একজন মা ও নমের আলির মুক্তিযুদ্ধ

একজন মা ও নমের আলির মুক্তিযুদ্ধ

 

ক’দিন থেকেই নস্টালজিয়ার ভুগছি। মন থেকে কোনভাবেই স্মৃতিগুলো সরাতে পারছি না। মানসপটে ভেসে আসছে আধা শুভ্র চুল দাঁড়ির একজন মানুষের মুখ। আর তাঁর ব্যাকুলতা আর আকুল করা চাহনি। একজন স্নেহময়ী মায়ের করুণতার কথা। তাঁর অলোকিত হৃদয়ের আর নির্জন নরম শিশিরের মত ভালবাসার কথা। তখনকার পাঁচ বছরের এই আমার কতটুকু স্মৃতিই বা মনে আছে। তার পরেও এক অদম্য ইচ্ছায় আমি নমের আলির কথা বলবো, আমার মায়ের কথা বলবো।

মুক্তিযুদ্ধ চলছে। আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধের ডাক্তার। ছয় নম্বর সেক্টরকে কেন্দ্র করে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্যে ছুটে যেতে হতো যুদ্ধক্ষেত্রে । আর এই নমের আলি ছিলেন বাবার নিত্য সঙ্গী, তাঁর কাছের মানুষ, প্রানের বন্ধু। নমের আলিকে প্রথমে আমি অন্যভাবে চিনেছিলাম । একজন শিশুর কৌতুহল থেকেই হয়তো তাঁর ডান কিংবা বাম হাতের ছটি আঙ্গুল আমার সাথে তাঁর সখ্যতার প্রথম কারণ। তিনি পরিচিত ছিলেন নমের বুড়া নামে। আর নমের দাদাকে নিয়ে আমি ছন্দ বানাতাম – নমের বুড়া/গমের গুড়া। আমরা তখন চার ভাইবোন। ছোট বোনটির বয়স এক বছর। আর আমরা বাকী তিনজন কোলা-পিঠে।  মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই আমাদের বাবা পাটগ্রাম সরকারী ডিসপেনসারির বাসায় চলে এলেন। কারণ আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্যে এ এলাকায় আর কোন ব্যবস্থা ছিল না । স্মৃতি হাতড়িয়ে খুঁজে পাই নি নমের দাদা কোথায় থাকতেন। কিন্তু এতটুকু মনে করতে পারছি বাসায় যতক্ষণ বাবা থাকতেন সারাক্ষণই তিনি থাকতেন তাঁর সাথে ছায়ার মত। আব্বার ডাক্তারি ব্যাগ, ঔষধপত্র, ব্যান্ডেজ ও সরঞ্জাম গুছিয়ে নমের দাদা সূর্য উঠার অগেই প্রস্তুত থাকতেন। আব্বা আর নমের দাদার যুদ্ধে যেয়ে স্বজনদের সেবা করবার বাহন ছিল কালো রঙের হোন্ডা  ৯০ সিসি মোটর বাইক । আব্বাকে নেবার জন্যে অবশ্য প্রায়শঃই একটা খোলা জলপাই রঙের জিপ আসতো। আমি গাড়িটার মোহে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতাম।  নমের দাদা নিমিষেই সব উঠিয়ে দিতেন গাড়িতে। আব্বার ও কি যেন তাড়া। নীরবতা কাজ করতো বাবা মার মাঝে। আব্বা চলে যেতেন নিরুদ্দেশের উদ্দেশে অজানা সময়ের জন্যে- গাড়ির পিছনের ছিটে নমের দাদা ছাদের কাঠামো ধরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। আর আমি ঐ গাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আম্মার চোখের পানি গলগল করে ছুটে চলতো লাল টুকটুকে গাল গড়িয়ে। বুঝতাম না আম্মা কাঁদছেন কেন?

আব্বা ফেরার পর, নমের দাদা ব্যস্ত হয়ে যেতেন বাসার বাজার সদাই নিয়ে। কোথা থেকে যেন দুহাতের ব্যাগ ভর্তি বাজার নিয়ে ফিরতেন। আব্বা ক’দিন পর পর ফিরতেন গভীর রাতে। আব্বার আগমনে আমরা সবাই জেগে যেতাম। আব্বার সাথে খেতে বসতাম। সাথে নমের দাদা। কিন্তু আবারও সেই কাক ডাকা ভোরে নমের দাদাকে নিয়ে আব্বা কোথায় যেন চলে যেতেন। আধা ঘুমে আব্বা আর নমের দাদাকে বিদায় জানাতাম প্রায়শঃ। মনে নেই কতদিন এমন চলেছে। কিন্তু এখনো মনে ভাসে আব্বা যখন ফিরতেন সারা বাড়ী আলোকিত হয়ে যেত, আম্মা অস্থির থাকতেন আর আমরা সব ভাই বোন জড়ো হতাম আব্বাকে ঘিরে। নমের দাদা আমাদের সবাইকে কোলে নিতেন, আদর করতেন। পঁয়তাল্লিশ বছর পরেও তাঁর আদরের ঘ্রান যেন এখনো শরীরে লেগে আছে।

বাসায় একটা বাংকার ছিল। কখন তৈরি করা হয়েছিল স্মৃতি হাতড়িয়ে খুঁজে পাইনি।। পাটগ্রাম মুক্ত অঞ্চল হলেও কোন শব্দ হলেই আম্মা আমাদের সবাইকে বাংকারে নিয়ে যেতেন। আম্মা যে কেমন করে আমাদের সব ভাইবোনদের নিয়ে বাংকারে ঢুকতেন তা আজও মেলাতে পারি না। কখনও দেখতাম বাসা ভর্তি লোক। গুনতে জানতাম না সে সময় কিন্তু বড় চুল, দাঁড়ির কাকারা এলে একটা বড় ঘর ভরে যেত। সবাই আব্বার খুব কাছের মানুষ। আম্মা আব্বা দুজনই তাঁদেরকে মনে হয় অঢেল ভালবাসতেন। তাঁদের সাথে থাকতো অনেক ধরনের অস্ত্র। আমি একবার সাহস করে কাউকে যেন বললাম আমি তাঁদের অস্ত্রগুলোকে দেখতে চাই। আমার হাতে কেউ একজন একটা কালো রঙের ভারি অস্ত্র দিতে চাইলেন আমি  আলগাতে পারলাম না। কিন্তু কেন যেন নিজেকে খুব সাহসী মনে হলো। আম্মাকে বললাম, বোন কে বললাম কিন্তু মনে হয় তাঁরা তেমন সায় দেয়নি আমার বীরত্বের।  কাকারা যখন বাসায় আসতেন আমাদের প্রতি আম্মার মনোযোগ কমে যেতো । আম্মা হয় রান্না ঘরে ব্যস্ত থাকতেন রকমারি রান্না নিয়ে, নয়তোবা কাকাদের কাপড় ধুয়ে দিতেন অনেক সময় নিয়ে। কাকারা কেউই বাসা থেকে বের হতেন না। আম্মাকে সবাই বুবু বলে ডাকতেন। এই শব্দটা এখনো কানে ভাসে। প্রায় সবার নাম ভুলে গিয়েছি। শুধু মনে আছে সালাম মামা, ইয়াছিন কাকাদের কথা। পরে শুনেছি এরা সবাই গেরিলা যোদ্ধা ছিলেন। ছিলেন আব্বার কাছের মানুষ, প্রিয় মানুষ।

সাদামাটা আমার মা তাঁর মুক্তিপাগল ভাইদের সেবা করবার জন্যে কিই না করেছেন। একটি দেশের স্বাধীনতার তাঁর কাছে কতটুকু মুল্যবান ছিল জানি না  কিন্তু এখন বুঝি এ ছিল এক জননীর অবিনশ্বর ভালোবাসা অন্য এক জননীর জন্যে –  জন্মভূমি জননীর জন্যে।

এটি হয়তো একটি অতি সাধারন সাদামাটা স্মৃতিচারণ। একটি অতি সাধারন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের গল্প। কিন্তু আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি এটি কোন মা কিংবা ব্যক্তি নমের আলির গল্প নয় এটি মুক্তিযুদ্ধকালীন ন’মাসের বাংলাদেশের প্রতিটি মা আর অতিসাধারন লাখ মানুষের প্রতিচ্ছবি। যাঁদের ভালবাসায় শিক্ত হয়েছে বাংলাদেশের আকাশ, বাতাস, ফুল পাখি আর প্রতিটি হৃদয়। এমন কোটি  মা   আমাদের কল্পনার সব সীমারেখাকে অতিক্রম করে নিদেনপক্ষে এমনি করেই আলো ছড়িয়েছেন, মুক্তিপাগল মানুষগুলোকে কাছে টেনেছেন আর একটি দেশের জয়যাত্রাকে নিশ্চিত করেছেন। আর নমের দাদাদের মত  লোকেরা তাঁদের পরের প্রজন্মের মানুষগুলোর বেঁচে থাকাকে অর্থবহ করেছেন, যাঁরা হয়তো কখনই কোন পরিচয় পেত না মানুষ হিসেবে নিজেকে দাবী করবার।

কিন্তু হাহাকারে হৃদয় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় যখন দেখি এই স্বাধীনতা প্রিয় বাংলাদেশের মানুষরাই হাড়িয়ে ফেলে  নমের দাদাদের কথা, স্নেহময়ী মায়েদের কথা।  যারা জননী মাতৃভুমির প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতা একান্তই কতব্য বলে মনে করতেন, যারা বিশ্বাস করতেন মনেপ্রানে যে এর কোন বিনিময় নেই। যারা শিখিয়েছেন মাকে ভালোবাসতে হলে জীবনকে তুচ্ছ করতে হয়, জীবনের স্পন্দনকে বিকিয়ে দিতে হয়।।

# লেখক প্রবাসী বিজ্ঞানী।

Dr Ezaz Mamun

Dr Ezaz Mamun

From Rangpur, Bangladesh. Agricultural Scientist. Studied Agriculture in Bangladesh and Australia. Involved in cultural movement, student politics and journalism. Worked at international agencies and government departments in Bangladesh, University of Sydney and Macquarie University. Currently working with Australian government department in agriculture and climate change areas.


Place your ads here!

Related Articles

বুদ্ধিজীবীদের নিধন এবং বিচার প্রসঙ্গ

১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর পাকবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদররা অত্যন্ত পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করে দেশের শ্রেষ্ঠসন্তান বুদ্ধিজীবীদের । আর

আনন্দের ঈদ ও প্রিয় অস্ট্রেলিয়া পরিবার

সম্পাদকীয় ঈদ মানে খুশি, খুশি মানে আনন্দ । ছেলেবেলায় ঈদের দিন ভোরবেলায় দূর ঈদগাহ মাঠ থেকে এরকম বানী ভেসে আসত

Bikrampur International Airport

প্রসঙ্গ পদ্মাসেতুঃ জাতিয় উন্নায়নের বাধার রাজনীতি কখনো কল্লান কর নয় । বিক্রমপুরের বুঁক চিরে দক্ষিন পষিচমাঞ্চলের উন্নায়নের দ্বার খুলে দেবে

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment