গাফফার চৌধুরী ও পবিত্র আল্লাহর নাম

গাফফার চৌধুরী ও পবিত্র আল্লাহর নাম

গাফফার চৌধুরীর পবিত্র আল্লাহর নাম নিয়ে সাম্প্রতিক বক্তব্যটুকু পত্রিকাতে যতটুকু এসেছে তাই পড়েছি I গাফফার চৌধুরীর উল্টোদিকের তথাকথিত মৌলভি (কবি নজরুলের ভাষায় মৌ- লুভি) ও নিয়মিত শরাব পানকারী এবং ব্রথেল গমনকারী ‘মমিন’ ভাইদের ভাব সাব দেখে কার্ল মার্কস এর সেই old maxim টাই মনে পড়ে: Religion is the opium of the mass people. আমাদের বর্তমান ইফতার পার্টিগুলোতে মহামান্যগণ যে বক্তব্য রাখেন, ইফতারের আগে যে রকম মিথ্যাচার করেন- তা দেখে ও শুনে আমার মনে হয় দেশে এখন religious patriotism has become the last resort of the scoundrels.

আমরা জানি মানুষ এবং ভাষা এসেছে আগে, ধর্ম অনেক পরে এসেছে I প্রকৃত ধর্মের নিজস্ব কোনো ভাষা নেই, আছে তার শ্বাশ্বত আবেদন I এই আবেদনকে নিজের ফন্দি ফিকিরের আর সুবিধামত ব্যখ্যা করে এক শ্রেনীর মোল্লা আর রাজনীতিক বেচে আছে I সব ধর্মেই এই শ্রেনীর টাউট বাটপার আছে, তবে এদের দৌরাত্ব আমাদের সমাজে একটু বেশি মনে হয় I

গাফফার চৌধুরী বাংলা ভাষা এবং সমাজ, তার সাথে আমাদের না বুঝে শুধু ধর্মের আবরণকে নিয়ে টানা হেচড়া করার বিষয়কে বুঝতে গিয়ে আল্লাহ’র ৯৯ নামের প্রসঙ্গ এনেছেন I এখানে উনি আল্লাহকে খাটো বা হেয় করার জন্য বলেন নাই I উনি বুঝাতে চাইছেন যে ইসলাম পূর্ব আহলে জালিয়াতের সময় অবিশ্বাসীগণ তাদের দেবতাদের যে সমস্ত নামে ডাকতো, পবিত্র আল্লাহ’র ৯৯ নামে সেই সমস্ত নামও অন্তর্ভুক্ত আছে I একটা উদাহরণ দেয়া যাক: এক দেশে মন্দ লোকজন একজন ব্যভিচারী রাজাকে ‘ন্যাপরায়ন’ ডাকে I অন্যদিকে অন্য এক দেশের ভালো লোকজন তাদের প্রিয় রাজাকেও ‘ন্যাপরায়ন’ ডাকে I এখন ‘ন্যাপরায়ন’ শব্দের দোষ কোথায়? এইটাতো একটা বিশেষ্য বা বিশেষণ I এই ধারা অনুযায়ী কাফেরদের দেবতার নাম, যা আল্লাহর গুনাবলিকে ধারণ বা প্রকাশ করতে পারে, তখন সেইমত নাম হতে অসুবিধা কোথায়? কোনো দেবতার নাম যদি ‘রহমানুর রহিম’ হয়ে থাকে, এবং আল্লাহ – যিনি প্রকৃতই ‘রহমানুর রহিম’- উনি যদি সেই নাম ধারণ করেন তাতে ক্ষতি কি? ট্যারা চোখওয়ালা কারো নাম ‘সুনয়না’ বলে যে সত্যিকারেই সুন্দর চোখের অধিকারী, তার নাম ‘সুনয়না’ রাখা যাবে না?

