অনেকের ভীড়ে একজন

অনেকের ভীড়ে একজন

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রিক্সায় যেতে যেতে হঠাৎ পাশে থাকা বন্ধু চিৎকার করে উঠলো, হুয়াক্কা হুয়া! সব দাঁত বের করে, দাঁড়িয়ে উঠে, দূর দিয়ে হেঁটে যাওয়া একজনকে লক্ষ্য করেই বার বার সে বলে যাচ্ছে, হুয়া, হুয়া, হুআ, আ আ আ। কে জিজ্ঞেস করতেই, আকাশ থেকে পড়ে বললো, হুআ’কে চিনিস না? হুমায়ুন আজাদ। তারপর, একের পরে এক হুমায়ুন আজাদের অপকীর্তির বর্ণনা দিতে দিতে টায়ার্ড হয়ে পড়ে। কিন্তু, তার সমালোচনা করতে করতেই আবার চনমনে হয়েও উঠে, মনে হলো শুধু হুমায়ুন আজাদের নাম মুখে নিতে পেরেই তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে। ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাসের সাথে সাথে ক্রমান্বয়ে বেড়ে যায় তার প্রতিক্রিয়া। ভাবখানা এমন যে, এমন এক মানুষকে নিয়ে কথা বলছে যাকে সে অনেক দূরে বর্জন করতে পারলেই খুশী হবে।

২০০৪ সালের ২৭ শে ফেব্রুয়ারী, যেদিন বাংলা একাডেমী বইমেলা থেকে ফেরার পথে কাপুরুষদের আক্রমণে রক্তাক্ত হলো বাংলার আজাদ, সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে রুমে এসে আমার সে একই বন্ধু আপত্তিকর শব্দের পর শব্দ,অপশব্দ ব্যবহার করে বলে গেলো, এ-দেশ শেষ হয়ে গেলো, এ-দেশকে শেষ করে দিলো। শুধু সে-ই নয়, একজন একজন করে উত্তপ্ত হতে হতে, অবশেষে উত্তপ্ত হয়ে গেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলো আবাসিক হল। আমি শুধু তাদের সবার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ভেবেছিলাম, কী অদ্ভুত মানুষের মনোজগৎ! মানুষ নিজেই বুঝতে পারে না, কাকে সে ভালোবাসে, কার সে অনুরাগী। চেতন মনে হুমায়ুন আজাদকে বর্জন করার জন্য উঠে পড়ে লাগলেও, অবচেতন মনে তারা আপন করে নিয়েছে হুমায়ুন আজাদ’কে। মনে মনে ভাবী, একদিন যাকে দেখলে তোমরা বাজে কথায়, সমালোচনায় জর্জরিত করে দিয়েছো, যার উপস্থিতিই তোমাদের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতো; তার উপর আক্রমণে আজ তোমরাই সবচেয়ে বেশি মর্মাহত, সবচেয়ে বেশি বিহ্বল? যে উপলক্ষ্যে চেতন মনে হুমায়ুন আজাদকে তোমরা বর্জন করে দিয়েছো, কে জানে, হয়তো সে বর্জন করার দুঃসাহসটুকু হুমায়ুন আজাদই তোমাদের দেখাতে শিখিয়েছিলো।

বাংলায় আজ মৌলবাদীদের অভাব নেই। শুধু আস্তিক মৌলবাদী নয়; অসংখ্য নাস্তিক মৌলবাদীদেরও আবির্ভাব ঘটেছে। তারা সারাজীবন নাস্তিক কারণ একবার হঠাৎ করে মনে হলো তারা নাস্তিক। এক মুখে দুই কথা বলা তাদের দিয়ে সম্ভব না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া এবং ওয়াক্তের ফাঁকে ফাঁকে পর্নো ছবি দেখতে থাকা আস্তিক যেমন পাওয়া যায়, তেমনি পাওয়া যায় শুধু আশপাশের লোকজনের কাছ থেকে সামান্য মনোযোগ পাওয়ার তুচ্ছ আশায় গজিয়ে উঠা মানসিকভাবে অসুস্থ নাস্তিক। এই ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠা নাস্তিকের দেশে হঠাৎ করে লাখ কিংবা কোটি টাকার সমান দামী হয়ে উঠেছিলেন হুমায়ুন আজাদ। সঠিক করে বলতে গেলে তাঁর দাম কোটি টাকা হয়নি, কোটি টাকা হয়েছিলো তাঁর খন্ডিত মস্তকের দাম। কেন? তিনি অবিশ্বাসী নাস্তিক ছিলেন তাই? না! তিনি অবিশ্বাসী ছিলেন সেই জন্য নয়; বরং এই জন্য যে, তিনি অবিশ্বাসী ছিলেন এবং তিনি জানতেন কেন তিনি অবিশ্বাসী ছিলেন, তিনি যৌক্তিকভাবে বুঝিয়ে দিতে পেরেছিলেন কেন তিনি অবিশ্বাসী ছিলেন। অবিশ্বাসে সৌন্দর্য নেই, সৌন্দর্য যুক্তিতে।

পরিসংখ্যান ছাড়াই বলা যাবে, মৌলোবাদীরাই সবচেয়ে বেশি পড়ে পাক সার জমিন সাদ বাদ, তারাই নাভিশ্বাসে ব্যাগে নিয়ে ঘোরে আমার অবিশ্বাস। সেখানেই হয়ে যায় সর্বনাশ, চুরমাচুর হয়ে যায় বছরের পর বছর ধরে লালন করতে থাকা অপবিশ্বাস। রাস্তার মোড়ের অযথাই নাস্তিকের দুর্বল যুক্তি অট্টহাসিতে উড়িয়ে দেয়া গেছে, কিন্তু আজাদের যুক্তির কাছে উড়ে গেছে তাদের নিজের যত অর্থহীণ, অযৌক্তিক অপবিশ্বাসগুলি। আরব মরুর বুকে প্রচণ্ড পানির অভাবে সেখানকার বেহেস্ত কল্পনাকারীরা বেহেস্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার বলেছে, সেটাই বেহেস্ত যার নীচ দিয়ে ঝর্ণা বয়ে যাবে। ঝর্ণা আর পানির লোভ হয়তো বর্বর আরবদের দেখানো যেত, কিন্তু নদীমাতৃক বাংলার মহান মোল্লা সম্প্রদায়, বছর বছর বন্যার পানিতে হাবুডুবু খেয়ে পানি আর ঝর্ণার লোভ বহু আগেই ত্যাগ করেছেন। সেটা না হয় ত্যাগ করা গেলো, কিন্তু চোখে কাজল দেয়া, দুধে আলতা গায়ের রঙ, বহু দিনের আরাধ্য সত্তরটা হুরপরীর যে কথা ছিলো, তার কি হবে? সেই লোভ যে ত্যাগ করা সম্ভব না। মদাসক্ত মাতাল যেমন সুস্থ হয়ে বুঝতে পারে, যত অবাস্তবই হোক, নেশার ঘোরে ঘটে যাওয়া ব্যাপারগুলো খুব একটা মন্দ নয়; অতএব, আবারো মাতাল হওয়া যাক। তেমনি, যত ভালো করেই বুঝতে পারুক হুরপরী আর সুমিষ্ট খেজুর বাগানের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝর্ণাধারা ঘুমপাড়ানী মাসী-পিসির গল্পমাত্র, তবুও মাতালের নেশার জগতের মত তারা টিকিয়ে রাখতে চায়, অবাস্তব বুঝতে পেরেও তাদের ভাবনায় রাখতে চায় ঝর্ণাস্নাত খেজুর বাগান আর হেরেমখানার রাজ্য।

