বিশ্বপটে ‘শহীদ মিনার’ এবং ‘জাতীয় স্মৃতিসৌধ’ – উপাখ্যান

বিশ্বপটে ‘শহীদ মিনার’ এবং ‘জাতীয় স্মৃতিসৌধ’ – উপাখ্যান

বাংলা, বাঙালি এবং বাংলাদেশের অস্তিত্বের সাথে ওতপ্রোতভাবে সংকরায়িত হয়ে মিশে গেছে ‘শহীদ মিনার’। যা শুধুই একটি স্থাপত্য নয়; নয় একটি দৃষ্টি নন্দন স্থাবর প্রতিকৃতি, ভাস্কর্য অথবা মূর্তি। এটি নয় একটি মাজার, বা স্মৃতিসৌধ, অথবা মিনার- যা শুধুই সালাম, রফিক, জাব্বার, বরকত, শফিকের আত্মত্যাগের স্মৃতি রোমন্থনে বা তাদের বিদেহী আত্মার প্রতি সন্মান জানানোর জন্য নির্মিত।

অধুনা বাংলা সংস্কৃতি ও কৃষ্টিতে ‘শহীদ মিনার’ মানেই মাতৃভাষা ‘বাংলা’ রক্ষা ভিত্তিক জাতীয় চেতনার সমন্বিত প্রতিফলনের ‘মূর্ত প্রতীক’; বাঙালি চেতনাদীপ্ত মাতৃভাষা’র সাথে সামাজিক ও আত্মিক সেতুবন্ধন; এবং সুরক্ষার অঙ্গীকারি চেতনার উন্মুক্ত স্থাপত্য কলা। এটি মাতৃভাষা ভিত্তিক সুদৃঢ়তম ঐকমত্য, স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ, দূর্বার প্রতিরোধ, গণজাগরণী অনুপ্রেরণা, প্রত্যয়ী প্রতিশ্রুতি অর্জনে আত্মোৎসর্গের সদাজাগ্রত অনুপ্রেরনার প্রতীক। এটি দেশ প্রেম-ভালবাসা, আবেগ-অশ্রু, আশা-অনুপ্রেরণা, ত্যাগ-ঐক্য, শপথ আর অর্জনের সর্বত্র সার্বক্ষণিক উৎসাহের নিশানায় আধুনিক বাঙালি জাতিসত্ত্বার ঐতিহ্যবাহী অহংকারী মহান প্রতিবিম্ব।

