বাংলাদেশে চালু হোক ক্রিকেট ট্যুরিজম
[ফজলুল বারী, ধর্মশালা, হিমাচল প্রদেশ(ভারত)] বাংলাদেশের ক্রিকেট আমাকে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে ধর্মশালায় নিয়ে এসেছে। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট বোর্ডের ওয়েবসাইটে ক্রিকেট ট্যুরিজমেরও একটা দিক আছে। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দল যখন যেখানে খেলতে যায়, অথবা ক্রিকেট ম্যাচ উপলক্ষে যারা অস্ট্রেলিয়া আসেন তাদের জন্যে নানা তথ্য, ট্যুর প্যাকেজের অফার সহ নানাকিছু আছে এই ওয়েবসাইটে। বাংলাদেশ এখন যখন একটি টেস্ট খেলুড়ে দেশ, বাংলাদেশ নানা দেশে খেলতে যায়, ম্যাচ উপলক্ষে যেখানে নানা দেশে যায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দল, তাই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও এমন কিছুর ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভাবতে পারে। এখন খেলা উপলক্ষে বিসিবির কর্মকর্তারা এবং তাদের লাটবহর নানা দেশে যান। কিন্তু ক্রিকেট ফ্যানদের নিয়ে তারা কতোটা ভাবেন তা আমার জানা নেই। তবে এই ভাবনাগুলো বাড়লে আমার ধারনা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইন্ডাস্ট্রির অবকাঠামো আরও মজবুত প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।
এখন আসি ধর্মশালা প্রসঙ্গে। হিমাচল প্রদেশকে বলা হয় ভারতের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর অন্যতম। সিমলা-ধর্মশালা সহ এর নানা অংশ আবহাওয়া-ইতিহাস-ঐতিহ্যের কারনেও পর্যটকদের সব সময় আকৃষ্ট করে এই জনপদ। হিমালয়ের তিব্বত অংশ এখান থেকে কাছে। জম্মু ও কাশ্মীর, পাকিস্তানও খুব দূরে নয়। তিব্বত থেকে বিতাড়িত হয়ে ভারতে রাজনেতিক আশ্রয়প্রাপ্ত সেখানকার ভিন্নমতালম্বী নেতা দালাইলামার বাস এখন ধর্মশালায়। তাও সেই ১৯৫৯ সাল থেকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মেহেরপুরের আজকের মুজিবনগরে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হলেও কৌশলগত কারনে এর নেতারা থাকতেন কলকাতায়-আগরতলায়। দালাইলামার নেতৃত্বে প্রবাসী তিব্বত প্রশাসনের কার্যক্রমও চলে ধর্মশালা থেকে। এ নিয়ে চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, চিরাচরিত শত্রু রাষ্ট্র পাকিস্তান সীমান্ত কাছে বলে সামরিক দিক দিয়েও ভারতের কাছে ধর্মশালার গুরুত্ব অনেক। এ এলাকায় আছে ভারতের অনেক সামরিক স্থাপনা।
দিল্লী থেকে আপনি ধর্মশালা যেতে পারেন বিমানে, ট্রেনে, বাসে, টেক্সিতে। এখানকার বিমান বন্দরের এলাকার নাম গগল। সেখান থেকে আপনি বাসে টেক্সিতে ধর্মশালা আসতে পারেন। তবে আমার অভিজ্ঞতা সড়ক পথে এলে বাসে আসাই উত্তম। ট্রেন আসে পাঞ্জাবের পাঠানকোট পর্যন্ত। আমি দিল্লী থেকে জম্মু মেইলে পাঠানকোট এসেছি। পুরনো দিল্লী রেল স্টেশন থেকে রাত আটটার পর ট্রেন ছেড়েছে। সকাল ৭ টার দিকে এটি আমাকে পাঠানকোট নামিয়ে দিয়ে জম্মুর দিকে চলে গেছে। ভারতে যেহেতু পাসপোর্ট-ভিসা দেখিয়ে বিদেশিরা পর্যটন কোটায় ট্রেনে আসন পান সেহেতু ট্রেনের টিকেট পাওয়া সহজ। দিল্লীতে স্টেশনের আশেপাশে প্রচুর দালাল। টিকেটের জন্যে দালালের কাছে যাবার দরকার নেই। নতুন দিল্লী স্টেশনের দোতলায় ফরেনার্স কাউন্টারে গিয়ে টোকেন নিয়ে ফরম ফিলাপ করে নিজেই কিনতে পারবেন নিজের টিকেট। প্রথম শ্রেনীর শীতাতপ কামরার পাঠানকোটের একটা টিকেট আমি ভারতীয় ১ হাজার ৬০ রূপিতে কিনেছিলাম। সাধারন কামরার এ টিকেটের দাম ২৬০-২৭০ রুপির মধ্যে।
পাঠানকোট নেমে ধর্মশালার টেক্সি চাইলে ভাড়া হাঁকবে ৫-৬ শ রুপি। এখানে শেয়ারেও টেক্সি পেতে পারেন। ২ ঘন্টার মধ্যে টেক্সি পৌঁছে যাবে ধর্মশালায়। বাস স্টেশন রেল স্টেশনের কাছেই। আপনি হেঁটে যেতে পারবেন। রিকশা নিলে ২০-৩০ রূপি নেবে। বাস স্টেশনে গিয়ে আমি কিছুটা বিভ্রান্ত হয়েছি। কাউন্টার থেকে বললো ধর্মশালার ডাইরেক্ট বাস ছাড়বে দেরিতে। আপনি এখান থেকে গগল চলে যান। সেখানে বাস চেঞ্জ করে দ্রুত ধর্মশালা পৌঁছে যাবেন। গগলের বাসের ভাড়া নিলো ১২০ রুপি। কিন্তু পথেই টের পেলাম এটি লোকাল বাস। কতক্ষণ পরপর যাত্রী তুলছে নামাচ্ছে। এভাবে প্রায় তিন ঘন্টায় গগল গিয়ে ধর্মশালার যে বাসে উঠলাম সেটিতে বসার জায়গাই পেলাম না। তখন মনে হয়েছে সস্তার সাত অবস্থা। অত সস্তা না খুঁজে টেক্সি নিয়ে চলে আসাই ছিল ভালো।
পর্যটন শহর বলে ধর্মশালায় হোটেল ভাড়া বেশ বেশি। দামী মোটেলগুলো শহর থেকে দূরে। সেগুলোর রুম ভাড়া দেড় হাজার থেকে আড়াই-তিন হাজার রুপি। শহরের ভিতরে সেন্টার পয়েন্ট নামের এক হোটেলে কিচেনের পাশের এক রুম দেখিয়ে সেটির ভাড়া চাইল ২১৫০ রুপি। পরে আমি ডিসি অফিসের কাছে আর-স্কোয়ার বলে এক হোটেলে দেড় হাজার রূপিতে একটা রূম নিয়েছিলাম। তবে ধর্মশালার গুলিস্তান বলে চিহ্নিত কোতয়ালি বাজার এলাকায় আপনি তিনশ থেকে হাজার-বারোশোর মধ্যে নানা রেঞ্জের রূম পাবেন। অস্ট্রেলিয়া থেকে রওয়ানার আগে মনে করেছিলাম ভারত অনেক সস্তা। ডলার ভাঙ্গিয়েই অনেক রূপি পাবো। এর আগে আমি ভারত এসেছিলাম ২০০৫ সালে। সে তুলনায় এখানকার সবকিছুর দাম এখন অনেক বেড়েছে। মানুষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরগুলোও হয়ে গেছে অনেক নোংরা। তবে দিল্লী যতোটা নোংরা ধর্মশালা অতোটা নোংরা নয়। শহরের বাইরের পর্যটন এলাকাগুলো অনেক বেশি সাজানোগোছানো। এ শহর আমাদের রাঙ্গামাটির মতো উঁচুনিচু। শহরের ভিতর যানবাহন বলতে টেক্সি-বাস। টেক্সিভাড়া বেশ বেশি। যার থেকে যতো নিতে পারে। সে তুলনায় বাস অনেক সস্তা। এখানেও হিন্দির প্রচলন বেশ। তবে স্থানীয়দের কাংগ্রি সহ অনেক মিশেল ভাষা। অনেকেই ইংরেজি বলতে পারেন বলে চলাফেরায় খুব অসুবিধা হবেনা। পর্যটন শহরগুলোর মানুষজন হাসিমুখ-বন্ধুবৎসল হয়। ধর্মশালাও তেমন এক শহর।
বাঙ্গালি খাবার ভাত-মাছ-মাংস-সব্জি বড় হোটেলগুলোয় পাবেন। কিন্তু দাম অনেক। রাস্তার পাশের হোটেলগুলো মূলত পাঞ্জাবি অথবা সাউথ ইন্ডিয়ান খাবারের। রাস্তার পাশের হোটেলগুলোতে এক গ্লাস চা পাবেন দশ রূপিতে। ঘোরাঘুরিতে ট্যুর অপারেটরদের সাহায্য নিতে পারেন। এদের অনেকের নির্দিষ্ট রেট নেই। যার কাছ থেকে যেমন নিতে পারে। বাসে বা হেঁটে হেঁটে আপনিতে নিজেও যেতে পারেন নানা এলাকায়। ইউরোপীয় টুরিস্টরা মূলত এভাবে নিজে নিজেই ঘুরে অভ্যস্ত। কোথায় কোথায় যাবেন তা হিমাচল প্রদেশ সরকারের ট্যুরিজম ওয়েবসাইটগুলো দেখে ঠিক করে নেয়া ভালো। তবে দালাইলামার দফতর এলাকাটি ঘুরে দেখতে ভুলবেননা। এর আগে আমি জর্দানে দেখেছিলাম সেখানকার বাসিন্দাদের সিংহভাগ ফিলিস্তিনি। ধর্মশালার বাসিন্দাদের বেশিরভাগ দালাইলামার অনুসারী তিব্বতিয়ান। সে জন্যে এখানকার বেশিভাগ দোকানে-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দালাইলামার ছবি দেখবেন। যে দেবতা যে ভোগে সন্তুষ্ট।
এবার একটু ক্রিকেট স্টেডিয়াম নিয়ে লিখি। বাংলাদেশের বাইরে আমি অনেক বছর। বাংলাদেশের স্টেডিয়ামগুলোর অবকাঠামো নিয়ে কোন ধারনা নেই। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের নানা স্টেডিয়ামে খেলা দেখেছি। ক্রিকেট দুনিয়া শাসন করে ভারত। ধর্মশালা ক্রিকেট স্টেডিয়াম বাইরে থেকে দেখতে সুন্দর। কিন্তু ভেতরটা অসম্ভব নোংরা। এ স্টেডিয়ামে যাবার মূল সড়কটি মোটামুটি চলনসই হলেও বেশিরভাগ গেট দিয়ে প্রবেশ পথগুলো ভাঙ্গাচোরা। বেশিরভাগ গেটে প্রবেশ পথে নিরাপত্তা তল্লাশীর আর্চওয়ে নেই। আপনার গায়ে হাত দিয়ে শরীর এমনভাবে তল্লাশি করবে যা আজকের দিনে খুব দৃষ্টিকটু ও অস্বাস্থ্যকর। এখনকার সময় ডিজিটাল প্রযুক্তির। দর্শকরা টিকেট কেটে উপভোগ করতে যান। তার হাতে থাকে স্মার্ট ফোন, আইপ্যাড-টেবলেট, এয়ারফোন, এগুলোর চার্জার সহ নানাকিছু। এসবের সঙ্গে আপনার একটা ব্যাগ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এসব সঙ্গে থাকলে নিরাপত্তার কি সমস্যা হয় বা হতে পারে তা আমার মাথায় ঢুকেনি।
পৃথিবীর এমন সব ভেন্যুই ধুমপানমুক্ত। কেউ ধুমপান করতে চাইলে স্টেডিয়ামের বাইরে চলে যান। আবার টিকেট দেখিয়ে ভিতরে ঢোকেন। কিন্তু কারো কাছে সিগারেট-লাইটার-চুইংগাম এসব পেলে গেটে রেখে দেয়া, এসবের সঙ্গে নিরাপত্তার কি সম্পর্ক তা আমার মাথায় আসেনি। পৃথিবীর এমন কোন ভেন্যুতেই খাবার-ড্রিঙ্কস এসব্ নিয়ে ঢুকতে দেয়া হয়না। এরসঙ্গে ভিতরের দোকানিদের সঙ্গে ভেন্যু কর্তৃপক্ষের অলিখিত চুক্তি থাকে। ভিতরে খাবার-ড্রিঙ্কসের দাম অনেক বেশি থাকে। সবাই এসব জেনেই যান। কিন্তু ধর্মশালা স্টেডিয়ামের খাবার এলাকাগুলো, টয়লেট এসব এত নোংরা যে তা আমার আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠানের জন্যে মানসম্মত মনে হয়নি। ক্রিকেট মোঘল ভারত হয়তো এ বিষয়গুলোকে আন্তর্জাতিক স্টান্ডার্ড নয়, ভারতীয় স্টান্ডার্ডই করতে চেয়েছে! এবং হয়তো এসবই ভারতীয় স্টান্ডার্ড! বাংলাদেশ যেন এসব সবকিছুতে আন্তর্জাতিক স্টান্ডার্ড নিশ্চিত করে।
ধর্মশাল থেকে দিল্লী ফিরতে আবার বিমান-বাস-ট্রেন যার যার সুবিধামতো বাহন খুঁজে নিতে পারেন। যেমন আমি ৯ শ টাকায় কিনেছি একটি শীততাপ বাসের টিকেট। শুনেছি আরও কম টাকার টিকেটের বাস আছে। ট্রেনে গেলে পাঠানকোট গিয়ে ট্রেন ধরতে হবে। দিল্লী থেকে যার যার মতো ট্রেনে বা বিমানে কলকাতা বা ঢাকা। একবার ঘুরেই আসুন ধর্মশালা। তবে এই ক্রিকেট উৎসবটি হতে পারতো ভালো একটি উপলক্ষ। বাংলাদেশতো আর বারবার ধর্মশালায় খেলতে আসবেনা! এই উৎসব ছাড়া আর কবে তারা ভারতে খেলতে আসতে পারবে তা কেউ জানেনা।
ফজলুল বারী, ধর্মশালা, হিমাচল প্রদেশ(ভারত)
Related Articles
ক্রিকেট ভক্ত
ফজলুল বারী, নেপিয়ার থেকে আমার এক বন্ধু লিখেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেট কী এখনো হোয়াইটওয়াশের পর্যায়ে আছে? উত্তরটি বাংলাদেশের কন্ডিশনে না, বিদেশের
বহে যায় দিন – দিন চলে যায়, সবই বদলায়
> বহে-যায়-দিন সকল প্রকাশিত পর্ব > ।। এক ।। দিন চলে যায়, সবই বদলায় (২০০৬ প্রকাশিত ধারাবাহিকের পুনঃ প্রকাশ) সকাল
হে ঈশ্বর তুমি ওদের বাংরেজ না করে বাঙ্গালী কর!
আমাদের সময়টা কি হারিয়ে গেল কালের গর্ভে। বিলীন হয়ে গেল রুপকথার মোড়কে মুড়ানোর মত আবেশ করা অনুভুতি গুলি। নুতন বইয়ের









