মানিকের যুদ্ধ – ৩

মানিকের যুদ্ধ – ৩

মানিকের যুদ্ধ – ১ | মানিকের যুদ্ধ – ২

মানিকের যুদ্ধ – ৩

নদীর ঘাটে একটি মাত্র নৌকা পাওয়া গেল। তাও চান্দার নৌকা! (চাঁদ মিয়া নাম থেকে চান্দা; নিয়মিত কুলির কাজ করে এবং এটি তার নিজস্ব বাহন; জড়সড় কঠিন অবস্থা; ওটা দিয়েই সে তার গ্রাম থেকে খিলাবাজার নিয়মিত যাতায়াত করে) খোলা, ছাদ নেই, কয়েকটা ছিদ্র আছে তলায় এবং নিয়মিতই পানি উঠে ওগুলো দিয়ে। তবুও ভাগ্য ভাল যে পাওয়া গেল। বড় জোর চার জন উঠতে পারবে ঐ নৌকায়, আর আমরা হলাম মাঝি সহ ছয় জন! পাঁচ মিনিটের মধ্যে আব্বা সবাইকে বাধ্য করলেন ঐ নৌকায় উঠতে। যে কোন মুহূর্তেই ডুবে যেতে পারে নৌকা। চান্দা নৌকা বাওয়া শুরু করল, আব্বা নৌকা সেচা শুরু করলেন। এ যেন কঠিন প্রতিযোগিতা – ফুটো নৌকায় পানি উঠা আর পানি সেচা নৌকা থেকে। আমিও সাথে থাকলাম আধা নেড়া হয়ে। মা কিছু চাল/ডাল নিতে চাইলেন – আব্বা সায় দিলেন না। এক কাপড়েই আমরা সবাই রওয়ানা দিলাম এক দুর সম্পর্কের নানা বাড়ীর দিকে। জুনাব আলী নানা। যার জন্যে আমরা ঘরের বাইরে জুতা রাখতে পারতাম না। যেটা পছন্দ হতো সেটাই নিয়ে চলে যেত। পরে ধরা পড়লে হাসত। আমাদের শোবার ঘর থেকে ‘পাক ও খাবার’ ঘরটা আলাদা ছিল। জুনাব আলী নানার ওটা ছিল গভীর রাতের আস্তানা। ভাত, তরকারি উধাও হলে মা বুঝতেন, এটা কার কাজ। সে যাই হোক, নানা নানী মহা খুশি হলেন আমাদেরকে দেখে। অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের খাবার ব্যবস্থা হয়ে গেল। আর মুহূর্তে আমি হয়ে গেলাম সবার হাসির খোরাক। আধা ন্যাড়া। নানী আমাকে রেসকিও করলেন শেষ পর্যন্ত। পুরো মাথাই ন্যাড়া করে দিলেন।

আমরা এখন যে গ্রামে আছি তার নাম পাথৈর। এই গ্রামকে আসে পাশের সবাই ভয় পায়। সবাই বলে ডাকাতের গ্রাম। মানুষ গুলোও ভয়ংকর, সামান্য কারণে মারধর, এমন কি মানুষ খুন করতে পারে তারা। আমরা যে নানার বাড়ীতে আছি, উনার বাবা সোবাহান বেপারী, বেশ বড় পাটের ব্যবসায়ী, নাম করা গন্যমান্য লোক। এলাকা ছাড়িয়েও তার নাম ডাক আছে। সমীহ করে সবাই, ভয়ও পায়। পাথৈর এর লোক বলে কথা। উনিও আমাদেরকে খুব খাতির করলেন, আন্তরিক ভাবে আমাদের খোজ খবর নিলেন।

শুনলাম পাক সেনারা খিলা বাজার থেকে পাথৈর গ্রামের দিকে আসছে। নৌকা করে। বর্ষাকাল, এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতে হলে নৌকাই একমাত্র বাহন। ঘণ্টা দুয়েক পর, এখান থেকেও আমাদেরকে সরে যেতে হল একই গ্রামের আরও ভিতরের দিকে। যে দিকে তাকাই অথই জল, খুব একটা সহজ ছিল না, এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে, বা এক বাড়ী থেকে অন্য বাড়ীতে মুভ করা।

এবার গিয়ে উঠলাম মায়ের মামার বাড়িতে। পাথৈর, মহাজন বাড়ি। নানা (মায়ের মামা), নানী ও খালারা মহা খুশি হলেন আমাদেরকে দেখে। মামারা সবাই ঢাকায়। আমি আমার বয়সী এক মামাত বোনকে পেলাম এখানে। নানার বাড়ি বেড়াতে এসে আটকা পড়েছে বেচারি। সারাদিন ওর সাথেই খেলাধুলায় মেতে থাকলাম। নানী সুযোগ পেলেই আমাকে ক্ষেপাত নাতনি জামাই বলে। খুবই লজ্জা পেতাম। সপ্তাহ খানেক থাকতে হয়েছিল ওখানে।