মহান ‘শহীদ মিনার’ বাঙালির সমন্বিত জাতিসত্ত্বা প্রতিফলিত সর্বোৎকৃষ্ট প্রতীক হলেও কোন সুনির্দিষ্ট অথবা ধরাবাঁধা নকশা, আকার বা আকৃতি নিয়ে আবির্ভূত হয়নি, অথবা তার ব্যাপকতা সীমাবদ্ধও নয়। বাংলা’র ‘শহীদ মিনার’ এর প্রথম সৃষ্টি ধার ধরেনি রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, পেশাদারি বা ঠিকাদারি নিয়মনীতির। মহান এই “শহীদ মিনার” মাতৃভাষা, মাতৃভূমি, সমাজ-সংস্কৃতি সুরক্ষায় অকুতোভয় দূর্বার প্রতিরোধের শোক ও গৌরবে রঞ্জিত চেতনায় দীপ্ত আবেগ-অনুভুতির (২১-২-৫২) তুলিতে কল্পিত তাৎক্ষনিক (২৩-২-৫২) ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’ নামাকরনে নির্মিত(বিস্ফোরিত)স্থাপত্য শিল্প। যে সৃষ্টির অন্তস্থিত আবেগ-অনুভূতি-চেতনা আর স্থাপত্য কলার প্রকৃত ব্যাখ্যা, অথবা ভাব সম্প্রসারনের উপসংহারে পৌঁছা কোনদিনই সম্ভব হবে না। যে চেতনা সময়ের চাকার সাথে সারাদেশে বিভিন্ন স্থপতির তুলিতে ভিন্ন ভিন্ন স্থাপত্যকলায় প্রস্ফুটিত হয়ে মাতৃভাষা রক্ষায় সর্বোচ্চ ত্যাগের বার্তার পাশাপাশি দৃঢ় শপথের বানীকে প্রতিক্ষণে প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে চলেছে। কালান্তরে সামগ্রিকভাবে এই মহান শহীদ মিনারের একটি নির্দিষ্ট অর্থবহ নকশা থাকার প্রয়োজনে গৃহীত হয়েছে ভাস্কর হামিদুর রহমান ও নেভেরা আহমদের(সহযোগী)নকশায় প্রতিষ্ঠিত(নভে-১৯৫৭-৬৩)শহীদ মিনারের জাতীয় আইকনিক নকশা। যে নকশায় মাতৃভাষা ‘বাংলা’ ভাষা আন্দোলনকে, একুশের আবেগ ও ইতিহাসকে ‘মা’ এবং ‘সন্তান’এর ভালবাসার অতি সাধারণ প্রকৃতিস্থ মৌলিক বন্ধনকে অটুট এবং অবিচ্ছেদ্ধ প্রতীক হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। এই নকশাই পরবর্তীতে জাতীয়ভাবে অনুমোদিত ‘শহীদ মিনার’ এর অনুকরণীয় নকশা; তবে তা পালনে কোথাও কোন বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে এখনও মাতৃভাষার চেতনায় লালিত স্থাপত্য শিল্পকর্মে বিভিন্ন আকার আকৃতিতে দৃষ্টিনন্দিত নকশায় নির্মিত হয়ে চলেছে শহীদ মিনার, যা শুধুই চেতনা সমৃদ্ধ, চেতনার আবেগে প্রস্ফুটিত-দীপ্ত, এবং চেতনার তুলিতেই অঙ্কিত এবং অলংকৃত। যে চেতনার ব্যাপ্তি এখন বিশ্বব্যাপী, সকল ঝুঁকিপূর্ণ মাতৃভাষা রক্ষার চেতনাদীপ্ত স্থাপত্যকলার পূর্বসূরি হিসেবে, আন্তর্জাতিক বলয়ে বৈশ্বিক মানদণ্ডে যার গর্বিত অবস্থান। সার্বিক বিবেচনায় বাংলার মহান ‘শহীদ মিনার’ কলকাতার ১৮২৮ সালে নির্মিত প্রাচীনতম ঐতিহাসিক দৃষ্টিনন্দিত ‘অকটারলনি মনুমেন্ট’ (Ochterlony Monument) পরবর্তীতে (১৯৬৯)নতুন নামাকরনের ‘শহীদ মিনার’সহ অন্যা যেকোন শহীদ মিনারের সাথে সমার্থক নয়।

‘বাংলা ভাষা আন্দোলন’ বা ‘একুশের চেতনার প্রেক্ষাপট’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার। দ্বিজাতিতত্বের জড়তা উপড়ে ফেলে বায়ান্নের একুশে ঘটমান ঐতিহাসিক ঐক্য, সংগতি, প্রতিবাদ-প্রতিরোধের জের হিসেবে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনিক কেন্দ্রস্থলে প্রতিষ্ঠিত অগণিত শহীদ মিনারই ভাষা ও দেশপ্রেমে গনসচেতনা সৃষ্টির সদাজাগ্রত বার্তাবাহী স্থাপত্যশিল্প। যার স্থিত উপস্থিতি, নীরব স্থাপত্যকলার জ্যোতি বিরতিহীনভাবে প্রতিটি সাধারন পথচারী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলের মানসপটে মাতৃভাষা-মাতৃভূমি, সংস্কৃতি-কৃষ্টি সুরক্ষার চেতনায় প্রতিনিয়ত তাগিদ যুগিয়ে ধাবিত করেছে বিভেদ বিমোচনে, দৃঢ়তম জাতীয় ঐক্যের পথে। বিরামহীনভাবে উজ্জীবিত করেছে স্বাধিকার অর্জনের শপথে একাত্ব হতে, দল-মত-ধর্ম-বর্ণের শৃঙ্খলমুক্ত মাতৃভাষা ভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনে। অবশেষে উনিশ’স একাত্তরে নয় মাস যুদ্ধ শেষে অর্জিত হয়েছে নতুন দেশ, বাংলার বাঙালির লাল সবুজের পতাকার ‘বাংলাদেশ’, পৃথিবীর মানচিত্রে মাতৃভাষা সুরক্ষার আন্দোলনের গর্বিত নির্যাস ফসল, একমাত্র দেশঃ ‘বাংলাদেশ’। কালক্রমে যার বৈশ্বিক স্বীকৃত ঈর্ষনীয় পুরস্কার, পৃথিবীর সকল ঝুঁকিপূর্ণ মাতৃভাষা রক্ষার অনুপ্রেরণার উজ্জীবনী শক্তি হিসেবে মহান ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’কে ইউনেস্কো কর্তৃক ১৭/১১/১৯৯৯ তারিখে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস”এর মর্যাদায় ঘোষণা।

আমাদের ‘জাতীয় স্মৃতিসৌধ’ একাত্তরে স্বাধীনতা আন্দোলনে সাহসী মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদদের অকুতোভয় ত্যাগ তিতিক্ষার স্মৃতির প্রতিফলনে পরিকল্পিতভাবে নির্মিত জাতীয় স্থাপত্য; চেতনাদীপ্ত নয়, ঐতিহাসিক প্রামান্য ভিত্তিক। যা জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক আয়োজনে উত্থাপিত সর্বমোট ৫৭টি নকশার মধ্যে যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে গৃহীত, এবং স্থপতি সৈয়দ মইনুল হুসাইনের নকশা নামে পরিচিত। ১৯৭৮ সালে জুনে নির্বাচিত নকশানুযায়ী ৮৪ একর জায়গার উপর নির্মিত এবং ২৪ দশমিক ৭ একর সবুজ চত্বরে ঘেরা মনোরম স্মৃতিসৌধটি ১৯৮২ সনের বিজয় দিবসে উদ্বোধন করা হয়। ইতিহাস বিধৃত এই নকশাটি সাত জোড়া ত্রিকোণাকৃতির প্রিসম বা প্রাচীরের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। বাহিরের প্রাচীরদ্বয় তুলনামুলকভাবে উচ্চতায় ছোট এবং পাশে বিস্তৃত। ভিতরের দিকে পরবর্তী প্রাচিরগুলি পর্যায়ক্রমে আনুপাতিক হারে উচ্চতা বৃদ্ধি এবং পাশে খর্বাকার হয়ে কেন্দ্রস্থিত প্রাচীরদ্বয় উচ্চতায় শীর্ষে (৪৬মি) এবং পাশে খর্বাকৃতি ধারন করে ঐতিহাসিক অর্থবহ সুদৃশ্য স্থাপত্যে পরিণত হয়েছে। স্থাপত্যে বিধৃত সাতটি প্রাচীর বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের সাতটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের প্রেক্ষাপটে প্রতিফলিত। বায়ান্নের মহান ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নের নির্বাচন, ছাপ্পান্নের সাংবিধান বিষয়ক আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছয়ষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, এবং সর্বশেষ একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের লোমহর্ষক ঘটনার প্রতিফলনে এই স্থাপত্য ‘জাতীয় স্মৃতিসৌধ’ এর মর্যাদায় আসীন।

আমাদের জাতীয় স্মৃতিসৌধের পাশাপাশি রয়েছে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ (মুজিবনগর [বৈদ্যনাথতলা-ভবেরপাড়া] মেহেরপুর) এবং বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ। মুজিবনগর স্মৃতিসৌধটি ১৯৭১ সনের ১৭ই এপ্রিলে প্রথম বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের স্মৃতিতে নির্মিত, এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের নামানুসারে মুজিবনগর নামাকরন করা হয়। স্থপতি তানভির নাকিবের নকশায় ২০ দশমিক ১ একর জায়গার উপর ত্রিকোণাকৃতি ২৩টি প্রাচীরে নির্মিত, যা পাকিস্তান সরকারের ২৩ বছরের অপশাসন এবং এর ৯টি সিঁড়ি ৯মাস সম্মুখ যুদ্ধের প্রতিফলনে নির্মিত।

বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ ১৯৯৩ সালে ২২টি নকশার মধ্যে স্থপতি ফারিদ উদ্দিন আহমেদ এবং মোঃ জামি-আল-সাফি’র নকশার ভিত্তিতে ১৯৯৬-১৯৯৯ সালে ৩ দশমিক ৫১ একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত। ঢাকার রায়ের বাজারের অদুরে যে ব্রিকফিল্ডে নৃশংসভাবে হত্যাকরা শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মৃতদেহ পাওয়া যায়, সেই স্থানেই বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতিতে নির্মিত হয় বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ। প্রায় ১১৬মি দীর্ঘ, প্রায় ১৮মি উঁচু এবং প্রায় ১মি পুরুত্বে নির্মিত প্রাচীর ব্রিকফিল্ডের প্রকৃত অবস্থান এবং প্রাচীরের উভয় পাশের শেষাংশে ভাঙ্গা নকশা বুদ্ধিজীবীদের প্রতি জাতীয় গভীর শোক ও বেদনার প্রকাশে নির্মিত।

বাংলা ভাষা আন্দোলনের চেতনাপুষ্ট দূর্বার প্রতিরোধের ফসল ঝলসানো শোক আর দৃঢ়শপথের প্রতিফলন তাৎক্ষনিকভাবে সৃষ্ট “শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ”! যা বলা যায় সৃষ্টির লগ্নেই (মাত্র দুই দিনের ব্যাবধানে) শাসকদের বুটের আঘাতে গুঁড়িয়ে নিমিষে নিশ্চিহ্ন করা হয়। আমাদের মাতৃভাষার প্রতি, সংস্কৃতি-কৃষ্টির প্রতি, মায়ের মাধুরী মাখা আদর ভালবাসার বুলির প্রতি শাসকদের এই নিকৃষ্ট অবজ্ঞা, অবহেলা, নৃশংস অত্যাচারের কঠোর অবস্থানের প্রতিবাদের মূর্ত প্রতীক হিসেবে প্রায় দুই বছর পর ১৯৫৪ সনে “শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ” এর স্থানেই নির্মিত হয় নতুন নামের প্রথম “শহীদ মিনার” (যার স্থাপত্য/নকশা আমাদের বর্তমান আইকনিক শহীদ মিনারের মত নয়)। যা অপ্রতিরোধ্য ভাবে ঢাকা শহর, শহরতলী পেড়িয়ে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে সময়ের তালে তালে; ভাষা আন্দোলনের স্থিত স্থাপত্য ‘শহীদ মিনার’ কালক্রমে স্বাধিকার অর্জনের প্রতীকী অনুপ্রেরণার নিদর্শন হিসেবে অবতীর্ণ হয়, যা জাতীয় স্মৃতিসৌধ এর নকশার ৭টি প্রাচীরের ভিত্তি প্রাচীরে প্রাথমিক প্রাচীর হিসেবে সন্নিবেশিত হয়। বাংলার ‘শহীদ মিনার’ মাতৃভাষা রক্ষার চেতনায় উজ্জীবিত, সর্বোচ্চ ত্যাগ-আবেগ তাড়িত জাতীয় অনুপ্রেরণার স্থিত স্থাপত্য; আর জাতীয় স্মৃতিসৌধ স্বাধীনতা অর্জনে সকল ত্যাগ এবং সংগ্রামের সমন্বিত স্মৃতিবিধৃত শ্রদ্ধা নিবেদনের ঐতিহাসিক স্থাপত্য।

স্বাধীনতা উত্তর কালে অভিবাসী বাঙালিরা প্রবাসেও শহীদ মিনার নির্মাণের মাধ্যমে আমাদের জাতীয় গর্ব ও ঐতিহ্যকে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ গ্রহন করে বিভিন্ন দেশের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই জাতীয়ভাবে স্বীকৃত হামিদূর রহমানের নকশা অনুযায়ী শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠায় সফল হয়েছে। তন্মধ্যে যুক্তরাজ্যে আলতাব আলী পার্ক (১৯৯৯) এবং ওল্ডহ্যাম (১৯৯৬-৯৭) (২টি); ইতালিতে বারি, ইতালি এবং পাদোভা (৩টি); যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির পিটারসন শহরে ২টি, জাপানের টোকিওতে ১টি স্থায়ী শহীদ মিনার অন্যতম উদাহরন। তাছাড়াও মাতৃভাষাপ্রেমী অভিবাসী বাংলাদেশীরা ইউনেস্কো কর্তৃক একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার সুবাদে পৃথিবীর সবদেশেই অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ (নিউ ইয়র্ক, ১৯৯২, ২০১৬, ক্যানবেরা ২০১৪-১৭) করে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনে উৎসাহী হয়ে উঠছে, এবং স্থায়ী শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে। এসকল অরজনের সবগুলিই আমাদের অত্যন্ত গর্বের; তবে, সময়ের বিবর্তনে, বিশেষ করে মহান একুশকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বৈশ্বিক আসনের সার্বজনীনতার ব্যাপকতার বিবেচনায় বৈশ্বিক মানদণ্ডে শহীদ মিনারের বাস্তবায়ন হবে আমাদের সুদূরপ্রসারী বৈশ্বিক প্রাপ্তি; শুধুই আমাদের বাংগালিদের আত্মতৃপ্তির জন্য বহির্বিশ্বে আইকনিক স্থাপত্যে শহীদ মিনারের বাস্তবায়ন বাংগালিদের সীমাবদ্ধতা প্রমান করবে। এই অনুভূতির ফলশ্রুতিতে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এর মর্যাদায় উত্তীর্ণ করার সাথে সংগতি রেখে শহীদ মিনার এর সম্পূরক আন্তর্জাতিক সংস্করণ প্রবর্তন করে ঐতিহাসিক ভিত্তি রচনা করেছে সিডনী অভিবাসী বাঙালিরা। মহান শহীদ মিনার এর আন্তর্জাতিক সংস্করণ হিসেবে তথা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে ‘শহীদ মিনার’ এর চেতনার সাথে সম্পৃক্ত করে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে শহীদ মিনার এর আদলে ২০০৬ সনে প্রতিষ্ঠিত করেছে পৃথিবীর প্রথম “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ”। যার বৈশ্বিক বার্তা, “Conserve Your Mother Language” বিশ্বের সকল ভাষাভাষীর জন্য উৎসাহব্যাঞ্জক এবং উপযোগ্য করে তোলার লক্ষ্যে প্রণীত। যার অনুকরনে কানাডার ভ্যানকুভারের বাঙালিদের নেতৃত্বে সারে কাউন্সিল কর্তৃক নির্মিত হয় “লিঙ্গুয়া একোয়া” নামে ২য় “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” এবং টরেন্টোর কনফেডারেশন পার্কে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।

“আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” ‘শহীদ মিনার’ -এরই আন্তর্জাতিক প্রজন্ম বা সংস্করণ। প্রবাসে বহুভাষা ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় বাংলাভাষা আন্দোলন কেন্দ্রিক শহীদ মিনার এর চেতনাকে সকল ভাষাভাষীর প্রয়োজনের উপযোগ্য করে ইউনেস্কোর ঘোষিত “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” উদযাপনের ঝাণ্ডা নিয়ে সকল ভাষাভাষীর অংশগ্রহণ এবং গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” এর প্রতিষ্ঠা। স্থানীয় ভাষা সমূহের বর্ণমালা সংরক্ষণ, বহুভাষা ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা, বিশ্বায়ন এবং মহান একুশের চেতনার মুখ্য উপাদান সমূহ সমন্বিতব ভাবে নকশায় নিশ্চিত করে “Conserve Your Mother Language” বার্তায় সকল ভাষাভাষীকে নিজ নিজ মাতৃভাষা রক্ষায় উৎসাহিত করাই এই স্থাপত্যকলার ভিত্তি। কারন ঝুঁকিপূর্ণ সব মাতৃভাষাগুলোর কোনটিই বাংলা ভাষার মত, অথবা অন্যান্য যেকোন ভাষার প্রতিবন্ধকতার মত একই ধরনের প্রতিবন্ধকতার শিকার নয়। প্রাকৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিকতা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, আবাসন, ডিজিটালাইজেশন বা বিশ্বায়নের মত বহু জানা অজানা বিভিন্ন কারন একক বা সম্মিলিতভাবে মাতৃভাষা সমুহের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার জন্য দায়ী। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা, যা একক ভাবে কোণ গুষ্টি বা জাতির পক্ষে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সম্মিলিত সমন্বিত বৈশ্বিক প্রয়াস। এই বাস্তবতার নিরিখেই ইউনেস্কোর “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” উদযাপনের ঘোষনা। এই ঘোষণা সকল ভাষাভাষীর কাছে বাংলা ভাষাকে এবং বাঙালিদেরকে গর্বিত জাতি হিসেবে উপস্থাপন এবং প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিয়েছে। তাই বাংলাভাষী প্রবাসীরা একুশের গর্বিত উত্তরসূরি হিসেবে আজ প্রতিটি ভাষাভাষীর কাছেই প্রয়োজনীয় বন্ধুর অবস্থানে আসীন। মহান একুশ এখন শুধুই বাংগালির নয়, সকল ভাষাভাষীর। একুশের আন্তর্জাতিক অবস্থানের ফলশ্রুতিতে প্রবাসে আমাদের শহীদ মিনার শুধুই আমাদের সংস্কৃতির সীমাবদ্ধতার শৃঙ্খলে বেঁধে রাখা আমাদের গৌরবগাঁথা ঐতিহ্যকে স্বার্থপরতার পর্যায়ে পর্যবেশিত করবে। যেখানে ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে একুশকে বিশ্বের সকল মাতৃভাষা রক্ষ্যার অনুপ্রেরণার উৎসাহ হিসেবে বেছে নিয়েছে, সেখানে একুশের প্রাণ মহান শহীদ মিনার এর চেতনা, স্থাপত্যকলা এবং সার্বজনীন বার্তা বিশ্বের সকল ভাষাভাষীর উপযোগ্য হয়েই বৈশ্বিক পর্যায়ে বিকশিত হয়ে প্রতিষ্ঠা পাওয়াটাই উচিৎ এবং সর্বোত্তম। পৃথিবীর প্রথম “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” এর নকশার মৌলিক বিষয়াদি এবং একুশের তথ্যসহ আইকনিক শহীদ মিনারের চিত্রায়ন বাংগালির জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সমাজে গর্বিত অর্জন ও ফসলের প্রতিকৃতি এবং ঐতিহ্য বহন করে। যা অন্যান্য ভাষাভাষীদের মধ্যে বাংলাভাষা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে অনুকরনের মধ্য দিয়ে নিজ নিজ মাতৃভাষা সংরক্ষণের প্রয়োজনেই একুশ উদযাপনে উৎসাহিত করে সহায়তায় এগিয়ে আনবে। ফলে আমরা, এবং আমাদের নতুন প্রজন্ম সকল ভাষাভাষীর কাছে হবে সমাদৃত, আমাদের নতুন প্রজন্ম নিজ মাতৃভাষা ‘বাংলা’ শিক্ষায় হবে অধিকতর আগ্রহী এবং গর্বিত। আমাদের মনে রাখতে হবে একুশের আন্তর্জাতিক বলয়ে উত্থানের গৌরবগাঁথা বিশ্বব্যাপ্ত স্থায়ী সম্মান বহু ভাষাভাষী সমাজ ব্যবস্থার সর্বক্ষেত্রে আমাদের মহানুভবতা, উদারতা, সার্বজনীনতা এবং বিশ্বায়নে একুশকে অর্থবহকরে বিকশিত করার মাধ্যমেই প্রমান করতে হবে, বহুজাতিক সমাজ ব্যবস্থায় শুধুই আমাদের নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে নয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে একুশের বৈশ্বিক উত্থান এবং সর্বোচ্চ সম্মানীয় অবস্থানে সকল ভাষাভাষীর সমাধিকার নিশ্চিত করার নৈতিক দায়িত্ব প্রাথমিকভাবে একুশের উত্তরসূরি হিসেবে বাঙালিদের উপরই বর্তায়। “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” উদযাপন প্রেক্ষাপটে নিজ নিজ মাতৃভাষা সুরক্ষায় প্রয়োজনে একুশের সম্মোহনী বৈশ্বিক বার্তা “Conserve Your Mother Language” যত বেশী এবং যত দ্রুত ভিন্ন ভাষাভাষীর কাছে পৌঁছাবে, প্রবাসে আমাদের নতুন প্রজন্ম তত দ্রুত(গানিতিক নয় জ্যামিতিক হারে)নিজ মাতৃভাষা ‘বাংলা’ শেখায় আগ্রহী হবে, এটি নিশ্চিতভাবে বলা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, “একুশ”-এর ঐতিহাসিক ভিত্তি “বাংলা”, এবং একুশের ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত; এ তথ্য আমাদের নতুন প্রজন্মকে তাদের বহু ভাষাভাষী বন্ধুদের মাঝে সহজেই গর্বিত করে তুলবে, এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রচার বৃদ্ধির সাথে আনুপাতিক হারে তাদের বাংলা শিক্ষায় আগ্রহ বাড়বে।

বাংলার “শহীদ মিনার” মাতৃভাষা বাংলা ব্যবহারের পথ চিরতরে রুদ্ধ করে সহস্র মাইল দুরের ভাষা প্রচলনে বাধ্য করার ঘৃণ্য প্রয়াসের বিরুদ্ধে দূর্বার প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ‘মূর্ত প্রতীক’; যা বাংলা ও বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি দমন, দ্বিজাতিতত্ব ভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক সংস্কার-কুসংস্কার, উপনিবেশিক শাসন-শোষণ-প্রশাসনিক ব্যবস্থায় নির্যাতন-নিষ্পেষনের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রতিফলিত, এবং প্রতিষ্ঠিত। “শহীদ মিনার” বাঙালি চেতনার সূর্যের মত ভাষাপ্রেমের চেতন-রশ্মি ছড়িয়ে মাতৃভাষা প্রেমে আলোকিত করেছে বাংলার মাঠ জনপথ, উদ্ভুদ্ধ করেছে প্রতিটি মানুষকে মাতৃভাষা রক্ষার সৈনিক হিসেবে নিজেকে তৈরি করার। যা মহীরুহ হয়ে রূপায়িত হয়েছে স্বাধিকার আন্দোলনে শপথে, আমরা পেয়েছি স্বাধীন পতাকা, একটি দেশ, আমাদের সোনার “বাংলাদেশ”। আন্তর্জাতিক বলয়ে, বিশেষ করে মহান একুশে’র “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে সম্মানীয় উত্থান বাংলার “শহীদ মিনার” এর চেতনাকে(স্থাপত্যকে নয়)সকল ভাষাভাষীর উপযোগ্য করে, এর স্থাপত্য কলা বৈশ্বিক পরিবেশ-পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে উপস্থাপন করার মাধ্যমে সকল মাতৃভাষা সংরক্ষণ ভিত্তিক গ্রহণযোগ্য চেতনায় বিকশিত করে সকল ভাষাভাষীর কাছে পৌঁছানো সহজতর হবে; একইভাবে, যেভাবে আমরা প্রথম নির্মিত “শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ” (২৩/২/৫২) অথবা “শহীদ মিনার”(১৯৫৪) স্থাপত্য কলার পরিবর্তে ভাস্কর হামিদুর রহমান নকশায় প্রতিষ্ঠিত শহীদ মিনারের জাতীয় আইকনিক নকশা হিসেবে গ্রহন যোগ্যতা পেয়েছে। মাতৃভাষা অবক্ষয়ের বৈশ্বিক বস্তবতা এবং মাতৃভাষার প্রতি ঝুঁকিপূর্ণতার জন্য দায়ী সংশ্লিষ্ট সামগ্রিক ইস্যুগুলি বিবেচনায় রেখে পৃথিবীর সকল ঝুঁকিপূর্ণ মাতৃভাষা রক্ষা এবং সকল ভাষাভাষীর সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার অনিবার্য প্রয়োজনে বাংলার শহীদ মিনার এর রশ্মির বিচ্ছুরণেই একুশের বিশ্বায়নে বাস্তবায়িত হয়েছে, পৃথিবীর প্রথম “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ” এর নক্সা-স্থাপত্য। যার মধ্যে পৃথিবীর সকল ঝুঁকিপূর্ণ মাতৃভাষা সুরক্ষায় গণসংযোগ ও সচেতনতার সৃষ্টির জন্য একুশ এবং শহীদ মিনারকে দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতীয়মান। মহান একুশ’র আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উত্তরণের সুবাদে, সকল ভাষাভাষীর উপযোগ্যতায় বাঙালির ঐতিহ্য-অহংকার মহান শহীদ মিনারের তির্যকতা অক্ষুণ্ণ রেখে সকল মাতৃভাষার সমান গুরুত্ব এবং অহংকারের সমন্বিত নকশা প্রণয়নের পাশাপাশি “Conserve Your Mother Language” বৈশ্বিক বার্তা প্রচারের মাধ্যমেই আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য একুশের চেতনাকে সার্বজনীন ও বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিকতায় উত্তরণ সম্ভব।

বাংলাদেশ লাইব্রেরী এসোশিয়েশন কর্তৃক ৩৫০০ লাইব্রেরীতে “একুশে কর্নার” প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত, এমএলসি মুভমেন্টের বরাবরে ইউনেস্কোর মহাপরিচালকের প্রশংসাপত্র, ভিডিও(৭০মিঃ)কনফারেন্স; এবং এমএলসি মুভমেন্টের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ১৩-৯-১৭ তারিখে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” উদযাপনে এসিটি ল্যাজিসলেটিভ এসেম্বলি কর্তৃক সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহন এই প্রবন্ধে উত্থাপিত প্রস্তাবনার বাস্তবতা এবং গ্রহণযোগ্যতার প্রামান্যচিত্র হিসেবে বিবেচনার দাবি রাখে।

লেখক পরিচিতিঃ নির্মল পাল; ইমেইলঃ nirmalpaul@optusnet.com.au
প্রতিষ্ঠাতা এবং চেয়ারপারশনঃ এমএলসি মুভমেন্ট ইনটারন্যাশন্যাল ইনক
প্রাথমিক নকশা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নকারী দলনেতাঃ পৃথিবীর প্রথম “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ”
প্রকাশিত গ্রন্থঃ “বিশ্বায়নে শহীদ মিনার”
বৈশ্বিক দর্শনঃ “লাইব্রেরীতে একুশে কর্নার”, (স্থানীয় বর্ণমালা সংরক্ষণ কেন্দ্র)

Nirmal Paul

Nirmal Paul

নির্মল পাল; ইমেইলঃ nirmalpaul@optusnet.com.au; প্রতিষ্ঠাতা এবং চেয়ারপারশনঃ এমএলসি মুভমেন্ট ইনটারন্যাশন্যাল ইনক; প্রাথমিক নকশা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নকারী দলনেতাঃ পৃথিবীর প্রথম “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ”; প্রকাশিত গ্রন্থঃ “বিশ্বায়নে শহীদ মিনার”; বৈশ্বিক দর্শনঃ “লাইব্রেরীতে একুশে কর্নার”, (স্থানীয় বর্ণমালা সংরক্ষণ কেন্দ্র)


Place your ads here!

Related Articles

জীবনের সফলতা উৎকর্ষতায় না উর্বতায়?

একটা নাটক দেখেছিলাম, আধুলি। কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র বন্ধ্যা, যিনি নিজ গৃহে তথা সামাজিক প্রেক্ষাপটে এক অচল আধুলি। মনে ধরেছিলো কথাটা।

International Criminal Court and Bangladesh

In the past, there was a joke in the UN corridor: if a person who deliberately kills another gets either

Please don’t take the government ‘hostage’

Every sensible person in the country was visibly horrified by the last week’s senseless and brutal massacre at the headquarters

1 comment

Write a comment
  1. Nirmal Paul
    Nirmal Paul 11 January, 2018, 17:09

    Thanks the Editor for publishing the article,

    Reply this comment

Write a Comment