প্রাক-শৈশব শিক্ষার গুরুত্ব
‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুদের অন্তরে’- বাংলা ব্যাকরণেএটি একটি খুবই পরিচিত ভাবসম্প্রসারণ। ক্লাশে আমাদের এই বিষয় সম্পর্কে বিশ্লেষণ লিখতে হত। আমরা ইনিয়ে বিনিয়ে নানাভাবে বাক্যটির সারমর্ম লিখেছি, এবং প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি, কেন সব শিশুদের অন্তরে শিশুর পিতা ঘুমিয়ে থাকেন। সেই সময় অবশ্য এটা মনে হয় নি যে, শিশুর পিতা কেন? মাতা নয় কেন? আমাদের সময়ে পুঁথিগত বিদ্যার উপর যারা শুধু নির্ভর করছেন, তারা আমার মত কাজের ক্ষেত্রে এসে নতুন অনেক কিছু জেনেছেন। আর যারা প্রচলিত শিক্ষার বাইরে বের হয়ে জানার চেষ্টা করেছেন, তারা নিঃসন্দেহে পরিবর্তনের জায়গায় অবস্থান করছেন। যাইহোক, কাজের ক্ষেত্রে এসে যখন লিঙ্গ বৈষম্য (জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশান) নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি তখন এই ভাবসম্প্রসারণটি মাথায় ঘুরত। অনেকের মতে, লিঙ্গ বৈষম্য একটি পশ্চিমা ধারণা। যদিও এ নিয়ে অনেক যুক্তিতর্ক রয়েছে। তবে আমার মতে, যেকোন মতবাদ নিয়ে মতবিরোধ থাকতেই পারে কিন্ত তা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কতটা যুক্তিযুক্ত কিংবা গ্রহণযোগ্যতার বিচারে কতটা উপযোগী তা বিবেচনার দাবী রাখে। আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা ও এর গুণগত মান নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে। বিস্তর লেখালিখি হয়, হচ্ছে। এই লিখায়, প্রাকশৈশব শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
প্রাক-শৈশব শিক্ষা যা ইংরেজিতে ‘আর্লি চাইল্ডহুড এডুকেশন’ বলা হয়। একটি জাতির শিক্ষা ব্যবস্থায় ভিত্তি প্রস্তর এর সাথে তুলনা করা যায় প্রাক-শৈশব শিক্ষা। প্রাক-শৈশব শিক্ষা কেবল শিক্ষা হিসেবে নয়, একটি শিশুর সামাজিক, মানবিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে প্রাক-শৈশব শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা পালন করতে পারে। উন্নত দেশগুলোতে প্রাক-শৈশব শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা যেভাবে বিবেচনা করা হয়, আমাদের দেশে সেভাবে দেখা হয় না। ফলে এই শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এখনও উপেক্ষিত। একটা সময় প্রাক-শৈশব শিক্ষাকে ছোট ওয়ান বলা হত (সরকারি শিক্ষা কারিকুলাম) আর বেসরকারি বিদ্যালয়ে তা কিন্ডারগার্টেন-১, ২ বলা হয়।
বেশ কিছু বছর যাবত, দাতা সংস্থাদের অর্থায়নে এনজিওদের পরিচালনায় প্রাক-শৈশব শিক্ষা চালু হয়েছে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুবাদে বেশ কিছু স্কুল পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছিল। সেসব স্কুলে প্রাক-শৈশব শিক্ষা বাস্তবায়নে চেষ্টা করা হয়েছে যদিও তা কতটা শিশুর সামাজিক, মানবিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে সহায়তা করে বা এর সফলতা কতটা তা এর সাথে যুক্ত প্রতিষ্ঠান পক্ষপাতদুষ্টু না হয়ে খোলামেলা কথা বলতে পারেন। আপাতদৃষ্টিতে আমার মনে হয়েছে তা অনেকটাই শিক্ষা বলতে বই এবং বই ভিক্তিক বিকাশের উপর জোর দেয়া হয়েছে এবং অনেকটাই প্রকল্প নির্ভর। একজন শিশুকে আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার জন্য বইয়ের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কাজটি এই শিক্ষার কারিকুলামে থাকা জরুরি ছিল।
ইংরেজি শিক্ষা মাধ্যমে প্রাক-শৈশব শিক্ষা বিষয়টিকে কিছুটা গুরুত্ব দেয়া হলেও সরকারি শিক্ষা মাধ্যমে এই শিক্ষাকে একেবারেই আমলে নেয়া হয় না। একজন শিশু আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে তার শাররিক, সামাজিক, মানবিক গঠনের যে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে তা একবারেই উপেক্ষিত সরকারি শিক্ষা কারিকুলামে। আমার পরিচিত এক বন্ধু সরকারি প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা করান। প্রাক-শৈশব শিক্ষার কারিকুলাম বিষয়ে জানতে চাওয়ায় জানালেন “শিশুদের জন্য নির্ধারিত শ্রেনীকক্ষটিকে কালারফুল করা হয়, এবং তাদের জন্য খেলনা কেনার বাজেট রয়েছে”। তিনি আরোও বলেন, বাংলা এবং ইংরেজি বর্ণমালা শেখানো হয়। তবে উক্ত শিক্ষকের কথা অনুযায়ী, প্রাক-শৈশব শ্রেনীতে শিশুরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খেলাধুলা করে থাকে। প্রাক-শৈশব শিক্ষা এখনও অনেকের কাছে ডে কেয়ার হিসেবে পরিচিত।
শিশুর নিজস্ব আইডেনটিটি তৈরির ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর আত্মনির্ভরশীলতা, অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, মতামতের স্বাধীনতা, বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান তৈরিতে বেশ কিছু জনপ্রিয় দর্শন রয়েছে যা প্রাক-শৈশব শিক্ষায় ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে ড. মারিয়া মন্তেসরির দর্শন অন্যতম যা ১০০ বছর আগে তিনি উদ্ভাবন করেন। মারিয়া মন্তেসরির দর্শনের মূল বিষয় হলো যে প্রতিটি শিশুর মধ্যে অসামান্য সম্ভাবনা রয়েছে। তাদেরকে যদি সঠিক পরিবেশ, শিক্ষাপোকরণ ও শিক্ষণ সহায়তা দেয়া যায় তাহলে সে সঠিকভাবে বেড়ে উঠবে। এই দর্শনে শিক্ষার যে প্রস্তুতিমূলক পরিবেশ থাকে (প্রিপেয়ার্ড এনভায়রনমেন্ট) সেখানে শিশু তার পচ্ছন্দ অনুযায়ী উপকরণ বেছে নেয়। শিক্ষা উপকরণের পাশাপাশি ‘প্রাকটিকাল লাইফ’ সংক্রান্ত উপকরণ থাকে যা শিশুকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে সাহায্য করে। আমাদের দেশে কিছু মন্তেসরি বিদ্যালয় আছে। তবে রিসোর্স এর অভাবে এর পরিসর অনেকটাই সীমিত। আমাদের দেশে শিক্ষায় শিশুর সামাজিক ও মানবিক বিকাশে মনোযোগ দেয়া জরুরি। কারণ শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যত, বাংলাদেশের ভবিষ্যত কর্ণধার। আমরা যে অসহিষ্ণু সমাজে বাস করছি, এর থেকে উত্তরণের উপায় শিশুদের জন্য একটি সুস্থ মানবিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী বিষয়ে কারিকুলাম তৈরি। আর এর শুরু হতে হবে প্রাক-শৈশব শিক্ষা থেকে।
সরকারি পর্যায়ে এ বিষয়ে একটি ফ্রেমওয়ার্ক জরুরি। বিভিন্ন উন্নত দেশের সাথে সরকারি উদ্যোগে এ বিষয়ে ধারণা বিনিময় হতে পারে। বেসরকারি পর্যায়ে হয়ত প্রাক-শৈশব শিক্ষা বিষয়ে উদ্যোগ শুরু হয়েছে কিন্তু সরকারি পর্যায়ে এর সার্বিক উদ্যোগ নেয়া জরুরি। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিশু শিক্ষার সাথে জড়িত শিক্ষকদের জন্য আলাদা কোর্সেও ব্যবস্থা থাকতে হবে। আমাদের শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ একাডেমী রয়েছে কিন্তু একজন শিক্ষকের শিক্ষক হয়ে ওঠার জন্য যে ধরনের পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ দরকার তা এই পেশায় আসার আগে সম্পূর্ণ করা জরুরি। নইলে পাঠদান প্রক্রিয়ার গুণগতমান ক্রমশ নীচে নামতে থাকবে।
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি, একটি পরিবারও শিশুর মানসিক বিকাশে ভ’মিকা রাখতে পারেন। পরিবারে তখাকথিত স্নেহ ও আদরের’ নামে আমি/আপনি আসলে আমাদের সন্তানের আত্মনির্ভরশীলতা নষ্ট করছি কিনা ভেবে দেখা জরুরি। একটি শিশুকে তার নিজের কাজ নিজে করতে উদ্ধুদ্ধ করতে হবে। নিজের কাজ নিজে করলে আপনার বা আমার ছেলে-মেয়েরা ছোট হয়ে যায় না। বরং নিজের অনেক ব্যক্তিগত কাজ আছে যা অন্যেরা কওে দিলেই বরং নিজেদের লজ্জা পাওয়া উচিত। পরিবারে ছেলে আর মেয়ের অবস্থান আলাদা করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। দেশের বাইরে পড়াশোনা করতে এসে ছেলে-মেয়েরা যে কঠিন বান্তবতার সম্মুখিন হয়, এটার জন্য আমাদের বাবা-মা দায়ী এবং দায়ী আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। কিছুদিন আগে, একটা নিউজ পড়লাম. মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী নাকি বলেছেন, উপজেলাগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবেন। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় কথাটা ভেবে বলেছেন নাকি পপুলিস্টিক রাজনৈতিক ভাষণের অংশ হিসেবে বলেছেন এটা আমার জানা নেই। অষ্ট্রেলিয়ার মত উন্নত দেশে ঘরে ঘরে গ্রাজুয়েট নেই। তাদের জনসংখ্যার বেশিরভাগই কর্মমূখী শিক্ষাকে বেছে নেয়। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে সার্টিফিকেট কোর্স কিংবা ডিপ্লোমা শেষ করে তাদের পচ্ছন্দনীয় কাজে যোগ দেয়। অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হওয়ার চেষ্টা করে। ফলে নিজের সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী কাজের ক্ষেত্র তারা নিজেরা নির্ধারণ করে। আমাদেও জন্য বিশ্ববিদ্যালয় নয়, কর্মমুখী শিক্ষা চালু করুন। আমাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করুন। আমরা বিদেশে নয়, দেশেই মেধা কাজে লাগাতে চাই।
Related Articles
প্রবাসীর বিজয় উদযাপন
“স্বাধীনতা তুমি রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান। স্বাধীনতা তুমি কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো মহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা-“
Canberra Ramadan Starts on Friday 24th April 2020 (1441H)
Salamu Alaikum WRT, WBT (Peace be on you). The Canberra Mosque along with the Imams Council of the ACT announces
UN General Assembly and Bangladesh
The sixty-fifth ordinary session opened on Tuesday, 14 September 2010, at 3 p.m. in New York The theme of the



