প্রবাসে বনভোজনের গল্প
অস্ট্রেলিয়ার ভূপ্রকৃতি এবং আবহাওয়া খুবই বৈচিত্র্যময়। এখানে তুষারে মোড়া পর্বতশ্রেণী থেকে শুরু করে মরুভূমি সবরকমেরই স্থলভূমি রয়েছে। আর আবহাওয়াও খুবই দ্রুত পরিবর্তন হয়। এই রোদ তো এই ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি আবার এই গরমে সিদ্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম তো পরমুহূর্তেই কনকনে শীত। এরই মধ্যে আমাদের আমাদের বসবাস এবং দৈনন্দিন জীবনযাপন। আর অস্ট্রেলিয়ার রুটিন জীবনে সবকিছুই মোটামুটি পূর্ব নির্ধারিত। সপ্তাহের কর্মদিবসের পাঁচ দিন গাঁধার খাটুনি খেতে সপ্তাহান্তের ছুটির দুটো দিন বানরের মতো লাফালাফি। এভাবেই কেটে যায় দিন মাস বছর। এর বাইরে ব্যক্তিগত এবং সামষ্টিক উদ্যোগে অনেক সময় ঘুরতে যাওয়া হয়।

শম্পা আপু একদিন ফোন দিয়ে বললেনঃ ভাই, সামনের রবিবার আপনারা ফ্রি আছেন শুনলাম আপনার গিন্নী তানিয়ার কাছে। আমরা একটা জায়গায় বনভোজন করতে যাচ্ছি আপনারাও আমাদের সাথে চলেন। শম্পা আপু আমার গিন্নীর ক্যাম্পাসের সিনিয়র আপু। দুজনেরই পেশায় ডাক্তারি আমরা অবশ্য মজা করে বলি কবিরাজ। আমার গিন্নীর কাজ এখন হাসপাতালে এবং তার ডিউটি রোস্টারের ভিত্তিতে সময়ে সময়ে পরিবর্তন হয় ফলে তাকে ফ্রি পাওয়া আসলেই মুশকিলের ব্যাপার। শম্পা আপু মিন্টোতে আইকন হেলথ কেয়ার সেন্টার একটা মেডিক্যাল সেন্টার চালান। উনার সব স্টাফকে নিয়ে প্রতি বছর বাৎসরিক বনভোজনে যান। এবারও যাবেন আর আমাদেরকে সেখানেই যুক্ত হতে বলেছেন।
বনভোজনের জায়গা হিসেবে ঠিক করার হয়েছে সিডনির রয়েল ন্যাশনাল পার্কের অডলি ড্যান্স হলের পাশের জায়গাটাকে। অডলি ড্যান্স হলের পাশে বেশ কিছু পিকনিক স্পট আছে। অডলি ড্যান্স হলের লাগোয়া স্পটটার নাম “আয়রন ব্যাক ফ্লাট পিকনিক এরিয়া” আর কাঠের সেতুটা দিয়ে হ্যাকিং রিভার পার হলেই পাহাড় আর নদীর মাঝের সমতল জায়গাটার নাম “কুরাজং ফ্লাট পিকনিক এরিয়া”। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ্যঃ সেটা হলো আপনি এইসব স্পটে বসতে চাইলে একটু সকাল সকাল যেতে হবে তা নাহলে জায়গা পাওয়া বেশ কঠিন। আর ঢুকেই শুরুতে আপনাকে প্রত্যেক গাড়ির জন্য একটা করে টিকেট করে নিতে হবে অথবা আপনি পরেও অনলাইনে এন্ট্রি ফিস জমা দিতে পারেন। হ্যাকিং রিভার এখানে দুই ভাগে ভাগ হয়েছে। অন্য ভাগটার নাম ক্যাঙ্গারু ক্রিক। হ্যাকিং রিভারের ণয়পাশেই রয়েছে “অডলি বোটশেড” সেখানে থেকে আপনি বিভিন্ন রকমের অযান্ত্রিক জলযান ভাড়া নিয়ে নদীর পানিতে ঘুরে বেড়াতে পারেন।

পৌঁছেই শম্পা আপু আমাদের গাড়িগুলোর জন্য টিকেট কিনে আনলেন। এরপর আমরা গাড়ি থেকে জিনিসপত্র নামাতে শুরু করলাম। সৌভাগ্যক্রমে আমরা কুরাজং পিকনিক স্পটের এক গাছের নিচে জায়গা পেয়ে গেলাম। অবশ্য সেদিন দর্শনার্থীদের তেমন চাপ না থাকায় কুরাজং স্পটে শুধু আমরাই ছিলাম। মালামাল নামানো শেষ হলে সবাই যে যার মতো ব্যস্ত হয়ে গেলো। বাচ্চারা তাদের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি শুরু করলো। মধ্যবয়সীরা ব্যস্ত হয়ে গেলো নাস্তার জোগাড় করতে আর সিনিয়ররা গাছের তলায় চেয়ার পেতে বসে খোশগল্পে মেতে উঠলেন। গাছটা একদম হ্যাকিং নদীর পারে। গাছের ছায়ায় একটা চেয়ারে এক কাপ চা বা কফি নিয়ে নদীর দিকে মুখ করে বসে আপনি সারাদিন পার করে দিতে পারেন। আর আমাদের দুলাভাই মানে শম্পা আপুর বর লেগে পড়লেন উনার মঞ্চ সাজাবার কাজে। উনার নিজের একটা ছবি তোলার প্রতিষ্ঠান আছে নাম “নাসের ফটোগ্রাফি”। দুর্দান্ত সব ছবি তোলা ছাড়াও উনি দারুণ সব ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন করেন। উনিই আগের কদিন টানা পরিশ্রম করে মাটিতে বসে খাওয়ার জন্য কিছু পাটাতন তৈরি করেছিলেন। সেগুলো মাটি থেকে সামান্য উঁচু। তার সাথে মাদুর বিছিয়ে দিলে মাদুরে বসে আর পাটাতনের উপর প্লেন রেখে বসে আরাম করে খাওয়া দাওয়া করা যায়।

নাস্তা তৈরি হওয়ার ফাঁকে আমি একটু এই জায়গাটার বিবরণ দিয়ে রাখি। মূল রাস্তার ডান পাশে অডলি ড্যান্স হল। সেটাকে ডানে রেখে এগিয়ে গেলে মূল রাস্তাটা হ্যাকিং রিভারের পাড় দিয়ে চলে গেছে। কারপার্কের পরেই হ্যাকিং রিভারের উপর রয়েছে একটা কাঠের সেতু অন্যপাশে যাওয়ার জন্য। সেতুটা কাঠের হলেও তার উপর দিয়ে অনায়াসে গাড়ি চালিয়ে যেতে পারবেন। ছায়াঢাকা, পাখি ডাকা সুশীতল একটা জায়গা। সামান্য একটু সমতল জায়গার পরেই শুরু হয়েছে পাহাড়। পাহাড়ের গাছে অবিরাম ডেকে চলেছে ঝিঁঝিঁ পোকার দল। আর হ্যাকিং রিভারের পানিতে খেলে বেড়াচ্ছে, বুনোহাঁসের দল, ডাহুক আর পানকৌড়ি। সেখান থেকে অডলি ড্যান্স পার্কার উঁচু উঁচু পামগাছগুলোকে দেখে মনেহয় তারা যেন দর্শনার্থীদের স্বাগত জানানোর জন্যই দাঁড়িয়ে আছে। আপনার কপাল ভালো হলে গুইসাপের দেখাও পেতে পারেন। আমরা গাছতলার বসার কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা গুইসাপ নদীর দিক থেকে পাহাড়ের মধ্যে যেয়ে লুকিয়ে গেলো ধীরপায়ে। আবারো কিছুক্ষণ পরে এসে আমাদেরকে দেখে গেলো। সেটার ভাবভঙ্গি দেখে মনেহচ্ছিলো যে আমরা তার দুপুরের ঘুমটা ভাঙিয়ে দিয়েছি তাই সে বিরক্ত। বারবার খেয়াল করে দেখছে আমরা গিয়েছি কি না।

নাস্তার আইটেমগুলোতে ছিলো ষোলআনা বাঙালিয়ানার ছোঁয়া। চালের আটার হাতে বানানো রুটি আর তার সাথে তরকারি হিসেবে ছিলো আলুভাজি, সবজি আর ডিম। সবাই ভরপেট নাস্তা করে নিলো দুলাভাইয়ের বানানো পাটাতনে আর মাদুরে বসে। তারপর আবারো শুরু হলো ব্যস্ততা। আইভি আপু, শ্যালিকা মিশু আর মাহিন এবং তাঁদের সাথে আরো যোগ দিয়েছিলো ফিজিওথেরাপিস্ট এবং উনার মেয়ে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো বুশ ওয়াকে যাবে। আমি উনাদেরকে যেতে দেখে রায়ানকে কাঁধে নিয়ে উনাদের পিছু নিলাম কারণ আমি জানি রায়ান এগুলো খুবই পছন্দ করে। পাহাড়ে সামান্য কিছুদূর উঠার পর বোর্ডের মধ্যে বাস ওয়াকের ম্যাপ দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম সবচেয়ে ছোটটা ধরে আমরা যাবো তাই ইংগাডিন ট্র্যাকে না যেয়ে আমরা উল্লা ফলস ট্র্যাক ধরে যাওয়া শুরু করলাম।

তাপমাত্রা ছিল সাইত্রিশ থেকে চল্লিশ ডিগ্রির মধ্যে উপরন্তু কারোরই বুশ ওয়াক করার প্রস্তুতি ছিলো না তাই শুরুতে একটু দ্বিধা কাজ করলেও মিশু আর মাহিনের উৎসাহে আমরা বুশ ওয়াক শুরু করলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর আইভি আপু ক্লান্ত হয়ে পড়লেন কারণ উনার পায়ে হাইহিল জুতো তাই উনার হাটতে বেশ কষ্ট হচ্ছিলো। আমরা উনাকে উৎসাহ দিয়ে গেলাম যে আর সামান্য একটু পথ বাকি আছে কিন্তু ওয়াকটা শেষ করার পর সময় দেখে মাহিন বললো সেটা ছিলো প্রায় দেড় ঘন্টার ওয়াক। গরমে ঘামে সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলো তাই সুযোগ পেলেই আমরা গাছের গুড়িতে বসে বিশ্রাম নিয়ে নিচ্ছিলাম। ওয়াকের মাঝামাঝি দুটো দুর্দান্ত লুকআউট পেয়ে গেলাম আমরা। সেখান থেকে নিচের নদী রাস্তা, গাড়িঘোড়া থেকে শুরু করে দূরের সবুজের বনরাজি দিগন্তে আকাশের নীলিমার সাথে মিতালি পর্যন্ত দেখা যায়।

বুশ ওয়াক থেকে ফেরার পর সবাই শ্যালিকা টিনার রান্না করে আনা বিরিয়ানি দিয়ে দুপুরের ভোজন পর্ব শেষ করে নিলেন। এরপর শুরু হলো বাচ্চাদের জন্য বিভিন্ন ক্রীড়া উৎসব। বাচ্চাদের বয়স অনুযায়ী বিভিন্ন গ্রূপে ভাগ করে খেলা শুরু হলো। শুরুতেই দুটো দলে ভাগ হয়ে পানি আনার খেলা শুরু হলো। দু গ্রূপের কাছে দুটো বালতি রাখা হলো আর একটু দূরে রাখা হলো অন্য একটা বালতি। সেখান থেকে একবারে একজন করে যেয়ে পানি নিয়ে এসে নিজেদের বালতিতে রাখতে হবে। একজন যত দ্রুত আসবে পরেরজন তত তাড়াতাড়ি যেতে পারবে। এরপর শুরু হলো দুই হাঁটুর ভাঁজে নারিকেল নিয়ে দৌড়। একটা জায়গা থেকে দৌড়ে অন্য একটা জায়গায় যেতে হবে। যে আগে যেতে পারবে সেই প্রথম হবে। সবশেষে শুরু হলো বড়দের যুগল দৌড় প্রতিযোগিতা। প্রথমে প্রত্যেক যুগলের দুটো পা একসাথে বেঁধে দেয়া হলো। তারপর শুরু হলো দৌড়। সেটা একটা দেখার মতো জিনিস হয়েছিলো। এই দৌড় থেকেই বুঝা যায় দুজন ভিন্ন ভিন্ন মানুষ কিভাবে একটা সংসারে একত্রে থাকেন। কখনো একজন পিছিয়ে পড়লে অন্যজন অপেক্ষা করছেন আবার ঠিক উল্টোটাও ঘটছে কারণ দুজনের পা একসাথে বাধা। সামনে এগুনোর একটাই উপায় দুজনকে কম্প্রমাইজ করে একসাথে যেতে হবে।

এভাবেই একটা দিন অনেক আনন্দে শেষ হয়ে গেলো। সবকিছু গোছানোর পর শুরু হলো চা-পর্ব। মেয়েরা সবাই চা বানাতে হাত লাগলেন। ঠিক তখনই সারাদিনের ভ্যাপসা গরমের পর ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো। ঝমঝমিয়ে বলছি কারণ আমরা যে শেডের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলাম সেটা ছিল টিনের। সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক শব্দ হচ্ছিলো। অনেকে উৎসাহী হয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে নেমে গেলো। আবার কেউকেউ চা নিয়ে গাছের পাতার নিচে আশ্রয় নিলো। আর বেশিরভাগই বসে বসে বর্ষণটা উপভোগ করছিলো। সবার অনুরোধে অবশেষে শ্যালিকা পলি একটা বর্ষার গান শুরু করলেন আর তখন সবাই কোরাসে উনার সাথে গলা মেলালেন। অবশেষে ভাঙলো আমাদের আনন্দমেলা। একে একে সবাই বিদায় নিচ্ছিলো।

এই জায়গাটাতে মোবাইলের নেটওয়ার্ক নাই তাই বাচ্চারা কেউই আর মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত না থেকে সবাই কোন না কোন কাজে ব্যস্ত ছিলো আর বড়রাও ফেসবুকিং না করে বাচ্চাদের সাথে তাল মিলাচ্ছিলো। সিনিয়রদের আড্ডা দেখে মনেহচ্ছিলো উনারা যেন সেই আগেকার দিনে ফিরে গেছেন। উনাদের আড্ডা দেয়া দেখে আমি বললামঃ আপনাদের দেখে মনেহচ্ছে ওল্ড স্কুলের বন্ধু আর বান্ধবী বলেই আমি উনাদেরকে ওল্ড স্কুল ব্যান্ডের “আজ রাতে কোন রূপকথা নেই” গানটা শুনিয়ে দিলাম। উনারা খুবই পছন্দ করলেন। মোবাইলের নেটওয়ার্ক না থাকাতে ইউটিউব ও চালানোর ব্যবস্থা ছিলো না। ভাগ্যিস আমার মোবাইলের মেমোরিতে কিছু গান রাখা ছিলো। সেখান থেকেই একের পর এক সঞ্জীব চৌধুরী, বাপ্পা মজুমদার, অর্ণব থেকে শুরু করে লাকি আখন্দ, কিশোর কুমার, আব্দুল আলীম গেয়ে চললেন। আমরা ঠিক যখন ফিরে আসছি তখন কিশোর কুমারের ভরাট কণ্ঠে বেজে উঠলোঃ
“আজ এই দিনটাকে মনের খাতায় লিখে রাখো
আমায় পড়বে মনে কাছে দূরে যেখানেই থাকো।।”
Md Yaqub Ali
আমি মোঃ ইয়াকুব আলী। দাদি নামটা রেখেছিলেন। দাদির প্রজ্ঞা দেখে আমি মুগ্ধ। উনি ঠিকই বুঝেছিলেন যে, এই ছেলে বড় হয়ে বেকুবি করবে তাই এমন নাম রেখেছিলেন হয়তোবা। যাইহোক, আমি একজন ডিগ্রিধারী রাজমিস্ত্রি। উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতে অস্ট্রেলিয়াতে আমার আগমন ২০১৫ সালের মার্চে। আগে থেকেই ফেসবুকে আঁকিবুকি করতাম। ব্যক্তিজীবনে আমি দুইটা জীবের জনক। একটা হচ্ছে পাখি প্রকৃতির, নাম তার টুনটুনি, বয়স আট বছর। আর একজন হচ্ছে বিচ্ছু শ্রেণীর, নাম হচ্ছে কুদ্দুস, বয়স দুই বছর। গিন্নী ডিগ্রিধারী কবিরাজ। এই নিয়ে আমাদের সংসার। আমি বলি টম এন্ড জেরির সংসার যেখানে একজন মাত্র টম (আমার গিন্নী) আর তিনজন আছে জেরি।
Related Articles
প্রিয় অস্ট্রেলিয়ার নতুন টিমকে শুভেচ্ছা সহ ভালবাসা –
১.মানুষকে যদি জিঞ্চাসা করা হয়, জীবনের সবচেয়ে সহজ কাজ কি? উত্তর আসবে মৃত্যু। অন্যদিকে যদি জিঞ্চাসা করা হয় সবচেয়ে কঠিন
ক্যানবেরার খেরোখাতা ৩
১. সেদিন এক দেশী ভাইয়ের সাথে আলাপচারিতা। কথায় কথায় উনি খালি বলেন, সুমন শুনছো " অজি ডলার না আম্রিকান ডলারের



অস্ট্রেলিয়াতে পিকনিক বাহ বেশ ভালো