বন্ধুত্বের স্বরূপ
রাজীবের সাথে আমার তেমন কোন পরিচয় ছিল না। তবে ওকে চিনতাম কলেজ জীবন থেকেই। কলেজ জীবনটা আমাদের কাছে ছোট্ট এক টুকরা স্বপ্নের মত। যেই স্বপ্ন আমরা বারবার দেখতে চাই। কারণ স্কুল জীবন পার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ জীবনে প্রবেশের আগের একটা মুহুর্ত হচ্ছে কলেজ জীবন। কিন্তু এত বর্ণে বর্ণিল যে তার রঙের আবেশ রয়ে যায় সারাজীবনে। আমি এখনও অবসরে সেই ক্ষুদ্র স্মৃতি হাতড়ে বেড়াই। যাই হোক রাজীবকে চিনতাম আমাদের যতটা না সহপাঠি হিসেবে তার চেয়ে বেশি চিনতাম ক্যাডার হিসেবে। একটা ছেলে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েও সারা কলেজ হই হই করে বেড়াচ্ছে। এক পাড়ার সাথে অন্য পাড়ার গেঞ্জামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। মিছিলে সবার আগে।
আমার এখনও মনে পড়ে মাথায় উল্টা করে লাল রঙের ক্যাপ আর গলায় একটা চেনের সাথে কিছু একটা ঝুলানো। হাটার ভঙ্গিটা কিছুটা অন্যরকম। হাটার সময় সামনের দিকে সবসময়ই কিছুটা ঝুকে থাকতো, তাতে ওকে অনেকটা কুঁজো মনেহত। হয়তোবা বয়সের তুলনায় বেশি লম্বা হওয়ার কারণেই এমন লাগতো। কলেজ জীবনের স্মৃতি বলতে এটুকুই। তবে ওকে মনে রাখার কারণ হচ্ছে আমিও এক সময় পাড়ার সবচেয়ে বজ্জাৎ ছেলেটিই ছিলাম। আমাকে নিয়ে মা মহলে প্রায় প্রতিদিনই সভা বসতো, এই ডাকাত, গোঁয়ার ছেলের হাত থেকে তাদের ভালো ছেলেমেয়েদেরকে কিভাবে বাচানো যায়। কিন্তু কালের আবর্তে আমি সেটা হারিয়ে ফেললেও এই ছেলে সেটা ধরে রেখেছে, তাই ওর কথা আমার মনে ছিল।
এরপর আর ওর সাথে অনেকদিন দেখা নেই। আমি কোনমতে টেনেটুনে অনার্স শেষ করে বন্ধুদের বদান্যতায় একটা ভালো চাকুরী পেয়েছি। সেই চাকুরীর বস একদিন বললেন যে তোমাদের পরিচিত কেউ যদি ভালো অটোক্যাড পারে তাহলে আমাকে জানিও। আমি বন্ধু জ্যাকের সাথে ব্যাপারটা আলোচনা করার পর ও বললো রাজীব ভালো অটোক্যাড পারে, ওকে রেফার কর। আমিও কোন কথাবার্তা ছাড়াই রাজীবকে ফোন দিয়ে বললাম স্যালারি এইরকম দিবে। এতে তোর চলবে কি না?
ও কি বলেছিল এখন আর মনে করতে পারছি না। কিন্তু আমি তখনও কর্পোরেট কালচার সম্বন্ধে ভালোভাবে ওয়াকিবহাল ছিলাম না তাই এই বোকামিটা করেছিলাম। আমার বসকে বললাম যে আমার এক বন্ধু আছে ও ভালো অটোক্যাড পারে। আমি ওকে নিয়ে আসি একদিন। বস বললো দাঁড়াও, ও কোন ক্যাম্পাসের? আমি বললাম অমুক ক্যাম্পাসের। সে বললো না, ওকে অমুক ক্যাম্পাসের হতে হবে, নাহলে হবে না। আমি যারপর নাই লজ্জিত বোধ করেছিলাম এবং এরপর আর রাজীবের সাথে আমার কথা বা দেখা হয় নাই।
জীবনের গতিময়তায় একদিন স্বপ্নলোকের চাবি হাতে পেলাম। আবারো বন্ধু জ্যাক বললো, রাজীবতো ওখানে আছে ওর সাথে যোগাযোগ কর। কিন্তু আমি দ্বিধা করছিলাম। আমার মনে বারবারই আগের স্মৃতিটা ভেসে উঠছিল আর আমি ততই সংকুচিত বোধ করছিলাম। দেখি একদিন ওই আমাকে ফেসবুকে মেসেজ দিল, কিরে তুই না কি চাবি হাতে পেয়ে গেছিস। আমি কাচুমাচু ভঙ্গিতে বললাম হ্যা। আমি তখনও সহজ হতে পারছিলাম না কিন্তু ও এমনভাবে কথা বলছিল যেন ওর সাথে আমার জীবনে মাত্র একবার কথা হয়েছে এমন না, ওর সাথে আমার প্রতিদিনই কথা হয়।
আমরা যেন প্রায়ই এমন করে আড্ডা দেই। এরপর ওই আমার মোবাইল নম্বর নিয়ে আমাকে ফোন দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বুদ্ধি দিত। আমাকে কি কি নিয়ে আসতে হবে, আসার আগে কি কি করতে হবে ইত্যাদি। এমনকি ও বললো তোর ভাবীকে আমি লাইনে দিচ্ছি তুই তোর বৌয়ের কাছে দে। গৃহস্থালির জন্য কি কি আনতে হবে তোর ভাবী সেটা ভাল করে তোর বউকে বুঝয়ে দিবেনে। এরপর তারাও প্রায়ই ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপ করতো। এতে আমাদের যে কি উপকার হয়েছিল সেই বর্ণনায় আজ আর যাচ্ছি না।
আসলে আপনি যে মানুষটা যুদ্ধ করে জিতেছে আপনি যদি তার কাছ থেকে যুদ্ধ করার বুদ্ধি নেন সেটাই ঠিক বুদ্ধি কিন্তু আপনি যদি এমন কারো কাছ থেকে বুদ্ধি নেন যে যুদ্ধের ময়দানে না যেয়েই যুদ্ধে জয়লাভ করেছে সে কখনই আপনাকে সঠিক ধারণা দিতে পারবে না। তাই ওদের দুজনের বুদ্ধি আমাদের অনেক কাজে এসেছিল।
ভূলোক থেকে স্বপ্নলোকে এসে সবারই কম বেশি ঝাকুনি খেতে হয়। আমারও তার ব্যতিক্রম হয় নাই। তবে যেহেতু আমার আশেপাশে অনেক ফেরেশতা বসবাস করে তাই আমাকে অন্যদের তুলনায় একটু কম ঝাকুনি খেতে হয়েছিল। স্বপ্নলোকে আমার আর রাজীবের মধ্যে বস্তুগত বিশাল দুরত্ব ছিল তারপরও ও সেই দূরত্ব পাড়ি দিয়ে এসে আমাদের জন্য বাজার করে দিয়ে যেত। যেটা আমরা কখনই সাহস করে এখানকার কাউকে বলতে পারি নাই। তবে আমাদের অপর্যাপ্ত সবকিছুর কারণে ওদেরকে একবেলা পেট ভরে খাওয়াতে পর্যন্ত পারি নাই।
যাইহোক এইবারের ছুটিতে আমি একা একা একেবারে উচ্ছন্নে যাচ্ছিলাম। না ছিল খাওয়ার ঠিক, না ছিল ঘুমানোর ঠিক। ঠিক তখনই ও এসে হাজির। ওদের সাথে ঘুরে সিডনীতেই কিছু অসাধারণ মানুষের সাথে পরিচয় হলো। এরপর ওরা আমাকে ক্যানবেরা বেড়াতে নিয়ে গেল। যদিও আমি শুরুতে একটু নারাজ ছিলাম যাওয়ার ব্যাপারে কিন্তু সিমির চাপাচাপিতে শেষ পর্যন্ত যেতেই হল এবং এরপরের গল্প আজ আর বলে শেষ করা যাবে না। ছুটিতে সাবাই অনেক টাকা পয়সা খরচ করে অনেক দামি দামি জায়গায় বেড়াতে গেছে কিন্তু আমি ওদের ওখানে যেয়ে যে সময়টুকু কাটিয়ে এসেছি আমার জীবনের অন্যতম সেরা সময়ের একটি। সেই কলেজ জীবনের স্মৃতিচারণ, পুরোনো বান্ধবীদের সাথে খুনসুটি আর সবার উপরে সিমির হাতের রান্না। আমি নিশ্চিত চার দিনে আমার ওজন অন্তত চার কেজি বেড়ে গেছে।
তাই ভালো থাকুক ওরা। ঘরের খেয়ে পরের মোষ তাড়িয়ে বেড়ানোর এই বদভ্যাস অটুট থাকুক সারাজীবন।
০৭ জানুয়ারি ২০১৬, সিডনি।
Md Yaqub Ali
আমি মোঃ ইয়াকুব আলী। দাদি নামটা রেখেছিলেন। দাদির প্রজ্ঞা দেখে আমি মুগ্ধ। উনি ঠিকই বুঝেছিলেন যে, এই ছেলে বড় হয়ে বেকুবি করবে তাই এমন নাম রেখেছিলেন হয়তোবা। যাইহোক, আমি একজন ডিগ্রিধারী রাজমিস্ত্রি। উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতে অস্ট্রেলিয়াতে আমার আগমন ২০১৫ সালের মার্চে। আগে থেকেই ফেসবুকে আঁকিবুকি করতাম। ব্যক্তিজীবনে আমি দুইটা জীবের জনক। একটা হচ্ছে পাখি প্রকৃতির, নাম তার টুনটুনি, বয়স আট বছর। আর একজন হচ্ছে বিচ্ছু শ্রেণীর, নাম হচ্ছে কুদ্দুস, বয়স দুই বছর। গিন্নী ডিগ্রিধারী কবিরাজ। এই নিয়ে আমাদের সংসার। আমি বলি টম এন্ড জেরির সংসার যেখানে একজন মাত্র টম (আমার গিন্নী) আর তিনজন আছে জেরি।
Related Articles
গুলতেকিন ভালো থাকলে ওপারে হুমায়ুন আহমেদও ভালো থাকবেন
ফজলুল বারী: গুলতেকিনের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে নেটিজানরা এখন বিশেষ তৎপর। কারন গুলতেকিন নামটার সঙ্গে হুমায়ুন আহমেদের নাম জড়িত। বাংলাদেশের সমকালীন
Bangladesh has to balance its relations with both India and China
The series of geopolitical developments in the Asia-Pacific region taking place all at once is certainly overwhelming: We live in
ক্যানবেরার তিল: লেক বার্লি গ্রিফিন
একজন রমণীর মুখমন্ডলে স্পষ্ট হয়ে ফুটে থাকা একটা তিলের উপস্থিতির কারণে সেই মুখাবয়ব হয়ে ওঠে অপরূপা এবং বাড়িয়ে দেয় হাজার