অনেক দিন পরে শুনেছিলাম যে সৈন্যরা খিলা বাজার থেকে পাথৈর যেতে চেয়েছিল, তাদের মধ্যে দু’তিন জন চান্দাকে খেয়া ঘাটে পেয়ে, জোর করে তার নৌকা চালাতে এবং তাদেরকে পাথৈর গ্রামে নিতে বাধ্য করেছিল। চান্দা’র অনিচ্ছা সত্যেও নৌকায় তুলতে হয়েছিল তাদেরকে। মাঝ পথে এসে চান্দা ইচ্ছা করে নৌকা ডুবিয়ে দেয়। নিজে ডুব সাতার দিয়ে তীরে উঠতে পারলেও, ঐ তিন জন আর নিজেদেরকে বাচাতে পারেনি। কেউই সাতার জানতো না। এতে অন্য নৌকার সৈন্যরা ভীষণ ভড়কে যায় এবং ফিরে আসে খিলা বাজারে। পাথৈর গ্রামে আর যাওয়া হয়নি তাদের। এখানে প্রসঙ্গত বলে রাখি, চান্দা খুবই সহজ সরল মানুষ ছিলেন এবং দেখতে অনেকটাই জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা টেলিসামাদের মত। উদাম গায়ের চান্দার চেহারা এখনও আমার চোখে ভাসে।

হঠাৎ আব্বা খবর পেলেন আমাদের দাদা বাড়ীতে (লাকসাম, পশ্চিম তালতলা, বড়বাড়ি) যত গুলো ঘর ছিল, সব গুলোকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে হানাদার বাহিনী। বাড়িতে কেও ছিল না বলে, সবাই প্রাণে রক্ষ্যা পেয়েছে। আব্বা আর দেরি করলেন না। চলে গেলেন দাদা বাড়ি। বাড়ি গিয়ে বসবার মতও কোন অক্ষত ঘর পেলেন না। ধান, চাল সহ ঘরে যা ছিল – সবই পুড়ে ছাই। প্রতিবেশীদের সাহায্যের উপরই নির্ভর করে আছেন সবাই। আব্বা কিছু ধান/চাউলের ব্যবস্থা করে নিজ বাড়ি প্রশন্নপুরে ফিরে এলেন।

আমার চাচাত বোন নুরী’র যুদ্ধ শুরু হবার সময়ই বিয়ে হয়ে ছিল, এক আর্মির সাথে। বিয়ের প্রায় দু’একদিন পরেই নতুন বর, কাজে যোগদানের জরুরী তার বার্তা পান এবং সাথে সাথেই কাজে যোগ দিতে চলে যান। আমার সেই দুলাভাই দেশ স্বাধীন হবার পর নিখোঁজ ছিলেন। এত বছর পরও ফিরে আসেননি। শুনেছি যুদ্ধকালীন অবস্থায় শহীদ হয়েছেন কোথাও। কেওই সঠিক তথ্য দিতে পারেননি। তিনি ছিলেন বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান (লাকসাম, মাদার গাঁও গ্রাম) । আমার সেই কিশোরী নুরী বু এর স্বাধীনতার অনেক পরে অন্য খানে পাত্রস্থ করা হয়েছিল। নূরী বুবু’র সাথে আমার এখনও যোগাযোগ আছে। উনার মেঝ মেয়ের জামাই জামায়াত রাজনীতির সাথে যুক্ত (শিবির করত কলেজ জীবনে)। বুবু’কে অনেক বলে কয়েও রাজাকার নীতি বোঝানো যায়নি। আমার এক সময়কার বন্ধু, ভাল ফেমেলি এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, এটাই যতেস্ঠ ছিল মেয়ে উপযুক্ত পাত্রের জন্যে। আমার যাওয়া হয়নি ঐ বিয়েতে বিভিন্ন কারণে।

