চুপচাপ থাকলে চলবে না, মাঠে নামতে হবে

চুপচাপ থাকলে চলবে না, মাঠে নামতে হবে

সাক্ষাৎকার : অজয় রায়
চুপচাপ থাকলে চলবে না, মাঠে নামতে হবে
অজয় রায়, অভিজিৎ রায়ের বাবা
দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। একজনের সন্তান লেখক, অপরজনের সন্তান ওই লেখকের বইয়ের প্রকাশক। দুজনের সন্তানকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুষ্কৃতকারীরা। সন্তানহারা এই দুই পিতার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শরিফুজ্জামান
প্রথম আলো: স্যার, কেমন আছেন? অবসর কীভাবে কাটছে?
অজয় রায়: কেমন আছি বুঝতে পারছি না। গতকাল শেরপুরে গিয়েছিলাম। সেখানে একজন স্থানীয় প্রবীণ ফটোসাংবাদিকের হাতে বিভিন্ন উপায়ে সংগ্রহ করা কিছু অর্থ দিয়ে এলাম। আসার পথে কয়েকজন ফোনে জানাল, দীপনকে মেরে ফেলা হয়েছে। ইশ্‌! একের পর এক ওদের মেরে ফেলা হচ্ছে। আমরা ওদের রক্ষা করতে পারছি না।
প্রথম আলো: আজ কী করবেন?
অজয় রায়: সকাল থেকে বারবার বাইরে যেতে মন চাইছে। কিন্তু পরিবার থেকে আমাকে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না। বলা হচ্ছে, বাইরে যাওয়াটা আমার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আবুল কাসেম ফজলুল হকের সঙ্গে ফোনে কথা বলার চেষ্টা করছি গতকাল থেকে। কিন্তু পাচ্ছি না। কী বা আর বলব? সেও আমার মতো এক হতভাগ্য বাবা। অভিজিতের বই প্রকাশ করার জন্য দীপনকে মরতে হলো। অভিজিতের বইয়ের আরেক প্রকাশক টুটুলও অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। ওকেও দেখতে যাওয়া দরকার।
প্রথম আলো: এই পরিস্থিতিতে আমরা কী করব?
অজয় রায়: দেশটা তো রসাতলে চলে গেল। এখন আর চুপচাপ বসে থাকলে চলবে না। উনসত্তরের কথা মনে করতে হবে। ওই রকম গণ-অভ্যুত্থান দরকার। কিন্তু মাওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও মোজাফ্ফর (ন্যাপ) সাহেবের মতো নেতা দরকার। সেই নেতৃত্বের শূন্যতা এখন প্রকট থেকে প্রকটতর হয়েছে। আন্দোলন শুরু হলে নেতা তৈরি হবে।
প্রথম আলো: তত দিন কি সবাই চুপ করেই থাকবে?
অজয় রায়: এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতিগুলো এগিয়ে আসত। ছাত্র সংগঠনগুলো নেমে পড়ত। ছাত্র সংগঠনগুলোর এখনকার অবস্থা আর নাইবা বললাম। কিন্তু শিক্ষক সমিতিগুলোও শিক্ষকদের রাজনৈতিক বিভক্তি ও ব্যক্তিস্বার্থের কারণে অনেকটাই অকেজো হয়ে পড়েছে। এখন তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। শুধু ফেসবুকে থাকলে হবে না, প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নামতে হবে। শিক্ষকদেরও দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে মাঠে নামতে হবে। যে পরিস্থিতির দিকে দেশ যাচ্ছে, তাতে কেউই এখন আর নিরাপদ নয়।
প্রথম আলো: অভিজিৎ হত্যার বিচার কত দূর?
অজয় রায়: এখন পর্যন্ত তেমন কিছুই হয়েছে বলে মনে হয় না। তবে ১৫-২০ দিন আগে গোয়েন্দা বিভাগে গিয়েছিলাম। সেখানে ঢোকাও কঠিন কাজ। তারপরও গেলাম মামলার অগ্রগতি জানতে। গোয়েন্দারা বললেন, পাঁচজনকে নাকি শনাক্ত করেছে। এদের দুজন হত্যাকারী, একজন অভিজিতের চলাফেরা অনুসরণ করত। বাকি দুজন নিলয় হত্যার সঙ্গে জড়িত।
প্রথম আলো: একের পর এক ব্লগার হত্যাকারীদের সঙ্গে কারা জড়িত বলে মনে করেন?
অজয় রায়: এদের একটি চক্র আছে। ওই চক্রের কিলার সেলে ১৫-২০ জন করে সদস্য আছে বলে মনে হয়। তারা দলনেতার নির্দেশ মেনে চলে। ওদের কী দুঃসাহস ভাবতে পারেন? আগে পথেঘাটে মারত। এখন বাসায় ঢুকে মারে, অফিসে ঢুকে মারার পর দরজা বন্ধ করে রেখে যায়।
প্রথম আলো: সরকারের ভূমিকা কেমন দেখছেন?
অজয় রায়: সরকার তো সবকিছু স্বাভাবিক আছে—এমনটি দেখাতে চায়। আর রাষ্ট্র একটি নিষ্ক্রিয়তার ভাব ধরে আছে। ব্লগারদের বিরুদ্ধে যেভাবে অপপ্রচার হচ্ছে, তাতে অনেকের ধারণা যে, তারা নাস্তিক এবং ধর্মের বিরুদ্ধে। প্রকৃতপক্ষে যারা ব্লগে ও ওয়েবে নিজের মত প্রকাশ করে, তারাই ব্লগার। তারা দেশ বা ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু বললে বা লিখলে তো প্রচলিত আইনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, ব্লগার হোক, নন ব্লগার হোক—তাদের প্রাণ রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু আমার প্রশ্ন, সরকার কি প্রাণ রক্ষার সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছে? এ প্রসঙ্গে কিছুদিন আগে দেওয়া পুলিশের মহাপরিদর্শকের বক্তব্য উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেছেন, টার্গেটেড কিল হলে তাকে রক্ষা করা যায় না। আমার প্রশ্ন, একজন আইজিপি কি প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য দিতে পারেন? এতে খুনিরাই তো উৎসাহিত হবে। টুটুল তো টার্গেট ছিল। সেও জানত, পুলিশও জানত। থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে। কিন্তু পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে?
প্রথম আলো: কীভাবে এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ হতে পারে?
অজয় রায়: আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করা। বিচার না হওয়ায় একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে খুনের এই ধারাবাহিকতা থামবে না। তদন্তের নামে সময়ক্ষেপণ বন্ধ করতে হবে। কত দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করবে, তা নির্দিষ্ট করতে হবে। যদি তদন্তে টুকটাক ভুলও হয়, তা আদালতে শোধরানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু অভিযোগ তো গঠন করতে হবে, বিচার তো শুরু করতে হবে। নইলে জঙ্গিরা আশকারা পেতে থাকবে।
প্রথম আলো: সরকার তো জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করার কথা বলেছে। বেশ কিছু গ্রেপ্তার হয়েছে, বিচারও চলছে।
অজয় রায়: সরকার কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে এটা সত্য। কিন্তু সেই ব্যবস্থা যে মোটেও কার্যকর হচ্ছে না, তার প্রমাণ একের পর নৃশংস গুপ্তহত্যা। আসলে আমাদের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো সবার আগে ভোটের চিন্তা করে। এমনকি আওয়ামী লীগও মনে করে, যদি জামায়াত বা ইসলামি দলের কিছু ভোট পাওয়া যায়। যদিও তাদের একটি ভোটও আওয়ামী লীগ কোনো দিন পাবে না।
প্রথম আলো: আপনার ছেলের বউ কেমন আছেন?
অজয় রায়: রাফিদা শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠছে। কিন্তু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। দেশে আসতে চায়। আমিই না করেছি। কারণ সেও তো তিন নম্বর টার্গেট। সম্প্রতি চাকরি ছেড়ে গবেষণা শুরু করেছে। ওই গবেষণার জন্য দেশে আসার দরকার ছিল। আমি না করায় বলল, তাহলে আমাকেই ওর গবেষণাকাজে সহায়তা করতে হবে। আমি ওকে বললাম, এই মানসিক অবস্থার মধ্যে তুমি গবেষণা করতে পারবে? রাফিদার জবাব, কাজের মধ্যে থাকলে ভালো থাকবে। ওর মেয়েকেও ওকে দেখাশোনা করতে হয়। বুঝলে, একটি মৃত্যু কতজনের জীবনকে কতভাবে প্রভাবিত করে!


Place your ads here!

Related Articles

HATIL opens showroom in Australia

Furniture major HATIL Complex Ltd. has launched its first ever showroom in Australia. The single-brand HATIL showroom was inaugurated in

Bangladesh thrash West Indies to record biggest win

The Report by Kanishkaa Balachandran | December 2, 2012 Bangladesh 292 for 6 (Anamul 120, Mushfiqur 79, Rampaul 5-49) beat

Make sure next govt won't allow hartal, Business leaders ask CG

Top business leaders of the country yesterday urged the caretaker government to make sure before the next general election that

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment