কাহিনী সামান্য

কাহিনী সামান্য

‘ও টাঙ্গাইলের তাঁতী
আমার ঘরে নিভেছে আজ বাতি’

যেদিন এই অসাধারন শোকগাথা লেখা হয়েছিল কেমন ছিল দিনটা? মেঘলা ছিল কি সকাল? নাকি সন্ধ্যারাতে জ্যোৎস্না ছিল ম্লান? সেই মেঘলা সকালে শাড়ীর স্তুপে বিষন্ন অবসাদে চোখ রেখে নাকি জানলা গলিয়ে বিছানায় পড়া ধূসর চাঁদের আলো মেখে টাল হয়ে পড়ে থাকা শাড়ীগুলো দেখে কথাগুলোর জন্ম হল।। নানা রং, নানা নক্শা আঁকা স্মৃতিমাখা সব শাড়ী। স্বামী-পুত্র হারিয়ে ব্যথা বিহ্বল নারীর তখন মনে পড়লো টাঙ্গাইলের তাঁতীতো জানেনা এই খবর। সব রং,সব নক্শা নিয়ে তাঁতীরা তেমনি অপেক্ষায় আছে। শুধু তার একান্ত নিজস্ব রং-নক্শামাখা আনন্দেরা অজানা ভুবনে চলে গেছে।

কবি রুবি রহমান রহস্যময় দূর্ঘটনায় একই সাথে মানবদরদী স্বামী শ্রমিকনেতা নূরুল ইসলাম ও একমাত্র পুত্র তমোহর ইসলামকে হারান।

অপূর্ব সৌন্দর্যে স্নাত, অসাধারন রুচিশীল আবরণে সজ্জিত সবার দেখা কবি রুবি রহমানের অন্তর নিঃসৃত এই সংবাদ শুধু তাঁতশিল্পীর জন্য নয় সবার জন্য
‘ও টাঙ্গাইলের তাঁতী
আমার ঘরে নিভেছে আজ বাতি’
কবিতায় হৃদয় নিংড়ে কান্না ঢেলে দিয়েছেন কবি।

প্রায় সবারই কমবেশী জানা আছে কেমন করে গানে গানে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল পুত্রশোকে হাহাকার গেথেছেন। রবিঠাকুরের পুত্র শমীর মৃত্যুর পর লেখা
‘আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে…..যদি আমায় পড়ে তাহার মনে’
আর বিদ্রোহী কবি নজরুলের পুত্র বুলবুলের মৃত্যুতে লেখা
‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি’
যা আজও আমাদের কাঁদায়।

কবি সাহিত্যিকেরা নানাভাবে মানুষের দুঃখবেদনা প্রকাশের মর্মস্পর্শী চিত্র এঁকে গেছেন। ছোটগল্পের জন্য বিশ্ব সাহিত্যে আন্তন চেখভ সুপরিচিত নাম। চেখভের এক গল্পে দেখা যায় পুত্রকে হারিয়ে ব্যথিত এক বাবা ঘোড়ার গাড়ী চালিয়ে যাচ্ছে। বরফ ঢাকা তীব্র শীত চরাচরে আর পুত্রহারা একাকী বাবা ঘোড়ার কাছে তার ছেলের গল্প বলছে, বলেই চলেছে। বর্ননা শুনে পাঠকের হৃদয় গলে গলে পড়ছে দুঃখ-বেদনায়

রুশসাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কি আত্মজীবনী তিনখন্ডে লিখেছেন। ‘আমার ছেলেবেলা’, ‘পৃথিবীর পথে’, ‘পৃথিবীর পাঠশালায়’। খুব ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়েছেন, যার কাছে স্নেহ-ভালবাসা পেয়েছিলেন সে হচ্ছেন গোর্কীর নানী। দারিদ্র ছিল ছোটবেলার সঙ্গী। কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ হয়নি তার। বালক গোর্কী শ্রমিকের কাজ শুরু করেন। মালিকের (সম্ভবতঃ ঘড়ি মেরামতকারী ছিল লোকটি) কাছেই থাকতেন। নানীর আদরও তখন অধরা। একদিন খবর পেলেন নানী মারা গেছেন। সে রাতে বালক গোর্কীর চোখে ঘুম নেই। চারপাশে কেউ জেগে নেই তাঁর দুঃখের ভাগ নেবার জন্য। আকাশে চাঁদ আর উঠোনে ইদুঁরেরা দৌড়াদৌড়ি করছে মাত্র। গোর্কী ইঁদুরদের কাছে নিজের মর্মবেদনা উজার করে দিলেন, নানীর কথা ইঁদুরদের বলেছিলেন যত্ন নিয়ে ভালবেসে।

দিলরুবা শাহানা


Place your ads here!

Related Articles

China-Bangladesh: Strengthening Partnership

Vice Premier of China Ms. Liu Yandong visited Dhaka on May 24-26, 2015. It is reported that Chinese Premier Li

Hajj, Umrah and Gomrah

হজ্ব, ওমরাহ এবং গোমরাহ অধ্যাপক নজরুল হাবিবী (লন্ডন থেকে) (এই লেখাটি কাল্পনিক। বাস্তবতার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। যদি কারো

প্রিয় মানুষের শহর – ৯

ক্যানবেরা প্রথম। বদলী হয়ে এসেছি কুমা থেকে। সাত বছর মালেসিয়ায় থাকার পর কোম্পানি বদলী করেছিল – তাঁদের প্রধান কার্যালয় –

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment