রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধান কে করবে? – দুই পর্বের প্রথম পর্ব
বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমার এর যে দুটি প্রদেশের সীমান্ত রয়েছে তার মাঝে রাখাইন প্রদেশ একটি। আর একটি চিন প্রদেশ। আর রোহিঙ্গা আদিবাসী জনগোষ্ঠী পশ্চিম মিয়ানমার এর রাখাইন প্রদেশের একটি উল্লেখযোগ্য নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। রোহিঙ্গারা সাধারণত ইসলাম ধর্মের অনুসারী। মিয়ানমার এ রোহিঙ্গা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মুসলিম ছাড়াও আরো মুসলমান রয়েছে তাদের নিয়ে কোন সমস্যার খবর পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করে রোহিঙ্গারা মুসলমান বলে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীরা তাদের মেরে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছে। আসলে ব্যাপারটা সেরকম কিছু নয়। রোহিঙ্গাদের এই অবস্থা তাদের ধর্মের কারণে না। তাদের আজকের এই অবস্থা আসলে তাদের নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর কারণে, তাদের রোহিঙ্গা জাতিসত্তার কারণে। এটা কোন ধর্ম যুদ্ধ নয়। আর এটা প্যালেস্টাইন-ইজরাইল বিষয়ের মত এত জটিলও না। তাই বাংলাদেশের মানুষের রোহিঙ্গাদের মুসলিম পরিচয়টা কে হাইলাইট না করে তাদের নৃতাত্ত্বিক জাতিসত্তা এবং নাগরিকত্বের দাবীটাকে সামনে নিয়ে আসা উচিৎ।
সাম্প্রতিক কালের বিষয় উল্লেখ করলে বলতে হয় জুন ২০১২ সালের মিয়ানমার এর রোহিঙ্গা মুসলিম এবং রাখাইন বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীদের মাঝে দাঙ্গার কথা উল্লেখযোগ্য। এই দাঙ্গার পরে রাখাইন প্রদেশে স্টেট স্পন্সরড সহিংসতা লক্ষ করা যায়। পাঁচ বছর পরে এসে ইস্যুটা একটা ফুল ব্লোউন হিউম্যানেটেরিয়ান ক্রাইসিসে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে আসিয়ান ( ASEAN) এর উচিৎ একটা আঞ্চলিক রেসপন্স দেয়া এবং মিয়ানমার কে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের দাবীর স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানানো।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইটস গ্রুপ, সরকার এবং ওআইসি (OIC) সহ অনেকেই মিয়ানমার সরকারের সহিংসতা দমন না করা ও রোহিঙ্গাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করার সমালোচনা করেছেন অনেকবার। অনেকেই ১৯৯১ সালে নোবেল শান্তি পুরষ্কার জয়ী অং সান সু চি এর সমালোচনা করছেন এই সহিংসতা বন্ধে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ তিনি নিচ্ছেন না বলে। আমি মনে করি অং সান সু চি এর জন্য সহিংসতা বন্ধ করা খুবই কঠিন। বিশেষ করে সামরিক জান্তার অনুমোদন কিংবা সহযোগীতা ছাড়া তিনি এই সহিংসতার দমন করতে পারবেন না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা হচ্ছে কে এই রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধান করতে পারবে। অনেকেই মনে করেন সু চি এবং তার পার্টি এটা করতে পারে। অনেকেই মনে করেন আন্তর্জাতিক কমিউনিটির ইন্টারভেনশন দরকার রাখাইন প্রদেশে। বিশেষ করে ইউএন, ওআইসি, আসিয়ান এবং বাংলাদেশ সরকার এর উপস্থিতি বিষয়টার সমাধান দিতে পারে। তবে গুরু দায়িত্বটা মিয়ানমার মিলিটারি, মিয়ানমার এর সিভিল সোসাইটি এবং মিয়ানমার এর জনগণ এর উপরই বর্তায়।
প্রথমেই স্টেট স্পন্সরড সহিংসতা বন্ধ করতে হবে, রোহিঙ্গাদের হিউম্যান রাইটসকে সম্মান জানাতে হবে। বিভিন্ন এইড এজেন্সিগুলোকে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহযোগীতা প্রদান করার অনুমতি দিতে হবে। আমরা জানি যে রাখাইন প্রদেশের উত্তর অংশে আন্তর্জাতিক মানবিক সাহায্য প্রদানকারী সংস্থাগুলোর এক্সেস নাই অনেক দিন ধরে। সেখানে তাদের এক্সেস দিতে হবে যাতে করে তারা রোহিঙ্গাদের মানবিক সাহয্য প্রদান করতে পারে।
এর পাশাপাশি মিউচুয়াল রেস্পেক্ট ও সহযোগীতা উৎসাহিত করার পাশাপাশি আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু স্ট্রাকচারাল সহিংসতাকে বন্ধ করা না গেলে এই বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন সম্ভব না। যেহেতু রোহিঙ্গারা অফিসিয়ালি মিয়ানমার এর নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত না এখনও তাই রাষ্ট্র তাদের প্রাথমিক সেবা গুলো থেকে বঞ্চিত করে আসছে বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও চাকরীর বিষয়ে। তাই পলিসি রিফর্ম ছাড়া এই সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার লং টার্ম সমাধান সম্ভব না। এই পলিসি রিফর্মে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়টা অবশ্যই থাকতে হবে। আমি এই ইস্যুটার সমাধান সাম্প্রতিক সময়ে হবে বলে মনে করিনা। কারণ বিশেষ করে গত ডিসেম্বর ২০১৬ সালে যখন মিয়ানমানর সরকার একটা কমিশন গঠন করে অক্টোবর ২০১৬ এর সহিংসতার বিষয়ে। এই কমিশন অনুসন্ধান করে গণহত্যার ও রিলিজিয়াস পারসিকিউশান ( Religious persecution) এর কোন প্রমাণ পায়নি রাখাইন প্রদেশে! এই ফাইন্ডিংস অন্যান্য রিপোর্ট এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আর গত কয়েক দিনের ঘটনার পরে আমার ধারণা আরো বদ্ধমূল হয়েছে যে রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধান হতে আরো অনেক সময় লাগবে।
গত বিশ বছর ধরে মিয়ানমার আসিয়ানের একটি সক্রিয় সদস্য দেশ। আসিয়ান এর সদস্য দেশগুলো একটা আর একটার সাথে কমন নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় পরিচয়, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ইন্টারেস্টের কারণে ইন্টারকানেক্টেড। এই কারণে কোন ধরণের হিউম্যানেটেরিয়ান ক্রাইসিস আসিয়ানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য হুমকি তবে মিয়ানমার এর এই সমস্যা সমাধানের জন্য আসিয়ানের সদস্য দেশগুলোর রোহিঙ্গা ইস্যুর প্রতি তাদের আচরণ এর পরিবর্তনের দরকার। এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে তাতে বুঝা যায় আসিয়ান দেশগুলো এটাকে একটা ইন্টারনাল সমস্যা এবং ইন্টারনার নিরাপত্তা সমস্যা সমস্যা হিসেবেই দেখছে। আমার মতে এটা আর ইন্টারনাল কোন সমস্যা না। এটা এখন একটা আঞ্চলিক সমস্যা। এই সমস্যা চলতে থাকলে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত এর প্রভাব পরিলক্ষিত হব।
আসিয়ান দেশগুলো আভ্যন্তরীন বিষয়ে যদিও হস্তক্ষেপ করে না তবে এই বিষয়টা আভ্যন্তরীন ভাবার আর কোন অবকাশ নাই। আসিয়ান দেশগুলো অন্য অনেক বিষয়ে এগিয়ে থাকলেও যখন হিউম্যানেটেরিয়ান ক্রাইসিস, আঞ্চলিক নিরাপত্তার উন্নয়ন, আঞ্চলিক সহিংসতার প্রতিরোধ এবং প্রিভেন্টিভ ডিপ্লোম্যাসি ( Preventive Diplomacy) তে পিছিয়ে রয়েছে। এর পিছনে ১৯৭৬ আসিয়ান চার্টার অনুযায়ী সদস্য দেশগুলোর এই সমস্যার ব্যাপারে কনসারভেটিভ এপ্রোচই দায়ী এবং সমস্যাটাকে স্থানীয় ঘরোয়া বিষয় বলে মনে করা অন্যতম একটা কারণ। অতীতে মালয়েশিয়া মিয়ানমার এর সমালোচন করলেও অন্যদেশগুলোর ক্ষেত্রে তেনটা দেখা যায় না। আর বর্তমানে ত সবাই কেমন যেন চুপ রয়েছে! ইন্দোনেশিয়াও উদ্যোগ নিয়েছিল মিয়ানমার এর সাথে কাজ করার জন্য কিন্তু অন্য আসিয়ান দেশগুলোর একত্রে কাজ করার অনীহা এখানে পরিলক্ষিত হয়।
এই রোহিঙ্গা ইস্যুটাকে সমাধানের জন্য আসিয়ান সদস্য দেশগুলোর অবশ্যই একত্রে কাজ করা উচিৎ। প্রিভেন্টিভ ডিপ্লোম্যাসির মাধ্যমে মিয়ানমারকে পুশ করা উচিৎ এই সহিংসতা দমনের জন্য। এই প্রিভেন্টিভ ডিপ্লোম্যাসির মাধ্যমে স্থানীয় লিগাল এবং স্ট্রাকচারাল রির্ফম করতে হবে যাতে করে রোহিঙ্গা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী মিয়ানমারকে তাদের দেশ বলে দাবী করার স্বীকৃতি মেলে। তবে আসিয়ান প্রস্তাব করেছে একটা রাখাইন স্টেট করার জন্য এটাও একটা সমাধান হতে পারে। কিন্তু এটা কিভাবে আনফোল্ড হবে সে বিষয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যায় সাথে আঞ্চলিক অন্য দেশগুলোর রাজনৈতিক সদইচ্ছা কতটুকু সেটার উপরেও নির্ভর করে। তবে সাময়িক সমাধান হিসেবে UNHCR কে সাথে নিয়ে বাংলাদেশ এবং অন্য আসিয়ান দেশগুলো এব্যাপারে একত্রে কাজ করতে পারে। এব্যাপারে সবচেয়ে ভুক্তভোগী দেশ হিসেবে বাংলাদেশকেই নেতৃত্ব দিতে হবে।
জুবায়দুল জেকব
মেলবোর্ন
jubaidul.jekab@gmail.com
Related Articles
World Water Day 2015 Bangladesh
March 22 was observed as the World Water Day. In February 1993, the UN General Assembly designated March 22 of
Bangabhandu Murder Trial: Dark Chapter Finally Closed
The Appellate Division of the Supreme Court on 19th November upheld a verdict of the High Court Division that handed
অস্ট্রেলিয়ার হ্যালোইন সম্প্রীতি
হ্যালোইনের উৎস বা ইতিহাস কি সেই বিষয়ে আমার ধারণা খুবই কম তবে অস্ট্রেলিয়াতে যেভাবে হ্যালোইন পালন করা হয় সেটাকে আমার