অতএব, গালগল্পপ্রিয় মৌলোবাদী সম্প্রদায় হুমায়ুন আজাদের দিকে তেড়ে আসবে সেটাই স্বাভাবিক। কারণ, এই ঠোঁটকাটা বাংলার আজাদ দিনে দুপুরে তাদের দেখিয়ে দিয়েছে, তারা নেশার ঘোরে মাতাল হয়ে আছে। এরকম সঠিক দুঃসাহস বাংলায় কম লোকই দেখাতে পেরেছে। মৌলোবাদীদের কাছে অবিশ্বাসী হওয়া হয়তো অতটা অপরাধ হয় না, যদি না কেউ যৌক্তিক হয়। হুমায়ুন আজাদ শুধু অবিশ্বাসী ছিলেন না, ছিলেন যুক্তিবাদী অবিশ্বাসী।দুটোর মধ্যে বিস্তর ফাঁরাক। বাংলায় যুক্তিবাদী হওয়া যাবে, তবে সেক্ষেত্রে আস্তিক হতে হবে; বহু সায়দাবী, যুক্তিবাদীরা বাংলায় ধর্মব্যবসা করেন। আবার, নাস্তিক হতেও সমস্যা নেই, কিন্তু সেক্ষত্রে যুক্তিবাদী হওয়া যাবেনা, বোকা নাস্তিক সেজে চুপচাপ বসে থাকতে হবে। একই সাথে যুক্তিবাদী হওয়া এবং নাস্তিক হওয়া?- আশ্চর্য! এটা কি নানা বাড়ীর আবদার না-কি। এ-দেশতো এখনো মগের মুল্লুক হয়ে যায়নি। মুমিন ভাইয়েরা বেঁচে থাকতে সেটা হবেও না।

কিন্তু মুমিনগণ একটা জিনিস এখনো কেন বুঝতে পারছেন না সেটাই অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার- তাদের উচিত এখনি দেশে দেশে হুমায়ুন আজাদের পরিণতি দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে অবিশ্বাস ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করা, সউদি আরব কিংবা কুয়েত এর তেলবান-দের খয়রাতি টাকায় ফান্ড করে বছরে কয়েকশো অবিশ্বাসী উৎপাদন করা; তারপর, রামদা দিয়ে কুপিয়ে সেই অবিশ্বাসীদের হত্যা করে শর্টকাট পদ্ধতিতে হেরেমখানাময় বেহেস্তে প্রবেশের জন্য অগ্রিম টিকেটর বন্দোবস্ত করা।কিন্তু এ-কী! ইন্সটিটিউট খোলাতো দূরের কথা, মুমিন মুরুব্বীগণ তাদের কন্যা-পুত্র, ভাই-বেরাদারদের পারলে হুমায়ুন আজাদের থেকে একশো হাত দূরে রাখেন, হুমায়ুন আজাদের বই দেখলে তার আশপাশ দিয়েও যেতে দেন না, তার চেহারাতো দূরে থাক, তার বইয়ের চেহারাও দেখতে দেন না সাত বছর থেকে বিশ্বাসের জগতে বিচরণ করে ধীরে ধীরে যে মিথ্যা বিশ্বাসের পর্বত তৈরী হয়, সে পর্বত আজাদের বইয়ের প্রচ্ছদ দেখেই হয়তো ভূপাতিত হয়ে যায়। উদীয়মান সূর্য দেখলে ক্ষুদ্র পোকামাকড়ের দল নির্বিচারে গর্তে ঢুকে যায়, কিন্তু তাই বলে সূর্যের শক্তিমত্তা কমে যায় না, কিছু যায় আসেও না। হুমায়ূন আজাদ কতটুকু গ্রহণযোগ্য সেটা আর কেউ বিবেচনা করে না, বিবেচনা করলেও কিছু যায় আসে না; বরং হুমায়ুন আজাদকে গ্রহণ করতে পারার সক্ষমতা দিয়ে আজ একজন মানুষ কতটা মানুষ সেটা বিচার করা যায়।

বাংলার আজাদকে শত শত বছর বাঁচতে হতো না, বাঁচেনওনি তিনি। স্ফুলিংগ তৈরী করা কঠিন। কিন্তু একবার আগুন ধরে গেলে, স্ফুলিংগ নিভে গেলেও পোড়ানোর কাজ ঠিকই চলে। বাংলার আজাদ যে যুক্তির স্ফুলিংগ বাংলায় ধরিয়ে গেছেন, যে আগুন বাংলায় জ্বালিয়ে গেছেন, সে-আগুনে পুড়ে যাবে সমস্ত অনাচার, অপবিশ্বাস আর কুসংস্কার। কত সালের কত তারিখে কোথায় জন্মেছে সেটা সবার জন্য বলতে হয় না। বাংলার আজাদ বললেই হলো, হাজার বছরের জন্য সেটিই যথেষ্ট।


Place your ads here!

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment