স্পর্ধা
এই গলিটা পার হলেই নাজ বেকারি। ওখানে একটা বিস্কুট পাওয়া যায়। ভেতরে ক্রিম দেওয়া। বাইরেটা চকলেট। এত মজা! মেহমান আসলেই মা ভাইয়া কে পাঠায় এই বিস্কুটটা আনতে। কিন্তু দাম বেশী। সব মেহমান ঐ বিস্কুটের স্বাদ পায়না। মাসের শেষ হ’লে তো শুকনো মুখে রং চা আর মুড়ি মেখে সামনে আনতে হয়। বাবা মুখের উপর পেপার ফেলে শিকড় গেড়ে বসে, আর আমি মায়ের মুখের এক্সপ্রেশন দেখি। আগে হাসি পেতো। এখন বড্ড মায়া হয়। চুলার পাড়ে মায়ের অন্য মনষ্ক মুখ খুব করে খেয়াল করি। আমাদের কোন আয় ইনকাম নেই, তাও মা কি করে সংসার চালায় সে এক রহস্য। বাবার পেনশনের টাকা সংসারে ঢোকে বলে মনে হয় না। ভাইয়া কোথা থেকে মাঝে মাঝে দু ,চার, পাঁচ শো টাকা হাতে গুজে দেয় ঠিকই তবে মায়ের কাছ থেকেও নেয়। আমি সবার ছোট দেখে কেউ কিছু বলে না। কিন্তু চোখের কোণা দিয়ে সবই দেখি। শুধু প্রশ্ন করলে উত্তর পাইনা।
আজ মাসের ২৭ তারিখ। কিন্তু আজ বাড়িতে ঐ বিস্কুট এসেছে। সাথে আবার কেক। আমি তাজ্জব চোখে মা’র ব্যাস্ততা দেখছি। এই নড়বরে টেবিলটা গোছাচ্ছে আবার রান্না ঘরে ঢুকছে। আমি আলগা ভাবে ঘুরতে ঘুরতে মাকে জিজ্ঞেস করলাম, “ কে আসছে মা?”
মা কাজ করতে করতে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, “ তোকে দেখতে”
আমি আকাশ থেকে পড়লাম না। এর আগে বেশ কিছু মাল আমাকে দেখে গেছে। এক সেক্স পারভার্ট সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশী লেবার, নীলক্ষেতের ফটোকপি’র দোকানদার, আরেক টা আসতে চেয়েও আসেনি।
সৌদি প্রবাসী টা সারাক্ষণ আমার বুকের দিকে চেয়ে ছিল আর জিভ দিয়ে সিগারেট খাওয়া কালো মোটা ঠোঁট গোঁফের নিচ দিয়ে চাটছিল। লোকটা ঐ দিনই বিয়ে করতে চেয়েছিল। বাবা মা’র এমন অবস্থা যে হাতে আকাশের চাঁদ পেয়েছে। কিন্তু ভাইয়া বাধ সাধায় ঐদিন বিয়েটা বন্ধ করা গিয়েছিল। পরে অবশ্য জানা গিয়েছিল লোকটার বউ বাচ্চা আছে।
নীলক্ষেতের ফটোকপি ওয়ালা সিঙ্গেল ছিল। কিন্তু দেনা পাওনা মেলেনি। তাই সরে পড়েছিল। সে যাই হোক, এদের বেলায় এত আয়োজন হয়নি। আজ যে আসবে সে হয়তো বেশ মালদার পার্টী। বাবার চকচকে চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। টাকা পয়সার বিষয় আসলে বাবা খুশি খুশি থাকে।
মা চোখ তুলে বললেন, “ নীল তাঁতের শাড়িটা পরিস। আর এই নে ১০ টাকা, দোকান থেকে সানসিল্কের একটা প্যাকেট নিয়ে আয়। মাথা ধুবি ভাল করে। আমি আমার লালচে হয়ে যাওয়া চুলে হাত বোলাই। শ্যাম্পু করি না অনেকদিন। বাসায় একটা সাবান আনা হয়, সেটা কাপড় কাঁচার। সেটা দিয়ে সব হয়। মাঝে মাঝে ভাইয়া লাক্সের মিনি প্যাক আড়ালে আবডালে নিয়ে আসে। তখন মাঝে সাঝে গায়ে গতরে মাথায় দেই। এছাড়া ঐ সেজেগুজে থাকা আমার মাথায় আসে না।
ক্লাস নাইনে উঠে একদিন স্কুলে যাব। মা বললেন, আর যেতে হবে না। আমি বললাম, কেন? তখন বাবা বললেন, “ এলাকাটা ভাল না। বাসায় বসেই পড়। প্রাইভেটে এস,এস,সি দিও।“ আমার এস,এস,সি আর দেওয়া হয়নি। ভাইয়া শেয়ার বাজারে দারুণ একটা ধরা খেয়েছিল। হয়তো সেটার খেসারত দিতে হয়েছিল। প্রথম প্রথম কষ্ট হত। এখন আর হয় না।
আমি শ্যাম্পু নিয়ে বাথরুমে ঢুকি। অনেক দিন পর ঘসে ঘসে সময় নিয়ে গোসল করি। মা দেখি আমার জন্য গোটা এক বালতি পানি আলাদা করে রেখেছে। নিজেকে রানী রানী লাগে। আমি এদের সংসার থেকে বিদায় হ’লে এরা বড্ড বেঁচে যাবে। আহারে! ভাবি আমি। আজ যে আসবে তার সাথে যেন চলে যেতে পারি। প্রার্থনা কাকে করব বুঝে পাই না। বিধাতার এত সময় নেই এই প্রার্থনা শোনার। তার আরও অনেক কাজ আছে নিশ্চয়ই! মা বাথরুমের দরজায় ঘা দেয়। মসুর ডাল- হলুদ বাটা বাড়িয়ে দেয়। আমি মাখি। আজ আমার বিদায় হতেই হবে।
ভাইয়া নাজ বেকারির সামনে দাঁড়িয়ে আছে ৫ টা থেকে। পাত্র পক্ষ রাস্তায় জ্যামে। আমি শাড়ী পরে জানালার পাশে বসে আছি। আমার চুল খোলা। আমার দারুন গরম লাগছে। পাশের বাড়ির মিনু ভাবির কাছ থেকে ধার করা ফেস পাউডার ফুটে ঘাম আমার আসল রং বের করে দিচ্ছে। আমার খুব তেষ্টা পাচ্ছে। মনে হচ্ছে ঠাণ্ডা পানি পেতাম! এক বোতল খালি করে দিতে পারতাম। কিন্তু উঠতে ইচ্ছে করছে না।
ওরা এলো সাড়ে সাতটার সময়। পাত্র আর ঘটক। পাত্র যে খুব বড়লোক বোঝা যাচ্ছিল। হাতে দামি ঘড়ি, ইস্ত্রি করা দামী শার্ট। তবে তার দৃষ্টি বলে দিচ্ছিল এত গরিব বাড়িতে সে এর আগে আসেনি। তবে ভদ্রতা দিয়ে সেই দৃষ্টি ঢাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিল। বেশ লাগল আমার। হোক না আমার চেয়ে ১৫/২০ বছরের বড়, তাতে কি!
নাস্তা তেমন কিছুই খেল না ওরা। ঘটক কে মাথা নিচু করে কি যেন বলল, ঘটক হেসে বলল, ছেলে মেয়ের সাথে একটু কথা বলতে চাইছে, যদি আপনাদের আপত্তি না থাকে। বাবা হা হা করে বললেন, “ আপত্তি কিসের, এটাই তো উচিৎ। এখন কি আর আগের যুগ আছে!…” ভাইয়ার দিকে চোখ পড়তেই বাবা তার উত্তেজনার ব্রেক কষলেন।
আমরা বাবা মায়ের ঘরে বসলাম। ভদ্রলোক কথা শুরু করলেন, “ আমার নাম তো শুনেছ, আমি মৃদুল। গার্মেন্টসের ব্যবসা করি। আমার বাবা মা ক্যানাডায় থাকেন আমার বোনের কাছে। আমি এখানে একা। “
আমি মাথা নিচু করে আছি।
উনি বললেন, “ তুমি কিছু বলছ না কেন?”
আমি বললাম, “ কি বলব?”
-“ কিছু একটা…”
-“ আমার কিছু বলার নেই, আপনি বলুন আমি শুনছি।”
মৃদুল একটু অবাক হয় কি? তবু আবার বলা শুরু করে, “ আমি তোমাকে যে কথাটা বলার জন্য আলাদা করে ডেকেছি সেটা না বলে আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারব না। শোন… শম্পা…
-“ সোমা…আমার নাম…”
“ও… সো সরি…”
-“না ঠিক আছে।“
-“ সোমা, আমার একটা অ্যাফেয়ার ছিল। একদিন ঝোঁকের মাথায় আমরা বিয়ে করি। বিয়ের পর সেভাবে একসাথে থাকা হয়নি। একটা পর্যায়ে সে সন্তান চায়। আমরা চেষ্টাও করি, কিন্তু শম্পা কোনদিন মা হতে পারবে না।“
মৃদুল মাথা নিচু করে বসে আছে। আমি বললাম,” শম্পা আপনার স্ত্রীর নাম?”
মৃদুল চমকে উঠল কেন যেন।
তার পর বলল, “ ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছে। এর পর আমাদের সেপারেশন হয়। শম্পাই আলাদা হয়ে যায়।“
আমার কেন যেন হাসি পাচ্ছিল। আমি হাসি চাপতে চাপতে খুক করে একটা শব্দ হয়ে গেল।
মৃদুল তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল, “ আমি কি মজার কিছু বললাম?”
আমি হাসি হাত দিয়ে ঢেকে বললাম, “ না, আপনাদের নিশ্চয়ই আইনগত ভাবে ছাড়াছাড়ি হয়নি?”
মৃদুল হঠাৎ করে আমতা আমতা করতে করতে বলল, “ সেটা তো খুব লেংদি প্রসেস…হবে ধীরে ধীরে।“
আমি সরাসরি মৃদুলের চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, “ আপনি আমার কাছে কি চান? বাচ্চা?”
মৃদুল একটা ধাক্কা খেল। চুপ করে থেকে বলল, “ সেটা তো স্বাভাবিক। তুমি কি চাও না?”
আমি এবার কাছে এগিয়ে বললাম, “ সেই বাচ্চাটা শম্পার জন্য গিফট হিসেবে নিয়ে তাকে আবার ফিরিয়ে আনবেন, তাই না?”
মৃদুলের মুখ থেকে রক্ত সরে যায় যেন। খাবি খেতে খেতে উঠে দাঁড়ায়, বলে,” না না…কি বলছ তুমি, তোমার প্রতি আজীবন আমার দায়িত্ব পালন করব…”
আমি মুখ থেকে কথা টেনে বলি, “ আর ভালবাসবেন আজীবন শম্পা কে, তাই না?”
মৃদুল তাও অক্ষম ভাবে মাথা নাড়তে থাকে। আমিও একটা গোঁয়ার, পেটে ভাত জোটে না, আবার ভালবাসা নিয়ে প্রশ্ন তুলি।
আমি আবার বলি, বিয়ে শাদির ঝামেলা না করে আমাকে বরং ভারি একটা অ্যামাউন্ট দিন। আপনার আর শম্পার বাচ্চার জন্য আমি পেট ভাড়া দেই।
মৃদুল এবার যেন হাল ছেড়ে আসল রূপে আসে, “ সেটা কি সম্ভব?”
আমি কথাটা ঠাট্টা করেই বলেছিলাম। ভাবিনি মৃদুল অসহায়ের মত তাই সত্যি ধরে নেবে। আমি একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, আপনি বরং এখন আসুন।
মৃদুল কোন কথা না বাড়িয়ে মাথা নিচু করে বেরিয়ে যায়।
আমি আয়নার সামনে গিয়ে হাত থেকে চুড়ি খুলি। বুকের আঁচল সরিয়ে নিজের দেহের দিকে তাকিয়ে থাকি কিছুক্ষণ। আমার তো কখনও কিছু ছিল না, কেউ ছিল না…তবু কেন যেন একটা চিনচিনে ব্যাথা হচ্ছে বুঝতে পারছি না।
মা এগিয়ে আসছে। চোখে মুখে রাজ্যের প্রশ্ন। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। মনে হচ্ছে কতকাল ঘুমাই না।
Related Articles
ক্যানবেরায় দুর্গোৎসব হোক নতুন প্রজন্মের স্বার্থে
অজয় কর: বাঙালী হিন্দুদের সবচাইতে বড় ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে ‘দুর্গোৎসব’। গতবারের মতো এবারেও ক্যানবেরায় বাংলাদেশী হিন্দুদের সংঠন ‘বাংলাদেশ-অষ্ট্রেলিয়া পুজা এসোসিয়েশন
Dr Atifur Rahman on Gold Coast Medical TV Serial
The race to save Darryl’s heart with a balloon – Dr Atifur Rahman on Gold Coast Medical: Wed 30 Nov,
A book in English – Dilruba Shahana
While in Bangladesh book lovers used to buy books in Bangla to bring with them abroad, it is a very


