রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ

রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ

বাংলাদেশে আশ্রয় পাওয়া রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ। সম্প্রতি স্যাটেলাইট চিত্রের বিশ্লেষন করে অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট (এএসপিআই) এর আন্তর্জাতিক সাইবার পলিসি সেন্টারের গবেষকরা জানিয়েছেন ২০১৭ সালের মিলিটারি ক্র্যাকডাউনে  ক্ষতিগ্রস্থ ৩৯২টি রোহিঙ্গা জনবসতির  ৩২০টিতেই জনবসতি পুনর্গঠনের কোনও চিহ্ন নেই। স্যাটেলাইট চিত্রে মনে হচ্ছে  ২০১৭ সালে যেখানে রোহিঙ্গা জনবসতি ছিল সেখানে নতুন ভাবে ছয়টি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে মিডিয়াতে ফাঁস হওয়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ান নেশনস (আসিয়ান)-এর জুন ২০১৯ প্রতিবেদন থেকে জানা যায় আগামী দুই বছরে মাত্র ৫০০,০০০ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এই প্রতিবেদন অনুসারে, মিয়ানমার সরকারের পরিকল্পনা হলো প্রত্যাবাসিত শরণার্থীদের প্রথমে ‘অভ্যর্থনা কেন্দ্রসমূহে’ নেওয়া হবে যেখানে তাদের বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়ায় নিবন্ধকরন করা হবে। তারপরে তাদেরকে ‘ট্রানজিট সেন্টার’-এ পাঠান হবে।

এই প্রতিবেদন থেকে জানা যায় অনাবাদি ও খাস জমি রক্ষনাবেক্ষন আইন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিচালন আইন কার্যকর করার মাধ্যমে রোহিঙ্গা জনবসতিগুলির জমি সরকারী মালিকানা এবং ব্যবস্থাপনায় আনা হয়। এর ফলে ২০১৭ সালের মিলিটারি ক্র্যাকডাউনে ধ্বংস হওয়া রোহিঙ্গা জনবসতি এলাকায় ‘ক্যাশ ফর ওয়ার্ক’ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত  আশ্রয়কেন্দ্রগুলিতে বেশিরভাগ প্রত্যাবাসিত শরণার্থী বাড়ির মালিক হতে পারলেও  জমির মালিকানা থাকবে মিয়ানমার সরকারের হাতে।

তাই আগামী দুই বছরে ৫০০,০০০ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া চললেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারের কতটুকু ইচ্ছা রয়েছে সে নিয়ে আসিয়ান রিপোর্টটি গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।  এই প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেসি সংস্থা ভয়েস অফ রোহিঙ্গা বলেছে, “রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যত এবং রোহিঙ্গা গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষের জীবন” ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মায়ানমার সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সরকারী সংখ্যা হিসাবে ৫০০,০০০ শরণার্থীর প্রয়োজনের মূল্যায়ন করা হয়েছে বলে জানালেও বাস্তুচ্যুত মানুষের আসল সংখ্যা ৯০০,০০০ এর বেশী।  

বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ০.৩১ শতাংশেরও কম জনসংখ্যার দেশ হয়েও বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে পৃথিবীর মোট শরণার্থীর ৪.৭% শরণার্থীকে। যেখানে প্রতি ৪৫ বর্গ মিটারে একজন শরণার্থী রাখার কথা সেখানে কক্সবাজার শরণার্থী শিবিরে রয়েছে  প্রতি ৮ বর্গ মিটারে একজন শরণার্থী।  পৃথিবীর সবচেয়ে ঘন বসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবির হচ্ছে কক্সবাজার এলাকার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির। ঘন জনবসতি’র প্রভাব পড়তে শুরু করেছে কক্সবাজারে। সম্প্রতি ইউ এন ডি পি এবং বাংলাদেশের পলিসি রিসার্চ ইনষ্টিটিউটের যৌথ ইম্প্যাক্ট এসেসমেন্ট স্টাডির ফলাফলে জানা যায়, কক্সবাজারে  নিত্য ব্যবহার্য জিনিষ পত্রের দাম বেড়েছে ৫০%, দিনমজুরদের পারিশ্রমিক কমেছে, প্রায় ২৫০০ পরিবার দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করছে, ৫৫০০ একর সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং ১৫০০ হেক্টর বন্যপ্রাণী ধংস হয়েছে।  পলিসি রিসার্চ ইনষ্টিটিউটের চেয়ারম্যন ডঃ জাহিদি সাত্তার তাই গত ২৫ জুলাই ২০১৯, বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করনের জন্যে মিয়ানমার সরকারের উপর গ্লোবাল কমুণিটির চাপ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

এর আগে, গত ৫ই জুন, ২০১৮ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনা বলেন, ‘জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে মিয়ানমার সরকারের উপর তাদের চাপ অব্যাহত রাখতে হবে।‘

বাংলাদেশের কারণে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি বলে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন বলেছেন যে মিয়ানমার মিথ্যাচার করছে। তিনি সম্প্রতি ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের পররাষ্ট্র সম্পর্কিত কমিটির প্রভাবশালী পাঁচজন সদস্যের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করে রোহিঙ্গা ইস্যুর টেকসই সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসকে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের আহ্বান জানান।

রোহিঙ্গা  উদ্বাস্তুদের প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন যে জটিলতার আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে তার ইঙ্গিত মেলে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের এশিয়া প্রশান্ত-মহাসাগরীয় উপকমিটির চেয়ারম্যান ব্রাড শেরম্যান রোহিঙ্গাদের জন্য মানচিত্রটাই বদলে দেওয়ার যে প্রস্তাব করেছেন তার মধ্যমে। তিনি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যকে দেশটি থেকে আলাদা করে দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনার কথা বিবেচনার জন্য পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতি আহ্বান জানিয়ে গত ১৩ জুন বলেন, সুদান থেকে দক্ষিণ সুদানকে আলাদা করে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে যুক্তরাষ্ট্র যদি সমর্থন করতে পারে, তাহলে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কেন একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না?

তাই দেশে বিদেশে বিভিন্ন মহলের কাছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম এখন প্রশ্নবিদ্ধ।  


Place your ads here!

Related Articles

Bangladesh and Dr. Manmohan Singh

Dr Manmohan Singh, Prime Minister of India is an erudite person, having earned degrees from both Oxford and Cambridge. He

হুমায়ূন আহমেদঃ সাহিত্য ও বিত্তের যাদুকর

কথাসাহিত্যের যাদুকর লেখক হুমায়ূন আহমেদএর লেখালেখির ভুবন যেমন ছিল বিশাল বিসত্মৃত তেমনি তাঁর জনপ্রিয়তাও আকাশচুম্বী৷ হুমায়ূনের সমসাময়িক জনপ্রিয় একের বেশী

Bangladesh foreign policy faces challenges.

Foreign policy is not formulated in a vacuum. It is based on certain ingredients that cannot be changed, such as,

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment