নৌকায় কেন ভোট দেবেন

নৌকায় কেন ভোট দেবেন

দেশে থাকতে শেষ ভোট দিয়েছিলাম ১৯৯১ সালে। আইএসআই, শ্যাম চাচা, সুবিধাবাদী শ্রেণী আর দেশ প্রেমিক বাহিনীর একাংশের কারনে আমার ভোটটি বৃথা গিয়েছিল। জামাতের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে, যদিও বিএনপি নিজেই জানত না যে জয়ী হবে। দেড় দশক নামে বেনামে সামরিক বাহিনী দেশ শাসন করেছে, হটাত করেই আওয়ামী লীগের মত একটা গণমুখী এবং স্বাধীনতা য়ুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া রাজনৈতিক দলকে সামরিক বাহিনী ও পনের বছরে বেড়ে উঠা সুবিধাবাদী ও নীতি বিবর্জিত মধ্যবিত্ত এবং ফেঁপে উঠা আমলা শ্রেণী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আসতে দেয় নাই। মেনে নিতে কষ্ট হয়েছিল; বাঙালি জাতিকে আমি মনে মনে অভিসম্পাত দিয়েছিলাম। সেই কষ্ট নিয়েই একদিন দেশান্তরী হলাম। সেই থেকে দেশের ভোটার লিস্টে আমার নাম নেই, ভোটও নেই। তবে মনের ভোট নৌকাতেই রয়ে গেছে।

ডিসেম্বর ৩০ নির্বাচন এই এল বলে; আর মাত্র বার দিন। অনুমান করি প্রতিদিনই ভোট ঈদ। নির্বাচন ও ভোট ছাড়া আর কোন কিছু আলোচনা হয় কিনা সন্দেহ। ভোট যেহেতু দিতে পারছি না, তাই ভাবলাম এই লেখা দিয়ে আমার রাজনৈতিক দর্শনের উল্টোদিকের একজন ফেসবুক বন্ধুকেও যদি নৌকায় ভোট দেয়াতে পারি, তবে বুঝবো আমার ভোট দেয়া হয়েছে।

দীর্ঘ একুশ বছর পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দেশ শাসনের সুযোগ পেয়ে দেশবাসীকে সত্যিকারের গনতন্ত্রের স্বাদ দিয়েছিল, যা ১৯৭৫ এর পর বাঙালি ভুলে গিয়েছিল। যারা উৎসাহী তারা সেই সময়ের উন্নয়নের খতিয়ান পূর্ববর্তী সরকারগুলোর সাথে মিলিয়ে দেখতে পারেন। ১৯৯৮ সালের অপ্রত্যাশিত বন্যা (সে সময় আমি দেশে বেড়াতে গেছিলাম) হাসিনা সরকার যে ভাবে সামাল দিয়েছিল, তাতে বিদেশী সরকার এবং তাদের সংস্থাগুলোও অবাক হয়েছিল কারন একজন মানুষও না খেয়ে মারা যায় নাই। দেশের অর্থনীতি, কৃষি, খাদ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, ইলেকট্রনিক মিডিয়া- সব খাতকেই একটা লাইনে দাড় করিয়ে দিয়েছিল- যা এগিয়ে নিতে আরও দুই মেয়াদের দরকার ছিল। প্রথমবারের মত শান্তিপূর্ণ ভাবে আওয়ামী লীগ কেয়ার টেকার সরকারের কাছে ক্ষমতা দিয়ে আবারও নির্বাচিত হবার আশায় নির্বাচনী প্রচারণায় নামে। কিন্তু নীলকুঠী আর উত্তরকুঠী এবং আন্তর্জাতিক সমীকরণ বিএনপিকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। ‘৭১ এর খুনি রাজাকার আল্ বদরদের মন্ত্রী বানানো হল, এদের গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা- জাতি তাও দেখল। বাংলা ভাই জাগল। আর শুধু হাওয়া ভবন আর খাম্বা আর কমিশন। পূর্ণিমা, সাংবাদিক, আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, নেতা- কাদের খুন করা হয় নাই? পুর দেশ জুড়ে একসাথে বোমাবাজি, ধর্মীও গোঁড়ামিদের শক্তিশালী উত্থান হল। শেখ হাসিনা এবং তাঁর দলকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে চালানো হল গ্রেনেড হামলা- যা রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল। দশ ট্রাক অস্ত্র আমদানি- ভারতের আসাম রাজ্যকে অস্থির করার লক্ষ্য নিয়ে আইএসআই এর হয়ে কাজ করা- জাতি ভুলে নাই। দেড় কোটি ভুয়া ভোটার লিস্ট, হাস্যকর নির্বাচন কমিশন, বিচারপতিদের অবসর বয়স বাড়ানো- সবই বিএনপি করেছিল। এরা কেয়ার টেকার সরকার প্রথাটাকে পচিয়ে ফেলে, যার ফলশ্রুতি ছিল আজব ধরনের দুই বছরের সামরিক বাহিনীর বেকাপে ফখ্রুদ্দিন আর মইন উদ্দিনের সরকার। এরাও বিএনপির প্রতি কোমল ছিল, যে কারনে শেখ হাসিনাকে প্রথমে গ্রেফতার করে, দেশে আসতে বাধা দেয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকা সত্ত্বেও এই দলেরই বেশি নেতাকে গ্রেফতার ও হয়রানি করা হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে যুবরাজ ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের কার্যকলাপ যখন বেরুতে লাগলো তখন মইনুদ্দিন সাহেবদের দাবার ছক উল্টে যেতে লাগলো। ছেড়ে দে মা করতে করতে নির্বাচন দিয়ে নিজেরাই দেশ ছাড়া হয়ে গেলেন, দেশে আসতেও ভয় হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিশাল গরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। সেই থেকে গত দশ বছর আওয়ামী লীগ দেশ শাসন করছে।

অর্থনীতির জিডিপি, বিদেশ থেকে আসা রেমিতেন্স, মুদ্রাস্ফীতি- ইত্যাদি সংজ্ঞাকে দূরে রেখে শুধু দৃশ্যমান উন্নয়ন ও স্থাপনার দিকে একটু তাকালেই বুঝা যায় যে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী সেতু, নতুন নতুন ফ্লাই ওভার ও সড়ক, রেল লাইন, পুর দেশকে একটা নেটওয়ার্কের ভেতর নিয়ে আসা হচ্ছে। যোগাযোগ যে কি গুরুত্বপূর্ণ তা দেশের বাইরে না এলে বুঝা যায় না। তিনশ কিলোমিটার সড়ক আড়াই ঘণ্টারও কম সময়ে চলে যেতে পারলে দেশবাসী বুঝবে ভাল সড়ক কি জিনিস। গেলবার দেশে গিয়ে দেখি বিদ্যুৎ কোন সমস্যা নয়- গ্রামেও বাতি জ্বলে। ইলেকট্রনিক মিডিয়া, ইন্টারনেট, ফোন ব্যবসা বাণিজ্যকে অনেক গতিময় করেছে। কৃষিতে তো কৃষক এবং কৃষিবিদগন বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন। দ্রব্য মুল্য সহনীয় এবং ক্রয় ক্ষমতা অনেক বেড়েছে। নতুন নতুন হাসপাতাল হচ্ছে, ভাল ডাক্তার তৈরি হচ্ছে। অনেক ইউনিভার্সিটি হয়েছে- তবে মান নিয়ে প্রশ্ন আছে, আশা করি সময়ে ঠিক হয়ে যাবে।

এই সরকারের একটা বড় কৃতিত্ব হল ধর্মীয় মৌলবাদকে শক্ত হাতে দমন, যা আন্তর্জাতিক মাধ্যমে প্রশংসিত হয়েছে। ভারতের সাথে সমুদ্র এবং সীমান্ত সমস্যার সুরাহা- অনেক বড় ব্যাপার, যারা আন্তর্জাতিক আইন জানেন তারা ভাল বলতে পারবেন। তিস্তা চুক্তি হয়েও হচ্ছে না, ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মারপ্যাঁচের কারনে। তবে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও সংবাদ মাধ্যমেও বাংলাদেশের উপস্থিতি লক্ষণীয়। বাংলাদেশকে এখন এরা উন্নয়নের মডেল মনে করছে। দেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ। বাজেট করতে প্যারিস আর জাপান ছুটতে হয় না- নিজের অর্থেই আমরা এখন উন্নয়ন বাজেটও করতে পারি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আমাদের এখন অনেক বড়।

এই সরকারের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালি চেতনার প্রসার ঘটানো। আমাদের সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু হল বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ। ‘৭১ এর ঘাতক রাজাকার আলবদরদের বিচার ও শাস্তি হয়েছে, বিচার হচ্ছে- এইসব আবর্জনা দূর করে দেশকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। সম্পূর্ণ আসতে সময় নেবে, বহুদিনের আবর্জনা যে! বঙ্গবন্ধুর কিছু সংখ্যক ঘাতকের ফাঁসি হয়েছে, অন্যরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে। সব জাতির কিছু অহঙ্কারের বিষয় থাকে, আমাদের আছে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ- যা সব কিছুর উপরে। আপনি যদি বাংলাদেশকে বিশ্বাস করেন, তবে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে মেনে নিতে হবে। আপনি যে কোন দল করতে পারেন, কিন্তু ওই বেসিক বিষয়গুলো মেনে নিয়েই আপনাকে রাজনীতি করতে হবে। আপনি দেশে রাজনীতি করবেন কিন্তু মৌলিক বিষয় অস্বীকার করবেন, তবে আপনি রাজনীতি দুরের কথা, বাংলাদেশেই আপনার স্থান হওয়া উচিত না। মেয়ে চরিত্র ছাড়া আপনি গল্প, উপন্যাস, নাটক, সিনেমা লিখতে বা বানাতে পারেন, কিন্তু রাজনীতি ছাড়া পৃথিবীতে কোন যুদ্ধ হয় নাই। আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধের পেছনে স্বাধিকারের রাজনীতি ছিল, সেই রাজনীতির একটা দল ছিল, তা হল আওয়ামী লীগ, আর এই দলের প্রধান নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এটি হচ্ছে একটা মৌলিক সহজ সরল সত্য। এটি মেনে নিয়ে কাজে নামুন, দেখবেন আপনার গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে না। হাসিনা সরকারের এগিয়ে যাবার এটা একটা বড় নিয়ামক যা মানুষকে জাগিয়ে ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।

এই সরকার অনেক বড় বড় কাজ হাতে নিয়েছে যার অগ্রগতি দৃশ্যমান। আমরা দেখেছি বিএনপি সরকার কি ভাবে ২০০১ এ আওয়ামী লীগের রেখে আসা কাজগুলো নষ্ট বা বাতিল করেছে। এর ভেতর শুধু হিংসা আর পরাজয়ের প্রতিশোধই ছিল, দেশকে এগিয়ে নেবার কোন পদক্ষেপ ছিলও না, কারন যুবরাজ আর তার পালের সীমাহীন লোভ। তাই গত দশ বছরে সরকারের নেয়া কাজগুলোকে সফল সমাপ্তি দিতে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে দেশবাসীর অন্তত আরও এক মেয়াদ নির্বাচিত করা খুবই দরকার। দশ বছর সময় দিয়েছেন, আর পাঁচ বছর দিন- দেখবেন দেশ আরও এগিয়ে গেছে। দেশে দুর্নীতি এবং ব্যাঙ্ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা আছে- কেউ অস্বীকার করবে না, এমন কি প্রধান মন্ত্রী নিজেও। তাই এবারের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রধান বিষয় দুর্নীতি দমন। তবে আপনি যদি ইতিহাস ঘাঁটেন, তবে দেখবেন যে যখন কোন জাতি উন্নয়ন দশার ভিতর দিয়ে যায়, তখন সমাজে দুর্নীতি বৃদ্ধি পায়, ধীরে ধীরে যখন সমাজের উপর বিশ্বাস জন্মায়, দুর্নীতি আপনা আপনি কমে আসে। আজকের সেরা দেশগুলো একই ভাবে এগিয়েছে, দুর্নীতি কমিয়েছে। এখানে কোন মেজিক বুলেট নাই। তবে চেষ্টা থাকতে হবে- রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞাসহ।

আমি আমার সম্মানিত ভিন্নমতাবলম্বী বন্ধুদের বলব দীর্ঘ মেয়াদি চিন্তা করে এবারে নৌকায় ভোট দিন, আপনার ক্ষোভকে একটু দমিয়ে জোরসে বলুনঃ

জয় বাংলা,
জয় বঙ্গবন্ধু

দেখবেন বিশ্বাস ও চলার পথ অনেকটাই বাধাহীন হয়ে গেছে।

তারিক জামান
ক্যানবেরা, ১৯/১২/২০১৮


Place your ads here!

Related Articles

মুক্তিযুদ্ধে নতুন প্রজ্ম্ম: ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক অবিরাম সংগ্রাম

পহেলা মার্চ। দিনটি আমার জীবনে অবিস্মরনীয় হয়ে আছে। আজ থেকে ৪২ বছর আগে এই দিনে একবুক স্বপ্ন নিয়ে আমি আমার

বিদায়ী হাই কমিশনারের মাতৃভাষা প্রেম, এবং জাতীয় তথা বৈশ্বিক দায়িত্ববোধ

নির্মল পাল: বাংলা’র মহান একুশে’র আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বৈশ্বিক মর্যাদাপ্রাপ্তির সুবাদে একুশের চেতনার বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জনের মাধ্যমে পৃথিবীর সকল

Migrants and Remittances: Strategies for Future

The remittances from migrants contribute significantly to Bangladesh’s socio-economic development. The remittances have a multiplier effect not only for the

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment