগম আখতারের একটা গান শুনছিলাম, উনার কোন গানটা শুনতেছিস? ”
আজ জানে কি জিদ না করো, বলতে না বলতে আব্বা পাঁচ ছ’টা লাইন বলে দিলো, বুঝলাম তার স্নায়ু জেগে উঠেছে তার প্রিয় গা নে। যে আব্বা আমার ছোট মেয়ের নাম ভুলে যায় রোজ বলে দিতে হয়, সে কিনা গানের লাইন এখনো ভুলেনি সত্যি আমি বিস্মিত হয়েছি বটে।
ভাল লাগলো আজ এই সকাল দুপুর হাসপাতালের ভেতর। জীবন কি জেনেছিল শতাব্দীর সবচাইতে না লেখা ভীষণতম আবেগ নিয়ে আজ স্মৃতিকাতর হবো ভাবিনি। একেই বলে সবর্গ্রাসী সময়ে সর্বংসহা জীবন। তবে ভালোবাসা সকলের চেয়ে বড়, আজ যে মানুষটার মুখোচ্ছায়া আমার লেখায় দেখতে পাবেন তিনিই আসলে আমায় শিখিয়েছিলেন ভালোবাসার আসল সমীকরণ। আমি সেই ভালোবাসার জলে ধ্বসে যাওয়া বালির মত খুবলে খুবলে যাচ্ছি, দুরে কোন কালো খেয়া বোঝা যায়, দেখা যায় না কিছু।
Najmin Mortuza
দার্শনিক বোধ তাড়িত সময় সচেতন নিষ্ঠাবান কবি। চলমান বাস্তবতাকে ইতিহাস-ঐতিহ্যের পরম্পরায় জারিত করে তিনি কাব্য রূপান্তরে অভ্যস্ত। কাব্য রচনার পাশাপাশি ক্ষেত্রসমীক্ষাধর্মী মৌলিক গবেষণা ও কথাসাহিত্য সাধনায় তাঁর নিবেদন উল্লেখ করার মতো। গবেষণাকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ফোকলোর ও লিখিত সাহিত্যঃ জারিগানের আসরে "বিষাদ-সিন্ধু" আত্তীকরণ ও পরিবেশন পদ্ধতি শীর্ষক গ্রন্থের জন্য সিটি-আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার ২০১২ অর্জন করেছেন।
Related Articles
Consular Camp in Melbourne on Friday 11 April Saturday 12 April 2014
Dear Respected Community Members Bangladesh High Commission (Canberra) has organized a Consular Camp in Melbourne on 11th & 12th April
সিডনিতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে ‘গানে গানে জোছনা’
‘কী বা আছে বলো দেবার মতসংকোচে তাই আমি অবনত।আছে শুধু মোর ভালবাসাতাই দিয়ে যেতে চাই উজার করে’—এ আমার কথা নয়।
China’s proposed dams on Brahmaputra River trigger concerns in India : Tit for Tat for India ’s water diversion policy
Unilateral water diversion or withdrawal of water from international or common rivers has been the long-standing policy of India .






