হৃদয়ে বাংলাদেশ

হৃদয়ে বাংলাদেশ

রবীন্দ্রনাথের “দুই বিঘে জমি” কবিতায় উপেনের জমি জবরদখল করে নেয় রাজা । বহু বছর পর সেই জমিতে দাঁড়িয়ে তার নিজের লাগানো আমগাছ টি কে উপেন বলেছিল :

সে কি মনে রবে ? একদিন যবে ছিলে দরিদ্র মাতা,

আঁচল ভরিয়া রাখিতে ধরিয়া ফুল ফল শাক পাতা ।

আজ কোন রীতে? কারে ভুলাইতে? ধরেছ বিলাস বেশ,

পাঁচরঙা পাতা অঞ্চলে গাঁথা, পুষ্পে খচিত কেশ ।

আমি তোর্ লাগি, ফিরেছি বিবাগী, গৃহহারা সুখহীন …

তুই হেথা বসি ওরে রাক্ষসী, হাসিয়া কাটাস দিন ?

ধনীর আদরে গরব না ধরে, এতই হয়েছ ভিন্ন?

কোনখানে লেশ নাহি অবশেষ, সেদিনের কোনো চিহ্ন ।

কল্যাণময়ী, ছিলে তুমি অয়ি ক্ষুধাহরা সুধারাশি

যত হাসো আজ, যত কর সাজ, ছিলে দেবী, হলে দাসী …

সাত সকালে কয়েক শ বছর আগে উপেন মিয়ার লাগানো আমগাছ নিয়ে টানাটানি করছি কেন? আছে, কারণ আছে । বলছি ।

আমার স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতায়, প্রবাসী বাঙালী দের তিনটি ক্যাটেগরী তে ফেলা যায়:

১) হৃদয়ে বাংলাদেশ

২) হোপলেস বাংলাদেশ

৩) হু কেয়ারস এবাউট বাংলাদেশ

প্রথম ক্যাটাগরী শারিরীক দূরত্বটাকে ঘোচাতে চেষ্টা করে প্রতিনিয়ত । দেশ ছেড়ে অন্য একটা জায়গায় থাকলে খুব স্বাভাবিক ভাবেই সেখানকার কিছু জিনিস মানুষ এডপ্ট করে নেয়। যেমন, চিংড়ি মাছের মালাই কারী রান্না করতে গিয়ে কাজের বুয়া কে দিয়ে ফ্রেশ নারকেল টা বাটিয়ে নেয়ার উপায় নেই । টিনজাত নারকেলের দুধ ই ভরসা। সাথে হয়ত কিছু কোকোনাট ফ্লেক্স সারারাত সেই দুধে ভিজিয়ে নিয়ে ব্লেন্ড করে দেয়া যেতে পারে। এই বিকল্প পদ্ধতি উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে মায়ের হাতের আদি ও অকৃত্তিম মালাইকারীর টেস্ট পাওয়া যাবে কিনা বলা মুশকিল, তবে চেষ্টায় কোনো ফাঁক নেই । এটাই আমার চোখেএডপ্টেশন, শেকড় কে আঁকড়ে রাখার চেষ্টা, হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তাই দিয়ে । এই শ্রেনীর প্রবাসীরা দেশের খবর রাখেন প্রতিনিয়ত । গেট টুগেদার এ দেশ নিয়ে প্রবল তর্ক বিতর্ক করেন । বৈশাখী মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, একুশে মেলা সবকিছুতেই ছেলে মেয়েদের নিয়ে যান ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে, কয়েক কিলোমিটার দুরে গাড়ি পার্ক করতে হলেও তাদের আপত্তি নেই, মেলায় জিনিস কি আছে না আছে তার চেয়ে তাদের কাছে বড় হলো চেতনা, এক টুকরো বাংলাদেশ কে খুঁজে পাওয়া । সারা বছরের ছুটি জমিয়ে অন্য কোনো দেশে না গিয়ে বাংলাদেশে যাওয়া টাই তাদের মূল লক্ষ্য থাকে, ক্রিসমাস কিংবা মিড-সিজন সেল এ দামী ব্র্যান্ডের জিনিষটা সাধ্যের নাগালে আসলে ঠিকই কিনে রাখেন স্বজনের জন্য। দেশের দুর্যোগে তারা ব্যথিত হন, বিচলিত হন … দেশের সুখে তারা হন আত্মহারা ! সারারাত জেগে সাকিব, তামিম, রাজ্জাক, নাসিরের খেলা দেখতে তাদের কোনো ক্লান্তি নেই !

দ্বিতীয় শ্রেনী হলো নৈরাশ্ব্যবাদী শ্রেণী । যারা প্রতিনিয়ত প্রকাশ্যে বা গোপনে শুকরিয়া আদায় করেন যে দেশ ছেড়ে তারা বের হয়ে আসতে পেরেছেন। এখন তাদের চিন্তা আত্মীয় স্বজন দের নিয়ে । দেশের যে কোনো ভবিষ্যত নাই, আওয়ামীলীগ বিএনপি জামাত জাপা সব যে চোরের গুষ্টি, কোনো ভদ্রলোকের ছেলে পেলে রাজনীতি তে এসে যে দেশ উদ্ধার করবে না এবং সর্বোপরি হরতাল অবরোধ খুন ধর্ষণ বোমা ককটেলের মধ্যে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিহীন বাংলাদেশ যে ধ্বংসের চূড়ার শেষ মাথায় একশন সিনেমার নায়কের মত এক আঙ্গুলে ঝুলে আছে, এইটা প্রমান করতে তাঁরা সদা তত্পর । এই শ্রেনী যখন দেশে বেড়াতে যায়, সাথে থাকে বিরাট আয়োজন, যা দেখলে আপনি অনায়াসে ভাবতে পারেন তাঁরা আমাজনের জঙ্গলে ক্যাম্পিং করতে যাচ্ছেন। শিশু কন্যা বা পুত্রের জন্য এন্টি ব্যাকটেরিয়াল ওয়াইপ, রেডী ফুড, মশা কামড়ানোর লোশন থেকে মিনারেল ওয়াটার পর্যন্ত সব কিছু ওভার ওয়েট চার্জ দিয়ে তারা নিয়ে যান । ফেরত আসার পর প্রচন্ড বিরক্ত মুখে আফসোস করে বলেন, বাচ্চা অসুস্থ হয়ে শুকিয়ে কাঠ, ট্রাফিক জ্যামে কথাও বের হবার উপায় নেই, গরম মশা লোড শেডিং ধুলাবালি জীবানু এইসব তো আছেই । কনক্লুশন : নাহ , আগামী পাঁচ / সাত বছর বাচ্চারা বড় না হলে আর দেশ মুখো হচ্ছি না । ইতিমধ্যে বাচ্চারা বড় হয় , মতামত দিতে শেখে । একসময় ঠোঁট উল্টে বলে – আই ডোন্ট ওয়ানা গো টু বাংলাদেশ … ইটস ডার্টি ..। বাচ্চা, যতটুকু না তার স্মৃতি থেকে কথা টা বলে, তার চেয়ে বেশী বলে তার বাবা মা’র দেশ সংক্রান্ত নেগেটিভ আলোচনা থেকে ।

তৃতীয় শ্রেণী হলো হু কেয়ারস শ্রেণী । দেশের খবরাখবর তাঁরা সচেতন ভাবেই রাখেন না । দেশে যেহেতু থাকি না, দেশ নিয়ে ভাবার কি আছে ? ৫ / ৭ বছরে একবার দেশে যান অথবা সেটাও যান না । মীরেরসরাইয়ে বাস উল্টে যখন অর্ধশতাধিক বাচ্চা মরে যায়, তখন তাঁরা তা জানেন ই না অথচ কোনো বিকারগ্রস্থ আমেরিকান যখন স্কুলে ঢুকে বাচ্চাদের ব্রাশ ফায়ার করে তখন কেন নাগরিক নিরাপত্তার নাম করে যুক্তরাষ্টে বাসায় আর্মস রাখতে দেয়া হয় সেই বিষয়ে প্রবল আক্ষেপ সহকারে শিশু গুলোর জন্য চোখের পানি ঝরান । দুটো ঘটনাই মর্মান্তিক সন্দেহ নেই, তবে কালো চামড়ার দেশের মৃত ছোট বাচ্চা গুলো কোনো এক অজানা কারণে সমবেদনা পায় না, পায় সাদা চামড়ার দেশের মৃত বাচ্চা গুলো !

উপেনের আমগাছে ফিরে আসি । উল্লেখিত দ্বিতীয় ও তৃতীয় ক্যাটেগরীর কিছু নন রেসিডেন্ট বাংলাদেশীর মুখোমুখি হলে আমার তাদেরকে রাজার আদর স্নেহধন্য ফুল ফলে সজ্জিত উপেনের আমগাছ আর বাংলাদেশ কে হতভাগ্য উপেন মনে হয় ! পোড়া দেশটা তবুও চোখের জল মুছে প্রতীক্ষায় থাকে তার সব সন্তানের জন্য ! তা সে যেই ক্যাটেগরীর সন্তানই হোক!

দেশ থেকে নানা কারণে মানুষ দূরে থাকতে পারে । অন্তত এই গ্লোবলাইজেশোনের যুগে । মায়ের কাছ থেকে বিয়ের পরে তো বাঙালী মেয়েটাও দূরে চলে যায় । সময়ে হয়ত মায়ের বাড়ি টাও বদলে যায়, ভাইয়ের বউ আসে, তার সাথে মা-বাবা, অন্য ভাই বোন্ দের হয়ত বনে না, কিংবা খুব ভালই বনে যায় ! অথবা ভাই বোনদের সবাই যার যার গন্তব্যে চলে যায় । তাই বলে কি মায়ের বাড়ির আবেদনটা কমে যায় ? মিথ্যে হয়ে যায় সব আবেগ ভালবাসা স্মৃতি? মুখ ফিরিয়ে নেই হতাশায় ?

কিছু মানুষের কথায় বুকের খুব গভীরে আমি দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতাম আগে ।

দিন বদলের সাথে সাহস বেড়ে গেছে … এখন ঝাড়ি দিয়া বসি !

ঘোড়ার আস্তাবলে কুকুর বাচ্চা জন্ম দিলেই বাচ্চাটা ঘোড়ার বাচ্চা হয়ে যায় না ।

তবে হ্যা, মাঠের সব ঘোড়া গুলিরে যখন খামারীর কুকুরটা দাবড়ায়া সন্ধ্যা বেলা আস্তাবলে ঢুকায়, কুকুর কে তখন আমার প্রবল পরাক্রমশালী প্রাণী মনে হয়।

আর হৃদয়ে, কর্মে, যাপিত জীবনের অনুসঙ্গে একজন প্রকৃত বাংলাদেশী? সে যেই চুলায়ই থাকুক না কেন, সে তো সবসময়ে ই সাচ্চা বাঘের বাচ্চা!


Place your ads here!

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment