আমার একটা নদী আছে…

আমার একটা নদী আছে…

একদল ছেলে নদীর পাড় ধরে দৌড়ে যাচ্ছে। একটু পরেই সুবিধামত কোন একটা জায়গা দিয়ে নদীতে নামবে। তাদের প্রত্যেকেরই বয়স ৮ থেকে ১০ এর মধ্যে। তারা নদীর পাড়ে কাকুরের (বাঙ্গির) ক্ষেতে পাহারা দেয়। প্রমত্তা পদ্মা নদীর পানি শুকিয়ে যেয়ে অনেক উচু পাড় তৈরি হয়েছে। আর সেই পাড়ে বাসা বেধেছে বিভিন্ন রকমের পাখি, বিশেষকরে শালিক। তারা সেইসব বাসাতে থাকে, ডিম পাড়ে এবং বাচ্চা ফুটায়। ছেলের দঙ্গল যাচ্ছে সেইসব বাসা থেকে ডিম কিংবা বাচ্চা আনতে। এটা তাদের কাছে অনেক আকর্ষণীয় খেলা। এতে কিছুটা বাহাদুরিরও ব্যাপার আছে। কারণ অনেকসময়ই পাখি, ডিম এবং বাচ্চার লোভে এইসব বাসাতে হানা দেয় বিষাক্ত সাপ। এমনও হয়েছে যে অনেকে ডিম বা বাচ্চার আশায় গর্তে হাত দিয়েছে আর ব্যাস অমনি নগদে সাপের আদর পেয়েছে। কিন্তু এই দুরন্ত ছেলের দল সেটাকে বড়দের বানানো গল্পই মনেকরে। কারণ বড়রা মনেকরে এমন গল্প বললে ছোটরা আর পাখির বাসাতে ডিম খুজতে যাবে না। ডিম বাচ্চা খোজা শেষ হলে দলবেঁধে পদ্মার পানিতে ঝাপিয়ে পড়ে গোসল করা অবশ্য সেটাকে গোসল না বলে জলকেলি বলাই ভালো কারণ সেখানে শরীর পরিষ্কার করার চেয়ে নিজেদের খেলাটাকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। এভাবে দুপুর গড়িয়ে যখন বিকেল চলে আসে তখন দুরন্ত ছেলের দল আবার পাড়ে উঠে আসে।

ক্ষেতে পাহার দেয়ার কুড়ে ঘর (ছবিঃ লেখক)

ক্ষেতে পাহার দেয়ার কুড়ে ঘর (ছবিঃ লেখক)

প্রত্যেকটা ক্ষেতের মধ্যে আলাদা আলাদা করে কুড়ে (ক্ষেতে পাহার দেয়ার জন্য তৈরি অস্থায়ী দোচালা ঘর) আছে। সেটাতেই তারা রাতে ঘুমায় এবং দিনের বেলায় পরিশ্রান্ত হয়ে গেলে বিশ্রাম নেয়। রাতে ঘুমাতে গেলে তারা প্রায় সবসময়ই এমনভাবে ঘুমায় যেন চোখ খুললেই ক্ষেতের বেশিরভাগ অংশ দেখা যায়। তাই শুয়ে শুয়ে চলে আকাশ দেখা আর সঙ্গী কোন মুরব্বীর কাছ থেকে মজার মজার গল্প শোনা। ঐ যে দেখছিস বড়শির মত সাতটা তারা ঐ গুলা হচ্ছে সপ্তর্ষিমন্ডল। আর ঐ যে দেখছিস চাঁদ আর তার মধ্যে কালো কালো সেটা হচ্ছে চাঁদের বুড়ি, সে অনেক ব্যাস্ত পরবর্তি শীতে চাঁদের জন্য জাম্পার (সোয়েটার) তৈরিতে। এমনিভাবে তারা সন্ধ্যাতারা এবং শুকতারাও চিনে ফেলে ভালোমত। এছাড়াও আছে বাস্তবধর্মি নিজেদের গল্প। একবার হয়েছে কি শোন, তোর এক দাদা এমনই এক কুড়েতে শুয়ে ক্ষেতে পাহারা দিচ্ছিল। তখন আকাশ দিয়ে একদল জিন পরী সবেমাত্র একটা বিবাহ অনুষ্ঠান শেষ করে যাচ্ছিল। যাওয়ার পথে নিচে কুড়েটা দেখতে পেয়ে নেমে আসে। এসে দেখে তোর দাদা ঘুমাচ্ছে, যদিও সে তখন ঘুমাচ্ছিল না, ভয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়েছিল এবং তাদের সব কথায় শুনতে পাচ্ছিল। জিন পরীর দলের মধ্যে থেকে একজন বলল চলো একেও আমাদের সাথে নিয়ে যায়। অন্যজন বলল না, এতো বুড়া মানুষ থাক নিয়ে যেয়ে কাজ নেয়। তখন অন্য আরেকজন বলল, ঠিক আছে তাহলে ওকে কিছু খাবার দাবার দিয়ে চলো আমরা আবার রওয়ানা দেয়। তারা কুড়েতে রাখা ধামা (বেতের তৈরি শস্য রাখার পাত্র) তে বেশ কিছু খাবার রেখে গেল। সকালে উঠে দাদা কাপতে কাপতে সেই ধামা নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিল। বাসার লোকজন সব শুনে এবং ধামাতে খাবার দেখে সেটা বিশ্বাস করলো। ধামাতে ছিল মুড়ি, মুড়কি, বাতাসা আরো কত কি। কিন্তু এরই সাথে ছিলো দুখানি মানব বিষ্ঠার চাপড়ি। তাই আর সেগুলো না খেয়ে ফেলে দিতে হল।

এই দুরন্ত ছেলের দলের মধ্যে থেকে একটা ছেলে দলছুট হয়ে তথাকথিত ভদ্রলোক (আসলে চোর) হয়ে যায়। দেশের লোকের টাকায় ভদ্রলোক হয়ে দেশের মানুষকেই আবার শোষণ করে যখন দেখলো তেমন সুবিধা করতে পারছে না কারণ সে তার পরিবারের চোরের প্রথম পুরুষ (জেনারেশন)। যদি আগের দু এক পুরুষ ধরে তারা শিক্ষিত (চোর) হত তাহলে সহজেই সে খাপ খাইয়ে নিতে পারতো এবং নিজের শৈশবের খেলার সঙ্গী সাথীদের ছোটলোক বলে নিজেই নিজের শৈশবকে অস্বীকার করতে পারতো। কিন্তু সেটা না হওয়াতে সে হাওয়ায় জাহাজে করে কালাপানি পাড়ি দিয়ে সাত সমুদ্র তের নদীর পারে চলে গেল দেশের মানুষদের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করে যাদের ঘামের বিনিময়ে অর্জিত টাকায় সে ভদ্রলোক (চোর) হয়েছিল। আর সে যেহেতু পুরোপুরি চোর হতে পারেনি তাই এখনও সে তার শৈশবের এবং কৈশোরের সেই অকৃত্রিম দিনগুলোকে খুজে ফিরে। এখনও তার কল্পনাতে প্রমত্তা পদ্মা নদী বয়ে চলে আপন গতিতে। প্রকৃতির নিয়ম মেনেই সেখানে জোয়ার ভাটা হয়। কখনও তার বুকে চর জেগে তৈরি হয় ধু ধু মরুভূমি আবার কখনও তার যৌবনের রূপে প্লাবিত হয় দুকুল। ছেলেটারও জীবনে এমনই খেলা চলতে থাকে। কিন্তু যেহেতু নদীটা থেমে নেই তাই সেও থেমে নেই। নদীর মতই তারও কখনও কখনও মনের পাড়ে ভাঙ্গন ধরে আবার অপর পাড় গড়ে।

আমরা প্রত্যেকেই হয়তো সেই ছেলেটার মত বুকে ধারণ করে চলেছি আপন আপন নদী এবং বয়ে চলেছি স্বমহিমায়। আর চলতে চলতে কখনও ক্লান্ত হয়ে গেলে খুজে ফিরি বুকের নদীটাকে…

Md Yaqub Ali

Md Yaqub Ali

আমি মোঃ ইয়াকুব আলী। দাদি নামটা রেখেছিলেন। দাদির প্রজ্ঞা দেখে আমি মুগ্ধ। উনি ঠিকই বুঝেছিলেন যে, এই ছেলে বড় হয়ে বেকুবি করবে তাই এমন নাম রেখেছিলেন হয়তোবা। যাইহোক, আমি একজন ডিগ্রিধারী রাজমিস্ত্রি। উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতে অস্ট্রেলিয়াতে আমার আগমন ২০১৫ সালের মার্চে। আগে থেকেই ফেসবুকে আঁকিবুকি করতাম। ব্যক্তিজীবনে আমি দুইটা জীবের জনক। একটা হচ্ছে পাখি প্রকৃতির, নাম তার টুনটুনি, বয়স আট বছর। আর একজন হচ্ছে বিচ্ছু শ্রেণীর, নাম হচ্ছে কুদ্দুস, বয়স দুই বছর। গিন্নী ডিগ্রিধারী কবিরাজ। এই নিয়ে আমাদের সংসার। আমি বলি টম এন্ড জেরির সংসার যেখানে একজন মাত্র টম (আমার গিন্নী) আর তিনজন আছে জেরি।


Place your ads here!

Related Articles

শাগানে, আমার শাগানে

সের্গেই ইয়েসেনিন্ (১৮৯৫-১৯২৫) মূল রুশ থেকে অনুবাদ দিলরুবা শাহানা (অনুবাদকের ভাষ্য: রুশ কবি সের্গেই ইয়েসেনিন রাশিয়ার রিয়াজন প্রদেশের এক সাধারন

President Pranab Kumar Mukherjee: the Man for All Seasons

Former Finance Minister Pranab Mukherjee (76) was sworn in as the President of the Republic of India with a colourful

Fundraising Dinner donation amount: Thanks from BAAC EC 2013-14

Dear Community Members, BAAC is proud of the Bangladeshi Canberra community for overwhelming responses and the active donation through participating

1 comment

Write a comment
  1. নীল
    নীল 5 February, 2020, 13:29

    বর্ণের কষাঘাত যেখানে লাগার সেখানেই লেগেছে। সরল প্রকাশ ভঙ্গি টাই আমার বেশ ভালো লাগলো।

    Reply this comment

Write a Comment