তার পর ঠিক কতদিন পরে আমরা ফিরে ছিলাম, আমাদের বাড়িতে, এখন তা আমার আর মনে নেই। তবে ফিরে এসেছিলাম কিছুদিনের মধ্যেই। আসবাব পত্র ছাড়া অন্যকিছুর তেমন ক্ষতি আমার মনে পড়ে না। পাশের বাসার খালু’র (হাজী মতিউর রহমান) অনুরোধে পাঞ্জাবীরা পোড়ায়নি আমাদের বাসা। তিনি বলেছিলেন, এটা আমার বাড়ি – ডাক্তার ভাড়াটে মাত্র। বাজারে তিনটি গলি, ডাকাতিয়া নদীর পাড় থেকে মসজিদ পর্যন্ত, উত্তরে থেকে দক্ষিণে সমান্তরাল। পূর্ব দিকের (আমাদের বাসার সামনে) গলিতে অনেক ধরনের গুলির খোসা পেলাম। নানান ধরনের – ছোট বড় মাঝারি। সব নিয়ে এলাম বাসায়। লুকিয়ে রাখলাম জমা করব বলে। প্রথমে আমার পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে, কলম পেন্সিলের সাথে, পরে জায়গা না হওয়াতে, খালি ঔষধের কার্টুনে রাখা শুরু করলাম। মাঝে মাঝে নিকট বন্ধুদের কাছে এই গুপ্তধনের এক্সক্লুসিভ গোপন প্রদর্শনী করতাম। জনপ্রিয় হয়ে পড়লাম। বন্ধুরা সবাই আমার সাথে গোপন বৈঠকই করতে আগ্রহী বেশি। গোপন আর গোপন থাকল না বেশি দিন। কি করে জানি মা জেনে ফেললেন আমার গুপ্তধনের কথা। আব্বা আর বড় ভাই গুপ্তধনের ইন্সপেকশন করলেন। সবার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল, বুজতে পারলাম না কেন! মাত্র অল্প কয়েকটা তাজা বুলেট পাওয়া গেল, বুলেটের মাথাটা টকটকে লাল। শাস্তি থেকে রেহাই পেলাম না। দিন ভর বকা, মারধর আবার বকা চলতে থাকল ম্যারাথন গতিতে। গুপ্তধন সত্যিকার অর্থেই গুপ্ত করা হল গভীর গর্ত করে, আমার চোখের অন্তরালে। হঠাৎ করেই সবার নজর দারিতে পড়ে গেলাম। যখন তখন দেহ তল্লাসি, সব ধরনের নূনতম অধিকার থেকে বঞ্চিত হলাম। এই ধারা ঠিক কত দিন চালু ছিল সেটা, এখন আর মনে নেই আমার।

আমাদের বাসার সামনে সপ্তাহে দু দিন বাজার বসত। বুধবার আর রবিবার। প্রচুর ক্রেতা/বিক্রেতা আসত গ্রাম থেকে। শহর থেকেও আসত এবং বেশির ভাগই বিক্রেতা। পাট গুদামের মহাজনরা বাজারের দিন নিয়মিতই আসত, তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিদের সাথে দেখা করতে। বড় বড় বজরা (স্থানীয় ভাষায় ‘বৌ চোরা নৌকা’) আসত নানান বড় বড় বন্দর (চাঁদপুর) থেকে নদী পথে, স্থানীয় দোকানদার মহাজনদের জন্যে। নিয়মিত মাল টানার কাজ করত হানিফা, চান্দা, রশিদ আরও অনেকে। বজরা আসলে ব্যস্ত হয়ে পড়ত এরা। নদীর খাড়া ঢাল বেয়ে, পানি, কাদা পেরিয়ে, ২০০ থেকে ৫০০ মিটার এরা ঘাড়ে করে বিরাট বিরাট ওজনী বস্তা, বজরা থেকে দোকানে বা মহা জনের আড়তে পৌঁছে দিত। ওজন নিয়ে এরা হেটে যেত বললে ভুল হবে, রীতিমত দৌড়াত এরা। পারিশ্রমিক খুব বেশি পেত বলে মনে হয়না এখন আর। হানিফা এখনো বেচে আছে (২০১২) – গত ৩০ বছর ধরে হাফানিতে ভুগছে। ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতি মাসেই হানিফা আব্বার গভীর রাতের ঘুম ভাঙাতেন – তার হাফানির চিকিৎসার জন্যে। আব্বা অনেক চেষ্টা করেও তার কুলির কাজ বন্ধ করাতে পারেন নি।অবশ্য অন্য কিছু করবার মত অবস্থাও তার খুব একটা ছিল না। এক মাত্র ছেলেকে লেখা পড়া করাতে না পারলেও – নাতি নাতনিরা ভাল লেখা পড়া করছে এখন।

(চলবে)

[নতুন কিস্তি প্রত‌্যেক ইংরেজী মাসের প্রথম সপ্তাহে]

[এ লেখার প্রতিটি চরিত্র ও ঘটনা কাল্পনিক। বর্তমান সময়ের সাথে এর কোন ঘটনা প্রবাহের কোন রকম বা ধরনের কোন মিল নেই। কোন কাকতালীয় মিল খুঁজে পেলে, ধরে নেবার কোনোও কারণ নেই যে, ওরা আমার লেখা থেকে উৎসাহ পেয়েছে।]


Place your ads here!

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment