নিঃশব্দের ভেতর শব্দের ঘ্রাণ
কয়েক দিন ধরে অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত সাহিত্যিক প্যাটরিক হোয়াইটকে নিয়ে পড়াশোনা করছি। তাকে আমরা অস্ট্রেলিয়ার রবীন্দ্রনাথ বলে ডাকি। তিনিই এ দেশের একমাত্র সাহিত্যিক, যিনি ১৯৭৩ সালে সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ পান। সিডনি শহরের অদূরে সেনটেননিয়াল পার্কের ভেতর মার্টিন রোডে তার স্মৃতি বিজড়িত একটি বাড়ি আছে। ১৯৯০ সালে পরলোকগত এ বরেণ্য ব্যক্তি জীবনের শেষ ২৬টি বছর কাটিয়েছেন এ বাড়িতে। তার বিখ্যাত রচনাগুলো এ বাড়িতেই লেখা। ১৯১২ সালে জন্ম নেওয়া এ লেখক তার দীর্ঘ জীবনে ১২টি উপন্যাস, তিনটি ছোট গল্পের বই আর রচনা করেছেন আটটি নাটক।
সেদিন বিকেলে খোলা জানালার পাশে বসে প্যাটরিক হোয়াইটের দ্য ট্রি অব ম্যান উপন্যাসটি পড়ছি আর মাঝে মাঝে সিডনির আকাশ দেখছি। নীরবে সরে যাওয়া বড় বড় মেঘ দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হলো, কাছেই তো, দেখে আসি প্যাটরিক হোয়াইটের বাড়িটি। মনে মনে ভাবছি, এ হয়তো শিলাইদহে আমাদের রবীন্দ্র কুঠিবাড়ির মতো কিছু একটা হবে। সামনে এসে দেখি, না, ওই রকম কিছুই নয়। কেমন নীরব যেন এ বাড়িটি। ভেতরে লোকজন আছে। বর্তমানে বাড়িটি যদিও স্টেট হেরিটেজের তালিকায়—তবে সেখানে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। এ কোনো প্যাটরিক হোয়াইট স্মৃতি সংগ্রহশালা নয়। মনে মনে ভাবছি, আমরা বাঙালি—বিশ্বের বড় বড় জাতির তুলনায় তেমন বড় কিছু আমাদের না থাকলেও, শিল্পমানসের দিক দিয়ে আমরা মোটেও দরিদ্র নই। কবি-সাহিত্যিকদের আমাদের মতো করে এত শ্রদ্ধা-সম্মান কে কোথায় করেছে। আমি নিজেই তো কবি নজরুলের মাজারের পাশে বসে, অকালে দুরারোগ্য ব্যাধিতে নীরব হওয়া আমাদের এই জাতীয় কবির জন্য কেঁদে বুক ভাসিয়েছি। কবি নজরুলের জানাজায় বিপুল জনসমাগম ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে আছে। বুকভরে গর্ব করি, এই তো আমাদের ভালোবাসা। সে নিরিখে এখানে তেমন কিছুই তো নেই।
বাড়িটির সামনে ক্রম-ঢালে নেমে বিস্তীর্ণ সবুজ ঘাস ছাওয়া মাঠটি বড়ই মনোরম লাগল। একা একা হাঁটছি। বড় বড় অচেনা গাছের ভেতর অচেনা পাখির ডাক ও নিবিড় ছায়া। অদূরে দেখি সাদা পোশাক পরা এক নারী। তাকে ঘিরে অসংখ্য পাখির মেলা বসেছে। বুনো হাঁস, ইবিস, সাদা চিল, কালো পাখি, শালিক আর কবুতর সব। প্রকাণ্ড এক গাছের ছায়ায় পাখি আর এ মানুষে কীসের যেন বিনিময়। সিডনি সিটির প্রাণকেন্দ্রে বিস্তীর্ণ হাইড পার্কেও তাকে এভাবে পাখিদের খাবার দিতে দেখেছি। এত পাখি দেখে মনে হলো তার আসার সময়টাও যেন পাখিদের জানা।
হাইড পার্কে কৌতূহল জাগানো এই নারীকে কী এক অজানা সংকোচে শুধু দূর থেকেই দেখেছি। কথা হয়নি। এই নারী আর পাখিদের সোহাগ বিনিময়ের ভেতর থেকে কী এক ঘ্রাণ যেন ধেয়ে আসে—কেমন টের পাই। মনে মনে স্থির করি, তার সঙ্গে আজ অবশ্যই কথা বলব। খাবার বিতরণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কাছে এসে দাঁড়ালে তিনি যথারীতি আমাকে বসতে বললেন। ঘাসের ওপর বসে সৌজন্য বিনিময়ের পর বললাম, আপনার নাম কি?
মেরি।
নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম, আপনাকে বহুদিন ধরে দেখছি পাখিদের খুব ভালোবাসেন। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে…।সেনটেননিয়াল পার্ক
এ পর্যায়ে এক কোমল দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, তুমি কোন দেশের?
আমি বাংলাদেশের।
এখানে কোথায় এসেছিলে?
হাত উঁচিয়ে দেখিয়ে বললাম, ওই যে প্যাটরিক হোয়াইটের বাড়ি দেখতেই এদিকে আসা।
অ আচ্ছা। খুব ভালো। এই লেখকের সবগুলো বই-ই আমি পড়েছি।
জি। আমি এখন তার দ্য ট্রি অব ম্যান উপন্যাসটি পড়ছি।
খুব ভালো। কি পেলে ওই উপন্যাসে…।
প্যাকার ফ্যামিলি। কয়েক যুগ ধরে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের কাহিনি। এ কাহিনির ভেতর দিয়েই তিনি অস্ট্রেলিয়ান ফোকলোর ও কালচারাল মিথগুলোর স্বরূপ উন্মোচন করতে চেয়েছেন। বন-জঙ্গলে প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা এ দেশের মানুষদের স্বকীয় জীবনধারা…। এই সব।
তোমার আগ্রহ অবাক করার মতো। সিলেবাস নামের তৈরি করা খাঁচায় বন্দী তুমি নও।
তেমন কিছু না। চেষ্টা করছি।
অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত কবি বেনজো প্যাটারসনের দ্য ম্যান ফ্রম স্নোয়ি রিভার কবিতাটি পড়েছ?
না, পড়িনি। সরি।
পড়বে। কবিতাটি তোমার পড়া দরকার। ওখানে বন্য ঘোড়ার রূপকের ভেতর দিয়ে অস্ট্রেলিয়ান জীবনসংগ্রামের রূপ-প্রকৃতি বর্ণনা করা হয়েছে।
অবশ্যই। আজ রাতেই পড়ব।
ইন্ডিয়া তো তোমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। তাই না?
হ্যাঁ, ঠিক তাই।
ভালোবাসা কি তা জানো?
হয়তো জানি। তবে আপনার এ কাজে আমি ভালোবাসার ঘ্রাণ পাচ্ছি।
সত্যি তাই। তুমি বুঝবে।
লেখকমেরি এ পর্যায়ে ব্যাগের ভেতর থেকে খাবারের অবশিষ্টাংশটুকুও পাখিদের দিলে কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে ঘিরে ঘাসের ওপর বুক পেতে বসে যায় পাখিগুলো। আমার দিকে আবারও একপলক তাকিয়ে মেরি বললেন, আমি পাপুয়া নিউগিনির মেয়ে। পোর্ট মোরস্বের জ্যাকসন্স এয়ারপোর্টের কাছেই আমাদের বাড়ি। সিডনিতে আছি আজ ত্রিশ বছর। আমার দুই মেয়ে আছে। বড় মেয়ে ওর স্বামী আর ছোট্ট দুটো নাতি-নাতনিসহ এখানে এক সাথেই আছি আমরা। তোমার কি খবর। একা?
না, আমার স্ত্রী আছে, মা-বাবার সঙ্গে থাকে। বাংলাদেশে। ওর ভিসার জন্য অ্যাপ্লাই করেছি।
ও আচ্ছা। এখানে হয়তো অনেক দিন ধরে একা আছ, খুব কষ্টে কাটছে তোমার দিনগুলো। তাই না?
জি, কষ্ট তো বটেই।
তারপরও তোমার আশা আছে।
মনে চিন্তা এল কী বলতে চাচ্ছেন এই নারী! কৌতূহল নিয়ে তার দিকে চেয়ে আছি।
আমার স্বামীর মৃত্যুর পর চার বছরের মেয়েকে নিয়ে এখানে চলে আসি।
আপনার জন্মের দেশ পাপুয়া নিউগিনি। ওখানে কি…? না, মানে বাংলাদেশকে তো আমি অনেক মিস করি। পরবাসকে আপন ভাবা যায়, তবে আপন হয় না যে কখনো…।
হ্যাঁ, তোমার কথায় যুক্তি আছে। তবে এ বিশ্বায়নের যুগে তোমাদের মতো ছেলেদের দৃষ্টি কোনো গণ্ডির ভেতর থাকলে ভালো দেখায় না। এ পৃথিবীটাই তোমার দেশ। সারা বিশ্বে অবাধ বিচরণ তোমার জন্মগত অধিকার।
অবাক চোখে তাকিয়ে বললাম, এমন করে ভাবিনি কোনো দিন। হয়তো সাহস হয়নি তাই। আপনি অনেক বড় এক সত্য বলেছেন।
এবার মেরির কণ্ঠ জড়িয়ে আসতে শুরু করল। তুমি কি মানুষখেকো জাতি সম্পর্কে কিছু জানো?
শুনেছি, তবে তেমন জানি না। অ্যানথ্রোপলজির বিষয় তো…।
অনেক সাহসী এক জার্নালিস্ট ছিল সে। ওখানে রিমোট এলাকাগুলোয় সভ্যতার আলোক বঞ্চিত মানুষদের নিয়ে কাজ করা ছিল ওর শখ। একদিন হঠাৎ করে ক্যানিবালদের কবলে পড়ে। সঙ্গে আরও দুজন ছিল। কারওরই আর কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না।
আহা, খুবই দুঃখজনক।
তারপর জন্মের দেশ হলেও ওই দেশে মনটা আর টিকল না। কিছুই আর ভালো লাগত না। তাই মেয়েকে নিয়ে চলে আসি এখানে।
জগতে আরও কত অদ্ভুত ঘটনাই তো ঘটে। তবে আমি জানতে চাই এ পাখিদের প্রতি তার এত ভালোবাসার কারণ কী? নীরব দুটি চোখ আমার ওই অপেক্ষাই যেন করছে।
মেরি বললেন, ইন্ডিয়া তো তোমার প্রতিবেশী দেশ, তাই তো বলেছিলে?
হ্যাঁ, তাই।
ওই দেশের এক দম্পতি। আমার বাসার পাশেই ওদের বাসা। পরপর তিনটা সন্তানই মেয়ে। তারপর চতুর্থ সন্তানটাও মেয়ে হতে যাচ্ছে জানতে পেরে স্বামী-স্ত্রী দুজনই সিদ্ধান্ত নেন ইন্ডিয়া গিয়ে অ্যাবরশন করাবে।
আচ্ছা। তারপর!
তারপর অনেক অনুরোধ করে ওদের এ কাজ থেকে বিরত রাখি। পরে জন্মের মাস খানেকের মধ্যেই মেয়েটাকে নিয়ে আসি। আপন সন্তান-স্নেহে ওকে লালন করি। নাম রাখি তানিয়া।
হ্যাঁ, আপনি খুব ভালো একটা কাজ করেছেন।
আমার তানিয়া সিডনির একটি স্কুল থেকে এবার দশম গ্রেডের পরীক্ষা দেবে। প্রতিটি ক্লাসে বরাবরই ওর রোল পাঁচের মধ্যে আছে। আমার নিজের মেয়েটিও এত মেধাবী ছিল না।
খুবই ভালো।
এবার মেরির চেহারায় হাসির ঝলক দেখা দেয়। বলেন, কিছুক্ষণ পরই আমার ওই মেয়ে আমাকে নিতে আসবে।
ওর মা-বাবা কি এখানেই আছে? দেখা হয় তানিয়ার সঙ্গে?
না, ওরা অনেক দিন হলো ইন্ডিয়ায় চলে গেছে। মাঝে মধ্যে যোগাযোগ করত, এখন তাও করে না। তানিয়ার বাবা সঞ্জয়ের একটা রেস্টুরেন্ট ছিল প্যারামাটায়। সবকিছু চলছিল ভালোই। একদিন শুনি কী সব সমস্যার কারণে ব্যবসা আর চালানো যাবে না। তারপর বছরখানেকের মধ্যেই একদিন দেখি ওরা চলে যাচ্ছে। তানিয়ার বয়স তখন তিন বছর।
এরই মধ্যে দেখা গেল, ১৩-১৪ বছরের একটা মেয়ে মেরির কাছে এসে বলল, মা, আজ পাখিরা তোমাকে কি বলেছে?
বাসায় গিয়ে বলব। পাশে কে বসে আছে দেখছিস মা?
তানিয়া আমার দিকে তাকালে মেরি বললেন, এ হলো বাংলাদেশের ছেলে। তোর প্রতিবেশী ভাই।
ও আচ্ছা।
এ কথা শুনে সৌজন্য বিনিময় দূরে থাক, তানিয়ার অভিমানী চেহারার দিকে চেয়ে আমি নিজেই কেমন যেন ভড়কে গেলাম। আর বুঝতে বাকি রইল না, সারা ভারতবর্ষের জঘন্য প্রথা নারী দলন আর পুরুষ তোষণের প্রতিই তানিয়ার এ অভিমান। এত মেধাবী, এমন সুন্দর মেয়েটি পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই ঝরে যাচ্ছিল। কী ছিল এ মেয়েটির অপরাধ? আমাদের প্রতি তার শ্রদ্ধা থাকবে কেন!
এদিকে তানিয়ার হাত ধরে মেরি চলে যাচ্ছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো দৃষ্টির আড়াল হবেন। এ সময় হঠাৎ আমার চেতন হলো। দৌড়ে গিয়ে বললাম, মেরি, আপনি তো বিষয়টা ব্যাখ্যা করলেন না।
মেরি ফিরে দাঁড়ালেন। ঠোঁটের কোণে হাসির শুভ্র রেখা।
আমি আমার ভালোবাসার যত্ন নিই। তোমার তো আশা আছে। আমি নিরাশার ভেতরও আশা খুঁজে ফিরি। ওকে দেখি এই মানুষ আর পাখিদের শান্তির ভেতর।
তানিয়া তার মাকে নিয়ে ক্রমে দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে মিলিয়ে যায়। আমি চেয়ে আছি। একা। চারদিকে প্রকাণ্ড গাছ সব। নিবিড় ছায়া। পাখি। আজ মনে হয়, এ দেশ ও দেশ নয়, এ জাতি, ওই জাতি নয়। এ পৃথিবীর বুকে সদর্প অস্তিত্বে বেঁচে থাকা মানুষ আমি এক। ঝিরঝিরে বাতাস। সেনটেননিয়াল পার্ক, কোমল ঘাস, মায়া। আমার চোখ। ভালোবাসা। শান্তি।
Related Articles
Happy Birthday to Joan, the most loved mum
জোন মর্গানের জন্মদিন ৬ই আগষ্ট। এইবার তার ৯৪তম জন্মদিন পালন করা হবে। ইনি শুধু তার সন্তানদের কাছে নন, পরিচিত জনদের
অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী লেখক মোঃ ইয়াকুব আলীর প্রথম বই ‘নদীর জীবন’ এসেছে এইবারের বইমেলায়
অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী লেখক মোঃ ইয়াকুব আলীর প্রথম বই ‘নদীর জীবন’ প্রকাশিত হয়েছে। বইটি মূলত লেখকের শৈশব কৈশোরের স্মৃতিকথা হলেও এতে
An Exclusive Interview with Advocate Tarana Halim, MP of Bangladesh Parliament
Bangla Radio Canberra – 30 Aug 2010 This week’s programme presented a very informative discussion on political and economic future





