সুখি বাংলাদেশের গল্প
আমাদের আমলে চতুর্থ অথবা পঞ্চম শ্রেণীর বাংলা পাঠ্য বইয়ে একটা গল্প ছিলঃ “সুখি মানুষ”। তার সারমর্মটা এইরকম ছিল, এক রাজার এক অরোগ্য ব্যাধি হয়েছে, যার নাম হাড় মুড়মুড়ে ব্যারাম। সারা রাজ্যের ডাক্তার বদ্যি দেখানো হচ্ছে কিন্তু কিছুতেই রাজার রোগের উন্নতির কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অবশেষে এক বদ্যি এসে রাজা মশায়কে বললেন, আমার কাছে আপনার রোগের ঔষুধ আছে। রাজা মহাশয় তখন ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন কি সেই ঔষুধ? তখন বদ্যি বললেন, যদি আপনি একজন সুখি মানুষের জামা পরতে পারেন তাহলে আপনার এই রোগ সেরে যাবে।
তখন রাজার প্রহরিরা সারা রাজ্যে তন্ন তন্ন করে সুখি মানুষ খুজতে থাকলো। কিন্তু কোনভাবেই তারা খুজে পাচ্ছিলেন না। অবশেষে রাস্তার ধারে এক লোককে পাওয়া গেলো সে আপন মনেই হাসছে খেলছে। তার লজ্জা নিবারনের জন্য পরনে সামান্য একটু নেংটি ছাড়া আর কিছুই নেই। এরপরের কথাগুলো আমার এখন আর মনে নেই। তবে গল্পটা দ্বারা এটাই বুঝানো হয়েছিল যে সুখি হওয়ার জন্য আসলে কোন কিছুর প্রয়োজন নেই, মনের সুখই প্রকৃত সুখ।
বাংলাদেশ “সুখি দেশে”র তালিকায় কত নম্বরে আছে এটা আমার জানা নেই, তবে একেবারে প্রথম দিকে আছে এটুকু জানি। আজো গ্রাম থেকে এই তিলোত্তমা ঢাকা শহর পর্যন্ত, টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত আসলে সারা বাংলাদেশ জুড়েই সুখি মানুষের বসবাস। এবং এই সাধারণ মানুষগুলোই আসলে প্রকৃত সুখি মানুষ, অভাব যাদের জীবনের নিত্য সংগি। ঠিকমত তিনবেলা অন্ন সংস্থান করতেই তাদের দিন চলে যায়। তারপর দিনশেষে রাজ্যের ক্লান্তি নিয়ে তাঁরা প্রশান্তির গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। যখন ঢাকা শহরের আধুনিক ও ধনী মানুষগুলার চোখে কোনভাবেই ঘুম আসে না। ব্যবসার চিন্তায়, চাকুরিতে পদোন্নতির চিন্তায়, অর্থ-বিত্তে অন্যকে টেক্কা দেয়ার চিন্তায়, অন্যের চেয়ে ভালো মডেলের গাড়ি কেনার চিন্তায়, অন্যের বাচ্চার চেয়ে নিজের বাচ্চাকে আরো ভালো স্কুলে ভর্তি করানোর চিন্তায় তাদের চোখে আর ঘুম আসতে চাই না। তাদের মনের অসুখ-অশান্তি তদেরকে দু-দন্ড শান্তিতে ঘুমাতেও দেয় না।
আহারে এদের নির্ঘুম চোখের নিচে জমা কালি পরিষ্কার করার জন্য আবার কত ধরণের প্রসাধনী আবিষ্কার হয়েছে। এদের অবস্থা দেখলে এদের জন্য আমি এক অদ্ভুত রকমের করুণা বোধ করি। কিন্তু ঢাকা শহরের (আবহাওয়া) উদ্বাস্তু (বেশীরভাগই রাতারাতি নদী ভাঙনের শিকার হয়ে সহায় সম্বল সব হারিয়ে ঢাকায় এসে আশ্রয় নেয়া) মানুষগুলা যাদের অন্নের কোন হদিস নেই যেমন- অটোওয়ালা, পেপার বিক্রেতা, খেটে খাওয়া দিন মজুর, ফুটপাতের চা বিক্রেতা, ফেরি করে সফট ড্রিংকস বিক্রেতা, ঝালমুড়িওয়ালা, বাদাম-কলা বিক্রেতা, ট্রাফিক সিগনালের ভিক্ষুক এদের জীবনে সুখের কোন সীমা নেই। আমি আজ আপনাদেরকে ঢাকা শহরের আমার পরিচিত এই সুখি মানুষদের দু-একজনের গল্প বলবো। এদের জীবনে একবেলার অন্নের ব্যবস্থা আছেতো অন্য বেলার অন্নের কোন হদিস নাই।
আমার বাসা থেকে বের হয়ে প্রায় ১/১.৫ কিলোমিটার হাটার পর ব্যাটারিচালিত অটোতে উঠতে হয়। রিক্সাতে যায় না কারণ একই রাস্তা রিক্সায় যেতে লাগে ৪০/৫০ টাকা আর অটোতে লাগে মাত্র ১০ টাকা। যে যায়গাটা থেকে অটোতে উঠি সেই জায়গাটার নামঃ পুলিশফাড়ি। সেখানকার অটগুলার মধ্যে একটা স্পেশাল অটো আছে যেটাকে অন্য চালকেরা মিলে নাম দিয়েছে হেলিকপ্টার। এই অটোটা ৬জন যাত্রী ও একজন ড্রাইভার নিয়ে যে কিভাবে চলে সেটা এখনও আমার কাছে এক অবাক বিস্ময়। এই অটোটা মোটেও ব্যালান্সড না, কুঁজো মানুষের মত সামনের দিকে এর বডিটা সবসময়ই কিছুটা ঝুকে থাকে। আর এর ব্রেকও ঠিকমত কাজ করে না। আর এর হ্যান্ডেলও ঠিকমত ঘুরে না। উত্তরখান থেকে রেললাইনে ঊঠার রাস্তাটা বেশ উচু, প্রায়ই আমাদেরকে অটো থেকে নেমে ধাক্কা দিয়ে অটোটাকে রেল লাইন পার করিয়ে দিতে হয়।
তারপর রেললাইন পার হয়ে উত্তরার সেকটরের মধ্যে যেহেতু ভদ্রলোকেরা বাস করে তাই এই সব গরীব মানুষি যানবাহন ঢোকা নিষেধ হওয়ায় অটোগুলাকে ৯০ ডিগ্রী ঘুড়ে অন্য একটা রাস্তা দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু এই অটোটার হ্যান্ডেল যেহেতু ঠিকমত ঘুরে না তাই বেশিরভাগ সময়ই উনাকে সেকটরের গার্ডদের বকা শুনতে হয়। এতকিছুর পরও এই মানুষটার মুখে আমি কখনই একদিনের জন্য খারাপ একটা কথা শুনি নাই। ইদানিং আমাদের বিজ্ঞ (বিশেষভাবে অজ্ঞ) হাইকোর্ট অটো বিষয়ে এক রায় দিয়ে তাদেরকে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ঢুকার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে পুলিশ ভাইদের আরো একটা ইনকাম সোর্স সৃষ্টি করে দেয়ার পর থেকে এখন আর অটোগুলা রেললাইন পার হয়ে আসতে পারে না। তাই যাত্রীরা এখন অটোর থেকে রিক্সাতেই বেশি ভ্রমন করে। তাই অবধারিতভাবেই উনাদের আয় সংকুচিত হয়ে গেছে। গতকাল উনার সাথে অনেকদিন পর দেখা, আমি বললাম আরে হেলিকপ্টার ভাই কেমন আছেন? উনি স্মিত হেসে বললেন ভালো।

আমার বাসা দিল্লি (উত্তরখান) থেকে দুই ভাবে ঢাকা (মহাখালী) আসা যায়-একটা হলো আজমপুর দিয়ে অন্যটা হলো হাউজ বিল্ডিং দিয়ে। এই দুই জায়গাতেই ওভার ব্রিজের সিড়ির নিচে দুই ভদ্রলোক পেপার নিয়ে বসেন সাথে আরো কিছু বই পুস্তক আছে। হাউজ বিল্ডিং এ বসেন খোকন ভাই আর আজমপুরে বসেন সোবাহান ভাই। এই দুজনই আমার লোকাল ব্যাংক, বিশেষ করে সোবাহান ভাই। বাসা থেকে বের হয়েছি বড় নোট নিয়ে পকেটে আর ভাংতি নেই। কোন চিন্তা নেই। সোবাহান ভাই, ভাংতি দেন? ভাই ভাংতিতো নাই, আপনি এই ১০০/৫০ টাকা নিয়ে যান পরে দিয়েন।
এমন অনেক দিন হয়েছে আমার পকেটে কোন টাকা নাই যাওয়ার জন্য কারণ আমি একেবারেই সীমিত টাকা নিয়ে যাতায়াত করি, হয়তো কোথাও একটু বিলাসিতা করে ফেলেছি ব্যস টাকা শেষ। কোন চিন্তা নেই। আবারো সোবাহান ভাই আছে না? কতবার পুলিশ উনার দোকান উঠিয়ে দিলো, আর নিয়মিত মাসোহারা তো আছেই। এরপরও এই মানুষটাকে আমি কখনই হাঁসি মুখ ছাড়া দেখেছি বলে মনে পড়ে না। কখনও উনি অসুস্থ থাকলে উনার এক বন্ধু ও মাঝে মাঝে উনার ছেলে বসেন দোকানে। এভাবেই উনার ছেলের ও বন্ধুর সাথেও পরিচয় হয়েছে। এরা সবাই সুখি মানুষ।

অফিসিয়াল কাজে শেরপুরে যেতে হবে, অফিসের রিপোর্টিং বস তাপস চৌধুরী বললেনঃ সকাল ৮টার মধ্যে হাউজ বিল্ডিং থাকো তোমাকে উঠিয়ে নিচ্ছি। আমি পৌনে ৮টা থেকে হাউজ বিল্ডিং সিগনালের কাছে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যাথা করছিলো তাই একটা “আমাদের সময়” কিনে নিয়ে ফুটপাতে বসে পড়া শুরু করলাম। একটু পরে একজন ভিক্ষুক এসে আমার পাশে বসলেন জিরোবার জন্য অথবা শুরু করবার পূর্ব প্রস্তুতি হিসাবে। আমি উনার সাথে গল্প শুরু করলাম। উনার বাড়িও শেরপুরের কোন এক থানায়, নামটা ভুলে গেছি এখন। অভাবের সংসারে উনি ভিক্ষা করেন আর উনার বউ লোকের বাসায় কাজ করেন। তিন ছেলেমেয়ের প্রত্যেকেই বিভিন্ন ক্লাসে স্কুলে পড়ে। উনাদের দুজনের যা আয় হয় তাতে জোড়াতালি দিয়ে মোটামুটি চলে যায়, তবে মেয়েদের (দুজনই বড়) লেখাপড়া করাতে যেয়ে একটু বেশি কষ্ট হয়ে যাচ্ছে, তারপরও ছেলে মেয়েদেরকে কাজে দিবেন না।
যে কষ্ট উনারা দুজনই করেন, যাতে উনাদের ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে উনাদের মত কষ্টে না থাকে। গল্প করছি ইতোমধ্যেই আরেক চাচি এসে হাত বাড়ালো ভিক্ষার জন্য। আমি তখন পাশের জনের দিকে ইঙ্গিত করে বললাম চাচি এখন আমি আর উনিতো একই লেভেলের মানুষ। চাচিতো হেসে খুন। উনার সেই নির্মল হাঁসি এখনও আমার চোখে ভাসে। যেহেতু গল্প করতে করতে আমার সাথে উনার একটু পরিচয় হয়ে গিয়েছিল তাই আমার সামনে উনি ভিক্ষা শুরু করতে পারছিলেন দেখে একটু পরে আমি নিজেই ওখান থেকে সরে যায়। এমন আত্মসম্মানবোধ কি আমাদের আছে।

আমরা কি কারো কাছে অন্যায়ভাবে টাকা চাওয়ার আগে একটু হলেও অস্বস্তি বোধ করি, আমার মনেহয় না? কোটি লোকের ঢাকা শহরে এমন অস্থায়ি পেশায় নিয়োযিত মানুষের সংখ্যার আমার কাছে কোন পরিসংখান নেই। তবে এটুকু বুঝি ঢাকা শহরের ধনী মানুশের বিলাসি জীবন যাপন কখনই উনাদের ছাড়া সম্ভবপর নই। তারপরও আমরা উনাদেরকে কতভাবেই না ছোট করি। আমাদের নিজেদের কল্যাণের জন্যই এই মানুষগুলোর সামান্য হলেও স্বাভাবিক জীবন যাপনের ব্যবস্থা করতে যদিও না পারি তাহলে অন্তত যেন অবজ্ঞা না করি। আমরা যেন উনাদেরকে একজন মানুষের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয়?
Md Yaqub Ali
আমি মোঃ ইয়াকুব আলী। দাদি নামটা রেখেছিলেন। দাদির প্রজ্ঞা দেখে আমি মুগ্ধ। উনি ঠিকই বুঝেছিলেন যে, এই ছেলে বড় হয়ে বেকুবি করবে তাই এমন নাম রেখেছিলেন হয়তোবা। যাইহোক, আমি একজন ডিগ্রিধারী রাজমিস্ত্রি। উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতে অস্ট্রেলিয়াতে আমার আগমন ২০১৫ সালের মার্চে। আগে থেকেই ফেসবুকে আঁকিবুকি করতাম। ব্যক্তিজীবনে আমি দুইটা জীবের জনক। একটা হচ্ছে পাখি প্রকৃতির, নাম তার টুনটুনি, বয়স আট বছর। আর একজন হচ্ছে বিচ্ছু শ্রেণীর, নাম হচ্ছে কুদ্দুস, বয়স দুই বছর। গিন্নী ডিগ্রিধারী কবিরাজ। এই নিয়ে আমাদের সংসার। আমি বলি টম এন্ড জেরির সংসার যেখানে একজন মাত্র টম (আমার গিন্নী) আর তিনজন আছে জেরি।
Related Articles
Brutal Massacre in BDR Headquarters
The whole nation is mourning and three days of mourning were declared where our national flags has been flying half-mast
Please don’t take the government ‘hostage’
Every sensible person in the country was visibly horrified by the last week’s senseless and brutal massacre at the headquarters


