ইউরোপে সামার ভেকেশান ওয়াসিম খান পলাশ প্যারিস থেকে

ইউরোপে সামার ভেকেশান ওয়াসিম খান পলাশ প্যারিস থেকে

দেখতে দেখতে আরেকটি সামার এসে হাজির । আমার এই আর্টিকেলটি গত বছর বহুল জনপ্রিয় ম্যাগাজিন সাপ্তাহিক ২০০০ সহ বর্তমান সময়ের সব জনপ্রিয় ওয়েব ম্যাগাজিন গুলোতে প্রকাশিত হয়েছিল। বিষয় বস্তুটি কিন্তু ছিল চমৎকার। মেল পেয়েছিলাম অনেকের কাছ থেকে। এই বিষয়টি নিয়ে যদি আমার প্রিয় লেখক জসিম মল্লিক ভাই কিংবা পান্থ রহমান রেজা লিখতেন তাহলে অনেক ভাল লিখতেন। আর্টিকেলটি হতো আরো অনেক সম্মৃদ্ধ।

ইউরোপ চমৎকার একটি মহাদেশ। একটি উন্নত মহাদেশ। প্রতিটি দেশের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি,আলাদা ভাষা। ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন ও ইউরো মুদ্রা করে মহাদেশটিকে একত্রিত করার চেষ্টা করা হলেও কিছু কিছু পার্থক্য থেকে যাবে চিরদিন।। আর ইউরোপীয়ানরা এই পার্থক্যগুলো উপভোগ করেন খুব। যেমন ধরুন খাবারের ব্যাপারটি। ফ্রেঞ্চ ফুড, ইটালীয়ান ফুড, ইংলিশ ফুড, কিংবা স্পেনিস ফুড, প্রতিটি দেশের নিজস্ব সব মজার মজার খাবারের ম্যেনু। জামা কাপড়ের সাইজের মাপও ভিন্ন। প্রতিটি রেডিমেট কাপড়ে বিভিন্ন দেশের সাইজের মাপ লিখা থাকে।

ইউরোপে সামারে এক মাসের জন্য জিনিষ পত্রের উপর বিশেষ মুল্য হ্রাস দেয়া হয়। খাবার সামগ্রী সহ প্রায় সব জিনিষের উপর দেয়া হয় এই ডিসকাউন্ট। এ সময়টাতে যেমন ইউরোপীয়ারা ছুটি কাটাতে বেড়িয়ে পড়েন, ইউরোপের যে যেখানেই থাকুক কেনা কাটার সুযোগটি হাত ছাড়া করেন না কেঊ।

এবছর শীত দীর্ঘায়িত হবে তা আবহাওয়া অফিস বছরের শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছিলো। আব হাওয়াবিদদের কথাই সত্য প্রমানিত হচ্ছে। এই জুনে এসেও শীত কাটেনি। মাঝখানে কয়েকদিন বেশ গরম পড়েছিল, তাপমাত্রা ঊঠেছিলো ২৮ ডিগ্রী সেলসিয়াছে। সবাই ভেবেছিলো এই বুঝি শীত বোধ বিদায় নিলো। কিন্তু পরের দিনগুলোতে আবার ঠান্ডা। মাঝে মধ্যে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিও হচ্ছে। যারা ইতিমধ্যে শীতের পোষাকটি উঠিয়ে রেখেছেন তারা আছেন বেশ বিড়ম্বনায়।

ইউরোপিয়ানরা সামারের জন্য অপেক্ষা করেন সারাটি বছর ধরে। শীতের ভারী কাপড়-চোপড় গায়ে চাপাতে চাপাতে এখন সবাই ক্লান্ত। সবকিছু ছুড়ে ফেলে সূর্যের তাপে শরীরটাকে একটু দাহন করে নেয়ার ইচ্ছা। শীতের আমেজ কমে যাওয়ায় গাছ গাছালিতে নতুন করে পাতা গজিয়েছে ইতিমধ্যে। গাছে গাছে রং বেরং এর ফুল ফুটতে শুরু করেছে। যতদুর চোখ যায় চারিদিকে শুধু ফুল আর ফুল। সবুজের মাঝে ফুলের সমারহ। রাস্তার দুই ধারে, বাড়ির আংগিনায়, মাঠ- ঘাট সব জায়গাতেই শুধু ফুল আর ফুল। না দেখলে বিশ্বাসই হবে না, যা কল্পনাকেও হার মানায়। মে জুন সময়টাতে এখানের প্রতিটি মিউনিসিপ্যালিটি অতিরিক্ত লোক নিয়োগ দিয়ে থাকে নিজ নিজ এলাকার সৌন্দর্য বর্ধনে। গাছের ডাল কাটা, ঘাস কাটা, রংবেরংয়ের ফুলের চারা লাগানো ইত্যাদি। এসব দেশের সরকারগুলো প্রকৃতিকে স্বপ্নিল করতে বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করে থাকে।

প্যারিসের আইফেল টাওয়ার

ইউরোপীয়ানরা নববর্ষের পরপরই সামার ভেকেশানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। অনেকের পরিকল্পনা দেশের বাইরে অন্য কোন দেশে গিয়ে ছুটি কাটিয়ে আসা। কেঊ কেঊ আবার সাগরের কাছাকাছি কোন জায়গা অথবা ইউরোপেরই কোনো শহর বা কোন পাহাড়িয়া অঞ্চলকে পছন্দের জায়গা হিসাবে বেছে নেন। আবার কেউ বা চলে যান দূরবর্তী কোন আইল্যান্ডে। এদের একটি অংশ আবার চলে যায় আফ্রিকা অথবা এশিয়ার কোন দেশে।

আর যারা থেকে যান তারা চলে যান নিজের গ্রামের বাড়িতে পরিবার পরিজন নিয়ে। কখনো ঘোড়া দৌড়িয়ে ,কখনো বা ঊন্মুক্ত মাঠে বারবিকিঊ পার্টি করে, নয়তো নদীতে নৌকা চালিয়ে সময় কাটিয়ে দেন।

যারা দেশের বাইরে ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা করেন তারা বছরের শুরুতেই ইন্টারনেটে বিমানের টিকিট,হোটেল রিজারভেশন করে ফেলেন। কারন সামার সিজনে টিকেটের দাম কয়েক গুন বেড়ে যায়। আর আবাসিক হোটেলগুলোতে সিট পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাড়ায় এই সময়টাতে। একটি মজার ব্যাপার হলো, অনেকে বাসা বদল করেও ছুটি কাটিয়ে থাকেন। এখানে অনেক ওয়েব সাইড আছে যার মাধ্যমে যে কেঊ নিজের বাসা ভিনদেশী কারো সাথে কিছু দিনের জন্য এক্সচেঞ্জ করে থাকেন। এতে করে দুজনেরই হোটেল খরচ বেচে যায় । অনেকে আবার নিজের গাড়ি নিয়ে নিকট কোন দেশে চলে যান।

প্রাচীন রোম নগরী

ইউরোপীয়ান দেশগুলো সরকারী ভাবেও সে দেশের সল্প আয়ের নাগরিকদের ছুটি কাটানোর জন্য বিশেষ ভাতা দিয়ে থাকে। এসব দেশের সোস্যাল সাভিস নাগরিকদের বিমান, রেল ও হোটেলের আংশিক খরচ বহন করে থাকে। ইঊরোপের সামার ভেকেশান জুলাই মাস থেকে পুরোপুরি শুরু হয়। এসময় অফিস আদালত, স্কুল, কলেজ,ইঊনিভারসিটি সব বন্ধ হতে শুরু করে। রাস্তায় গাড়ি, লোক চলাচল কমে আসে। এসময়ে শহরের টুরিষ্টিক পয়েন্টগুলোতে লোকজনের ভিড় দেখা গেলেও শহরের বাইরের এলাকাগুলোকে মনে হয় ভূতুরী নগরী। ইন্টারন্যাশাল এয়ারপোট ও রেল ষ্টেশনগুলোতেও প্রচুর ভিড় দেখা যায়। ছেলে-মেয়ে সবার পরনেই হাফ শার্ট[ – প্যান্ট, পায়ে কেটস। তবে যে জিনিষটি চোখে পড়ার মতো, সেটি হলো ছেলে-মেয়ে সবার কাধে লম্বাকৃতির বিশাল বিশাল ব্যাগ। ইউরোপিয়ানরা এই বিশাল বিশাল ব্যাগ নিয়ে ট্রাভেল করতে বেশ সাচ্ছন্দ বোধ করেন।

সারা ইউরোপে অনেক বিদেশি অভিবাসী আছেন। যাদের অনেকের অরজিন এশিয়া কিংবা আফ্রিকাতে, তাদের অনেকেই ছুটি কাটাতে স্ব-পরিবারে চলে যান নিজ নিজ দেশে।

এথেন্স নগরী

আমাদের দেশের মত এখানেও সামারে পিকনিকের ধুম পড়ে যায়। ইউরোপিয়ানরা নিজেদের গাড়ি নিয়ে চলে যান সমুদ্র তীরবর্তীকোনো জায়গায় অথবা কোন পাহাড়িয়া এলাকায়। সাথে নিয়ে যান খাবার-দাবার , পাণীয়। আর বিদেশী অভিবাসীরা দল বেধে পিকনিক করেন এই সময়টায়। লাক্সারিয়াস বাস ভাড়া করে দল বেধে চলে যান দূরবর্তী নৈসগিক সুন্দর কোন জায়গায়।প্রবাসে থেকেও দেশীয় গান, খেলাধুলা আর আনন্দ ফূতি করে দিনটি কাটিয়ে আসেন।

জুরিখ নগরী

সামারে ইউরোপের প্রায় সব দেশেই কমবেশী টুরিষ্টরা ভিজিটে আসে। এর মধ্যে ফ্রান্স,ইটালী,স্পেন, সুইজারল্যান্ডে সব চেয়ে বেশী টুরিষ্ট আসে। টুরিষ্টদের প্রথম পছন্দের দেশ ফ্রান্স। আন্তজাতিক পরিসংখানে ফ্রান্স বরাবরই শীর্ষে। বিশ্বের অত্যন্ত চাকচিক্ক, ও অত্যাধুনিক জাকজমকপূর্ন শহর প্যারিস। আইফেল টাওয়ার, লুভ মিউজিয়াম, শনজলিজে, কনকড, সাতো দো ভারসাই,সাক্রে কোর আর ইউরো ডিজনি টুরিষ্টদের বিশেষভাবে আকর্ষন করে। ইটালী, প্রাচীন সভ্যতার লালন ভূমি রোম, ভেটিকেন সিটি, নীল সমুদ্র মেডিটেরিয়ানে অসংখ্য ভিজিটর স্নান করতে আসেন। অনেকে আবার চলে যান লন্ডন ,মাদ্রিদ, বারসেলোনা জুরিখ, জেনেভা, এথেন্স বা অন্যকোন শহরে।

প্যারিস ০৬/০৬/০৯ | Mail : polashsl@yahoo.fr


Place your ads here!

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment