বিদায়ী হাই কমিশনারের মাতৃভাষা প্রেম, এবং জাতীয় তথা বৈশ্বিক দায়িত্ববোধ
নির্মল পাল: বাংলা’র মহান একুশে’র আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বৈশ্বিক মর্যাদাপ্রাপ্তির সুবাদে একুশের চেতনার বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জনের মাধ্যমে পৃথিবীর সকল ঝুঁকিপূর্ণ মাতৃভাষা রক্ষার দীর্ঘসূরী বিশ্বব্যাপ্ত কৌশল এমএলসি মুভমেন্ট ইন্টারন্যাশন্যাল “কন্সারভ ইউর মাদার ল্যাংগুয়েজ” বৈশ্বিক আবেদনের মাধ্যমে শুরু করেছে। তারই প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা আজ ২২শে সেপ্টেম্বর সকাল ৯ ঘটিকায় অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরায় এসিটি লেজিসলেটিভ এসেম্বলিতে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সুচিত করেছেন ক্যানবেরা থেকে প্যারিসে বদলীর আদেশপ্রাপ্ত বাংলাদেশ হাই কমিশনার মান্যবর কাজী ইমতিয়াজ হোসেন। এসিটি লেজিসলেটিভ এসেম্বলির বিরোধী দলীয় নেতা মাননীয় এলিসটার কোএমএলএ’র কার্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে এসিটি রাজ্য সরকার কর্তৃক ইউনেস্কোর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করার সিদ্ধান্ত বিষয়ক লেজিসলেটিভ এসেম্বলিতে সর্বসন্মতভাবে পাশকৃত মোশনের মূল কপি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণের মাধ্যমে তিনি একুশের চেতনার বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জনের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রার গোঁড়াপত্তন ঘটান। উল্লেখ্য, বিগত ১৩ই সেপ্টেম্বর ২০১৭ এসিটি বিরোধী দলীয় নেতা মাননীয় এলিসটার কো এমএলএ’র প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে লেজিসলেটিভ এসেম্বলি সর্বসন্মতভাবে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উদযাপন করার পাশাপাশি ক্যানবেরায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ এবং প্রতিটি লাইব্রেরীতে “একুশে কর্নার” প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
এপ্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৯৯৯ সনে ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্বব্যাপী মাতৃভাষা সমূহের দ্রুত অবক্ষয় রোধে প্রত্যেকটি ইউএন সদস্য রাষ্ট্র কর্তৃক প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উদযাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলেও বাংলাদেশ ব্যাতিত অন্য কোন দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি উদযাপন করা বা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। সে ক্ষেত্রে এসিটি লেজিসলেটিভ এসেম্বলি কর্তৃক গৃহীত এই সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত একটি ঐতিহাসিক, তাৎপর্যমূলক এবং ক্ষয়িষ্ণু মাতৃভাষা রক্ষার ক্ষেত্রে আন্যান্য যে কোন স্টেট বা রাষ্ট্র কর্তৃক অবশ্যই অনুকরণীয় সিদ্ধান্ত। ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার শুরু থেকেই এমএলসি মুভমেন্টের সদস্যবৃন্দ এই বিষয়ে গবেষণা, সুনির্দিষ্ট কৌশল প্রণয়ন, এবং ক্ষয়িষ্ণু মাতৃভাষাসমূহ রক্ষায় প্রত্যেক দেশ কর্তৃক সুনির্দিষ্ট নীতিমালা গ্রহনের অপরিহার্যতার বিষয়ে বহু সভা-সেমিনার করার এক পর্যায়ে গত ৭ই জুলাই ’১৭ ইউনেস্কোর সাথে এমএলসি মুভমেন্টের দীর্ঘ ৭০মিনিট ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিষয়টি ইউনেস্কোকে বুঝাতে সক্ষম হয়। তাদের উৎসাহব্যঞ্জক পরামর্শে বিগত ২৮শে জুলাই বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ক্যানবেরার স্থানীয় লিবারেল নেতা মি ইগ্নেটিয়াস রোজারিও’র মাধ্যমে এমএলসি মুভমেন্টের নেতৃবৃন্দ মাননীয় এলিসটার কো এমএলএ’র সাথে তাঁর কার্যালয়ে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে সকল ভাষাভাষীর জন্যই মাতৃভাষা সংরক্ষণের বিষয়টি বুঝাতে সক্ষম হন, এবং তিনি এমএলসি মুভমেন্টের নেতৃবৃন্দের সাথে পর্যায়ক্রমে আলোচনার ভিত্তিতে মোশনটি সকলের গ্রহণযোগ্যভাবে তৈরি করেন, যা সর্বসম্মতভাবে এসিটি লেজিসলেটিভ এসেম্বলিতে পাশ হয়ে এই ঐতিহাসিক বৈশ্বিক যাত্রার পথ উন্মুক্ত করেন।
মান্যবর হাই কমিশনার কাজী ইমতিয়াজ হোসেন সম্প্রতি প্যরিসে বদলি হওয়ায়, এবং তাঁর প্যরিসে হাই কমিশনার অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ইউনেস্কোর দায়িত্ব থাকায় এমএলসি মুভমেন্ট ইন্টারন্যাশন্যাল এবং ইউনেস্কোর সাথে বিগত ৭ই জুলাই ’১৭ অনুষ্ঠিত ভিডিও কনফারেন্সসহ ইউনেস্কোর সাথে পূর্বাপর অনুষ্ঠিত যাবতীয় যোগাযোগ বিষয়ে তাঁকে অবহিত করার বিষয়টি উপস্থাপন করার প্রেক্ষাপটে তিনি ১৩ই সেপ্টেম্বর ১ ঘটিকায় ক্যানবেরা যাওয়ার পরামর্শ প্রদান করেন, যা কাকতালীয় ভাবে এসিটি লেজিসলেটিভ এসেম্বলিতে মোশন মুভের একই দিন এবং সময়ের সাথে মিলে যায়। একই দিনের দু’টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ এবং উৎসাহজনক প্রেক্ষাপট আমাদের মত মাননীয় হাই কমিশনারের মনে গভীর দাগ কাটে, যার ফলশ্রুতিতে তিনি আমাদের মতই আবেগাপ্লুত হয়ে এই ঐতিহাসিক দলিল স্বহস্তে গ্রহণের সুযোগের প্রেক্ষাপট তৈরি করেন, এবং একুশের চেতনার আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জনের লক্ষে বাংলাদেশ সরকার এবং ইউনেস্কোর সাথে সমন্বয় সাধনের বিষয়ে এমএলসি মুভমেন্ট ইন্টারন্যাশন্যাল উদ্ভাবিত কৌশলসমূহ বাস্তবায়নে কাজ করার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। তিনি এসিটি লেজিসলেটিভ এসেম্বলিতে গৃহীত এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক বলয়ে দৃষ্টান্তমূলক বলে মন্তব্য করেন, এবং গত ১৩ই এপ্রিলের ঐতিহাসিক মুহূর্তে এসিটি লেজিসলেটিভ এসেম্বলিতে ব্যাক্তিগতভাবে আমাদের সাথে উপস্থিত থাকতে না পারার কারনে তিনি স্বহস্তে এই ঐতিহাসিক দলিল গ্রহণে ইচ্ছা প্রকাশ করেন, এবং ইউনেস্কোর দায়িত্ব পালনকালে বিশ্বব্যাপী মাতৃভাষা সুরক্ষার প্রয়োজনে এই ঐতিহাসিক দলিলের দৃষ্টান্ত সহায়ক ভুমিকা পালন করবে বলে মন্তব্য করেন।
এসিটি লেজিসলেটিভ এসেম্বলিতে পাশকৃত এই ঐতিহাসিক দলিল মান্যবর হাই কমিশনার কাজী ইমতিয়াজ হোসেন কর্তৃক মাননীয় এলিসটার কো এমএলএ’র অফিস থেকে আজ (২২/৯/১৭) গ্রহণের সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ হাই কমিশনের প্রথম সচিব মিসেসে ফরিদা ইয়াসমিন, স্থানীয় লিবারেল নেতা মি ইগ্নিটিয়াস রোজারিও, মি জিওয়াউল হক বাবলু এবং ডঃ অজয় কর। অনাড়ম্বরভাবে আয়োজিত ঐতিহাসিক দলিল হস্তান্তর অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে এমএলসি মুভমেন্ট ইন্টারন্যাশন্যালের অনুরোধক্রমে এই ঐতিহাসিক মাইলফলক সৃষ্টির জন্য ‘ফুলের তোড়া’, এবং ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ ও একুশে কর্নার এর গ্লোবাল পোষ্টার এবং ১৩ সেপ্টেম্বর ধারণকৃত কয়েকটি ছবি’ দ্বারা তৈরি সুভেনির দিয়ে মাননীয় এলিসটার কো এমএলএ কে সম্মানিত করেন এমএলসি মুভমেন্ট ইন্টারন্যাশন্যালের ক্যানবেরাস্থ দলনেতা ডঃ অজয় কর। তাঁর প্রতি সম্মান জানানোর জবাবে মাননীয় এলিসটার কো এমএলসি মুভমেন্ট ইন্টারন্যাশন্যালের পৃথিবীর সকল মাতৃভাষা রক্ষার পরিকল্পনাকে অত্যন্ত ব্যতিক্রমী একটি চ্যলেঞ্জ হিসেবে প্রশংসা করেন, এবং ডঃ অজয় করকে এই কর্মকাণ্ডের সাথে তার সম্পৃক্ততার প্রতি সম্মান জানিয়ে এসিটি সরকারের নেতৃত্বে সকল ভাষাভাষীর সমন্বয়ে ২০১৮ সনে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উদযাপনের আশ্বাসসহ গৃহীত অন্যান্য সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানান। আমরা মাননীয় এলিসটার কো এবং মান্যবর হাই কমিশনার কাজী ইমতিয়াজ হোসেনের দীর্ঘ কর্মজীবন এবং দীর্ঘায়ু কামনা করি।
Nirmal Paul
নির্মল পাল; ইমেইলঃ nirmalpaul@optusnet.com.au; প্রতিষ্ঠাতা এবং চেয়ারপারশনঃ এমএলসি মুভমেন্ট ইনটারন্যাশন্যাল ইনক; প্রাথমিক নকশা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নকারী দলনেতাঃ পৃথিবীর প্রথম “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ”; প্রকাশিত গ্রন্থঃ “বিশ্বায়নে শহীদ মিনার”; বৈশ্বিক দর্শনঃ “লাইব্রেরীতে একুশে কর্নার”, (স্থানীয় বর্ণমালা সংরক্ষণ কেন্দ্র)
Related Articles
অপেক্ষা
১. ঘরের ছোট্ট জানালায় দুপুর পেরিয়ে বিকেলের আলো ঢুকেছে অনেকক্ষণ। বিকেলের মরে আসা রোদে ধুলোরা ছায়াপথ তৈরি করেছে জানালার গ্রীল
Zaglul Ahmed Chowdhury: As I knew him
Zaglul Ahmed Chowdhury’s tragic demise due to the road accident on 29th November was the most wrenching piece of news
বহে যায় দিন – একবার যেতে দে না আমায় ছোট্ট সোনার গাঁয়
> বহে-যায়-দিন সকল প্রকাশিত পর্ব > ।। চার ।। একবার যেতে দে না আমায় ছোট্ট সোনার গাঁয় ১৯৯১ সালের জুলাই মাসে








Thanks the editor for publishing the report,