অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী – ক্যানবেরা’র যত কথা

অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী – ক্যানবেরা’র যত কথা

ক্যানবেরা অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী। অনেকেই এখনো মনে করে থাকেন সিডনী বা মেলবোর্ন হয়ত বা এই দেশের রাজধানী। সে যাই হোক আমি যখন এই শহরে প্রথম বসতি স্থাপন করতে এলাম সিডনী থেকে তখনও এই শহরে গড়ে ওঠেনি আজকের মত কু ঝিকঝিক ট্রেনের জীবন গতি।

সেই প্রায় উনিশ বছর আগের ক্যানবেরা দেখতে দেখতে আজ চোখের সামনে টগবগ করছে কখনো টকটকে লাল চেরি’র মত কখনো গোলাপি ম্যাগ্নোলিয়ার মত কখনো মসৃণ পিংক লেডী আপেলের মত চকচকে আভায় উজ্জলিত হয়ে।

সেই তখন এই শহর আমাকে যেমন টেনেছিল বেঁধেছিল অন্য এক অলীক অলৌকিক বাঁধনে আজ এত্ত গুলো বছর পরে আজো দেখি এতটুকু ছেদ পড়েনি সেই বাঁধনে। শিথিল হয়নি কোন গেরো তার, দিন দিন যেন আরো মজবুত হয়েছে আমাদের আত্মিক সম্পর্কের সেতু। যেন আরো নিবিড় হয়েছে আমাদের খোলামেলা মেলামেশা।

কবে কখন আমরা মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছি মনে ও মননে আমাদের জানাও নেই। এ যেন সেই প্রথম ভালবাসার মত এক ফালি চাঁদের অপার হাসি। এ যেন সেই প্রথম প্রেমের মত লুকিয়ে রাখা অমুল্য রতন ভান্ডার যার চাবি থাকে বুকপকেটের গোপন পকেটে।

এই শহরে অনেক অনেক অনেক পাহাড় আছে যার বুকে জমে আছে অনন্তের কান্না মাখা গল্পের পর গল্পের মখমল। জমে আছে লাল কালো চাপ ধরা কান্না যার প্রবাহ ঝর ঝর ঝর্ণা হয়ে নেমে আসে তার বুক চিরে আমাদের আনন্দ দিয়ে কিন্তু শুধু পাহাড়ই জানে তার রহস্য!

সেই ঝর্ণার চোখে চোখ রেখেও আমি দেখেছি গভীর এক ভালবাসা তার স্ফটিক স্বচ্ছতায় যা সে রাখে ঢেকে বুকের অনাবৃত গভীর খাদের নীচে। পাহাড়ের কান্না নিয়েই সে বয়ে চলেছে আর তাকিয়ে আছে শুধু ওই পাহাড়ের দিকেই।

এ এক অন্য রকম ভালবাসা যা শুধু আমাকেই টানে আর বাঁধে। আমি বেরিয়ে আসতে পারিনা সেখান থেকে এক মুহূর্তের জন্যও না, একেবারেই না।

পাহাড় গুলো মৌনতার চাদরে নিজেদের আবৃত করে রাখলেও আমার কাছে তারা উন্মুক্ত হয়ে যায় খুব সংগোপনে একান্তে নিরালায়।আমি চোখ বুজে পাহাড়ের পর পাহাড় পেরিয়ে আসি।

হাত বুলিয়ে দেই পাহাড়ের শক্ত নিথর কিন্তু সরব বুকের মাটিতে। ওরাও আমার হাতে মেখে দেয় হিম হিম ভালবাসা। কখনো উষ্ণ তপ্ততায় বাঁধে আবার কোনদিন শিশির জমিয়ে দেয় হাতের পাতায় চোখের বারান্দায়।

আমি ফিসফিস করে পাহাড়গুলোর কানে কানে বলে আসি আমার কথা। আমার ভালবাসার কথা। আমার একান্ত কান্নার কথা। আমার নিজস্ব স্বপ্নের কথা।

রাতের ঘুমে পাহাড়গূলো আমাকে আশ্বাস দিয়ে যায় পরম মমতায়। তারা খুব জোর দিয়ে বলে যায় আমার ভালবাসা সত্যি এবং আমার স্বপ্ন সফল তাদের ভালবাসায়। সকালের বালিশে দেখি দাগ জমে আছে তাদের মমতার নীল ছায়া।

এই শহরে আমার খুব প্রিয় এক জায়গা আছে- সেটা লেক বার্লি গ্রিফিনের শান্ত সফেদ বুকের খাঁচায় গড়ে ওঠা চমৎকার এক নিরিবিলি উদ্যান। যেখানে আমি আমাকে খুলেমেলে দেখি বারবার দেখি আর ভাবি আমাদের দুজনের এত মিল! এই লেক বয়ে চলেছে হাসি মুখে বুকের ভেতরে লুকিয়ে কান্নাধার, আর আমি!!

ক্যাঙ্গারুর মৃতদেহ গুলো এত বছর পরেও আমাকে কাঁদায় দেখে সবাই হাসলেও ওই সব মৃত ক্যাঙ্গারুর চোখে আমি দেখেছি সমবেদনার ভাষায় ভালবাসা আমার অবুঝ হৃদয়ের অবাধ্যতার জন্য।

আমার ভালবাসার কান্না মৃত আত্মার চোখেও জল এনে দেয়!

এই শহরে কত কত অমানবিক ঘটনা ঘটে যায় যাচ্ছে যাবে। আমি সব সময় তাদের সবার সাথে মিশে যেতে পারিনা পারিনি পারব না। অনাচারের সাথে আমার যে সখ্যতা নেই একেবারেই নেই!

এই শহরেই অজস্র ভাল উদাহরণ প্রতিনিয়ত রচিত হচ্ছে। মানুষের জন্য মানুষ এই ব্রতে জীবন দিচ্ছে কত শত প্রাণ। আমি তাদের সাথে মিশে থাকি জ্ঞানে অজ্ঞানে মনে ও মননে।

এই বসতি ছেড়ে হাজার মাইল দুরের ওই দেশে আমার বাংলাদেশের বুকে আমি হেঁটে আসি প্রতিদিন।আমি ক্লান্ত হইনা। আমার পায়ে ফোস্কা পড়েনা। আমার চোখের তারা এতটুকুও ভয় খেলা করেনা।

আমি এই শহরের শুদ্ধ বাতাস বুকে নিয়ে যাই ওই শহরে আমার ঢাকা শহরে। আমি শুদ্ধ বাতাসের হাসি ছড়িয়ে দিয়ে আসি আজিমপুর কবরস্থানে আমার বাবার কবরের পাশে ইউক্যালিপটাস গাছের চিকন পাতার বুকে এই আশায় যে – সেই শুদ্ধ বাতাস আমার বাবার বুকের গভীরে পৌঁছাবেই।

এই শহরের ফুলের হাসি আমি বিলিয়ে দিয়ে আসি আমার মায়ের কবরের চারিপাশে এই স্বপ্নে যে- আমার মা কি অদ্ভুত খিলখিল হাসি হেসে আমাকে বুকে টেনে নেবেন।

আমি আবার ফিরে আসি এই ক্যানবেরাতে । আমি জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি এই শহরের সবকিছু বুকে ধরেই। মিশে থাকি এই শহরের ভালমন্দে…

এই শহরের প্রতিটা ইটের কান্নায় আমি যেন আমাকেই খুঁজে বেড়াই।

এই শহরের প্রতিটা ফুলের হাসিতেই যেন আমি ফুটে থাকি। এই শহরের প্রতিটা স্বপ্ন দেখা চোখেই যেন আমি কাজললতা।

আইভি রহমান।
২০১৭


Place your ads here!

Related Articles

Capital Punishment: Arguments For Against

There has been on-going debate on whether death penalty or capital punishment should be retained or abolished. Both sides advance

যেমন দেখেছি

দীর্ঘ ছুটি কাটিয়ে বাচ্চারা আজ স্কুলে গেল। আবারো সেই ছুটোছুটি। জব। রাজ্যের কর্ম ব্যস্ততা। মাঝে আমার গাড়িটা ও সপ্তাহখানেকের জন্য

Foreigners joined Bangladeshis to pay respect to language martyrs in Canberra

High Commission for Bangladesh , Canberra Press release Canberra, 21 February 2021 Bangladeshis and Australians participated at a Probhat Fery

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment