Seminar in Canberra 2008

Inagaral Session in Sydney 2008

Recent Posts

Archive for ◊ October, 2008 ◊

• Wednesday, October 29th, 2008

বিশেষভাবে আমন্ত্রিত হয়ে সম্প্রতি সিডনি থেকে অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরায় গিয়েছিলাম বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্ক (বেন) নামক একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংগঠনের দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত দিনব্যাপী সেমিনারে যোগ দিতে। সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের অডিটোরিয়ামে। এখানে অস্ট্রেলিয়ার নানা প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিষয়ক অধ্যাপক ও খ্যাতিসম্পন্ন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। সারাদিন ওই অডিটোরিয়ামে বসে বসে বাংলাদেশের পরিবেশ দূষণ, তার নানাবিধ কারণ ও প্রতিক্রিয়াগুলো এবং দূষণ রোধের উপায় প্রভৃতি সম্পর্কে বহু মূল্যবান বক্তব্য (লিখিত এবং অলিখিত) শুনে আমাদের দেশের পরিবেশ পরিস্খিতি সম্পর্কে নিজে এতদিন ধরে যা জানতাম তার চেয়ে অনেক বেশি তত্ত্ব ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা শুনে যথেষ্ট উপকৃত হয়েছি। কিন্তু মনে গভীর দু:খ পেয়েছি পরক্ষণেই এ কথা ভেবে যে, আগামী বছরের প্রথম দিকে দেশে ফিরে গিয়ে বাংলাদেশের ক্রমাবনতিশীল পরিবেশ উন্নয়নে আমি কিছু করতে পারব কি? বড় জোর হয়তো ২/৪টা সেমিনারে কিছু বক্তব্য তুলে ধরতে পারি, কিছু প্রস্তাবও হয়তো তুলে ধরতে পারি ওই সেমিনার কক্ষে বসে বা দাঁড়িয়ে। আর হয়তো কখনও কখনও দেশের পত্রিকাগুলোতে আমার ওই বক্তব্যগুলো তুলে ধরতে পারি। কিন্তু অতীত ও বর্তমান অভিজ্ঞতা থেকে নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, নির্বাচিত-অনির্বাচিত কোন সরকারই তা কার্যকর করতে এগিয়ে আসতে বিন্দুমাত্র উদ্যোগী নয়।

তাই দেশের অরাজনৈতিক এবং দেশপ্রেমিক এনজিওদের সেগুলো এবং প্রয়োজনীয় রসদসহ তুলে দিতে পারলে অনেকটা কাজ হতে পারে বলে আমার অনেকটা নিশ্চিত ধারণা। বাঙালি জাতি এতে বহুলাংশে লাভবান হবেন। যা হোক দিনব্যাপী ওই সেমিনারের উদ্বোধনী অধিবেশন সকাল ১০টায় শুরু হয় সাবেক কূটনীতিক বদিউজ্জামানের সভাপতিত্বে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের মিলনায়তনে। এ পর্বে বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য কেরী ট্যাকার, দ্য অস্ট্রেলিয়া ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. রিচার্ড ডোনল, অস এইডের পরিচালন বিভাগের পরিচালক ব্রায়ান ডওসন এবং অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার মাহবুব হাসান সালেহ। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বেন অস্ট্রেলিয়ার আহ্বায়ক কামরুল আহসান খান। এছাড়া ক্যানবেরায় বেড়ে ওঠা বাঙালি শিশুদের পক্ষ থেকে সুবা কামাল এ পৃথিবীকে শিশুদের বাসযোগ্য করে তোলার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানান। বেনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ দশ বছরের কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন বেনের অন্যতম উদ্যোক্তা সংগঠক ড. নিলুফার জাহান। উদ্বোধনী পর্বে বক্তারা বিশ্বব্যাপী পরিবেশ রক্ষার তাগিদ দিয়ে বলেন, নিরাপদ পরিবেশে বসবাসের নিশ্চয়তা আমাদের মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত। পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে, এ ক্ষেত্রে অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের মানুষের জীবনের যেন অবমূল্যায়ন আদৌ না করা হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে, জীবন সর্বত্র সমভাবে মূল্যবান। অনুষ্ঠান উপলক্ষে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির এমপি ও বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সংসদীয় গ্রুপের চেয়ারম্যান ক্রস হিইস, বিরোধীদলীয় এমপি ও পরিবেশ বিষয়ক ছায়ামন্ত্রী গ্রুপ হাস্ট এবং পরিবেশবাদী দল গ্রীন পার্টির সিনেটর ক্রিস্টিন মিলনে শুভেচ্ছা বাণী পাঠিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন জ্যোতি রহমান।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর অস এইডের পরিবেশ বিভাগের পরিচালক ব্রায়ান ডওসনের সভাপতিত্বে সেমিনারের প্রথম অধিবেশনে ‘ভবিষ্যৎ জ্বালানি সমস্যা ও বাংলাদেশের ওপর তার প্রভাব’ শীর্ষক নিব উপস্খাপন করেন ডা. নারায়ণ চন্দ্র দাস, ‘বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে খনিজ প্রকল্পের উপকার ও ঝুঁকি’ শীর্ষক নিব উপস্খাপন করেন ড. কুন্তলা লাহিড়ী দত্ত, ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও জল ব্যবস্খাপনা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক নিব উপস্খাপন করেন বাংলাদেশের ক্যানবেরা দূতাবাসের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম এবং ‘পরিবহন ব্যবস্খা ও পরিবেশ : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক নিব উপস্খাপন করেন ক্যানবেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্যামেরুন গর্ডন।

সেমিনারের দ্বিতীয় পর্বে ‘পরিবেশ ও স্বাস্খ্য’ বিষয়ক নিব উপস্খাপন করেন নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মিল্টন, ‘বাংলাদেশে হাসপাতাল বর্জ্য ব্যবস্খাপনা এবং জনস্বাস্খ্য ও পরিবেশের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব’ শীর্ষক নিবটি উপস্খাপন করেন পিএইচডি গবেষণারত ডা. শম্পা বড়ুয়া এবং ডা. ডোমিনিক রবীন গুদা, ‘বাংলাদেশে বন উজাড় এবং দারিদ্র্য : কে দায়ী?’ শীর্ষক নিবটি উপস্খাপন করেন ড. অজয় কর, ‘বাংলাদেশে পরিবেশ বিষয়ক আইনের মূল্যায়ন ও সংস্কারের জন্য করণীয়’ শীর্ষক নিব উপস্খাপন করেন বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ইমতিয়াজ কায়েস রিপা। সেমিনারের এ পর্বে সভাপতিত্ব করেন কুইনস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন।

স্যার দিকে অনুষ্ঠিত হয় সেমিনারের সমাপ্তি অধিবেশন। এতে সভাপতিত্ব করেন মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শরীফ আস সাবেরের পরিচালনায় উন্মুক্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রাণবন্ত এ আলোচনা সভায় সেমিনার ও বাংলাদেশের ক্রমাবনতিশীল পরিবেশ পরিস্খিতির নানাদিক নিয়ে আলোচনা করেন বিশিষ্ট ভূতত্ত্ববিদ নজরুল ইসলাম, বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ড. কামাল উদ্দিন, বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ড. স্বপন পাল, ক্যানবেরায় বাংলাদেশ এসোসিয়েশনের সভাপতি এনামুল হক মুকুল, কৃষিবিদ জিয়াউল হক বাবুল, পিএইচডি গবেষক আহমেদ ইমরান, পিএইচডি গবেষক বায়েজিদুর রহমান এবং এই নিবরে লেখক।
দিনব্যাপী এ সেমিনারের সমাপ্তি অধিবেশনটিতে সভাপতিত্ব করেন মেলবোর্নের বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় মোনাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শরীফ আস সাবের। এই অধিবেশনে অনুষ্ঠিত মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক কলামিস্ট রণেশ মৈত্র, বিশিষ্ট ভূতত্ত্ববিদ নজরুল ইসলাম, বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ড. কামাল উদ্দিন, বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ড. স্বপন পাল, ক্যানবেরায় বাংলাদেশ এসোসিয়েশনের সভাপতি এনামুল হক মুকুল, কৃষিবিদ জিয়াউল হক বাবলু, পিএইচডি গবেষক আহমেদ ইমরান, পিএইচডি গবেষক বায়েজিদুর রহমান প্রমুখ। আয়োজকদের পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ জানান উম্মে সালমা।
সেমিনারের শেষ পর্যায়ে সাবেক মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি আলগোর পরিচালিত পরিবেশ বিষয়ক তথ্যচিত্র çঅহ ওহপড়হাবহরবহ: ঞৎঁ:যÿ ও আনিসুর রহমান নির্মিত ‘গ্রামের নাম ফুলবাড়ি’ প্রদর্শিত হয়। বেনের দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘প্রিয় ক্যানবেরা’ ওয়েবসাইটের সম্পাদক শাহাদাত মানিকের সম্পাদনায় তথ্যবহুল একটি অনলাইন ক্রোড়পত্রও প্রকাশিত হয়।

যে সব ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের পরিবেশন দূষণের পরিণতি ও তা প্রতিকারের নানাদিক তুলে ধরেন তাদের মধ্যে কেরী টুকার, সাবেক সংসদ সদস্য বলেন, পরিবেশবিদ ও সুশীল সমাজ যৌথভাবে কাজ করতে হবে বাংলাদেশের ক্রমাবনতিশীল পরিবেশ পরিস্খিতির ইতিবাচক উন্নয়ন ঘটানোর লক্ষ্যে। অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মি. রিচার্ড ডেনিস, উন্নয়ন, অর্থনীতি ও বাংলাদেশের পরিবেশ দূষণের পর্যালোচনা করেন অর্থনীতিকে উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী করার জন্য পরিবেশ দূষণের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য পরিকল্পিতভাবে কাজ করার উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান। অস এইডের পরিবেশ ও আবহাওয়া পরিবর্তন ও তার ইতিবাচক অগ্রগতি, রিচার্ড ডেনিস, অস এইডেয় নির্বাহী পরিচালকের ‘এশীয় প্রশান্তæ মহাসাগরীয় এলাকায় আবহাওয়া পরিবর্তনের ওপর হস্তক্ষেপের নানা দিক’, কুন্তলা লাহিড়ী দত্তের ‘আন্তর্জাতিক পরিস্খিতির নিরিখে বাংলাদেশে খনিজসম্পদ প্রকল্পগুলো ও তার ঝুঁকি ও লাভের খতিয়ান,’ ইমতিয়াজ কায়েস রিপার ‘বাংলাদেশের পরিবেশ সংক্রান্ত আইনগুলোর মূল্যায়ন, তার কার্যকারিতা এবং যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংযোজনের প্রয়োজন’ ড. নারায়ণ চন্দ্র দাসের ‘ভবিষ্যৎ জ্বালানি সঙ্কট ও বাংলাদেশে তার বহুমুখী প্রতিক্রিয়া’, টিম স্টুয়ার্টের ‘আবহাওয়া সঙ্কটে পরিবেশকর্মীর করণীয়, ড. আবুল হাসনাত মিল্টনের ‘পরিবেশ ও জনস্বাস্খ্য’, নজরুল ইসলামের ‘আবহাওয়া পরিবর্তন’ এবং ‘কার্যকর জলব্যবস্খাপনা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’, ড. শম্পা বড়ুয়া, হাসপাতাল বর্জ্য ব্যবস্খাপনা ও বাংলাদেশ : একটি পর্যালোচনা’, ড. অজয় করের ‘দারিদ্র্য ও বাংলাদেশে বন উজাড় : কে দায়ী’ শীর্ষক প্রবগুলো একদিকে বাংলাদেশের নানা স্খানে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর অর্জিত অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি বিজ্ঞানের উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে লিখিত হওয়ায় তা প্রচণ্ডভাবে বাস্তবধর্মী হয়েছে বলে সেমিনার হলে উপস্খিত সুধীজনের গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। সর্বাপেক্ষা বেশি জোরদারভাবে জ্বালানি নীতিতে কয়লা উত্তোলন (জাতীয় স্বার্থের নিরিখে) অত্যন্ত জরুরি করণীয় এবং অনুরূপভাবে আবহাওয়া জলদূষণ ও কার্যকরভাবে ব্যাপক বৃক্ষায়নের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন বলে অভিমত প্রকাশ করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ সরকার চাইলে দেশে প্রয়োজনীয় সময়ের জন্য গিয়ে সব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করতেও এগিয়ে আসবেন বলে জানান।

এ প্রসঙ্গে জোর দেয়া হয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জবাবদিহিতা এবং অস্ট্রেলিয়াসহ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সরকারের বাইরেও দেশের সুশীলসমাজ ও আগ্রহী এনজিওগুলোর দ্রুত এগিয়ে আসার ওপর।
আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি হলো উপরোক্ত করণীয়গুলোর সঙ্গে অসৎ রাজনীতিবিদ, দুর্নীতিবাজ আমলা ও ব্যবসায়ীদের কঠোরভাবে শাস্তি প্রদান এবং শর্তহীন বিদেশী সাহায্য যুক্ত হলে বাংলাদেশকে শিগগিরই সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করা সম্ভব। এ বিষয়ে আদৌ কোন কালক্ষেপণ না করে সবাই দেশ বাঁচাতে উদ্বুদ্ধ হতে এগিয়ে আসবেন।

original | 03 October 2008