অনেকদিন আগে আমজাদ হোসেন নামের এক মোটর মেকানিককে আমি ফোন করে ‘আস সালামালায়কুম’ বললে সে আমাকে ‘অলাঅকুম আস সালাম’ জবাব দেয় I তবে পরক্ষনেই সে আমাকে বলে যে, ব্রাদার তারিক- আমি কিন্তু মুসলিম না, খ্রিস্টান আর এসেছি ইজিপ্ট থেকে I পরে জেনেছি আমরা যেগুলো মুসলিম নাম হিসেবে জানি বা রাখি, আরব দেশগুলোতে ঐসব নাম খ্রিস্টান বা অন্য ধর্মের লোকজনও রাখে I,আমার নাম তারিক, আমার বড় ভাইয়ের নাম আজিজ I আমাদের বাবা খুব আদর করে দুই ছেলের দুইটা ‘ইসলামী’ নাম রেখেছেন I মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরাক আক্রমন করলো তখন আমরা জানলাম যে ইরাকের উপ-রাষ্ট্রপতি তারিক আজিজ একজন খ্রিস্টান I উনি আমার আর আমার এক ভাইয়ের নাম দখল করে আছেন I হারুনুর রশিদ অনেক খ্রিস্টান লোকের নাম আছে I তাতে নামের কি আসল গেল! আমদের দেশে অনেক মেয়ের নাম সামিরাহ- যার প্রকৃত অর্থ রাত্রিতে আনন্দ প্রদানকারী I আমার মনে হয় কেউই সামিরাহ’র অর্থ খুঁজে নাম রাখে নাই I গাফফার চৌধুরী সম্ভবত এইসব ব্যাপার বুঝাতে চেয়েছেন, কিন্তু ‘উল্টো বুঝলিরে রাম’!

ইদানিং হিজাবের প্রচলন একটু বেশি হয়েছে I হিজাব নিয়ে অন্য পরিসরে লেখা যাবে I শুধু এইটুকু বলি যে মেয়েরা হিজাব পরলো, ছেলেরা মেয়েদের অবয়ব দেখতে পেলনা I ধরে নিলাম ঠিক আছে I কিন্তু হিজাব পরা একজন মেয়েতো সব ছেলেকে ইচ্ছে হলেই দেখতে পাচ্ছে, তাহলে কি ব্যাপারটা এক তরফা হয়ে গেল না?

আমাদের বুঝতে হবে যে আমরা প্রথমে বাঙালি, পরে মুসলমান I আমরা বাংলায় গান গাই, মাকে মা ডাকি (উম্মু ডাকি না), নৌকা বাই, হাল চাষ করি, গরু চড়াই, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-শরথ পড়ি I এইগুলো বাঙালির স্বত্তা, যেখানে ধর্ম সামান্য স্থান করে নিয়েছে I আমি মনে করি ধর্ম তার নিজের অবস্থান নিয়ে সুখী, কিন্তু আমাদের কিছু সুবিধা লোভি এবং সুবিধ ভুগি তথাকথিত ইসলামী পন্ডিত এবং হেজাবি মনোভাবাপন্ন চোরা কিসিমের বাঙালি পাকিস্তানি (মুনতাসির মামুনের ভাষায়) ইসলাম ধর্মের ভেতর বাঙালি স্বত্তাকে ঢুকিয়ে ফেলতে চায় I আর একদল রাজনীতিকতো আছে এদেরকে বাতাস দিচ্ছে I

ব্যাপার স্যাপার দেখে মনে হচ্ছে কাজ দিয়ে নয়, আমরা শুধু নাম আর কাউকে মুরতাদ ঘোষণা দিয়ে, কল্লা ফেলে দিয়ে স্বর্গ সুধা লাভ করতে চাই I অথচ আল্লাহ খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করনা, কারণ এই বাড়াবাড়ির কারণে অনেক ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে গেছে I আল্লাহ আরো বলেছেন, তোমরা সত্য প্রকাশ করবে, আর জেনে শুনে সত্যকে মিথ্যার সাথে মিসিও না I আমাদের প্রতিদিনের ইফতারির সময় আমরা কি বলছি, আর কি করছি?


Place your ads here!

Related Articles

সম্রাটের দরবারের সামনে থমকে যাওয়া অভিযান!

ফজলুল বারী: কথা ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান হবে। এ কথা দেয়া হয়েছিল নৌকার নির্বাচনী ইশতেহারে। জিরো টলারেন্স! ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারন সম্পাদকের

সাদা কথা-পরিচয় সংকট

সাদা কথা-পরিচয় সংকট ১৯২৪ সাল মার্চ ৩, তুরস্কের জাতীয় সংসদ খেলাফত বিলুপ্তি ঘোষনা করে আইন পাশ করলো । যার পরিপেক্ষিতে

বাংলাদেশের কাটা মন্ডু আর ভয়ঙ্কর অসুস্থ আমরা

অনেক আগে কোথায় যেনো পড়েছিলাম এক এক্সপেরিমেন্টে নাকি দেখা গেছে যে একটা ব্যাঙকে যদি একটা পানি ভর্তি পাত্রে রেখে খুবই

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment